বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্ম ও তার ইতিহাস চেতনার কথা ভাবতে গেলে শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আসবে। সেই চেতনার পুর্ববর্তী ইতিহাসের প্রতি চোখ ফেরালেও দেখব তার বুকজুড়ে কেবলই লড়াই আর সংগ্রামের ইতিহাস। ৪৭এর দেশভাগ, ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬দফা আন্দোলন এবং ৬৯এর গণ অভ্যুত্থানের চেতনা টগবগ করছে আমাদের ইতিহাসে। এমন লড়াকু, সংগ্রামী, বারুদগন্ধা একটি দেশের চলচ্চিত্রের গানেও সেই ছাপ থাকবে এটাই স্বাভাবিক হওয়ার কথা। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এই যে, স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গান বিশেষত ৭০ থেকে ৯০ দশক পর্যন্ত তার মেলোডি দিয়ে আপামর মানুষকে মুগ্ধ করে গেলেও সেসব গানে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, লড়াই, সংগ্রাম বা দ্রোহের কোনো ছাপ পাওয়া গেছে এমনটা কিন্তু দেখা যায় না। বিস্ময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিতভাবে এটা হতাশারও ব্যাপার।
যদিও চলচ্চিত্র সংগীতের বেলায় একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না যে, এসব গান সৃষ্টি হয় মূলত ছবির কাহিনী ও চরিত্রকে মাথায় রেখে। আমাদের চলচ্চিত্র যে জনপ্রিয় ধারাগুলো মেনে নির্মিত হয়েছে সেখানে আন্তর্জাতিক মুভির মতো পলিটিক্যাল ড্রামা বলতে যা বোঝায় দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা ছাড়া তা কখনোই হয়নি, বা হতে পারেনি। ফলে এখনো পর্যন্ত আমরা জনপ্রিয় যেসব ধারা পেয়েছি তার বিষয়গুলো মূলত – ফোক, ফোক ফ্যান্টাসি, রোমান্টিক, অ্যাকশন কিংবা পোশাকি ছবি বা সামাজিক ছবি হিসেবে তকমা পেয়েছে। সুতরাং ছবির কাহিনীতেই সেই দুর্বলতা বিদ্যমান ছিল বলা যায়। ফলত দ্রোহের সেই উত্তাপ আমাদের চলচ্চিত্র সংগীতে সেই অর্থে পাওয়া যায় না।
তবে এসব ছবিতেও সমাজের চলমান অন্যায়, অবিচার, শ্রেণি বৈষম্য এবং নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র কিন্তু ঠিকই এসেছে, মজার ব্যাপার হলো, তারা যখন চলচ্চিত্রে গান গেয়ে উঠেছে সেখানে দ্রোহের উত্তাপ না পেয়ে শুধু হা-হুতাশই পেয়েছি। এ ধারার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে এমন একটি গানের কথা উল্লেখ করতে চাই, যা বাংলা চলচ্চিত্র সংগীত শ্রোতারদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। গানটি লিখেছিলেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, সুরকার সত্য সাহা এবং গেয়েছিলেন মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার-
তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়?
দুখের দহনে, করুণ রোদনে, তিলে তিলে তার ক্ষয়।।
আমি তো দেখেছি কত যে স্বপ্ন মুকুলেই ঝরে যায়
শুকনো পাতার মর্মরে বাজে কত সুর বেদনায়
আকাশে বাতাসে নিষ্ফল আশা হাহাকার হয়ে রয়।।
যদিও এই গান স্বাধীন বাংলাদেশে নির্মিত চলচ্চিত্রের নয়। এটি ১৯৬৮ সালে মুক্তি পাওয়া এতটুকু আশা সিনেমার, তবু উদাহরণ হিসেবে এই গানকে শুরুতেই চিহ্নিত করার কারণ আমার ধারণা পরবর্তীতে এটিকেই উদাহরণ মেনে আরও অসংখ্য গান বাংলা ছবিতে যুক্ত হয়েছে। এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার আগে উল্লেখিত গানটিকে নিয়েও কিছুটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়। আসুন এ গানের বাকি কথাগুলোতেও একবার চোখ রাখি –
প্রতিদিন কত খবর আসে যে কাগজের পাতা ভরে,
জীবন পাতার অনেক খবর রয়ে যায় অগোচরে।
কেউ তো জানে না প্রাণের আকুতি বারে বারে সে কি চায়
স্বার্থের টানে প্রিয়জন কেন দূরে সরে চলে যায়
ধরণীর বুকে পাশাপাশি তবু কেউ বুঝি কারো নয়।।
লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো, গানটি সিনেমাতে গাইছে সমাজের নিপীড়িত ও ব্যর্থ একজন মানুষ, কিন্তু তার বয়ানে সমাজের প্রতি রেগে ওঠা নেই, ক্রোধ নেই, দ্রোহ নেই, যা আছে তা হলো বয়ানকারী নিজে এখানে শুধু এক বিবৃতিদাতা মাত্র এবং তিলে তিলে ক্ষয়ে যাওয়া পরাজিত করুণ এই জীবনকে, সমাজকে, পালটে ফেলায় তার কোনো ভূমিকা নেই! করুণারপাত্র এই চরিত্র যেন আরেকটু করুণারই প্রত্যাশী।
কী করে এই গান পরবর্তীতে আইকনিক হয়ে উঠেছে সে আলাপে যাওয়ার আগে আরও কয়েকটি কথা বলে নিতে চাই। আসলে কোনো ধারারই তো হুট করে জন্ম হয় না, তার পরম্পরা থাকে। পেছনের গল্প বা ইতিহাস থাকে। প্রতীতি হয়, এই গান ১৯৫৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত উত্তম সুচিত্রা অভিনীত ‘শাপ মোচন’ চলচ্চিত্রের একটি গানের ভাবধারায় প্রভাবিত। যে গানের গীতিকার ছিলেন বিমল ঘোষ আর শিল্পী ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। পাঠকের সুবিধার্থে সে লিরিকটি সামনে পেশ করছি-
শোনো বন্ধু শো্নো, প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা
ইটের পাঁজরে, লোহার খাঁচায় দারুণ মর্মব্যথা।।
এখানে আকাশ নেই এখানে বাতাস নেই
এখানে অন্ধ গলির নরকে মুক্তির আকুলতা।।
জীবনের ফুল মুকুলেই ঝরে সুকঠিন ফুটপাতে
অতি সঞ্চয়ী ক্রুর দানবের উদ্ধত পদাঘাতে।
ইত্যাদি…
এই দুটি গান পাশাপাশি মিলিয়ে পড়লে বা শুনলে দেখবেন একটি সমিলধারা ঠিকই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। যাইহোক, এবার আমরা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র থেকে আরও কয়েকটি গানের এমন উদাহরণ দেখব।
০২
তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয় গানটি ১৯৬৮ সালের। এর এক বছর পর ১৯৬৯ সালে মুক্তি পায় ‘মায়ার সংসার’ শিরোনামের আরও একটি চলচ্চিত্র সেখানে শাপ মোচনের শোনো বন্ধু শোনো’র অনুকরণে আরও একটি গান শুরু হয় এভাবে-
শহরবাসী শোনো…
তোমরা যাদের মানুষ বলো না
বিধিও যাদের কান্না শোনে না
তারাও মানুষ কাঁদে তাদের প্রাণ
আমি চোখের জলে শোনাই তাদের গান।।
তাদের বুকের রিক্ত হাহাকার
কেউ বোঝে না ওগো কেউ শোনে না
সর্বহারার মর্ম বেদনা
দুঃখে যাদের জীবন গড়া মানুষ যাদের নাম
আমি চোখের জলে শোনাই তাদের গান।।
অর্থাৎ সর্বহারাদের মর্মবেদনা নিয়ে গান আর সে গানেও কোনো রাগ নেই, ক্ষোভ নেই, দ্রোহের বালাই নেই! কাজের কাজ হলো “আমি চোখের জলে শোনাই তাদের গান” বলে কান্নাকাটি করা। প্রথম গানটির মতো এই গানের শিল্পীও আব্দুল জব্বার আর গীতিকার কে জি মোস্তফা এবং সুরকার আনোয়ার উদ্দীন খান।
স্বাধীনতার পরে ১৯৭৪ সালে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের অবক্ষয় নিয়ে নির্মিত হয় ‘আলোর মিছিল’ চলচ্চিত্রটি। ছবির জনপ্রিয় একটি গান –
এই পৃথিবীর ‘পরে কত ফুল ফোটে আর ঝরে
সে কথা কি কোনোদিন কখনও কারও মনে পড়ে?
এটিও একই ধারার আরো একটি গান। তবে বেখাপ্পা লাগে এই ছবিতে যখন নায়ক (রাজ্জাক) চোখের সামনে অভাব, দুর্নীতি, চোরাকারবারি, লুটতরাজ আর অবিচার দেখেও বন্ধুদের আসরে গিয়ে কাঁদো কাঁদো সুরে গান গায়-
দুঃখ কোরো না, বন্ধু তোমরা যদি না পারি
আগেকার সেই সুরে সুরে গাইতে আমার গান
প্রশ্ন কোরো না, হৃদয় জুড়ে এ কোন অভিমান।।
…
হাজার মনের রক্তগোলাপ, অশ্রু শিশিরে ঝরে
কত প্রান্তর শূণ্য বুকের জ্বালা নিয়ে কেঁদে মরে
রিক্ত প্রাণের কান্নাগুলো, জানালো আজ এ কোন আহবান।।
এ গানের গীতিকার মোস্তাফিজুর রহমান, সুরকার সত্য সাহা এবং এ গানেরও শিল্পী আব্দুল জব্বার।
১৯৮০ সালে আব্দুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত ‘এখনই সময়’ চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিক ধারার বাইরের এক ছবি। সেই ছবিতে আমরা দেখি একটি পলিটিক্যাল পার্টিঅফিসের দৃশ্য, যেখানে বসে গীত হওয়া একটি গান ভীষণ সমাদৃত হয় সাধারণ দর্শক শ্রোতাদের কাছে। গানের শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন, গীতিকার মনিরুজ্জামান মনির এবং সুরকার শেখ সাদী খান। গানটি ছিল-
জীবন মানে যন্ত্রণা, নয় ফুলের বিছানা
সে কথা সহজে কেউ মানতে চায় না
চোখ মেলে যে দেখে না কাঁচের দেয়াল ভাঙ্গে না
কত কঠিন পৃথিবী সে বুঝতে পারে না।।
গানটি মেলোডিয়াস। শুনতে ভালো লাগে। দুঃখবোধ হয়। কিন্তু কোনো চেতনায় প্রভাবিত করতে পারে না এবং এটিও শেষ পর্যন্ত বিবৃতিমূলক করুণ রসেরই গান হয়ে ওঠে শেষ পর্যন্ত।
১৯৮১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ সিনেমাটি শুরুই হয় একাত্তরের পূর্ব কোনো এক সময়ের রাজপথের গণ আন্দোলনের একটি পথসভার দৃশ্য দিয়ে। সে দৃশ্যে অনেকের হাতে প্ল্যাকার্ড উঁচু করে ধরা, শ্লোগান দেখা যায়- জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো। শুরুতেই উদ্বোধনী সংগীত। এই দৃশ্যে দাবি করে মূলত গণ সংগীতের, অথচ আমরা শুনি হাহাকার ভরা বেদনার্ত গান –
জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো
আর কতদিন বলো সইবো
এবার আদেশ করো, তুমি আদেশ করো
ভাঙনের খেলা খেলবো।।
সুতরাং হতাশার ব্যাপার হলেও এটিই সত্য যে বাংলা চলচ্চিত্রসংগীত নানান ঘরানার শ্রোতা প্রিয় অনেক অসাধারণ গানের জন্ম দিলেও এখানে লড়াকু, স্বাধীনচেতা, বুক টানটান করা গণমানুষের জন্য সাহসী গানের জন্ম দিতে দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। উপহার দিয়েছে কেবলই করুণ রসের, দায় দায়িত্বহীন, হা হুতাশের গান।





কমেন্ট করুনঃ