শাহেদ কায়েস
বাংলা সঙ্গীত জগতে সলিল চৌধুরী এমন এক নাম, যাঁকে কেবল সুরকার বা গীতিকবির পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। তিনি ছিলেন যুগচেতনার কণ্ঠস্বর, সংগীতের ভাষায় সমাজের কথা বলা এক শিল্পসাধক। বাংলার লোকজ সুর, পূর্ব ইউরোপের বিপ্লবী মার্চ, ল্যাটিন আমেরিকার ছন্দ, পাশ্চাত্যের অর্কেস্ট্রেশন—এসবের অদ্ভুত এক সংমিশ্রণে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন এমন সুরব্যঞ্জনা, যার প্রতিটি নোটে অনুরণিত হতো মানুষের মুক্তি–স্বপ্ন। তাঁর গান ছিল যেমন মাটির মানুষের, তেমনই আন্তর্জাতিক মানবতার; ছিল ব্যক্তিগত বেদনার মতোই সংগ্রামের স্থির ঘোষণাও। # সলিল চৌধুরী নিজেও ছিলেন একজন অসামান্য কবি। তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তা উপলব্ধির জন্য সলিল চৌধুরীর ‘শপথ’ কবিতাকে এক উজ্জ্বল দিকনির্দেশক বলা যায়। কাকদ্বীপের মতো এক প্রান্তিক ভূখণ্ডে বঞ্চিত মানুষের ক্ষুধা, অন্ধকার, এবং জন্মের অধিকারহীন শিশুর কান্না—এসব তাঁর কাছে কেবল শিল্পের উপাদান নয়, বরং গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতার আহ্বান। কবিতায় আমরা দেখি বৃষ্টিভেজা রাতের হরতালের ভেতর দিয়ে উপেক্ষিত মানুষের আর্তস্বরে সাড়া দেওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত। “কার ঘরে জ্বলেনি দীপ—চির আঁধার তৈরি হও”—এই আহ্বান শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের নৈতিক দায়িত্বের স্মারক।
সলিল চৌধুরীর সৃষ্টিকে আলাদা করে তোলে তাঁর শিল্পীসত্তার ভেতর থাকা এই সমাজমানবতাবাদ। তাঁর সুর যেন কৃষকের জমিতে নতুন অঙ্কুরের মতো, শ্রমিকের হাতের ধাতব তাল, মাতৃহারা সন্তানের কান্না অথবা নিভে যাওয়া প্রদীপের সুপ্তগাথা। তাঁর মিছিল কেবল রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক নয়, এটিই সেই জনমানুষের মিছিল, যারা বঞ্চনা ও ক্ষুধার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই লিখতে চায়। তাই কবিতায় তিনি ঘোষণা করেন—“কোটি দেহের সমষ্টি এই আমিই হিমালয়।” এই উচ্চারণে আছে সংগ্রামী মানুষের শরীরী শক্তি, আছে তাদের অমিত সম্ভাবনার প্রতি গভীর আস্থা।
তাঁর নিজের কথা ও সুর করা কয়েকটি কালজয়ী বাংলা গান: ১. ‘গাঁয়ের বধূ’—হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (১৯৪৯), ২. ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’—হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (১৯৫৪), ৩. ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’—হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (১৯৬৯), ৪. ‘যা রে উড়ে যা রে পাখি’—লতা মঙ্গেশকর (১৯৫৯), ৫. ‘না মন লাগে না’—লতা মঙ্গেশকর (১৯৬৯), ৬. ‘ধরণির পথে পথে’—সুবীর সেন (১৯৮০), ৭. ‘আহা ওই আঁকাবাঁকা যে পথ’—শ্যামল মিত্র (১৯৬২), ৮. ‘যদি কিছু আমারে শুধাও’—শ্যামল মিত্র (১৯৬২), ৯. ‘প্রান্তরের গান আমার’—উৎপলা সেন (১৯৫৩), ১০. ঝুনঝুন ময়না নাচো না’—মুকেশ (১৯৬৮)—এমন অসংখ্য গান যুগের পর যুগ বাঙালিকে আন্দোলিত করে রেখেছে—এগুলোর তুলনা সত্যিই কিছুতে হয় না। আজও বাঙালির যে কোনো আন্দোলন, অধিকার দাবি কিংবা প্রতিবাদের মুহূর্তে তাঁর সুর করা ‘হেই সামালো’, ‘পথে এবার নামো সাথি’, ‘বিচারপতি তোমার বিচার’, ‘ও আলোর পথযাত্রী’—গানগুলোর কোনো বিকল্প নেই। এগুলো এখনো আমাদের সংগ্রামের মর্মে জ্বালিয়ে রাখে অপ্রতিরোধ্য আগুন।
তাঁর জন্মশতবর্ষের প্রাক্কালে আমরা যখন সলিল চৌধুরীকে স্মরণ করি, তখন তাঁর শিল্প শুধু নান্দনিকতার জন্য নয়, বরং মানবিক শক্তির জন্যই নতুন করে সামনে আসে। আধুনিক সমাজের নানা সংকট—অধিকারহীনতা, দারিদ্র্য, বৈষম্য—আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সলিল চৌধুরীর কবিতা ও গান এখনও অসমাপ্ত সংগ্রামের দিশারি হতে পারে। তাঁর সুর আমাদের শেখায়—শিল্প কেবল সৌন্দর্যের অলঙ্কার নয়, এটি মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস, প্রতিবাদ, প্রতিজ্ঞা এবং পরিবর্তনের সম্ভাবনা।
সলিল চৌধুরী তাই স্রেফ একজন সুরস্রষ্টা নন; তিনি বাংলার হৃদয়ে ন্যায়, প্রেম ও সংগ্রামের এক অবিনশ্বর সঙ্গীত।





কমেন্ট করুনঃ