ভোররাতে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির সাথে দমকা হাওয়া ক্ষণে ক্ষণে বাজপড়ার মাঝে আশির দশকের প্রথম দিকে পৃথিবীতে এক শিশুর আগমন ঘটে। তার মুখের জবানিতে তার চিৎকারের সাথে নাকি আযানের ধ্বনি মিলেমিশে গিয়েছিল। তার মা মূর্ছা যাওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত তার দ্বিতীয় ছেলে সন্তানের চিৎকার মস্তিষ্কে ধারণ করতে করতে স্বস্তিতে চোখ বুজেছিল। মায়ের সেই স্বস্তিতার স্নেহ মিশ্রিত প্রশয়ে কোমল গঠনে শিশুটি বেড়ে উঠেছিল নিজের উপর স্বেচ্ছায় আরোপিত এক স্বাধীনতা নিয়ে। অবশ্য স্বাধীনতাকে স্বচ্ছল পরিবারের আশীর্বাদ হিসেবেও আমরা ধরতে পারি। ছেলেটির সাথে আমার প্রথম দেখা হয় অগুনতি সন্ধ্যার কোন এক সন্ধ্যায় খোলা আকাশের নিচে এক দ্বিতল ভবনের ছাদে। সে নিজেকে পরিচিত করে মামুন হুসাইন নামে। গড়পড়তা বাঙালিদের চেয়ে লম্বা প্রায় পাঁচফুট এগার। দোহড়া গড়ন, উস্কোখুস্কো চুল, খাঁটি অস্ট্রালয়েড নাক, গোলাকৃতি মুখের গড়নে এক সারল্য ও আত্মবিশ্বাস যুগপৎ খেলা করে। প্রথম পরিচয়েই মামুন হুসাইন নামটি মস্তিষ্কে গেঁথে যায়। আড্ডাপ্রিয় ছেলেটির অন্তঃকরণ আভিজাত্য ও মানবিকতায় প্রশ্বস্ত। জেলা শহরের বাসে বসে সে এক জেলা শহর থেকে আরেক বিভাগীয় শহরে ঘুরে বেড়াত তার দীর্ঘ গঠনের শরীর নিয়ে। তাকে দেখা যায় সিদ্ধিরগঞ্জ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের খোলামাঠে, কখনও নিউমার্কেট হাজারো লোকের ভিড়ে, কখনওবা ধানমন্ডি লেকে, কখনও বাড়িধারায়, কখনও গুলিস্তান, শাহবাগ মোড়, কখনওবা পুরানা পল্টনের ফুটপাতের পাশে ধুলোমলিন জীর্ণ বইয়ের ঘ্রাণ নিতে। কিন্তু দিন শেষে তাকে পাওয়া যেত খোলা আকাশের নিচে বন্ধুপরিবেষ্টিত দ্বিতল ভবনের ছাদে। সে অনুভব করে তার কাঁপা কাঁপা হৃৎপিণ্ড, সিগারেটের নীলাভ ধোঁয়ায় একটি মেয়ের মুখ। তিলোত্তমার মত যার মুখের দিকে তাকিয়ে হত্যা করা যায়, হত্যা হওয়া যায়। সে লম্বা লম্বা বাক্যে মেয়েটির চাহনি, পোশাক, লঘু পদক্ষেপ, মুখের ভঙ্গি, তার নির্বাক দিনের গল্প বলে। সে প্রতিক্ষা করে আরেকটি দিনের আরেকটি ক্ষণের, আরেকটি মুহূর্তের যখন মেয়েটি আবার তার হৃৎপিণ্ড কাঁপিয়ে হেঁটে যাবে। সে এমিলি ডিকিনসনের কবিতা ভালোবাসত। তার বেডরুমের দেয়ালে কামরুল হাসানের পেইন্টিং ঝুলতে দেখা যায়। তার ওয়ারড্রোবের ওপরে সাজানো থাকে মানিক রচনাবলি। তার বেডসাইডে ছোট্ট টেবিলে ক্লাসিক্যাল মুভির অনেকগুলো ডিভিডি এবং বিছানার ওপর পড়ে থাকতে দেখা যায় দ্য নর্টন অ্যানথ্রোপলজি অব পোয়েট্রি, ফোরথ এডিসন বইটি ( কয়েক বছর পর বইটি আমার হস্তগত হয় )। চসার, শেক্সপিয়ার, শেলি, কিটস, মিলটন, ইয়েটসের ওপর নোট নিতে নিতে (সে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রছিল) সে ঝুকে পড়ে কম্পিউটারের প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের দিকে এবং তার সব সময়ের আইকন হয়ে ওঠে স্টিভ জবস। স্টিভ জবস প্রতিদিন ট্রাফিক সিগন্যাল ভাঙার জরিমানা দিত। একটি গাড়ির গ্যারেজে জায়ান্ট আইটি কোম্পানি অ্যাপলের যাত্রা শুরু হয়। স্মার্ট ফোনকে স্মার্ট করে তোলে অ্যাপল। এরকম নানা তথ্য তরঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়ত মামুনের সরল চাহনির বাক্যে ও গঠনে। । কথা প্রসঙ্গে সে একবার বলেছিল ওয়েদারিং হাইট তার প্রিয় বই। তার ভালো লাগত শেক্সপিয়ারের নাটকের চরিত্রগুলো। তারা নাকি তাকে ঘুমে স্বপ্নে ঘোরে আবদ্ধ করত কোনো কোনো শেষ রাতে। সে একবার সমুদ্রে ঝড়ের মুখে পড়ে টার্নারের আঁকা জাহাজের মাস্তুল ধরে ঝুলেছিল এবং পর মুহূর্তে নিজেকে খুঁজে পেয়েছিল বালির মাঝে মুখ ডুবিয়ে পড়ে থাকতে। সে নিজেকে আবিষ্কার করেছিল জনপ্রাণীশূন্য এক দ্বীপে একা, সঙ্গীহীন। সে নাকি দীর্ঘক্ষণ শুধু হেঁটে বেড়িয়েছিল একটি মুখের প্রতিচ্ছবি নিয়ে। সে জেনেছিল এই দ্বীপের কোথাও সে মেয়েটিকে খুঁজে পাবে, যার চোখে সেই হবে তার প্রথম আকাঙ্ক্ষিত পুরুষ, যেখানে কেউ কখনও তাকে আর খুঁজে পাবে না। যেন বা সে দ্বীপ আর মেয়েটিকে নিয়ে এই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে একদম বেমালুম গায়েব হয়ে যাবে। সে হাঁটতে থাকে ক্লান্তিহীন, যে হাঁটার কোনো শেষ হয় না। সেই ক্লান্তিহীন হাঁটায় ইস্তফা দিয়ে একদিন আমরা তখন দেখি মামুন হুসাইন শূন্যে ভাসছে। তার আইফোন ও আইপডের সাথে আমরা দেখি সে ধীরে ধীরে এক আগন্তক হয়ে উঠেছে, আমাদের পরিচিত মাঠে, ইটের রাস্তায়, বাড়ির ছাদে, রেললাইনের স্লিপারে, বটগাছের তলায় যেখানে এক চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে কাক আর মানুষের আনাগোনায় যেখানে তাকে দুপুরে মাঝে মাঝে বসে থাকতে দেখা যেত। মামুন হুসাইন ব্যস্ত হয়ে উঠে জিম্যাট, আইএলটিএস, ব্যাংক সলভেনসি, সিকিউরিটি মানি এবং কোনো এক উন্নত দেশের ভিসা নিয়ে। সে রাতে ফিরতে দেরি করে তার পরিচিত ছাদের আড্ডায়। সে অপেক্ষা করে কোনো একদিন সে তার বন্ধুদের এয়ারপোর্টে বিদায় জানাবে এবং ফিরে আসার আশ্বাসে তার চোখ ভিজে উঠবে। তারপর কোনো এক রাতে তার খুবর শুনতে পাই সে দূরতম দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। দূষিত বায়ুতে ভরা খোলা আকাশের লুকানো তারার মতো মামুন হুসাইন অন্য এক দেশের স্বচ্ছ ঝকঝকে আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে হয়তো সে চেয়ে থাকে অগুনতি তারার দিকে। আর আমরা হঠাৎ আবিষ্কার করি মামুন হুসাইন আমদের শহরের ঘোলা আকাশে ম্রিয়মান একটি তারার মতো উজ্জ্বল হয়ে বিকিরণ করে আমাদের একঘেয়ে ক্লান্ত জীবনে।
মামুন হুসাইন, জন্ম ১৯৬২ তে কুষ্টিয়ায়। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিদ্যা বিভাগে কর্মরত। নিক্রপলিস উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন বাংলার পাঠশালা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পুরস্কার। ২০১৯, আগস্ট ৩, শ্রুতির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে মামুন হুসাইনকে রনজিত পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে পুরস্কার গ্রহণের সময় মামুন হুসাইন দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই মুহূর্ত ধরে আমরা মামুন হুসাইনকে নতুনভাবে আবিষ্কার করি।
মামুন হোসাইনের ভরাট কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়েছে অডিটোরিয়ামের প্রত্যেকটি কোণে আর মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ স্থানু করে রেখে ছিল গুপী-বাঘার গানের মতো করে। মানুষের সম্মিলিত নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই। আমি দেখি আর কানে আসে কোনো ধ্রুপদী সঙ্গীতের ন্যায় বাক্যের পিঠে চড়ে নানা বর্ণের বর্ণাঢ্য বাক্যের মিছিল। আমরা নিক্রপলিসের দৃশ্যকল্পের ভেতর ডুবতে ডুবতে পৃষ্ঠার অক্ষরগুলোতে যে দুর্ভাবনা চঞ্চলতা আহত করে, তার ভেতর থেকে মুখ ভাসিয়ে মামুন হুসাইনকে আবার অবলোকন করি। চোখের দীপ্তিতে উজ্জ্বলতা আর মুখের আভায় নির্মল সরল হাস্যময়। কথার মানবিকতায় লম্বা সটান মানুষটি আমাদের চিন্তালোকের একজন সঙ্গী। আমরা মামুন হোসাইনের সাথে বিচরণ করি। আমাদের চোখের তারায় লুকানো কান্নায় রনজিত কুমারের উপস্থিতি তিনি টের পান। মামুন হুসাইন আমাদের কান্না ও রনজিত কুমারের প্রতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তার কথায় সুর তুলে উনি চলে যান পুরস্কার না তিরস্কার, নোবেল, টলস্টয়, সাম্রাজ্যবাদ, আমলাতন্ত্র, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, প্রান্তিক মানুষের জীবনরেখা, পেছন ফেরা দেখা এবং হঠাৎ নিশ্চুপতার বলয় ভেঙে দিয়ে তার বক্তব্যের সমাপ্তি। আমাদের বুকের রক্ত উদ্বেল হয়, মুগ্ধ হই তার পাশে দাঁড়িয়ে মুহূর্তকে সেলফোনের ক্যামেরায় ধারণ করি। অটোগ্রাফ নেই এবং তাকে মননে ও স্মরণে জড়িয়ে যে যার মতো করে বাসায় ফিরি ঘোর ভাঙা এক ঘোর নিয়ে। আমরা আহত হেয়ালি নিয়ে তারা কাঁটায় বিদ্ধ কাটা শরীরের স্বরূপ উন্মোচনে কয়েক রাত নির্ঘুম পাড় করি। প্রাচীন বাংলা অক্ষরের পরপর কয়েকটি লাইন পেরিয়ে ধুসর ও কালো রঙের মাঝে ফুটে উঠা লাল অক্ষরের মৃতদের নগরে বিচরণ করি একা আমাদের আদিম ভয় ও ব্রাত্য রক্তের কাপুরুষতা নিয়ে। আমরা দ্বিমাত্রিক হাতের শাহাদাত ও বৃদ্ধাঙ্গুলের ফাঁক গলে ছয়টি কড়ি একলাইনে সমানভাবে পড়তে দেখে আমরা কিশোর বয়সের কৌশল অনুসন্ধানে বেড়িয়ে পড়ি। শৈশবের এক রঙ বাদামি, হালকা বাদামি, গাঢ় বাদামি, ধুসর বাদামি উজ্জ্বল বাদামি, ম্রিয়মান বাদামি, অস্পষ্ট বাদামি, অ্যাবস্ট্রাক্ট বাদামির নানা প্রলেপে দৃশ্য পাঠের নানা চিহ্ন ফুটে উঠলে, আমাদের বুকজুড়ে পালানোর দীর্ঘ স্মৃতি শব্দহীন হয় ঘুমের ভেতর। আমরা অলংকারের খোঁজে নারীদের নরম বুকের মাংসে দাঁত বসাই আর পলাতক শ্রেষ্ঠ সমুদ্দরটি ও সুন্দরতম দিনের খোঁজে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে একদিন আসবে এই আশ্বাসে ধুসর কাগজ ছুয়ে আঙুলের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা খোলা চোখ দিয়ে লক্ষ লক্ষ মাইলব্যপি ছড়ানো বধ্যভূমির ভেতর কারো হেঁটে যাওয়া অবলোকন করি। আমরা সেলুলার টিভি স্ক্রিনে রক্তপাত, মৃত্যু, ক্ষত, হত্যা, গুম, অনাহার, অর্ধাহার, রোগ বালাই, গৃহহীনতা দেখতে দেখতে অবসন্নতায় ভর করি কিংবা অবশ হওয়ার এক অনুভূতি আমাদের ওপর ভর করে। কালচারাল অ্যানাসথেসিয়ায় আক্রান্ত দেহমন নিয়ে আমরা যখন ঈশ্বর, নারী ও মাতৃত্ব বিষয়ে অভিজ্ঞান রচনায় হাত দেই, তখন দেখি একজন নারী একজন মা যা চান, ঈশ্বর যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে তাই চাইছেন। আমরা গদ্যের বিষয়বস্তু ঠিক করতে এক কন্যাকে করা কোনো যুবকের টেক্সট ম্যাসেজ ধার করি; ধরা যাক একবার তীব্র বৃষ্টির সন্ধ্যায় আমরা আটকে যাই ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের অফিস বারান্দায়। বৃষ্টি আমাদের বিপন্ন করে, বিহ্বল করে, বিভ্রম ছড়ায় এবং রেজিস্ট্রারের কুমন্ত্রণায় দ্রুত স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে সরকারি খাতায়। সেই থেকে আমাদের শুরু হয় পরস্পরকে এমন কিছু দেওয়া যা আদতে আমাদের ছিল না। আমরা অদৃশ্য কিছুতে রুপান্তরিত হওয়ার বাসনায় নিজেদের খরচ বা ধ্বংস করে ফেলি অন্য মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে এবং একভরা পূর্ণিমায় বাঞ্চোদ চাঁদের দেখা পাই ব্লাকআউট হওয়া সুসজ্জিত নগরীতে। আমাদের গলা ভিজে গেলে, ব্যথা হলে, বমির মতো কষ্ট নিয়ে মেমোরাইজ করি- টেরোরিজম ইজ দ্য ওয়ার অব দ্য পুর, অ্যান্ড ওয়ার ইজ দ্য টেরোরিজম অব দ্য রিচ। এরপর আমরা জোর পালাতে শুরু করি একই পথে, প্রতিদিন পালাতে পালাতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করি এবং একটি মসৃণ দেয়ালের কাছে এসে আটকা পড়ি। এবার গুলি করা হবে- একটি ভালো বন্দুকের ভালো গুলি ছুড়ে, ভালো একটি কোদালের গর্ত খুড়ে ভালো মাটির রাজ্যে আমাদের ভালো দেহটি সমাধিত হতে হতে আমরা জমির দখল নিয়ে নিস্তব্ধতায় ডুবে যাই কুয়াশা ও আলোর ভেতর প্রাচীণ আগুন আগুন দেখতে দেখতে। আমরা সাবানে লোবানের গন্ধ মেখে ফেলে যাওয়া বিপুল জনগোষ্ঠীর মুখ ও মুখোশের সাতকাহন, হারিয়ে যাওয়া পথনাটকের পথ ধরে বেড়ে উঠা মাদ্রাসার বিস্তার, আজাব ও আগুনের ভয় আগলে থাকা মানুষের মন মগজ ও তার বিবিধ ব্যবহারের চর্চা, চর্চিত মানুষের বিবমিষা, আত্মহননের হাস্যোজ্জ্বল মুখ স্মৃতিতে অবলোকন করি এবং আমাদের ঊন বুদ্ধির মন ও মগজে আমূল বিদ্ধ হতে হতে মৃত, জীবিত নগরীর ওপর দিয়ে বিচরণ করি। আমাদের বিভ্রম জাগে সত্য থেকে আরও উন্নততর সত্যে। আমরা ভেবে নিই মামুন হোসাইনের শৈশবের বিচরণ খোয়াবনামার সখিনার চোখের তারায় ভেসে উঠা আরেকটি খোয়াবনামার মতো, যার অর্থ উদ্ধারে এক জেলা শহর থেকে আরেক জেলা শহরে মানুষের নিঃসঙ্গ বিপুল আর্তনাদের সঙ্গী হয়ে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দিয়েছেন নানারকম চিন্তার বুননে, সেলাই ও কাটাছেঁড়া করে, শব্দের পর শব্দ বুনতে বুনতে হেঁটে চলেছে অসীম জগতে। আমরা মামুন হোসাইনের পথের সঙ্গী হই, অসুখী হই ঘুমের ভেতর সারাজীবনের সমস্ত বিষণ্নতা জমা করে একা হই, তারপর কোনো একদিন চিরকালের মতো যে যে যার যার মতো নিখোঁজ হয়ে যাই।
দাইমার ভয়ার্ত চিৎকারের সাথে মিশেছিল নবজাতক এক শিশুর কান্না। আর যন্ত্রণায় কুকড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে জ্ঞান হারিয়েছিল শিশুটির মা। সেদিন ছিল পনের ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার নিচের এক শীতার্ত রাত যখন এক শিশুর পৃথিবীতে আগমন ঘটে। তার বাবা জামাল উদ্দিন তার দীর্ঘ দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে ঘরের বাইরের বারান্দায়
একমনে জিকির করছিল। আর তার মা প্রসব বেদনায় নীল হয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে উর্দ্ধে কারও কাছে সাহায্য প্রার্থনা সহযোগে শিশুটিকে পৃথিবীতে আনার সম্ভাব্য চেষ্টায় রত ছিল। সেদিন বার্থ ক্যানেলের মুখে আটকা পড়ে শিশুটি হাবি খেতে খেতে মায়ের জরায়ুর থেকে অলৌকিক এক উপায়ে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পেয়েছিল। বলা হয়ে থাকে জীবিত প্রতিটি মানুষই কয়েক কোটি জীবনের সম্ভাবনাকে পরাজিত করে মায়ের জরায়ুতে বিজয়ী বেশে তার জীবনের সূচনা ঘটায়। তার প্রমাণস্বরুপ এনজিওর ডাক্তারদের মেডিক্যাল ফ্রি ডেলিভারিকে বাতিল করে তার বাবা যখন একজন দাইমা ঠিক করে শিশুটিকে পৃথিবীতে আনার দায়িত্ব দিয়ে, তখন দাইমার পুরানো অভিজ্ঞতায় ও মামুন হোসাইনের বিজয়ী সত্তার গুণে অসময়ে পানি ভেঙে পড়া তার মায়ের জরায়ু থেকে বার্থ ক্যানেলের মুখে আটকে পড়ার পরও বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। এবং তার মা সম্ভাব্য সমস্ত বিপদকে বৃদ্ধাঙুল দেখিয়ে ঘণ্টা তিনেক পর জ্ঞান ফিরে পেয়েছিল। জামাল উদ্দিনের প্রথম ছেলে হিসেবে জন্ম নেওয়া শিশুটির জন্য মানত ছিল সে কোরআনের হাফেজ হবে। সাদা টুপি সাদা পাজামা ও সাদা পানজাবি পরে তার নরম কোমল ছোট ছোট আঙুল কোরআনের আরবি হরফ ছুয়ে ছুয়ে সুর করে কোরান পাঠ করবে। বাবার সাথে কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়বে। কোরআনের হাফেজ হয়ে ইমামতি করবে তারাবির নামাজের, এই ধরনের নানারকম জল্পনা-কল্পনায় জামালউদ্দিন তার ছেলেকে প্রথম কোলে নিয়ে পেয়ারা নবীর নাতির নাম মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে হুসাইন বলে। আর তার মায়ের আদরের ডাকে হোসাইনের আগে এসে যুক্ত হয় মামুন নামটি। মার মানত ছিল তার ছেলে সুস্থ হয়ে জন্মালে নিরানব্বইজন ফকির-মিশকিনকে একবেলো পেট চুক্তিতে ভাত খাওয়াবে। পরে শিশুটির জন্মের তিন মাস পর তার আকিকা করে নিরানব্বইজন ফকির-মিসকিনের সাথে গ্রামের মসজিদের ইমাম, চেয়ারম্যান, জোতদার, ইটখোলার ব্যবসায়ী, প্রতিবেশী সবাইকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা একটি আস্ত গরুর মাংস দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজন করেন তার বাবা। আর নাম ঠিক করা হয় মামুন হুসাইন। সে বেড়ে উঠেছিল নদীর পাড় ঘেঁষা মধ্যনগর নামের একটি ছোট গ্রামে। যেখানে তখন একটি দুটি করে ইটের ভাটা তার খোলা মুখ চিমনির এক মাথা নিয়ে এক দুই করতে করতে পুরো নদীর পাড় জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আকাশ ঘোলা করা ব্রিকফিল্ডের চিমনির ধোঁয়ায় আকাশের নিচে মামুন হুসাইন বেড়ে উঠছিল কওমি মাদ্রাসার শিক্ষায়। সে মায়ের পরম আদর আর বাবার স্নেহ মিশ্রিত শাসনের সাথে সাথে নবী, খলিফা, আল্লাহ, নামাজ, রোজা, জাকাত, কোরবানি, দোজখ, বেহেশত, হাসর, আজাব সম্পর্কেও শিক্ষা লাভ করছিল। মাত্র পনের বছর বয়সেই সে কোরআনের হাফেজ হয়েছিল। এই সুখবরটা যখন মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল নিজে এসে তার বাবার কাছে জানায়, তখন তার বাবা আদর্শ টেলিকমের প্রোপ্রাইটর, পুরো বাজারে মিষ্টি বিতরণ করে। তার মার মানত অনুযায়ী দুইশত রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, তখন রাত প্রায় শেষ। এর মাঝেই মামুন হোসাইনের বাবার বুকে গোপনে লুকানো এক ব্যথার উদয় হয়। তার বাবা ব্যথার ঘোরে কেঁপে কেঁপে ওঠে, তার মায়ের নাম ধরে চিৎকার করে ওঠে। তার মা স্বামীর পাশে বসে কপালে মাথায় হাত বুলায়, অনবরত দোয়া ইউনুস পড়তে পড়তে তার বুকে ফু দিতে থাকে। হৃৎযন্ত্র বিকল হওয়ার ব্যথা নিয়ে তার বাবার শরীর পুরো ঘামে ভিজে ওঠে। তার মা মামুনকে বলে পাশের বাসার এক প্রতিবেশীকে ডেকে নিয়ে আসতে। কিন্তু এর মাঝেই তার বাবার মুখ থেকে ভাঙা ভাঙা স্বরে মামুন বলে ডাকতে গিয়ে কণ্ঠ যেন থেমে যায় আজরাইলের অনিমন্ত্রিত জান কবজে। যখন তার মা বুঝতে পারে তার স্বামী মারা গেছে তখন ফজরের আজানের ডাক শোনা যায়। এবং দীর্ঘ বারো বছরে সেই প্রথম তার মা ফজরের নামাজ পড়তে ভুলে যায়। সদ্য কোরানের হাফেজ হওয়া মামুন হুসাইন অনির্নীত আঘাতে তীব্রভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এবং সংসারের এই বিপুল যজ্ঞে মৃত্যুই একমাত্র সত্য বলে আবিষ্কার করে। সে তার মৃত বাবার দেহের পাশে পলকহীন তাকিয়ে থাকে এবং বুঝতে পারে তাকে আগলে রাখা তার বাবার শক্তিশালী হাত তার মাথার ওপর থেকে হারিয়ে গেছে। বাবাকে কবরে নামিয়ে তার ওপর মাটির বৃষ্টি ঝড়িয়ে সে যেন এক অন্য মানুষ। আদর্শ টেলিকমের একমাত্র উত্তরাধিকারী মামুন হোসাইনের অভ্যস্ত রুলটানা জীবনের বাইরে নতুন পৃষ্ঠা সংযোজিত হয়। যেখানে আয়াত, ওয়াক্ত, ফরজ, সুন্নত, জামাতের সাথে সাথে কর্পোরেট টেলিকম কোম্পানির নিত্যনুতন অফারের কলরেট মিনিট বান্ডেল এমবি গিগাবাইট তার দৈনন্দিন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পায়ের গোড়ালির ওপর পাজামা আর পাঞ্জাবি পরিহিত মামুন হুসাইনকে নিয়মিত আদর্শ টেলিকমে সকাল সাতটা থেকে রাত দশটা নামাজের ওয়াক্ত বাদে বসে থাকতে দেখা যায়। এরকমই একদিন টপস আর জিনস পরা একটি মেয়ের মুখ দিয়ে বের হওয়া দেশের সেরা নেটওয়ার্ক সেরা কলরেট লেখা লাল রঙের আধিক্য চোখের কোটরে ছায়া ফেললে মামুন হোসাইনের কাছে বার্তা আসার মতো তার মস্তিষ্ককে অন্য ধরনের অনুরণন ঘটে। সাদা কাফনে মোড়া তার বাবার নিষ্প্রাণ দেহ কবরের শায়িত অবস্থায় অকস্মাৎ তার বুক খামচে ধরে। সে জীবনের নশ্বরতা আর অনন্তজীবনের মাঝের তফাত বুঝতে পারে। সে একরকম মনস্থির করে যে জীবনের ক্ষণস্থায়ী সময়টা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করাই সর্বোত্তম। সে শরতের এক সকালে তাবলিগ জামাতের সাথে চল্লিশ দিনের এক চিল্লায় বেরিয়ে পড়ে বগুড়ার শান্তাহার নামের এক জায়গার উদ্দেশে তার রুগ্ন স্বল্পবাক মায়ের দোয়া নিয়ে। এরকমই তাবলিগ জামাতের সাথে মানুষকে দ্বীনের ইলমের কথা শোনাতে শোনাতে এক বিকেলে আমার পথ রুখে দাঁড়ায় আমার সাথে দুটা কথা বলার উদ্দেশ্যে। তার হাস্যময়ী নিস্পাপমুখ, নরম কালো দাড়ি আর চোখের উজ্জ্বলতার সাথে সাথে দ্বীনের উচ্চারিত শব্দাবলির বর্ষণ শেষে তার পরিচয় জানতে চাইলে সে নিজেকে মামুন হুসাইন নামে পরিচিত করে। মামুন হুসাইন আমাকে নবীর জীবনযাপন, পরকালের অনন্ত জীবন, হাসরের ময়দানের কথা শোনায়। কিয়ামতের লক্ষণ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ করে দ্বীন ইসলামে মানুষের মুক্তির কথা বলে। আমি তার সরল চাহনি আর গভীর বিশ্বাসের কাছে নিশ্চুপ থাকি। আর সে তার বেডিং ও কাপড়ের পুটলি নিয়ে তার অন্তঃগত বিশ্বাসের শব্দ ছড়িয়ে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায়। পরে কোন একদিন তার হাস্যমুখ নিয়ে হাতে ধরিয়ে দেয় তার বিয়ের নিমন্ত্রণের কার্ড। আমি আসব বলে আশ্বাস দেওয়ার সাথে সে যেন নববধূর রঙিন আঁচলে আর দ্বীনের এলেম নিয়ে অদ্ভুতভাবে হারিয়ে যায়। হয়ত তাকে পাওয়া যাবে মধ্যনগর গ্রামের মসজিদে নামাজের ওয়াক্তে, না হলে তার আদর্শ টেলিকমের দোকানে যেখানে যাওয়ার পথ আমার পথে কখনও পড়ে না।
মামুন হুসাইন সুদূরের অতিথি পাখি
মামুন হুসাইন বিপন্ন লক্ষ্মীপেঁচা
মামুন হুসাইন থিকথিক ঘরে ফেরা চড়ুই
নাহলে লাক্স সাবান
সাম্পান
খেজুর।
যদি কোনোটার মাঝেই মামুন হুসাইনকে চিনতে পারা না যায়, তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেন। তাদের প্রত্যেককেই আপনারা মামুন হুসাইন নামে চিহ্নিত করতে পারবেন।





কমেন্ট করুনঃ