পুলক হাসান
চিন্তা-চেতনায় প্রাগ্রসর এবং বিদ্যাবুদ্ধিতে আধুনিক ও আলোকিত মানুষ সলিমুল্লাহ খান। ব্যাপক তাঁর জ্ঞানার্জনের পরিধি। সে-অর্জনে তাঁর সৃজনপ্রয়াসও বিচিত্রমুখী। তবে তাঁর মধ্যে প্রবল মানব ইতিহাসের সত্যানুসন্ধানে প্রবহমান বাস্তবতার নির্মোহ গ্রন্থনা। তথ্যপ্রমাণ ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তাকে হৃদয়গ্রাহী করে তোলার মুন্সিয়ানা। যার মধ্যে আমরা দেখি পশ্চিমী ও সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার মুখোশ বাস্তবতা। অর্থনৈতিক লালসা থেকে শোষণের অভিনব পন্থায় দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার হীনচিত্র।
সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার তথাকথিত সে নব-ইতিহাস সৃষ্টি বাস্তবে এক কলঙ্কিত অধ্যায়, যা দেশে দেশে রক্তক্ষয়ী পাঠ থেকে রচিত। তার প্রত্যক্ষ বিভীষিকা ও নেপথ্য নিষ্ঠুরতার যুক্তিসংগত উপস্থাপনা সলিমুল্লাহ খানের সিরিজগ্রন্থ ‘ইতিহাস কারখানা’। এ সিরিজের প্রথম কান্ড তথা প্রথম প্রয়াস ‘সত্য সাদ্দাম ও স্রাজেরদৌলা’ এবং দ্বিতীয় কান্ড ‘আদমবোমা’। পশ্চিমী দুনিয়ার কখনো ব্রিটিশ কখনো ফরাসি এবং ইঙ্গ-মার্কিন জোটের এই যে ইতিহাস পয়দা তা আসলে ইতিহাসের করুণ ধারাপাত। যে কারণে বাংলার নবাব সিরাজ উদদৌলা ও ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের পরিণতি প্রায় একই সূত্রে গাঁথা। দুজনই ছিলেন জাতীয় বীর ও জাতীয়তাবাদী নেতা। ফলে পশ্চিমাদের কাছে অনিবার্য হয়ে ওঠে তাদের হত্যা। পশ্চিমা শক্তির এ মিশন মূলত মুসলিম বিশ্বকে নেতৃত্ব-শূন্য করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। মোগল থেকে ইরাক পর্যন্ত তাদের নগ্ন হস্তক্ষেপ জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নির্মূল করারই অপপ্রয়াস। ইতিহাসের আলোকে সেই সত্যই উন্মোচন করেছেন সলিমুল্লাহ খান। দেশে দেশে বিশেষ করে আরব বিশ্বে জাতীয়তাবাদী জাগরণকে বিস্ফোরণের চোখে দেখে পশ্চিমা বিশ্ব, যে কারণে রাজ্যহারা ফিলিস্তিনি কিশোরের দেশের জন্য আত্মত্যাগকে মনে করে ‘আদমবোমা’। এই আত্মঘাতী হামলা স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রীলঙ্কার মাটিতে তামিল টাইগারও কম চালায়নি। কিন্তু পশ্চিমারা এই আত্মঘাতী হামলার জন্য আরব বিশ্বকেই আতঙ্ক মনে করে। অথচ এই আতঙ্ক তাদেরই তৈরি। তারা আরব তেল সম্পদ লুটপাট ও অস্ত্র বাণিজ্যের জন্য নানা অজুহাতে একের পর এক আরব রাষ্ট্র অস্থিতিশীল করে তুলছে। গণতন্ত্রের নামে তৈরি করছে স্থায়ী রক্তপাত। যার ফলে সেখানে নিত্যই শোনা যাচ্ছে আত্মঘাতী বোমার ঘটনা। তাতে প্রাণ দিচ্ছে নিরীহ জনগণ। অন্যদিকে নিশঙ্কচিত্তের ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি বিমান হামলার সামনে অকাতরে জীবন দিয়ে দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে চলেছে। তারা ধরেই নিয়েছে এটাই তাদের একমাত্র মুক্তির পথ। তার মধ্যে আমরা আমাদের স্বাধীনতার মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কালজয়ী ভাষণের অমর সেই পঙ্ক্তির প্রতিধ্বনি শুনি : ‘আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়া রাখতে পারবা না’। তাদের অন্তরের ভাষা অন্তত বুঝতে পেরেছিলেন ব্রিটিশ নাট্যকার হ্যারল্ড প্রিন্টার। এখানে তাঁর ‘বোমা’ কবিতাটি হুবহু তুলে দেয়া হলো:
বলবার মতো আমাদের আর কোনো কথা নাই
যা বলার তা বলবে আমাদের বোমা
আমাদের মাথা ফেটে বেরিয়ে এসেছে ও মা
যা বলার তা বলবে আমাদের বোমা
আমাদের শেষ ফোঁটা লোহু চুষে খায়
যা বলার তা বলবে আমাদের বোমা
মড়ার মাথার খুলি
সুন্দর পালিশ হবে এমন বোমায়।
সলিমুল্লাহ খান অনূদিত হ্যারল্ড প্রিন্টারের এই কবিতা থেকে আমরা এই বার্তা পাই যে, আগ্রাসী ইসরাইলের তোপের মুখে জীবন বোমাই নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের ভাষা। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত মাতৃভূমির অধিকার দাবিতে এভাবেই তারা ঝরে যেতে প্রস্তুত। তবু পিছু হটবে না। আর তাদের সামনে এই মরণপণ ছাড়া কিইবা করার আছে? তারা সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের শিকার। এ ষড়যন্ত্রের বীজ বপন করে গেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। ১৯৩৫ সালে তাদের উপর থেকে মেন্ডেট তুলে নিয়ে নিজ ভূমিতে অবৈধ ইহুদি রাষ্ট্রটির গোড়াপত্তনের সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে মার্কিনের সরাসরি মদদে তারা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অবশিষ্ট ভূমি থেকে পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের উৎখাতে তৎপর। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একচোখা ভূমিকায় পাত্তাই পাচ্ছে না জাতিসংঘ। এই যে ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমির অধিকার দাবির মুক্তির সংগ্রাম পশ্চিমা ও সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির দৃষ্টিতে সেটাই সন্ত্রাস বলে গণ্য। সলিমুল্লাহ খান নম্র শ্লেষে সেই নির্মম সত্যেরই নসিহত করেন আমাদের। তাঁর প্রাজ্ঞ বিশ্লেষণে আমরা অভিভূত হই। তিনি ইতিহাস তালাশে আমাদের এর মর্মোদ্ধারের দিকে নিয়ে যান। আরব পন্ডিত, ইতিহাসবিদ তালাত আসাদের বরাতে পরিস্কার করে দেন ‘আদমবোমা’ তথা স্বেচ্ছা-মৃত্যু পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে ধর্মীয় উন্মাদনা ভাবা হলেও আদপে তা এসেছে স্বাধিকার সংগ্রামের চেতনা থেকে। ‘আর এর জন্ম খোদ ইতিহাসের গর্ভাশয়ে। আত্মঘাতী বোমা অসহায়ের শেষ সহায়, ভাষাহীনের শেষ ভাষা মাত্র। এসলামের হৃৎপিন্ডে বোমা নাই- বোমা বাঁধা নিছক ইতিহাসের কোমরবন্ধে’। আত্মঘাতী বোমা হামলার কার্যকারণ ও সত্যানুসন্ধানে সলিমুল্লাহ খান বহু মনীষীর ব্যাখ্যা বয়ানে তথ্য উপাত্তের বহু বাঁক ঘুরে দেখেছেন। সেজন্য তাঁর ‘আদমবোমা’ বহিখানা পড়া খুবই জরুরি।
২
মূলত জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে রচিত মহাত্মা আহমদ ছফা’র সাহিত্য। তিনি তাঁর সাহিত্যে জীবন চেতনাকেই ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি মনে করতেন, যুদ্ধের মধ্যদিয়েই যখন একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, একটি জাতির নতুন পরিচয় ও ইতিহাস রচিত তখন সে-যুদ্ধকে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ কি ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ যেভাবেই দেখা হোক না কেন, পেছনে অর্থনীতি, রাজনীতি কি ভাষা এমন সব মৌলিক দিকগুলোর পরিবর্তন কামনা করেই তা সাধিত হয়। ফলে তাকে ‘বিপ্লব’ ভাবাটা অসমীচীন নয় বরং যুক্তিযুক্ত। সেই মৌলিক চেতনা থেকেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পর্বটাকে বিপ্লব হিসেবে দেখেছেন আহমদ ছফা। তাঁর লেখার উৎসার সেখানেই। মুক্তিযুদ্ধ যদি জাতীয় সাহিত্যের আধার তবে বিপ্লবের আদর্শ থেকেই জীবন ও সাহিত্যকে একাকার করে দেখেছেন তিনি। ছফা’র স্বাতন্ত্র্য এখানেই। তাঁর লেখা তাই আমাদের জাতীয় সাহিত্যে এক মৌলিক প্রেরণা। এবং তিনি তাঁর লেখায় মাটি ও মানুষের মৌলিক সত্তার সন্ধান করেছেন বলেই আমরা তাঁকে শেকড়সন্ধানী লেখক তথা ‘ভূমিপুত্র’ অভিধায় সম্মান জানাই। তাঁর রচনাবলি তাই আমাদের জাতীয় সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এ কারণেই ছফা’র সাহিত্যসম্ভারকে সলিমুল্লাহ খান মনে করেন ‘জাতীয় সঞ্জীবনী’। এটা অমূলক নয় এ কারণে যে, ছফা জাতীয়তাবোধের সঙ্গে ধর্মকে গুলিয়ে ফেলেননি। যে কাজটি করেছেন আমাদের আধুনিক কথা সাহিত্যের সম্রাট অভিধায় চিহ্নিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যিনি ছিলেন একই সঙ্গে আধুনিক ও হিন্দুত্ববাদী। সে কারণে ‘বঙ্গভঙ্গ’-এর জন্য বঙ্কিমের হিন্দুত্ববাদিতাকেই সরাসরি দায়ী করেন মহাত্মা আহমদ ছফা। কারণ তিনি বঙ্কিমের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন স্বদেশপ্রেমের ধ্বজাধারী ধর্মান্ধ এক ঋষিকে।
৩
সবশেষে এই অভিমত রেখে এই লেখা শেষ করতে চাই যে, সলিমুল্লাহ খান নিতান্তই জ্ঞানপিপাসু এক জীবনসাধক। তাঁর সেই জ্ঞানার্জন শুধু অর্জন নয়, ফল দানের জন্যও। যেহেতু জ্ঞান কুক্ষিগত করে রাখার বিষয় নয়, বিলিয়ে দেয়ার বিষয়। তিনি সে কাজটিই করছেন। আমাদের বিশ্বের তাবৎ বিষয়ে চোখ খুলে দিচ্ছেন। তার মধ্যেই তিনি আলোকিত। তাঁর জ্ঞানের পৃথিবীতে যখন ঢুকে পড়ি দেখি কি ইতিহাস, রাজনীতি, সাহিত্য ও দর্শন, হেন বিষয় নেই যা তাঁর পঠনের বাইরে, বরং বিশ্ব সাহিত্যের আদ্যপান্ত তাঁর নখদর্পণে। জ্ঞানের অদম্য তৃষ্ণায় তিনি যেন ক্রমশ নিজেকেই অতিক্রম করে চলেছেন। যে কারণে তিনি ইতিমধ্যে বুদ্ধিজীবী শিবিরে আলাদা একাটা জায়গা করে নিয়েছেন। সেখানে তিনি ব্যতিক্রমী প্রাজ্ঞজন হিসেবে স্বীকৃত। সেই ক্ষেত্রে তাঁর মতো ‘ব্যক্তিত্ব-বিশেষ’কে নিয়ে আমার এই প্রয়াস সামান্যই।





কমেন্ট করুনঃ