এক
ঝর্ণা চমৎকার লেখে! যা লেখে তা-ই কবিতা হয়ে যায়! ঝর্ণার লেখা মানিকের ভীষণ পছন্দ ! কবিতার শব্দমালার দিকে তাকালে মনে হয়, শব্দের চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তাদের অবয়ব, অস্তিত্বের প্রগাঢ় উপস্থিতি, এদের নড়াচড়া চোখে দেখা যায়। শব্দ দিয়ে যেন সে জীবনেরই ছবি আঁকে!
আজ সন্ধ্যায় মানিক ঝর্ণাকে কথায় কথায় বলে, তুমি এত চমৎকার লেখ! দাঁড়াও, আমিও একটা কবিতা লিখে দেখাচ্ছি। ঝর্ণা হাসতে হাসতে বলে, এভাবে বলে কয়ে কি কবিতা হয়?
হয় না?
অবশ্যই হয়!
আমাদের মতো না লেখকদের দ্বারা সবই হয়। মানিক হাসতে হাসতে জবাব দেয়।
ঝর্ণা গরম চা এগিয়ে দেয়, সাথে মুড়ি।
চা-মুড়ি ওর খুবই প্রিয়। সেই ছেলেবেলা থেকে ঘুম ভাঙ্গা ভোরে ঘরে ভাজা মায়ের হাতের মুড়ি ও ধোঁয়া উঠা চায়ের গন্ধে ঝর্ণার বেড়ে ওঠা।
চুমুক দেয়ার আগে মানিক গরম চায়ে ফুঁ দেয়। ঝর্ণা চমকে ওঠে! একী! বাঁশির শব্দ!
মানিক আবার চায়ে ফুঁ দিতেই ঠোঁটের ফাক গলে ভেসে এলো নরম মিষ্টি সুরেলা ধ্বনি! যেন পাখি শিষ দেয়!
ঝর্ণা হাসতে হাসতে বলে, ব্যাপার কী?
তুমি ফুঁ দিলেই শিষ বাজে!
এ কথায় মানিকও কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। যখনই চায়ে ফুঁ দিচ্ছে আপনা আপনি শিষ বেজে ওঠছে। ঝর্ণার হাসির সাথে মানিকও হাসতে থাকে। হাসতে হাসতেই মানিক বলে, এ শিষের শব্দের শেকড় অনেক গভীরে, যা তোমাকে বলা যাবে না। যদিও বার বার এই শিষের নিগূঢ় রহস্য শুনে শুনে এর আদ্যোপান্ত সবই ঝর্ণার মুখস্থ হয়ে গেছে।
বেশ কয়েক দিন ধরেই তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। জনজীবন প্রায় অচল। কেউ ঘর থেকে বেরোতে পারছেনা। প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা, কখনো মুষলধারে, কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি মিহি দানার মতো ঝিরঝির বৃষ্টি। বৃষ্টির বাঁধভাঙ্গা অবিরাম ধারায় সম্পূর্ণ ঘরবন্দি মানুষ। তাদের বাহিরে বেরোনো, দৈনন্দিন কাজকর্ম একেবারেই বন্ধ বললেই চলে ।এমন অবিরাম শ্রাবণের ধারা বহু বছর দেখেনি কেউ।
এ এক অলস জীবন! ভাবুক, বৃষ্টি পাগল খামখেয়ালিপনা মানুষদের জন্যে এ এক কাঙ্ক্ষিত সময়, এক অপরূপ নিসর্গ! যা মনকে পাগল করে দেয়! প্রকৃতির এই নৈসর্গিকতা যেন অন্য এক পৃথিবীর রূপকথার গল্প বলে। মানিকের হৃদয়ের গভিরে সে গল্প তরঙ্গের মত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে —-
“শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে
তোমারি সুরটি আমার মুখের ‘পরে, বুকের ‘পরে ॥
এমন বিরামহীন বৃষ্টির আহ্বানে মানিক ডুবে যায় কৈশোরের ফেলে আসা নষ্টালজিয়ায়। হারিয়ে যায় উদ্দাম- উচ্ছল দুরন্ত শৈশবের সেই উৎসবমুখর রঙিন দিনগুলোতে ।
সারাদিন বন্ধুদের নিয়ে হই হই রই রই করে বৃষ্টিতে ভেজা। মহা আনন্দে আপন মনে টই টই করে ঘুরে বেড়ানো। ঘন্টার পর ঘন্টা খালপাড়ের নরম কাদায় গড়াগড়ি খেলা। দিনভর খালের ঘোলা পানিতে ঝাপাঝাপি করা। প্রাণভরে ডুবিয়ে দুচোখ জবা ফুলের মতো লাল করে দিনশেষে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফেরা। চুপি চুপি ঘরে ঢোকা। মায়ের রুদ্রমূর্তী! চুলের মুঠি ধরে উপুর করে পিঠের উপর চলতে থাকা ধুম-ধাম কিলের পর কিল।
মানিকের আর্ত চিৎকারে আশেপাশের লোকজন সব হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। বাড়ির লোক আর প্রতিবেশীরা সব একাকার। আহা, করো কি, করো কি মিলনের মা, এমন কইরা পোলাডারে মারতাছো ক্যান? মিলন, শাহাজাদি বেগমের বড় ছেলে। তাই বাড়ির মুরুব্বিরা ও বয়োজ্যেষ্ঠরা তাকে মিলনের মা বলেই ডাকে।
সবাই ছুটে এলে শাহাজাদি বেগম অস্বস্তিতে পরে যায়।তিনি এবার ছেলের চিৎকার থামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। চিৎকার কি আর থামে!
সবার একই কথা। মিলনের মা, তুমিতো জানো, তোমার এই পোলাটা এক চিক্কোইরে দম টম আটকাইয়া কেমন নীল অইয়া যায়। তুমি কিন্তু কামডা বালা করলা না। এইবার সামলাও অরে।
সবাই মানিকের বুকে, পিঠে, মাথায় হাত বুলাতে থাকেন। শাহাজাদি বেগম কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন, তার সুন্দর মুখখানা লাল টকটকে হয়ে ওঠে। মায়ের সেই করুণ মুখ মনে করে মানিক খিল খিল করে হেসে ওঠে।
ঝর্ণা জিজ্ঞেস করে, হাসছো যে? মানিক বলে, ও কিছু না, এমনিই।
ঝর্ণার নষ্টালজিয়া একটু অন্যরকম। বৃষ্টির হাবভাব দেখলেই ওর ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। ভেতরটা কেমন আনচান করতে থাকে। ওর শিশু মন উদাস চঞ্চল হয়ে ওঠে। ঝর্ণা তখন চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে নিরব চেয়ে থাকে।
মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে ঝর্ণা খুশিতে একেবারে আত্মহারা হয়ে যায়। একবুক হাহাকার নিয়ে ঝর্ণা স্মৃতি হাতড়িয়ে বেড়ায়। স্মৃতির পটে দেখা দেয় গ্রামের আলো হাওয়ায় বেড়ে ওঠা এক চঞ্চল কিশোরী। ঘাসের ডগার মতো ওর নরম কচি পায়ে ঘুঙুরের মিষ্টি শব্দ। সবুজ ঘাসের ডগায় ভোরের শিশির বিন্দু। হাঁসের সাদা ধুসর পালকের মতো নরম রোদ। শিশুর গালের মতো তার লাল আভা।
ভোরের আলো ফোঁটার আগেই উঠান, মাটির ঘর, ঘরের পীড়া, মেঝে, রান্নাঘরের আঙ্গিনা, বাড়ির সর্বত্র ধুয়ে মুছে পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত ঘামে ভেজা মায়ের হাসিমুখ!
গ্রামের কিশোর কিশোরী দল বেঁধে ছুটে যায় দূরের ঐ পদ্মবিলে। সেখানে লাল, সাদা, অজস্র পদ্মফুলে ছেয়ে আছে মস্ত বড় দীঘি। দীঘির অথৈ জলরাশির বুকে কোমল স্নিগ্ধ প্রস্ফুটিত জলপদ্ম আপন মনে হাসে, খেলে, দোলখায়। পদ্মফুলের শরীর পেঁচিয়ে কখনো কখনো বিষধর পদ্মগোখরা মনের আনন্দে খেলা করে।
তখন শিশু কিশোররা ভয়ে দীঘির পাড় থেকে কিছুটা দূরে চলে আসে। এখনো ঝর্ণার চোখে ভাসে, কয়েকটি পদ্মফুলের শাখা পেচিয়ে দুটো পদ্মগোখরা একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিবিড় বন্ধনে।
ওরা গলায় গলায় পেচিয়ে লম্বা ফণা তুলে মুখোমুখি ডানে বামে দোলছে। অবুঝ কিশোর কিশোরীরা ভাবে এমনি করেই ওরা নাচে, খেলা করে, খুশিতে আপন মনে ঘুরে বেড়ায়।
সন্ধ্যার শান্ত রঙিন গোধুলীতে গ্রামের গাছে গাছে পাখিদের নীড়ে ফেরার ধুম লেগে যায়। ওদের উচ্ছল দাপাদাপি, কিচিরমিচির শব্দ, অফুরন্ত প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত গ্রাম, গ্রামের মেঠোপথ, খালবিল, পুকুরপাড়, ঝোপঝাড়, বাড়ির আঙ্গিনা।
ভরা পুর্ণিমায় জোছনার নরম আলো ছড়িয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে । রাতের ঝড়ো বাতাসে গ্রামের বাঁশবনে সৃষ্টি হয় এক দারুণ মধুর সুর।যা রাতের বাতাসে ছড়িয়ে দেয় সুরের এক মায়াবী আবেশ।
আর ঘোর অমাবশ্যায় জোনাক পোকার আলো মিটিমিটি জ্বলে। অন্ধকার আকাশের বুকে তখন অগুনিত তারার মেলা।
আজ বৃষ্টির প্রকোপ একটু বেশী। বিকেল থেকেই মুষলধারে বৃষ্টির সাথে বাতাসের গতিবেগ বেড়ে প্রায় ঝড়ের রূপ নিয়েছে।
ওরা উত্তর দিকের ঘরের জানালা দরজা খুলে বারান্দার মুখোমুখি অনেকক্ষণ বসে আছে।
ঝাপটায় বৃষ্টির আছলা জানালা দরজা পেরিয়ে ঘরের মেঝে, বিছানা, সোফা ভিজিয়ে দিচ্ছে। বৃষ্টির আঁচ লাগছে ওদের গায়েও ।
তবুও ওদের ভালো লাগছে, ভীষন ভালো লাগছে। দুচোখ ভরে বৃষ্টির মায়াবী রূপ দেখে দেখে যেন আশ মিটেনা। মাঝে মাঝে দুজনে গ্রীলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দুহাত বাড়িয়ে উন্মুক্ত বুকে জড়িয়ে ধরে ঝড়ো বাতাস আর অবাধ্য বৃষ্টির মুর্হুমুহু ঝাপটা।
বৃষ্টির ঝাপটায় মুহূর্তেই ওদের চোখ-মুখ- সমস্ত শরীর ভিজে একাকার।
বারান্দার বাম প্রান্তের গ্রীলের উপরের অংশটায় দুটি জালালি কবুতর সুন্দর বাসা বেঁধেছে। মানিক দুটি চওড়া কাঠের টুকরা গ্রীলের উপরে কার্ণিশ থেকে দু দেয়ালে কিছুটা আড়াআড়ি করে আটকে দিয়েছে। এতে ওদের বাসা বাঁধতে খুব সুবিধা হয়েছে। কবুতর দুটি গায়ে গা জড়িয়ে চুপচাপ বসে আছে। বৃষ্টির আছলা না লাগলেও বাতাসের ঝাপটা ঠিকই মাঝে মাঝে ওদের কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
বারান্দার ডান দিকের ছোট্ট কার্ণিশে দুটি চড়ুই পাখি পাশাপাশি চুপটি মেরে বসে আছে। আশপাশের কোনো দেয়ালের ফাক ফোকরে ওদের বাসা। এই ঘরেরই পশ্চিমের জানালার বাম দিকের গ্রীলের ফাকে দুটি চড়ুই পাখি বাসা বেঁধেছে। জানালার বাইরের দিকে গ্রীলের অংশ, আর ঘরের ভেতর থেকে থাইগ্লাস লাগানো। চড়ুই পাখির বাসা বাধতে দেখে ওরা আর জানালা খুলেনা। বাসা ভেঙে যাবে তাই। চড়ুই পাখির জীবন যাত্রায় যাতে ব্যঘাত না ঘটে সেজন্য পশ্চিমের জানালাটা স্থায়ীভাবে বন্ধ। জানালার পুরো অংশটা এখন চড়ুই পাখির বসতবাড়ি।
একটা বুলবুলি পাখি যখন তখন বারান্দার ভেতরের কার্ণিশে এসে বসে। আজও সে খুব অস্থির চঞ্চল। সারাক্ষণ খুবই ব্যস্তভাবে লাফাচ্ছে । কার্ণিশ বেয়ে বেয়ে বারবার গ্রীলে নেমে আসে। গ্রীলে পাদুটো পেচিয়ে সে কী কসরত! এক গ্রীল থেকে আরেক গ্রীল দু আঙ্গুলে পেচিয়ে ঝুলে ঝুলে জায়গা বদলায়। কখনও কখনও ওর ছোট্ট নরম ধূসরকালো শরীরটা গ্রীলের বাইরে মেলে ধরে, বুক চিতিয়ে বৃষ্টির ঝাপটায় শরীর ভেজায়। কখনও মাথা ঘুরিয়ে জানালার ভেতর দিয়ে মানিক আর ঝর্ণাকে পিট পিট চোখে দেখে, পর্যবেক্ষণ করে। এখনও এই রাতের বেলাতেও সে গ্রীল পেচিয়েই ঘাপটি মেরে পড়ে আছে। ঘুমিয়েছে, না জেগে আছে ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। আষাঢ়ী পূর্ণিমার মায়াবী রাতে শ্রাবণের বৃষ্টি ঝরে। মানুষের কান্নার মত বিরামহীন বৃষ্টি।
ঝর্ণার কন্ঠে রবীন্দ্রনাথ বেজে চলে–শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে পড়ুক ঝরে –।
মানিকের হাতে জীবনানন্দ–আট বছর আগের একদিন, যা মানিককে মনে করিয়ে দেয় আট বছর আগের এক ব্যথার স্মৃতি, হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণের এক গভীর ক্ষত।
____________চলবে।





কমেন্ট করুনঃ