দুই
আট বছর আগের এক রাত, যে রাতের দুঃসহ স্মৃতি ইথারে ভেসে আসা একটা ফোনকল–হাতে ধরে থাকা মোবাইলের টুংটাং টুংটাং শব্দ মানিকের হৃদয়কে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে ফেলে।
শ্রাবণের অবিরাম ধারায় অবগাহন করেও জোছনামাখা রাতের এক নিষ্ঠুর স্মৃতি মানিককে ক্ষত বিক্ষত করতে থাকে।
সেবার সময়ের একটু আগেই শীত চলে আসে। অগ্রায়ণ মাসের মাঝামাঝি। একটু একটু শীত পড়তে শুরু করেছে। রাতের আকাশ, প্রকৃতি কুয়াশায় ঢেকে যায়। শিশিরে ভিজে সবুজ ঘাস, ফসলের মাঠ। উত্তরের বয়ে চলা হিমেল হাওয়া জানান দিয়ে যায় তীব্র শীতের আগাম বার্তা।
হেমন্তে প্রকৃতি রঙ বদলায়। প্রকৃতি এ রঙ বদলায় তার আপন নিয়মে। মানুষের মাঝেও তার প্রভাব পড়ে নিয়ত। মানুষ ও প্রকৃতি মিশে যায় রঙ বদলের অপূর্ব এক অপার্থিব খেলায়।
হলদে রঙের ধানে ভরে উঠে দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ। মাঠজুড়ে কেবল হলুদ সোনা রঙের ধান আর ধান। দলে দলে কৃষক ধান কাটে, আঁটি বাঁধে আর সেসব ধানের আঁটি বাগের দু’পাশে দাঁড়িপাল্লার মতো কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ি ফেরে। কোথাও বা কখনও ধানের আঁটি বোঝাই গরুর গাড়ি ক্যাচর ক্যাচর শব্দ তুলে মেঠো পথে এগিয়ে যায় গৃহস্থের বাড়ি বা ধানের খোলায়।
শেষ হেমন্তের ভোরে কুয়াশা নামে মাঠে। হলুদ ধানের শীষে শিশির জমে। বিন্দু বিন্দু শিশির। সোনালি ধানের বিস্তীর্ণ প্রান্তর ছাড়িয়ে পুবাকাশে সোনারাঙা সূর্য হাসে।
ভোরের সূর্যের শরীর থেকে রূপালি রোদ এসে কৃষকের আঙ্গিনায়, সোনালি ধানের উপর ছড়িয়ে পড়ে।
রোদের ছোঁয়ায় ধানের শীষে জমে থাকা শিশির বিন্দু গলে গলে পড়ে পৃথিবীর মাটিতে।
ভোরের এ রূপের বর্ণনায় কবি জীবনানন্দ দাস লেখেন,
“শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপর মাথা রেখে
অলস গেঁয়োর মতো এইখানে- কার্তিকের ক্ষেতে;
মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার
চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ
তাহার আস্বাদ পেয়ে পেকে ওঠে ধান”।
হেমন্তের এই দিনে অনিয়মের বৃষ্টি ঝরে! এই বৃষ্টি, এই রোদ, শীতের পরশ মাখা রোদ! দিনশেষে সন্ধ্যা নামে। ঝিরঝির বৃষ্টি ঘন কুয়াশায় রূপ নেয়। সন্ধ্যা ছাপিয়ে রাত ঘনিয়ে আসে। একটু একটু করে রাত বাড়ে, কুয়াশার আড়াল থেকে বেড়িয়া আসে রূপালি চাঁদ।
ভরা পূর্ণিমার চাঁদ, জোছনা ঝরা এক রাত। চাঁদের উজ্জ্বল আলোর স্নিগ্ধতা রাতের আঁধার কেটে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
উত্তর দিকের বারান্দার সামনে বসে মানিক আনমনে ভাবছে। মাঝে মাঝে ঝর্ণার ইজি চেয়ারে বসে মানিক গভীর ভাবনায় ডুবে যায়। ঠিক কি ভাবছে তা ও নিজেই জানে না। তবে এটা ঠিকই বুঝতে পারছে, রাজ্যের যত চেনা অচেনা ভাবনা ওকে ঘিরে ধরেছে। উত্তর দিকের বারান্দা দিয়ে চাঁদ দেখা না গেলেও চাঁদের রূপালি আলো, চারিদিকে ছাপিয়ে পড়া জোছনার পাগল করা রূপ ঠিকই ধরা দেয়।
মানিক ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে ছাদে গিয়ে দাঁড়ায়। মাথার উপর খোলা আকাশ, আকাশে মস্ত বড় চাঁদ কুয়াশায় আচ্ছাদিত!
পূর্ণিমার চাঁদ! কী অদ্ভূত সুন্দর! কুয়াশার চাদর ছিঁড়ে চাঁদের রূপালি আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। জোছনার শান্ত স্নিগ্ধ আলোয়, এ অপরূপ নিসর্গের ভেতর মানিক আকণ্ঠ ডুবে থাকে। মানিকের মনে হয়, আজ যেন চাঁদ একটু অন্য সাজে সেজেছে। মনে হয় আকাশের বুক জুড়ে অনেকগুলো চাঁদ একসাথে জড়াজড়ি করে আছে। মানিকের খুব ইচ্ছে করে মুঠো মুঠো জোছনা নিয়ে গায়ে মাখে।
মানিকের দুচোখ ভরা মুগ্ধ বিস্ময়!
হঠাৎ চাঁদের বুকে ভাসে ছোট্ট অয়ন্তর হাসিমাখা মুখ, মানিক নস্টালজিয়ায় হারিয়ে যায় —
জোছনায় মাখামাখি এক রাত। ছাদে মাদুর বিছিয়ে চাঁদের দিকে মুখ করে মানিক শুয়ে আছে। ওর খোলা বুকে চিৎ হয়ে ছোট্ট অয়ন্ত হাত পা নেড়ে চাঁদের সাথে খেলা করছে। চারিদিকে অবাক জোছনা গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে, হাত বাড়িয়ে ডাকে। আকাশে ভাতের থালার মতো গোল চাঁদ সুকান্ত’কে মনে করিয়ে দেয় —
মানিক ওর শিশু সন্তান অয়ন্তকে কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
বড় চাঁদকে দেখিয়ে উচ্চস্বরে বলে,
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্নিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”
যেমন করে, আলেক্স হ্যালির অম্র বিন্টে জন্মের পর তার নবজাতক ছেলে কুন্ঠাকে দুহাতে মাথার উপর তুলে আকাশ দেখিয়ে বলেছিলেন,
“মনে রেখ, একমাত্র ঐ আকাশই তোমার চেয়ে বড়।”
অয়ন্ত খিলখিল করে হাসে, বাবার ঠোঁটে গালে চুমু খায়। প্রতি রাতে অয়ন্তকে কাধে নিয়ে গান গেয়ে গেয়ে মানিক ঘুম পাড়ায়। এটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। এ না হলে যে অয়ন্ত সহজে ঘুমুতে চায় না।
অয়ন্তকে কাধে নিয় মানিক ছাদের এপাশ ওপাশ হাঁটে আর গুনগুনিয়ে গানের সুরে সুরে গেয়ে যায় —
“আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।”
“এতো সুন্দর সেলিম বাদশা, এতো তোমার গুণ, আইতে না আইতে ঘরে লাগাইলা আগুন।”
এসব গীত শুনতে শুনতে আকাশে ভেসে থাকা চাঁদ মামার সাথে খেলতে থাকা ছোট্ট অয়ন্ত দুহাতে বাবার গলা জড়িয়ে খিলখিল করে হাসে আর ওর লোলভরা মুখে বাবার গালে, ঠোঁটে, মুখে বড় বড় করে চুমু খায়। ওর এমনতরো আদর মানিকের খুব পছন্দ, ছোট্ট অয়ন্ত তা জানে। তাই একটু পর পর ওর মুখের লোলে মানিকের গাল মুখ মাখামাখি করে দেয়। একসময় অয়ন্ত ঘুমের কোলে লুটিয়ে পড়ে। মানিক তন্ময় হয়ে ওর ঘুমন্ত মুখের পানে তাকিয়ে থাকে। অয়ন্তর মুখের আদল একেবারে ওর দাদির মতোন। মানিক যেন সন্তানের মাঝে তার মায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। মায়ের কথা মনে হতেই ওর বুকের বাম পাশটা ব্যথায় কেমন টনটন করে ওঠে।
অয়ন্ত যখন পাঁচ মাসের গর্ভে, তখন শাহাজাদি বেগম চাইলেন ঝর্ণাকে সাধ দেবেন। সাধ দেয়া অনুষ্ঠানের একটা তারিখও নির্ধারণ করেন। মানিক ব্যস্ততার কথা বললে, মা তারিখ পিছিয়ে দেন। এর তিনদিন পর নতুন তারিখ ঠিক করেন। কিন্তু হায়! দুখিনি মা ওর! মানিকের অসীম ব্যস্ততায় মায়ের ইচ্ছে অসীম অনন্তে মিলিয়ে যায়। সাধ দেয়ার দিনটিতেই শাহাজাদি বেগমের হার্ট এ্যাটাক হয়।
মানিকের দুখিনি মায়ের নরম বুকের ভেতর ব্যথার রক্তক্ষরণ! ক্ষতবিক্ষত হৃৎপিন্ড তার জীবনের শক্তি কেড়ে নেয় অনেকখানি!
অনেক অপূর্ণ ইচ্ছা বুকে নিয়ে মা তার অনন্তের পথে……অসময়ে তার মরণযাত্রা।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তার শেষ কথা, আমার মানিককে তোরা দেখিস!
মানিক দেখে, তার সন্তানের স্নিগ্ধ মুখে তার মা ঘুমায়।
ওর বুকে ব্যথার রক্তক্ষরণ, দুচোখে জলের অন্তহীন ঝর্ণাধারা! মা, যেন ওর জোছনার চাদরে ঘুমিয়ে আছে!
মানিকের হৃদয় আকাশের অসীম অনন্তে ভেসে বেড়ায় এক মায়াবী সুর—
“চাঁদের কন্যা চাঁদ সুলতানা,
চাঁদের চেয়েও জ্যোতি।”
ছাদে ওঠার সিঁড়ির গোড়ায় দাড়িয়ে ঝর্ণা ডাকে, অয়ন্তর আব্বু, নিচে আসো, চা খাবে।
সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-রাত্রি, যখনই হোক, ঝর্ণা যদি মানিককে জিজ্ঞেস করে, চা খাবে?
মানিক তখন বলবে, না, খাবো না। আর যখনই চা রেডি করে এক কাপ এগিয়ে দেবে, বা ডাকবে, অয়ন্তর আব্বু আসো চা খাবে। মানিক না করবে না।
তাই ঝর্ণা সাধারণত চায়ের কথা ওকে জিজ্ঞেস করে না।
ঝর্ণার ডাক শুনে মানিক চা খেতে নিচে নেমে আসে।
রাত প্রায় ১১ টা।
মোবাইল ফোনটা বাজছে!
মানিক ওর মোবাইলটা হাতে নিয়ে উৎকণ্ঠিত তাকিয়ে থাকে। নাবিল ফোন করেছে, সুদূর আমেরিকা থেকে।
নাবিল আকমল ভূঁইয়া, নাবিল ওর ডাক নাম।
২০০৮।
ডিসেম্বরের নিষ্ঠুর মায়াবী এক রাত। বিদগ্ধ জোছনার রূপালি চাদরে ঢাকা পূর্ণিমার রাত।
সে রাতে রক্তের আঙুরলতারা শক্ত শেকড় গেড়েছিলো মানিকের আহত বুকের ক্ষতবিক্ষত হৃদপিণ্ডে। তপ্ত
রক্তাক্ত বুক ওর। বুকের ভেতর বয়ে চলে অবিরাম রক্তক্ষরণ।
একটি মাত্র টেলিফোন! এক অন্তহীন বেদনার স্মৃতি! এক বুভুক্ষু হৃদয়ের আর্তনাদ! বেঁচে থাকার এক করুন আকুতি, কী এক প্রাণান্তকর চেষ্টা, নাবিল আর মৃত্যুর মাঝে দোলছিলো।
বন্ধু নাবিলের নিভু নিভু জীবন প্রদীপ যেন ক্ষণে ক্ষণে মিশে যেতে থাকে এই নরম মৃত্তিকার রক্তাক্ত শরীরে।
এ এক অন্তহীন সময়ের ভার। এক কষ্টের আকর।
অনাদিকালের পথিক হয়ে সেই নিষ্ঠুরতম সময়ের ভার বয়ে চলে মানিক।





কমেন্ট করুনঃ