আদিবাসীদের জীবন ও সংগ্রামের গল্প নিয়ে রাঙ্গামাটিতে শুরু হয়েছে জাক নাট্য উৎসব

ফন্ট সাইজ-+=

আদিবাসীদের জীবন ও সংগ্রামের গল্প নিয়ে রাঙ্গামাটি ভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠন জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে তিন দিনব্যাপী নাট্য উৎসবের আয়োজন করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিত্তিক তিনটি থিয়েটার সংগঠনের নির্মিত পাঁচটি নাট্য প্রযোজনা এবং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান দিয়ে সাজানো হয়েছে ‘১ম জাক নাট্য উৎসব ২০২৩’ শিরোনামের এই উৎসব।

ছবি: জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল

জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল উৎসবের প্রথম দিন, ২১ ডিসেম্বর ২০২৩, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অবদানের জন্য অভিনেতা সুনির্মল চাকমা এবং সংগঠক অলিন্দ্র ত্রিপুরাকে জাক পদক দিয়ে সম্মানিত করে।

এছাড়া, জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল মঞ্চস্থ করেছে ‘বিঝুরাম’র স্বর্গত যানা’ শিরোনামের নাটক।

নাটকটি রচনা করেছেন শান্তিময় চাকমা এবং পরিচালনা করেছেন ঝিমিত ঝিমিত চাকমা।

ছবি: জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল

এ নাটকে চাকমাদের প্রায় তিন শতকের ঘাত—প্রতিঘাত, উত্থান—পতন, অবক্ষয়—অধপতন ইত্যাদি পটভূমি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। এ নাটকের মূল নেপথ্য চরিত্র রুনু খাঁ, যিনি ১৭৭৬ সাল থেকে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ ওয়ারেন হেস্টিংস থেকে লর্ড কর্ণওয়ালিশ আমল পর্যন্ত বৃটিশদের বিরুদ্ধে প্রধান সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন।

নাটকটিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন রন্ত কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, বিশ্বজিৎ তঞ্চঙ্গ্যা, বিনয় কান্তি চাকমা, শশীরন চাকমা, জয়শান্তি চাকমা, শান্ত চাকমা, সুকেশ খীসা, সুবর্ণা তঞ্চঙ্গ্যা, যুথি চাকমা, মোনালিসা চাকমা, ঊর্মি চাকমা, টুনি চাকমা প্রমুখ।

ছবি: জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল

পরিচালক ঝিমিত ঝিমিত চাকমা বলেন, ‘১৯৮৫ সালে প্রথমবার বিঝুরাম’র স্বর্গত যানা নাটকটি মঞ্চায়ন করা হয়। এই উৎসবে আমরা নাটকটির দ্বিতীয় শো মঞ্চস্থ করেছি। এটি চাকমা সম্প্রদায়ের জীবন সংগ্রাম এবং উত্থান-পতনকে নিয়ে রচিত।’

ঝিমিত ঝিমিত চাকমা বর্তমানে জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।তিনি বলেন, আমাদের সংস্কৃতির প্রচার ও সংরক্ষণের জন্য ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল। সংগঠনটি মূলত জুম সম্প্রদায়ের থিয়েটার চর্চা, গান, নৃত্য এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে কাজ করে।

‘আমরা ১৯৯৮ সালে নাট্য উৎসব আয়োজনের চেষ্টা করেছিলাম। এই বছর আমরা প্রথমবারের মতো নাট্য উৎসবের আয়োজন করছি। নাটকের মধ্যে দিয়ে জুম সম্প্রদায়ের বিদ্যমান সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি এখানে থিয়েটার চর্চা ছড়িয়ে দেওয়া এই উৎসবের একটি লক্ষ্য,’ বলেন ঝিমিত ঝিমিত চাকমা।

উৎসবের দ্বিতীয় দিনে জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল ঝিমিত ঝিমিত চাকমা রচিত ও নির্দেশিত নাটক ‘ফিরিই’ এবং রন্ত কুমার তঞ্চঙ্গ্যার গল্পে আশিক সুমনের নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় তৈনগাঙ থিয়েটার এর নাটক ‘মন’ উকূলে’ মঞ্চস্থ হয়।

‘ফিরিই’ নাটকে তুলে ধরা হয়েছে জুম সম্প্রদায়ের নারীদের দুর্দশার কথা। প্রাকৃতিক কারণে মানুষের ওপর বিপর্যয় নামলে তা ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা যায়। কিন্তু মানুষের কারণে মানুষের ওপর বিপর্যয় নেমে আসলে তা সহজে কাটানো যায় না। ঠিক এভাবেই ১৯৮৬ সালে মানবসৃষ্ট বিপর্যয় নেমে আসে ‘হিল চাদিগাঙ’-এর জনজীবনে। ভিটামাটি থেকে উৎখাত হয়ে জীবন বাঁচাতে বেছে নিতে হয় শরণার্থী জীবন। জীবন বাঁচানোর জন্য শরণার্থী জীবন বেছে নেওয়ার পরেও মানুষের কূপমণ্ডুকতার কারণে খাদ্য আর ঔষধের অভাবে শরণার্থীদের মৃত্যুর মিছিলে সামিল হতে হয়। আর যারা শরণার্থী জীবন বেছে নেয়নি সচেতন কিছু মানুষ আন্দোলনে নামে। শরনার্থীদের ফিরিয়ে আনা হয় বেহাত হয়ে যাওয়া ভিটে-মাটি ফেরত পাবার আশায়। এখানেও অদৃশ্য হাতের কালো থাবায় নেতৃস্থানীয় এক নারীকে গুম করা হয়। একসময় চুক্তি হয়। চুক্তির পরবর্তী জীবনে বিভক্ত মনের কালো থাবা ছড়িয়ে পড়ে, হারিয়ে যেতে থাকে একের পর এক তরতাজা মানুষ। এ বিভক্ত মনের কালো থাবার কারণে একে একে বোন হারায় ভাইকে, মেয়ে হারায় বাবাকে, মা হারায় সন্তানকে, স্ত্রী হারায় স্বামীকে। সর্বক্ষেত্রেই নারীদের ওপর নেমে আসে বিপর্যয়ের আহাজারি। এ বিপর্যয়কে নিয়ে রচিত ‘ফিরিই’ নাটকটি।

ছবি: জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল

উৎসবের সমাপনী দিনে, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৩, জুমফুল থিয়েটার নিরুপম চাকমা রচিত ও ননাবী চাকমা নির্দেশিত ‘আদেই ধন’ এবং জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল মৃত্তিকা চাকমা রচিত ও ঝিমিত ঝিমিত চাকমা নির্দেশিত নাটক ‘হক্কানীর ধনপানা’ মঞ্চস্থ হবে।

‘হক্কানীর ধনপানা’ নাটকে জুম সম্প্রদায়কে কীভাবে শোষিত করা হয় তা তুলে ধরা হয়েছে। এ নাটকটি জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিলের ১৪তম প্রযোজনা। এ নাটকটি মূলত রূপক নাটক। হক্কানী নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র। হক্কানী সুখ চায়। একসময় সুখের সন্ধান পেয়ে যায়। আরো যারা যেকোনো কিছুর বিনিময়ে সুখ প্রত্যাশী, তাদের খুঁজে বেড়ায় হক্কানী। পেয়ে যায় কেড়ংচান, দোত্তোপুনো, উল্লেইয়ে, ফান্নোগালী ও বারামুইকে। তারা হক্কানীর অনুসারী হয়। সুখ পেতে হলে তাদের কিছু শর্ত দেয় হক্কানী। এ শর্ত অনুযায়ী তাদের আরো সুখ প্রত্যাশী মানুষের সন্ধান করতে নির্দেশ দেয়। বিভিন্ন ধরণের অসুখী, অসুস্থ মানুষ তারা খুঁজে বের করে। তার মধ্যে ঝুরগোবী নামে এক অন্যরকমের অসুখী মানুষকে তারা খুঁজে পায়। সে এমন সুখ চায় না, যা অন্যের সুখ নষ্ট করে। ইন্দ্ররাজা একসময় হক্কানীর অসুস্থ, অসুখী মানুষগুলোকে সুখী করার কাজ পরিদর্শন করেন। দেখতে পান যারা যতটুকু অসুস্থ, অসুখী ছিল তাদের অবস্থা আরো বেশি খারাপ হয়ে পড়েছে। এতে ইন্দ্ররাজা খুব খুশী হন। খুশী হয়ে ইন্দ্ররাজা আরো অর্থ (টাকা, সোনার খোলোস) বরাদ্দ করেন। ঝুরগোবী এ ধরণের অসুস্থ সুখ-সন্ধানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

কমেন্ট করুনঃ

Scroll to Top
Copy link