ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে, এ শহর নোংরা। অনেকে বলেন, এ শহরে গরু-ছাগলের বসবাস। কথাগুলো অনেকাংশেই সত্য। আবার ঢাকা উপভোগ্যও। নান্নার কাচ্চি, বিউটি ফালুদা, নাবিস্কো মোড়ের বিস্কুটের মিষ্টি গন্ধ এই ঢাকাতেই। লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বকুলতলা, টিএসসি, রমনা পার্ক, শিল্পকলা, বইমেলা, ছবির হাট, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, নিউমার্কেট, আজিজ, গুলিস্তান, রিকশা, ঘোড়ার গাড়ি এই ঢাকার বুকেই। আজকের ঢাকাচিত্র দিয়ে পুরো ঢাকাকে মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। এক সময় এই শহরও সম্ভ্রান্ত ছিল, ঢাকার প্রেমে পড়তো পশ্চিমারাও। জাদুর শহর ঢাকার টানে যারা ছুটে আসতেন তাদেরই একজন এফ. বি. ব্র্যাডলি-বার্ট।

ব্র্যাডলি-বার্ট ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের ব্রিটিশ সদস্য হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। সহকারী হাকিম ও কালেক্টর হিসেবে ১৮৯৬ সন থেকে তিনি ভারতে কাজ করা শুরু করেন। এ অঞ্চলে তিনি প্রধানত খুলনা, মেদিনীপুর, হুগলি ও কলকাতায় চাকরি করেছেন। ভারতে তিনি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে কাজ করেছেন। তার মানে ইতিহাসের সঙ্গে তার একটা যোগ ছিল। এক সময় কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে পদোন্নতি পান। পরে তেহরানে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ব্র্যাডলি-বার্ট বিয়ে করেন ব্রিটেনের প্রভাবশালী চার্চিল পরিবারে। তার স্ত্রী লেডি নোরা স্পেন্সার-চার্চিল ছিলেন মালবোরার অষ্টম ডিউক জর্জ চার্লস স্পেন্সার-চার্চিলের কন্যা। নোরার আপন চাচাত ভাই যুক্তরাজ্যের দুইবারের প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল। নোরা ও উইনস্টন চার্চিল প্রায় সমবয়সী ছিলেন।

যাহোক। সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার পাশপাশি ব্র্যাডলি-বার্ট ছিলেন উঁচুদরের লেখক ও ইতিহাসকার। বৃহত্তর ঢাকার ইতিহাস নিয়ে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বই রয়েছে। ‘দ্য রোমান্স অব অ্যান ইস্টার্ন কাপিটল’ শিরোনামের সেই বইটি বের হয় ১৯০৬ সনে। প্রকাশ করেছিল লন্ডনের ‘স্মিথ এল্ডার অ্যান্ড কোম্পানি’। প্রায় সাড়ে চার শ পৃষ্ঠার এই বইয়ে বৃহত্তর ঢাকার ইতিহাস ছাড়াও রয়েছে ৩০টি আলোকচিত্র ও মানচিত্র। এর আগে তিনি আরো দুটি বই লিখেছেন, ১৯০৩ সনে ‘ছোটা নাগপুর : এ লিটল—নোন প্রোভিন্স অব দ্য এম্পায়ার’ এবং ১৯০৫ সনে ‘দ্য স্টোরি অব অ্যান ইন্ডিয়ান আপল্যান্ড’।
১৯৬৫ সনে বাংলা একাডেমি ঢাকাবিষয়ক বইটির বাংলা অনুবাদ বের করে। ‘প্রাচ্যের রহস্য নগরী’ শিরোনামে বইটি অনুবাদ করেন রহীম উদ্দীন সিদ্দিকী। সেই অনুবাদ থেকেই ব্র্যাডলি-বার্টের কিছু কথা তুলে ধরছি। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি ব্র্যাডলি-বার্টের ছিল ভীষণ আগ্রহ ও মমতা। বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘যেসব অঞ্চল পর্যটকগণের পীঠস্থান বলে পরিচিত হয়ে এসেছে, পূর্ব বাংলা সেগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়। এখানেও যথেষ্ট দর্শনীয় বস্তু বা স্থান আছে, এমন কথা কোনো দিন জোরেশোরে প্রচার করা হয়নি। ফলে প্রদেশটি বহুকাল যাবৎ যথাযথ দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছে।’ এই বইয়ে সেই অবহেলিত প্রদেশের রাজধানীর কথা প্রাধান্য পেয়েছে। ব্র্যাডলি-বার্ট এদিকে এই মহানগরের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন, অন্যদিকে নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সুচারুভাবে তুলে ধরেছেন।
এমন বর্ণনা শিল্পীই দিতে পারেন, ‘আস্তে আস্তে দিন শেষ হয়ে যায়। জনস্রোত এবার গৃহাভিমুখী হয়। অস্ত আকাশে আগুন ছড়িয়ে সূর্য ডুবে যায়। আকাশে আর নদীতে প্রতিবিম্বিত হয় তার জ্বলন্ত আভা। নদী পরিষ্কার হয়ে ওঠে। অশ্রান্ত মর্মর-ধ্বনি তুলে বিশাল ব্রহ্মপুত্র ছুটে চলে।’ অথবা শীতলক্ষ্যার কাব্যময় বর্ণনা, ‘ওপরে মৃত নীল আকাশে নক্ষত্রপুঞ্জ মিটমিট করছে। নীচে প্রবহমান বিশালকায় নদীতে তরঙ্গের নর্তন। নাচের প্রতিটি মুদ্রায় সারা রাত ধরে ক্ষীয়মান চাঁদের রূপালী আলো প্রতিবিম্বিত হয়েছে। নদীর উভয় তীর কালো পাড়ের মতো দেখায়। দুই পাড়ের মধ্যবর্তী স্থানটিতে যেনো আলোর চুমকি বসানো। দূরে—নদীতে ও স্থলভাগে একটা অস্পষ্ট সাদা কুয়াশার আস্তরণ ঘুমন্ত পৃথিবীতে ঘুমের জামার মতো লেগে আছে।’
তবে আমাদের আলোচনার মূল এই বইয়ে থাকা বৃহত্তর ঢাকার মোট ২৬টি আলোকচিত্র। এরমধ্যে ১৭টি ছবি নদীকেন্দ্রিক। বড় কাটরা, সাত গম্বুজ মসজিদ, পরীবিবির মাজার, লালবাগ কেল্লা, ঢাকেশ্বরী মন্দির, পাটভর্তি গাড়ি থেকে পাট নামানো এবং ঢাকায় জন্মাষ্টমীর উৎসবে হাতির শোভাযাত্রার একটি করে মোট সাতটি ছবি। আর দুটি ছবি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দীদের। এই ২৬টি ছবিকে মোটাদাগে চার ভাগে ভাগ করা যায় : সংস্কৃতি, স্থাপত্য, বাণিজ্য ও নদী।

সংস্কৃতিবিষয়ক ছবির মধ্যে রয়েছে ঢাকার জন্মাষ্টমী উৎসব উদযাপনের একটি দুর্লভ চিত্র। ছবিতে দেখা যায়, রাজধানীর সড়কে নেমেছে হাতির শোভাযাত্রা। প্রায় একই সময়ে তোলা (১৯০৪) জার্মান আলোকচিত্রী ফ্রিৎজ ক্যাপের একটি ছবিতেও ঢাকার পিলখানায় হাতির দীর্ঘ শোভাযাত্রার একটি দৃশ্য দেখা যায়। নদীর ১৭টি ছবির মধ্যে তিনটি ছবি লাঙ্গলবন্দ পুণ্যস্নানের।

স্থাপত্যবিষয়ক বা আর্কিটেকচারাল ছবি ৫টি, হানাবাড়ির মতো পড়ে থাকা লালবাগ কেল্লার একাংশ, পরীবিবির মাজার, সাত গম্বুজ মসজিদ, বড় কাটরা ও ঢাকেশ্বরী মন্দির। বিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ার দিকে এই স্থাপনাগুলো দেখতে কেমন ছিল এ ছবিগুলো থেকে জানা যায়।

দুটি ছবি পাট ব্যবসা সংক্রান্ত। একটি ছবিতে দেখা যায় কারখানা থেকে আসা সোনালি পাট গুদামে নামানো হচ্ছে। আরেকটিতে পাট বোঝাই নৌকার দৃশ্য। সেসময় যে পাট বৃহত্তর ঢাকার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক পণ্য—ছবি দুটি সে তথ্যই দেয়।
ব্র্যাডলি-বার্টের তোলা বেশিরভাগ ছবিতেই ঘুরেফিরে এসেছে নদী, নদীকেন্দ্রিক মানুষ ও নৌকা। নদীগুলোর মধ্যে আছে মেঘনা, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র ও ধলেশ্বরী। কয়েককটি নদীর ছবিতে নদীর নাম নেই—‘বিক্রমপুর’ লেখা। ছবিগুলো সম্ভবত পদ্মা নদীর। নদীর ছবিগুলো গুরুত্বপূর্ণ নৌকাগুলোর জন্য। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা ধরনের নৌকা ছবিগুলোতে দেখা যায়, এসব নৌকার প্রায় সবগুলোই হারিয়ে গেছে।

দুটি ছবি ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরের ছবি। একটি ছবিতে দেখা যায় বন্দীরা সারিবদ্ধভাবে বসে চরকায় সূতা কাটছে। আরেকটি ছবিতে দেখানো হয়েছে বন্দীরা সুশৃঙ্খলভাবে খেতে বসেছে। খাওয়ার ছবি এবং ক্যাপশনটি পড়ে মনে হয় সেসময় কারাগারে ‘ডিনার’ হতো ব্রিটিশ নিয়মে—অর্থাৎ বিকেল অথবা সন্ধ্যার দিকে।
বিশ শতব্দীর একেবারে গোড়ার দিকের ঢাকাকে পাঠ ও অনুধাবন করতে এই ছবিগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। সেসময়ের ঢাকার এতোগুলো ছবি একসঙ্গে পাওয়া আমাদের জন্য সৌভাগ্যের। ভাগ্যিস তিনি কলমের পাশাপাশি ক্যামেরাটাও চালিয়ে ছিলেন! লেখালেখির পাশাপাশি তিনি ফটোগ্রাফিকে কতোটা ভালোবাসতেন তার প্রমাণ মেলে তারই লেখা গ্রন্থ ‘থ্রু পার্সিয়া ফ্রম দ্য গাল্ফ অব কাসপিয়ান’ (১৯০৯) থেকে।
তিনি লিখেছেন, একবার তাদের গাড়িটি একটি জলাভূমিতে নেমে পড়ে। গাড়ির চাকাগুলো পানিতে দাবতে থাকে। গাড়ি চলাচলার মতো সড়কের নাম নিশানাও নেই। তারা গাড়ি থেকে নেমে জলাভূমি ধরেই হাঁটা শুরু করেন। তাদের বিছানাপত্র সব নিজ নিজ পিঠে বাঁধা। ব্র্যাডলি-বার্টের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ক্যামেরা ও ফিল্মগুলো নিয়ে। সেগুলো না পানিতে ডোবে! কপাল আরো খারাপ, কিছু দূর যেতেই তারা আরো প্রায় দুই ফুট পানির গভীরে চলে যান। সুতরাং তাদের জিনিসপত্রও পানির নিচে! তিনি লিখেছেন, ‘আমার ক্যামেরা এবং ষোল ডজন ফিল্ম যদি একেবারে নষ্ট হয়ে যায় তাহলে হাসা ছাড়া আর কিইবা করার থাকতো। কিন্তু ঢাকনাওয়ালা টিনের বাক্সগুলো ফিল্মগুলোকে নির্দয় পরিণতি থেকে বাঁচিয়েছে। পরে যখন গাড়িতে উঠলাম তখন বোঝা গেল বাক্সে পানি খুব একটা ঢুকতে পারেনি। বাক্সের ভেতরের ছোট টিনের বাক্সে যে ফিল্মগুলি ছিল সেগুলো শুকনো ও অক্ষতই আছে। বিপদ কানের নিচ দিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত যতগুলো ছবি তুলেছি সেগুলো এবং আরো ছবি তুলতে রেখে দেয়া ফিল্মগুলো যদি নষ্ট হয়ে যেতো তাহলে আমাকে অবশ্যই শূন্য থেকে আবার শুরু করতে হতো।’
ব্র্যাডলি-বার্টের অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে, ‘পার্সিয়া : থ্রু পার্সিয়া ফ্রম দ্য গাল্ফ অব কাসপিয়ান’ (১৯০৯), ‘টুয়েলভ ম্যান অব বেঙ্গল ইন দ্য নাইনটিন্থ সেঞ্চুরি’ (১৯১০), ‘সিলেট ঠাকরে’ (১৯১১), ‘বেঙ্গল ফেইরি টেলস’ (১৯১৬),‘ পোয়েমস অব হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও : এ ফরগটেন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান’ (১৯২৩) ইত্যাদি।





কমেন্ট করুনঃ