লীলাময়ীর কৃষ্ণ গভীর চোখের তারা দু’টি অপরাহ্নের বিস্তৃত ছায়াতেও নিষ্প্রভ নয়, বরং হরিণ শাবকের ক্ষিপ্রতা সেখানে। মাখন-মসৃণ পায়ে আলতার নকশা। নকশা ঘিরে রূপোর ঘুঙুর বেঁধে কত্থক মুদ্রায় অদূরের নরম রোদকে কাম তাড়নায় রঙিন করে তোলে। অশ্বত্থ গাছের পাতা আনন্দ শিহরনে কাঁপে, পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে তেমন মদির রোদ এসে কাঁচুলির চুমকিতে চোখের তারায় চমকায়। তখন লীলাময়ীর ভ্রুযুগলে ঢেউ ফোটে, রূপের অহংকার বাঁকা রেখায় কপালেও ফুটে ওঠে। ইচ্ছা হয় মতির হার কোমরের বিছা আর পায়ের ঘুঙুর রেখে পোশাকের ছলনাটুকু আকাশে উড়িয়ে দেয়। লীলাময়ীর এমন অভিলাষ ঘুঙুরের তালে তালে বড়ো সরব হয়ে ওঠে। নীল নাভিমূলের নীচ থেকে আরও নীচে গভীর খাঁজে জরি চুমকিতে চমকিত ঘাগরা কোন এক রহস্যময় উপায়ে আটকে আছে। এমন বর্ণিল রোদের কামবীভায় তখন রাখাল এসে দাঁড়ায়। লীলাময়ী চকিতে অদূরে কোথাও সখীদের দেখে নেয়, তারাও অভিসারে মদির। কপট অভিমানে লীলাময়ীর চোখের পাতা একবার বুঁজে যায়, আবার খুলে, ঘুঙুরের মৃদু বোল তুলে রাখালের বুকে এসে মুখ লুকায় লীলাময়ী।
মনে পড়লো? লীলাময়ীর কণ্ঠ মাদক রসে ভারি। চওড়া লোমহীন বুকে রাখাল লীলাময়ীকে জড়িয়ে ধরে রাখে। অশ্বত্থ গাছের পাতাদের হঠাৎ শিহরন থেমে যায়, উঁচু ডালের ঘুঘু দম্পতি বিহ্বল হয়ে থমকে থাকে, কোনো কাতর স্বর বের হয় না। একজোড়া ঘাসফড়িং ঘাসের শিষের ওপর বসবার কসরৎ থামিয়ে আনমনা হয়ে পড়ে। এই হঠাৎ নৈঃশব্দের ভিতর শুধু লীলাময়ীর কোমরের বিছা খুলে ঘাসে পড়ার মৃদু শব্দের সঙ্গে কাঁচুলির বন্ধন ঘের মুক্ত করে দেয় রাখাল।
দেখো, এই মোহময় রোদ অল্প পরেই পুড়ে ছাই হয়ে যেত, লীলাময়ীর কণ্ঠে অভিমান।
কোথায় যেতো গো সোনা ? রাখালের কণ্ঠে কৌতুক।
দিগন্তে মিলেয়ে যেত, তুমি বুঝো না ? জল আর অভিমানের কোরাস অভিঘাতে লীলাময়ীর কণ্ঠ বেশ জড়ানো, শুনতে অবশ্য বেশ লাগে।
রাখাল এবার নিজের ভারি দুই ঠোঁট লীলাময়ীর কপালে রেখে বলে, বুভুক্ষু দিগন্তের সব আলো দুই ঠোঁট দিয়ে শুষে এনে তোমার কপাল চোখ ঘিরে বিছিয়ে দিতাম।
লীলাময়ীর আবেষ্টন প্রেমাবেগে আরও জোরালো হয়। সূর্যের নিজের বুকেও এখন রঙিন নেশার ঘোর। পশ্চিম প্রান্ত থেকে সেই রঙ লীলাময়ীর চোখেও কিছু এসে জমে। রাখাল লীলাময়ীর চোখে চুমু খেয়ে ধীরে ধীরে প্রায় স্বগতোক্তির মতো বলে, লক্ষ্মী সোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমার যে ভয় করে, তোমার জন্য ভয়।
কেন ? দেখো আমি অতি সবল…।
মহারাজের গুপ্তচর শুনেছি তোমাকে অনুসরণ করে।
রাখালের ঠোঁটে হাসি উদ্ভাসিত হয়, নীরব ও প্রশস্ত। লম্বা একটা শ্বাস গাঢ় অপরাহ্নের মৃদু শীতল বাতাসে মিলিয়ে দিয়ে লীলাময়ীকে ছেড়ে এক কদম পিছিয়ে দাঁড়ায়। লীলাময়ী বন্ধনহীন কাঁচলীসহ দুই হাত বুকের ওপর এনে ঢেকে রাখে। কমলা আলোর মায়াবী পরশে দেহ তনু মনে কামাবেশ জড়ানো। রাখাল অবশ্য মদনদেবের সৃষ্টি মদির রূপে বিমোহিত নয়। তার অভ্যন্তরের যে গহীন-গহ্বর তৈরি হয়ে আছে তার চাপ সে কখনো এড়াতে পারে না। বলে, লীলাময়ী আমার বুক কেন উন্মুক্ত বলো, কেন এত অবাধ মুক্ত ! কোনো বর্মের আচ্ছাদন নাই। লৌহবর্মের আচ্ছাদন তারই লাগে যার বুকে ও শরীরে পৌরুষ ও সৌন্দর্যের জৌলুষ নেই। রাজা মহারাজার নিজের ও তার সহচরদেরও কুৎসিত লৌহবর্মের দরকার হয়। কারণ কি জানো ! তারা অন্যায়ী শক্তির আধার বলে অšরের শক্তিতে সাহসী নয়। অনার্য ক্ষমতার কোনো জৌলুষ নেই। পশ্চিম দিগন্তের দিকে দুই হাত ছড়িয়ে দিলে পেশল মাংসের মসৃণ ত্বকে বিদায়ী সূর্যও আশীর্বাদের লাল আলোর উপহার রাখালের শরীরে ঢেলে দেয়। সবল পেশী, চোখ ত্বকে তখন শক্তি ঐশ্বর্য চমকায়।
বিমনা বিমুগ্ধ লীলাময়ীর চোখেও আবেশ, পরম প্রেমের প্রতি সমর্পণ করেও যেন মনে করে এই সুন্দরের প্রতি যথার্থ উপহার বুঝি দেয়া হলো না। অতি সামান্য নগণ্য নারী আমি, কি’ই বা পারি দিতে এই শরীরের অমৃত ও মনের সকল অন্তর বাহির ছাড়া ! রাখাল বুঝি বুঝতে পারে লীলাময়ীর মন, বলে, তুমি শুধু আমার থেকো, এর চেয়ে বেশি স্বপ্নেও আমি চাইতে পারি না।
ছায়া আরও গাঢ় হয়ে এলে ম্রিয়মাণ আলোর ভিতর সখীরা এসে দাঁড়ায়। তাদের ঠোঁটে ঠোঁটে হাসি, কৌতুক, কপট লজ্জা আর দুষ্টুমিতে ভরা। রাখালকে তারা ডাকে গোসাই বলে, রাখালরাজও বলে কখনো। গোসাঁইজী, লীলাময়ী দেবীকে যে এখন বিদায় জানাতে হয়, নাহলে আমাদের মুণ্ডুর সঙ্গে তোমার গর্দানও একই তলোয়ারের নীচে সঁপে দিতে হবে। রাখাল প্রশস্ত চোখ মেলে বলে, এ খুবই অন্যায়, ভিন্ন ভিন্ন তলোয়ার হলেই ভালো হয়। তোমাদের দেবী সখা নাহয় তার মহারাজ পিতাকে বলে দিবে। সখীদের মধ্যে যিনি শরীরের ভারেই কাতর বেশি, কথা বলে সমস্ত শরীর দুলিয়ে, বিশেষ ভঙ্গিতে শুধু বক্ষদেশ দুলিয়ে বলে, আ-মরণ ! কালী সন্ধ্যায় দেখো কথার ছিরি। রাখাল রসিকতা করেই যায়, কালী সন্ধ্যার দোষ হলে, লক্ষ্মী সন্ধ্যাতেই না হয় হলো। অপর সখীরা লীলাময়ীর গহনা কাঁচুলি ঘাগরা প্রসাধন সব ঠিকঠাক করে সাজিয়ে নেয়। ছল-লীলা পারদর্শী সখীরা লীলাময়ীকে নিয়ে আসন্ন সন্ধ্যার কমলা আলোর ভিতর দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পথে রাখাল নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে। লীলাময়ীও দুই পাশের সখীদের হাতের বন্ধন থেকেও ঘাড় ঘুরিয়ে বার বার দেখে। মুখে কোনো কথা, এমনকি বিদায় সম্ভাষণও নেই, যদিও অন্তর্গত সংলাপে দু’জনেই মুখর। এই নিঃশব্দ অন্তর্গত আলাপ বিনিময় ওই অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত চলবে, প্রতিদিনই এমন হয়।
পশ্চিমের রক্তলেপা প্রান্তে সূর্য বিলুপ্ত হওয়ার আগে দিবসের শেষ চিহ্নটুকু সাক্ষী মেনে রাখাল মা-জননীর দর্শন প্রার্থনা করে। বাবাকে রাখাল দেখেনি। শুনেছে জমির আইলে পড়ে থাকা বাবার শরীর জুড়ে ছিল রক্তজবার ছাপ। টকটকে লাল রক্তজবার চিহ্ন বুকে নিয়ে বাবা তার স্বর্গে আরোহণ করেছে। স্বর্গারোহণ তাঁর ইচ্ছাতে না হলেও, স্বর্গেই বাবা পৌঁছে গেছে। স্বর্গের নিশ্চিন্ত সুবাতাসে বাবা আয়েশেই আছে। স্বর্গবাসী কোনজন মর্তের ব্যথা বেদনা নিয়ে ঘোরে ! রাখালের প্রশস্ত বুক চোয়াল আর প্রশান্ত চোখের আড়ালে কোথাও বাবার ছবি আঁকা, সেখানে তিনি স্বর্গবাসী নন, পিছন থেকে তলোয়ারের কোপে গোটা শরীর শুকনা রক্তের দাগ নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। স্বর্গের সুখী বাবাকে সে কখনো দেখতে পায় না, মর্তের বাবাকেও সে দেখেনি। দুনিয়ায় যার দর্শন মিলেনি, স্বর্গে কেন তার রূপ মিলবে ! রাখাল তবুও বাবাকে দেখে পিছন থেকে, জমির আইলে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা বাবাকে। শরীরে জমাট রক্তের কালচে ছায়া, রক্ত জবার মায়ায় বিভ্রান্ত নয় তার এই দেখা। রাখাল আশ্চর্য রকম ছলনাগূঢ় কৌশলে স্বর্গের কথায় মুদ্রিত হওয়া বাঁকা হাসি ত্বকের অভ্যন্তরে লুকিয়ে রাখে। রহস্যময় ঔদাসীন্য চোখের ওপর ভাসে, কার সাধ্য এই গভীর ঔদাসীন্য ভেদ করে মর্ম জেনে নেয় !
মা তার মর্তেই আছে, স্বর্গবাসী হওয়ার কাহিনী জনে জনে প্রচার হয়নি কখনো। কোনো এক দুপুরে, বাবা রক্তজবার ক্ষত বুকে নিয়ে জমির আইলে পড়ে থাকার তিনদিন পরে ভরা রোদের ভিতর আতঙ্কিত শত-সহস্র চোখের সামনে লোহার বর্ম জড়ানো ভয়াবহ দুই ঈগল পাখি মা’কে ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম যে কোন আকাশ সীমানায় নিয়ে যেতে পারে। শিশু রাখালের কাছে পাষাণ প্রাসাদ বা দিকচিহ্নহীন অসীম আকাশের কী ভিন্ন অর্থ বহন করে ! রাখাল এমন এমন লগ্ন মুহূর্তে, সন্ধিক্ষণে বাক্সময় দিকেই মা’কে খোঁজে, তাঁর দর্শন পায়, মা’র মুখে হাসি সর্বদা, মা হাসিতে লুকায় অন্তর, ছলনা জানে না অন্তর, ফলে রাখাল হাসির আচ্ছাদন সরিয়ে মা’র বুকেও দেখে রক্তজবা, দেখে রাখালের ছবি। রাখাল চোখ মুদে সেই রক্তজবায় ঠোঁট ছোঁয়। মা তখন আকুল আবেগে রাখালের কাঁধে পিঠে বুকে চুমু দেয়, আদর করে দেয়। মায়ের সেই স্পর্শধন্য শরীরের অংশে রাখাল বোধ করে লৌহদণ্ডের থেকেও পুরু সবলত্ব, তীক্ষ্ণ তীব্র ফলা বা তীরের অতি সরু সূক্ষ্মতা বাঁকা হয়ে পড়বে তবুও জননী মেনকার স্পর্শধন্য শরীরে বিদ্ধ হতে পারবে না। রাখাল এমনই মনে করে। এবং এই প্রবল বিশ্বাসের জোরে ভীতি তৈরি হতে পারে না। উন্মুক্ত বুক গুপ্তচরের তলোয়ারের কোপের নীচে নিজেই মেলে ধরবে দরকার হলে। লীলাময়ীও রাখালের বুকে নিজেকে সমর্পণ করে বড়ো নিরাপদ বোধ করে। তার শরীরেও সাহস ও শক্তির সঞ্চয় হয়, মহারাজ বা তার বাহিনী তাকে ওই সংলগ্ন অবস্থায় সন্ত্রস্ত করতে পারে না।
রাখাল বলে, লক্ষ্মী, প্রিয়ে, তুমি আমার এই বক্ষদেশের মাঝে একটি বৃক্ষ রোপণ করেছ।
সত্যিই করেছি, অশ্বত্থ বৃক্ষ।
অশ্বত্থ না শেওড়া বৃক্ষ ?
শেওড়া কেন হবে ! এ কেমন কথা ?
শেওড়াই গো, তাই থেকে থেকে এত ভয় পাও, ভূতদের দানবের ভয়।
মোটেই না, সুরক্ষিত রাজপ্রাসাদের সুদৃঢ় নিরাপত্তার চেয়েও এই আমার অশ্বত্থের বেদী বহুগুণে নিরাপদ। রাখাল আবার লম্বা শ্বাস ফেলে, মা মেনকা আমাদের নিশ্চয় দেখছে। একদিন তোমাকেও ওই রকম আদর করে দিবে।
লীলাময়ী চুপ থাকে, কিছু সময় পর বলে, তাহলে আমার এই কোমল লোলিত শরীর বসন্ত আর মদন দেবের তৈরি কাক্সিক্ষত লাবণ্য, সুকঠিন মাংসপেশীর আড়ালে লুপ্ত হয়ে যদি যায় ! রাখাল সেদিন অপরাহ্নের মৃদু ঊষ্ণ কামউজ্জ্বল রোদ কাঁপিয়ে হেসে উঠেছিল। সেই তো, তখন আমি হবো সর্বসুখ বঞ্চিত অভিশপ্ত নিষাদ। না না, মা জননী নিশ্চয় তোমার মদনদেবকে অসন্তুষ্ট করবেন না।
লীলাময়ী প্রাসাদগৃহে অদৃশ্য হতে হতে রাখাল তার প্রশস্ত প্রশান্ত চোখ মেলে মেঘের সিংহাসনে তার মা জননীকে দেখে। মুখে তার সেইরকম হাসি, গভীর মর্মবেদনার তল থেকে যে হাসি ও আনন্দ তৈরি হয়ে জগৎকে মুগ্ধ করে। মুগ্ধ বিমোহিত রাখাল নব নব রূপে মা’কে দেখলেও এমন হাসিটির কোনো ব্যতিক্রম হয়না। আজ মনে হলো মা’র আসনের পাশে লোহিত মেঘের কোলে স্বয়ং ইন্দ্র। দেবী অপ্সরা মেনকা এইমাত্র দেবতাদের তুষ্ট করে নাচের ইতি ঘটিয়ে কেবল বসেছেন। বসেছেন মর্তমুখী হয়ে, তার রাখাল নন্দনের আহ্বান সে কখনো ভুলে না। মা’কে রাখাল কখনো আবার দেখেছে ওই দূরে সাগরের ঢেউয়ের ওপর, বিচিত্র এক আসনে রাখালের অপেক্ষায়। কখনো বড় পাহাড়ের চুড়ায়। এমনকি রাখালের ঘরে রাখালের মাথা কোলে নিয়ে বসে আছে। রাখাল তখন চোখ খুলে না। চৈতন্যকে একটি বিন্দুতে এনে স্থির করে রাখে। কিছুতেই সমূহ জাগরণে মা জননীর কোল ছাড়া হতে পারবে না। ঘুমে তন্দ্রায় জাগরণে মায়ের ঊষ্ণ সুগন্ধময় বুকে অনন্তকাল যাপন করে যায়।
রাখাল তার জননীকে দেখবার আগেই লৌহবর্মে আচ্ছাদিত ঈগল মা’কে উড়িয়ে নিয়ে গেল। তিনদিনের শিশু রাখালের মাতৃস্মৃতি শুধু তার অমিত স্বপ্নে, জনরবে। বাবা তো জন্ম পূর্বেই ঈগলের তীক্ষ্ণ নখের আঁচড়ে ভূমি শয্যা নিয়েছিল। তবু তার মা জননীই তাকে ঘিরে আছে। হয়তো তার ইহলীলার সাঙ্গ করার কথা জনরবে জানা যায় না বলেই। অপ্সরা, স্বর্গের বেশ্যা বলে খ্যাত হলেও সে দেবী মেনকা, দেব ঔরসজাত, দেবের উদ্দেশ্য সাধনে তার জন্ম, দেবতাদের আদেশে স্বর্গ মর্ত পাতাল সহ সকল স্তরে তাঁর সহজগম্যতা। রাখাল তাকে দেখেও ভিন্ন ভিন্ন লোকে, ভিন্ন ভিন্ন রূপে। এজন্যই তার মা জননীর নাম রেখেছে মেনকা। দেবী হলেও বেশ্যা মেনকার তো কিছু অপবাদ আছেই। রাখাল সব বুঝে না বুঝেই তার জননীকে দেবী মেনকা হিসেবে জেনেছে। হয়তো রাখাল এও বুঝে, বাবার তীর বিদ্ধ বুকে যারা রক্তজবার ছবি দেখেছিল, তিনদিন পর যারা তার অমিত রূপসী স্ত্রীকে হরণ করে নিয়ে যায়, আঁতুড় ঘরে কাঁচা নাড়ীতে তখনো রক্তের দাগ মুছেনি যে মায়ের, সেই হায়েনা ঈগল মা জননীকে শুধুই খুন করার জন্য হরণ করেনি, মা আছে, যে নিমিত্তে সে অপহৃত হয়েছিল এখনো তার সেই দায় হয়তো ফুরায়নি। মা জননী দেবী মেনকা হয়ে এখনো বেঁচে আছে। কোথায়, কেমন আছে রাখাল তার কোনো খোঁজে আকুলতা প্রকাশ করে না। এ তার অভ্যাসের কারণেই হয়তো। সে তার মায়ের কথা কখনো জানতে চায়নি, শুধু স্বপ্ন কল্পনার নিবিড় মুহূর্তে মা’কে খোঁজে, সন্ধান পায়, মায়ের সঙ্গে বাসও করে বৈকি। মা তার চিরন্তনী।
লীলাময়ী তবুও মানে না, নানা প্রসঙ্গে কথা তুলে, তার নামটাও জানা যায় না গো ?
নাম দেবী মেনকা।
তার পৈতৃক নিবাস, স্বজনদের কাছে জানা যায় ?
স্বর্গে মর্তে তার সহস্র স্বজন।
না গো, আমি তার খোঁজ চাই।
রাখাল লীলাময়ীকে ছেড়ে তার চোখের ওপর চোখ রাখে, তোমার ভিতরেই তার খোঁজ করো প্রিয়ে।
এ কেমন হেঁয়ালি গো !
রাখালের চোখে যেন কি আছে। লীলাময়ী চুপ করে যায়। রাখাল লীলাময়ীর চিবুক উঁচু করে বলে, তোমার রূপেই আমি মা’কে বহুবার দেখেছি, তুমি বলতে পার না আমার মা কোথায় ?
লীলাময়ী ভীত কণ্ঠে বলে, আমি তোমার প্রেম, মাতৃরূপ নই।
প্রেমিকা কি বৃক্ষ না পাথরখণ্ড ! নারীর নারীসত্তাই প্রেম জাগানিয়া। এই সত্তার গুণ ক্ষুণ্ন হলে প্রেম তৈরি হয় না। মাতৃপ্রেমও সেই নারীসত্তার শিষ্ট রূপ।
রাত আরও গভীর হলে, বন প্রান্তরের রেখা চন্দ্রহীন আকাশের আড়ালে লুপ্ত হয়ে গেলে নিঃসঙ্গ রাখাল ঘরে ফিরে। কেউ তার অপেক্ষায় নেই, কোনো আহ্বান নেই। রাখাল তার তক্তাপোশে শরীর ছেড়ে দিয়ে চোখ মুদে। হঠাৎ তার মনে হয় সে তার মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়েছে। আর আশ্চর্য এই কোলে অবিকল লীলাময়ীর শরীরের গন্ধ। রাখাল তার মা’কে গভীরভাবে জড়িয়ে মাথা ডুবিয়ে এই গন্ধ ভোগ করে। মা জননী মেনকা না লীলাময়ীর গন্ধ সে বুঝে না। মোহময় সুগন্ধের ভিতর শরীর ডুবিয়ে পড়ে থাকে। রাত্রির কোনো এক প্রহর, তার দরজায় কেউ সন্তর্পণে ঠকঠক আওয়াজ তোলে। রাখাল মুহূর্তে বিস্মিত হয়, সে তার মায়ের কোলে মাথা ডুবিয়ে পড়েছিল। সচকিত ভঙ্গিতে বলে, কে ?
কোনো উত্তর আসে না। দরজায় আবার তেমন টোকা।
উত্তর দেও, কে ?
উত্তর নেই। রাখাল দরজা খুলে দাঁড়ায়। একজন অবগুণ্ঠিত মানুষ। মনে হয় কোনো মহিলা। রাখাল বলে, বলো তোমার কি প্রয়োজন ? সহসা একটা অতি চেনা সুগন্ধ তার নাকে আসে। অবগুণ্ঠিত মুখের আচ্ছাদন সরায়। আবছা আলোতে রাখাল বুঝে নেয় লীলাময়ীর কোনো সখী হবে। তার হৃদয় চঞ্চল হয়ে ওঠে। তাহলে এই সুগন্ধ কে বয়ে আনলো ! তবুও রাখাল বিশেষ কোনো বার্তা শোনার অপেক্ষায় অস্থির।
সখী বলে, মহারাজা প্রিয়দর্শিনী লীলাময়ীকে গৃহবন্দি করেছে। আর বিশেষ ধরনের সৈন্যশ্রেণীকে পাঠিয়েছে তোমাকে বধ করার জন্য। তুমি কোথাও নিরাপদ আশ্রয়ে যেয়ে তোমার প্রেমকে উদ্ধার করার জন্য তৈরি হও।
রাখালের ওষ্ঠে হাসি মুদ্রিত হয়। হত্যায় অপহরণে পারদর্শী বিশেষ সৈন্যদলের জন্য তার করুণা হয়, চিন্তার কোনো বলিরেখা জাগে না, বরং কিছু পূর্বের আশঙ্কা তিরোহিত হয়ে আরও আশ্বস্ত হয়ে ওঠে। বলে, কল্যাণীয়া সখী তুমি নিশ্চিন্তে ফিরে যাও। মহারাজ তার কন্যাকে রক্ষা করার আয়োজন করেছেন, কাজেই কোনো বিপদ আমি দেখছি না। আর আমি ! তোমাদের মহারাজার থেকে নিরাপদ। সখী আতঙ্কিত চোখ তুলে, তুমি পালাও রাখাল।
আমার বাবার বুকে রক্তজবার চিহ্ন তোমরা একদা দেখেছিলে। আর আমার মা উভগামী, তিনি নক্ষত্রের পাশ থেকে বা এই তক্তাপোশ থেকে আমাকে দেখছেন। আমার কোনো ভয় নেই। যাও তুমি স্বচ্ছন্দে।
সখী ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। রাখাল বলে, দাঁড়াও, তোমাদের মহারাজার মহারাণীকে বলবে লীলাময়ী এবং রাখালরাজ নিরাপদেই থাকবে। তিনি যেন চিন্তা না করেন।
সখী এবার বিস্মিত, মাথার ঘোমটা ফেলে দেয়। রাখালও চকিতে যেন লীলাময়ীকে দেখে। এই সখীকে দেখেছে বলে মনে হয় না তো। শরীরে গহনা আর ঐশ্বর্যের সাজ নেই, মলিন বসন, কিন্তু কেমন এক আলোর দীপ্তিতে উজ্জ্বল, বয়সের রেখা ওই আলোর মহিমায় ঢাকা পড়েছে। গাঢ় কণ্ঠে বলে, মহারাণীকে কেন ? মহারাণী কি তোমার নিরাপত্তা নিয়ে ব্যকুল ?
বিস্মিত রাখাল নিষ্পলক চোখে এই মহিয়সী রূপ দেখতে দেখতে বলে, তার প্রশ্রয়ধন্য না হলে লীলাময়ী এই রাখাল যুবকের বাহুলগ্ন হতে পারতো না। তাঁর আশীর্বাদ আছে বলেই…।
রাখাল তার কথা শেষ করার আগে ওই নারী দ্রুত সরে যায়। রাখাল বিমূঢ় অবস্থা কাটিয়ে আবার শোয়, কিন্তু ঘুম চলে গেছে, মাতৃক্রোড়ও এখন নেই। বরং সে উঠে উঠানে দাঁড়িয়ে আকাশে তারার পাশে তারা দেখে। কোথাও কোনো তারার অঙ্কে শুয়ে নিশ্চয়ই তার মা জননী তাকে দেখছে। রাখাল নির্নিমেষ আকাশে তাকিয়ে থাকে। একসময় পূর্ব দিগন্তে রঙের আভা ফুটলেও তার তারা দেখা শেষ হয় না, যতক্ষণ ওই আভায় তারারাজি মিলিয়ে না যায়। নতুন একটা দিনের আরম্ভ। অন্যরকম এক রাত শেষে রাখাল বেশ ক্লান্ত বোধ করে। বরং এইদিনের শুরুতে সে একটু ঘুমিয়ে নিতে চায়। কোনো সৈন্যদলই যেহেতু এলো না, তখন আর অপেক্ষা কেন।
অশ্বত্থতলায় আজ কেউ অপেক্ষায় নেই। রাখাল অদূরে বসে এই শূন্য বৃক্ষতলের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষায় প্রহর গোণে, কেউ আসে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার মুহূর্তে সে প্রতিদিনের মতো মাতৃদর্শন পেতে তৈরি হয়ে ওঠার সময় পিছন থেকে কেউ তাকে ডাকে। রাখাল চিনতে পারে লীলাময়ীর এই স্বাস্থ্যোজ্জ্বল সখীকে। রস কৌতুক তার অঙ্গের ভূষণ। তেমন কৌতুক আর দেহভঙ্গিমায় বলে, কি গো রাখালরাজ, আজ বুঝি খুব বিরহ হলো ?
মধুর বিরহ তো আর কপালে নেই ভাই, তুমি তো সাক্ষাৎ সখী হয়ে এলে। তো সখীসঙ্গ পেলে কে বিরহে ভোগে ? আসো, তোমাকে আলিঙ্গন করি।
সখী দ্রুত কাছে এসে বলে, খবরদার আমাকে ছোবে না, মহারাণীর চর আমাকে দেখছে।
রাখালের ভ্রুতে বঙ্কিম রেখা ভাসে, মহারাণীর চর ! তোমাদের মহারাজার চর কোথায় গো ?
শুনো রাখাল, হাতে সময় অল্প। কাল দ্বিপ্রহরে তুমি রাজার দরবারে আসবে, রাণীমা’র হুকুম। তিনিও থাকবেন।
রাজ-দরবারে রাখালের তো কোনো দরবার করার কিছু নেই।
তোমার নেই, কিন্তু রাজার আছে। তোমার সঙ্গে কথা বলে দেখতে চায়, মহারাণীই রাজাকে বলে এই আয়োজন করেছেন।
তোমাদের মহারাণীর এমন শখ হলো কেন ? উনি কি এখনো যুবতী রূপসী, রাজা তাঁকে সময় দেয় না ?
আঃ মরণ, কথার ছিরি কি ! এ তো তোমার লীলাময়ীর মা জননী, কন্যার প্রেমিককে দিনের আলোতে দেখে নিতে চায়।
রাতের অন্ধকারে কি দেখেছে ?
দূর, কথা শুনো। কাল দ্বিপ্রহরে, মনে থাকে যেন। এই বলে সখী দ্রুত চলে যাওয়ার উপক্রম হলে রাখাল খপ করে তার হাত টেনে ধরে। হাতের চাপে সোনার চুড়ি কিছু বাঁকা হয়, কাচের চুড়ি চুরচুর করে ভেঙে পড়ে। সখীর কপালে আতঙ্কিত রেখা, তবে হাত ছাড়িয়ে নেয় না, বলে, যা হয় তাড়াতাড়ি কর। আমাতে আর সেই স্বাদ পাবে !
রাখাল মুচকি হাসে, সখীর চোখে চোখ রাখে, না গো সখী, লীলাময়ী ভিন্ন অমৃতেও আমি স্বাদ খুঁজি না, বলো, আমার লক্ষ্মীময়ী কেমন আছে, তার ঘর কি শিকলে আটকানো, তার হাতেপায়ে কি বেড়ি, সে কি অভুক্ত, তার চোখ কি অশ্বত্থ গাছের পানে একবারও পড়ে না ?
সখীর চোখে জল নামে, কণ্ঠে সেই জলের বাধা। তার হাতেপায়ে সোনার বেড়ি নেই, অফুরন্ত খাদ্যের আয়োজন আছে, তার দরজায় সোনার শিকল হলেও সে বন্দি শুধু তোমার হৃদয়ে। আর কে তাকে বন্দি করতে পারে !
রাখালের চোখে এবার জল, শেষ আলোর লাল ছোপ চোখের পরিসর ঘিরে, পশ্চিম দিগন্তের বিষণ্ন রঙীন শোভা রাখালের চোখেও জেগে ওঠে।
নাম-মাত্র পরিধেয় বস্ত্রে রাখাল শুধু অঙ্গ ঢেকে নেয়, শরীর সম্পূর্ণ উন্মুক্ত উদার খোলা পর্বতের মতো। মহারাজা আর তার মহাসৈন্যবলের সকল কৌশল আর অস্ত্রের সামনে নিজেকে সে এভাবে উপস্থিত করবে। সৈন্যদলকে, এমনকি রাজাকেও প্রলুব্ধ করতে পারে এমন উন্মুক্ত খোলা বুকে নিশানা নির্ভুল বর্শা বিঁধিয়ে দিতে। রাখাল দেখতে চায় রাজার প্রলুব্ধ চোখ, আর তার নিশ্চিত পরিণাম আশাহত হওয়া। রাখাল দ্বিপ্রহরে দরবারের ফটকে এসে দাঁড়ায়, ক্রুদ্ধ প্রহরী পথ আটকায়। রাখাল তাদের জানায়, তোমাদের মহারাজাই আমাকে আমন্ত্রণ করেছেন আমার শরীর ও যৌবনের জৌলুষ দেখার আগ্রহে। তোমরা ভিতরে সংবাদ জানাও, রাখাল হাজির।
আগে পিছে সশস্ত্র প্রহরীর প্রহরায় রাখাল দরবারে রাজার নিকটবর্তী নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হয়। সভাসদ নিশ্চুপ। রাজা নিশ্চুপ, সকলের দৃষ্টি রাখালের ওপর, রাজার ওপর দুপাশ থেকে বিশাল পাখা দুই জোয়ান ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মৃদুমন্দ বাতাস তুলছে। রাখালের প্রশান্ত মূর্তি, চোখের তারা উজ্জ্বল, শরীরের মসৃণতায় দরবারের আলো পিছলে যায়। রাজা চিবুকে তর্জনি ঠেকায়, তাতে হীরার টুকরা, বলেন, তোমার নাম ?
ভরতচন্দ্র।
রাজা সহ সভাসদের কপালে হাল্কা ভাঁজ পড়ে।
তুমি রাখাল নও !
ভরতচন্দ্র কি রাখাল নয় ? সে রাজা হয়েও রাখাল।
তোমার পিতা ?
রাজার চোখে চোখ রেখে রাখাল দৃঢ় প্রত্যয়ে বলে, মহারাজ নিশ্চয় কৌতুক করছেন না। ভরতচন্দ্রের পিতা মহাবীর রাজা দুষ্মন্তই। তবে আমিই আমার পিতা। আমি আমার মাতা। আমি একই অঙ্গে পুত্র-পিতা-মাতা।
মূর্খ বালক, এটি রাজদরবার। হেঁয়ালি করার পানশালা নয়।
ক্ষমা করবেন রাজা, পানশালা আমি ভাবিনি, কারণ সে জিনিস আমি কখনো দেখিনি, তবে শুনেছি রাজদরবারের মতই সেখানে হেঁয়ালি চলে, কূটকৌশল মতলব আর জোচ্চুরির সমাবেশ ঘটে। আমি রাজার উত্তর করেছি মাত্র। পিতা, যিনি স্বামীও তিনি স্ত্রীর গর্ভে আপনাকে আপনি পুত্ররূপে জন্মদান করেন। পিতাই পুত্ররূপে স্ত্রীর গর্ভে পুনরায় সন্তানরূপে জন্মলাভ করেন। সেইজন্যেই ভার্যা বা স্ত্রীর নাম হয়েছে জায়া, জননী। এইসব আপনি মহাজ্ঞানী মহাশক্তিধর আপনি জানেন, ঋষি কবিরা বলে গেছেন। কিন্তু সেই প্রাচীন কবি যা বলেননি তা হলো, এই পুত্র বা কন্যা শুধু পিতারই প্রতিবিম্ব নয়। একই সঙ্গে সে মাতাও। মাতাও সন্তানের ভিতর দিয়ে পুনর্জন্ম লাভ করেন। তাই আমি আমার পিতা, মাতা এবং স্বয়ং ভরত নামধেয় পুত্র।
রাজা অসীম ধৈর্যের পরিচয় দেন। সভাসদ একবার রাখালকে দেখে, আর একবার রাজাকে। আর রাজার পিছনে, ঝালরের আড়ালে মহারাণী নির্বাক নির্নিমেষ তাকিয়ে দেখছেন এই যুবাকে। রাজা শান্ত স্বরে বলেন, তোমার মাতা জননী তাহলে শকুন্তলা দেবী ?
না মহারাজ তিনি নন, শকুন্তলা দেবী স্বয়ং ব্রহ্মের কন্যা দেবী মেনকার গর্ভে জন্ম নিয়েছেন। আমার মাতা দেবী মেনকা। উভগামী, অপ্সরা, নৃত্যপটিয়সি মোহমুগ্ধকারিনী, ঋষী-তপস্বী দেব-দানবের তপস্যা ছুটে যায় আমার মা মেনকার নৃত্যরসে। আমার শকুন্তলা রাজকন্যা প্রিয়দর্শিনী লীলাময়ী। লীলাময়ীর ভিতর দিয়ে আপনি এবং আপনার ভার্যা মহারাণীর পুনরায় জন্ম হয়েছে, অদূর ভবিষ্যতে আমারও হবে, সুতরাং মহারাজা পিতা-পুত্র-মাতা-কন্যার পরস্পর সম্পর্ক যত লৌকিক মনে করা হয় তা তত লৌকিক নয়, বরং প্রাকৃতিক। প্রকৃতি যেমন প্রকৃতির ভিতর লয় আবার প্রকৃতির ভিতর জন্ম ঘটে।
লীলাময়ীর নামধ্বনি শুনেও রাজার ধৈর্য অটুট, অস্থিরতা অনুপস্থিত দেখা গেল, তবে দাঁতে দাঁত রেখে বলেন, দুষ্মন্তের পুত্র ভরত তুমি রাখাল হয়ে গেলে কোন খেয়ালে ?
খেয়াল নয় রাজা, বলতে পারেন বাধ্য হয়ে, প্রকৃতিরও অভিপ্রায় হয়তো। রাজা দুষ্মন্ত তাঁর ভার্যার গর্ভে আমাকে সঞ্চার করে বনের অভ্যন্তরে এক ঋষিগৃহে ফেলে গিয়েছিলেন। ভরতের জন্ম সেই বনের মধ্যে বনের তৃণলতা পশুপাখির মতো। সেখানেই তার শিক্ষা লাভ। প্রান্তহীন বনের কিশোর তো রাজকুমার নয়, প্রকৃতির মতো রাখাল, রাখাল হয়েই জন্মে।
তোমার সেই পিতা এখন কোথায় ?
আমার মধ্যেই তিনি বিরাজ করেন, আমাকে জন্ম দিয়ে তিনি সর্বভূতে মিলিয়ে গেছেন। তাঁকে মিলিয়ে যেতে হয়েছে। কারণ রূপ রস যৌবনের অমিত আধার তার দেবী মেনকার প্রতি শক্তিমান দেব-দানবের নজর যে পড়েছিল, দেবী মেনকাকে হরণ করার পথ সুগম করার লক্ষ্যে আমার পিতাকে সর্বভূতে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে। লৌহবর্ম আচ্ছাদিত হিংস্র ঈগল দানবের আজ্ঞাবাহী হয়ে এই কাজ করে।
আর তোমার জননী ?
জননী মেনকা আছেন সর্বত্রগামী, হয়তো এখনো তিনি রস বিতরণের দায় মিটিয়ে চলেছেন স্বর্গে মর্তে।
রাজা হাতের ইঙ্গিতে তার দুই পাশের পাখা থামিয়ে দেন। বলেন, শুনো বালক, তোমার আয়ু প্রলম্বিত করে সব বাচালতা শুনে গেলাম। যবনিকা এখন আসন্ন, তোমার কোনো অভিপ্রায় আছে ?
রাখালের ঠোঁটে হাসি ভেসে ওঠে, চোখেও তার রেশ, বলে, আপনার ধৈর্যের জন্য সভাসদ নিশ্চয় আপনার প্রশংসা করবেন, তবে অযথাই আপনি আমার অনেকটা সময় নষ্ট করলেন। আমার অভিপ্রায় আপনাকে জানাবার কোনো অভিপ্রায় আমার নেই। তবু বলি, দয়া করে লীলাময়ীর দ্বার উন্মুক্ত করে দেন, আমাদের দুই হৃদয় আত্মা বহু আগেই অভিন্ন হৃদয়ে একই সত্তায় রূপ নিয়েছে। মৃত্যুর ভয় আমাকে দেখাবেন না। আমি মা মেনকার বরে মৃত্যুঞ্জয়ী। আমি রাখাল, কবে কোন কালে রাখাল, কৃষক, প্রকৃতি রাজকোপে নিশ্চিহ্ন হয়েছে ! বরং রাজার পর রাজা খুন হয়ে যাচ্ছে। ইতিহাসের পাতা রাজার খুনে ভারি হয়ে উঠেছে গো মহারাজা।
রাজা তার সভাসদগণের ওপর চোখ বুলিয়ে পিছনে ঝালরের আড়ালে মহারাণীর উদ্দেশেও একবার তাকান। সকলেই নিরুত্তর। রাজা তাঁর পাশের প্রহরীকে আরও নিকটে ডাকেন, প্রহরীর কোমর থেকে তরবারি খুলে নিয়ে তার ধার পরখ করেন।
রাখালের ঠোঁটে সেরকম হাসি অবিকলই থাকে, হয়তো একটু বাঁকা হয়। বলে, আমাদের কৃষ্ণপুর গ্রামে আমার বাবা খুন হয়ে পড়েছিল জমির আইল রেখায়। তারপর আঁতুড় ঘর থেকে আমার মা লুঠ হয়ে যায়। তার কোলে ছিল তিনদিনের শিশু। আমি বনপ্রান্তে শালবৃক্ষের মতো একা নিঃসঙ্গ বেড়ে উঠেছি। আমাকে মৃত্যুর ভয়, খুনের ভয়াবহতা দেখাবেন…!
রাখালের কথা শেষ হওয়ার আগে মহারাজার পিছন থেকে দুই হাতে ঝালর ছিঁড়ে, সরিয়ে মহারাণী দরবারে সকলের সামনে এসে রাখালের মুখের ওপর চোখ রেখে কি যেন খোঁজেন, তারপর স্থির দৃঢ় স্বরে বলেন, যাও বাছা, তুমি ফিরে যাও। তোমার কোনো ভয় নেই।
রাখাল বিস্মিতভাব প্রকাশ করে না। এই মহারাণীই অন্ধকার রাতে তাকে সতর্ক করতে এসেছিল না !
মহারাণী অঙ্গুলি নির্দেশ করেন রাখালকে বেরিয়ে যেতে। রাখাল পিছন ঘুরে ফিরে যেতেই রাজার চোখের ওপর চোখ রেখে রাণী তীব্র আগুনের বহ্নিশিখায় রাজাকে ভষ্ম করে দিতে চান। রাজা চোখ একবার নামিয়েও আবার এই রূপের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই কি যেন ভাবেন, কোন স্মৃতি তাকে বেমনা করে দেয়, এই সেই অপরূপা অনিন্দ কান্তি সুনিতস্বনী রমণী, মহারাণীর মর্যাদায় যাকে অভিষিক্ত করেছিলেন কোনো পর্ণ কুটির থেকে তুলে এনে ! রমণসুখদায়ী বাধ্য বিনম্র রাণীর এই লেলিহান অগ্নিদৃষ্টি এতকাল কোন্ গুহায় লুকিয়ে ছিল, কেনই হঠাৎ তা তীব্রতায় অতুলনীয় তেজে জ্বলে উঠলো। রাজার চোখে বিস্ময় ও কৌতূহল ঘনায়। রাণী দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই বলেন, রাখাল নিরাপদেই থাকবে।
রাণীর কণ্ঠে প্রত্যয় এবং রাজ অহংকে আঘাত করার সাহসে উজ্জ্বল। রাজার চোখে পলক পড়ে না রাণীর এই রূপ এই অভূতপূর্ব রূপ দেখে। রাণী নিষ্ক্রান্ত হওয়ার মুখে রাজার ঠোঁট ঘিরে হাসি দোলা দেয়। রাজা ইঙ্গিতে সভাসদ বিদায় করে দরবার কক্ষে একা কিছু সময় যাপন করেন। একা দরবার ঘরে তার ভ্রুযুগলে নানা প্রশ্ন জেগে ওঠার পর ধীরে ধীরে ক্রোধ জন্মে। তার মনেও খুনের প্রত্যয় আরও দৃঢ় হয়, আর প্রশ্রয় নয়, প্রয়োজনে মহারাণী নির্বাসন যাবেন, পরিত্যক্ত হবেন। ইতর নিষাদ যুবার অহং ও সাহসকে জল হাওয়ায় বিচরণ করতে দেয়া হবে না। আবারো রাজার মনে প্রশ্ন উদয় হয়, রাখালকে নরকে পাঠালেই সব মীমাংসা যেন হয়ে উঠছে না। রাণী কী এমন দেখল ওই ঔদ্ধত্য যুবার ভিতর ? কুল বংশ হীন অর্ধনগ্ন অশিষ্ট যুবার বালকোচিত বাক্স্ফূর্তিতে কি ছিল এমন ? কোন সত্যে রাণী আন্দোলিত অথবা বিব্রত হলেন ! রাজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ মুদেন, সময়ের নানা বাঁকে, অতীতের কত শত ঘটনা উপঘটনায় কোনো উত্তরই একমাত্র উত্তর হয়ে ওঠে না।
রাখালের মনে যুগপৎ আনন্দ ও বিষ্ময়। রাজার গর্ব, ক্ষমতা অহং সভাসদের সামনে, মহারাণীর শ্রবণ গোচরে অবহেলা করতে পারার আনন্দ, অন্যদিকে মহারাণীর এমন আচরণের পিছনে নিহিত কোন কারণ ! কেন তিনি আমাকে রক্ষার জন্য নিজে বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি নিলেন ? মধ্যরাতে কেন তাঁকে আসতে হয় আমার নিরাপত্তার আশঙ্কায় ? নাকি এই আশঙ্কা রাখাল যুবার জন্য নয়, তাঁর রাজ পরিবারের জন্যই ! কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিজ পুত্রদের পাশে পাওয়ার জন্য ওমন প্রহরে উদ্বিগ্ন কুন্তি যেমন ছুটে এসেছিলেন বীর কর্ণের কাছে কর্ণ তো কুন্তির গোপন পুত্র ! রাজার সঙ্গে বাকচাতুর্যে যেমন জানিয়ে ছিলাম আমি ভরত, বনে জঙ্গলে শালবৃক্ষের মতো বেড়ে ওঠা। এই জঙ্গলে ঋষিআশ্রমে মাতা শকুন্তলার সঙ্গে জন্ম থেকে শৈশব-কৈশোর পর্যন্ত ভরত তো কর্ণের কাছেই শিক্ষা পেয়েছিলেন, বীর হয়ে ওঠার শিক্ষা ! মহারাণী উৎকণ্ঠিত এইজন্য যে কর্ণের কাছে অস্ত্রশিক্ষা পাওয়া প্রাপ্ত মহাবীর ভরত এই রাজবংশের ধ্বংসের কারণ হবেন ! রাখাল আর গৃহে ফিরে না। দ্বিপ্রহর থেকে অপরাহ্ন সন্ধ্যা পর্যন্ত অশ্বত্থতলায় অপেক্ষায় থাকে, ভীত রাজা লীলাময়ীকে মুক্ত করে দিতে পারেন, মহারাণীও পারেন লীলাময়ীকে তার প্রেমিকের বাহুডোরে আলিঙ্গনাবদ্ধ হওয়ার জন্য মুক্তি দিতে, রাজার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই।
ধীরে ধীরে অপরাহ্নের আলো নিভে যেতে থাকে, শূন্য প্রান্তর আরও শূন্য বিষণ্ন হয়ে ওঠে উত্তরের ঠাণ্ডা হাওয়ায়। রাখালের উদোম শরীরে ঠাণ্ডা হাওয়া আজ আরও বেশি ঠাণ্ডা লাগে। শরীর শিহরিত হয়। তবুও এইসব তুচ্ছতা অগ্রাহ্য করে আকাশ প্রান্তে সন্ধিক্ষণের গাঢ় আভায় দৃষ্টি মন নিবদ্ধ করে মা জননীকে আহ্বান করে। মেঘের রঙিন সিংহাসনে তিনিও আজ খানিক বিলম্বে আসীন হন। তাঁর মুখে প্রশান্ত হাসিরেখা যেন নেই, প্রত্যয় দৃঢ়তায় সবল, কঠিন। রাখাল তার কোলে মাথা রেখে শান্তি সুখ খুঁজে না। বরং বিষ্ময় কৌতূহলে তার মগ্নতা ছুটে যাবার উপক্রম হয়। এ তার মা মেনকা নয়, এই মা’কে এতকাল জলে স্থলে আকাশে গৃহে দেখেনি, এ তো মহারাণী। রাখাল তবুও ধ্যান মগ্ন স্থিরতার ভিতর মা’কেই দেখতে চায়, তার রূপ তো জননীরই রূপ। জননীর রূপ কি বহুরূপের হতে পারে ? চক্ষু কর্ণ নাসিকার বিন্যাসে জনে জনে তারতম্য ঘটলেও মাতৃরূপের সার্বজনীনতা ওই বিদায়ী সূর্যের চেয়েও সত্য। প্রতি প্রহরে প্রহরে চন্দ্র সূর্যের ও রূপের বদল ঘটে, এই বদলে তো চন্দ্র সূর্য স্বধর্ম চ্যূত হয় না কখনো। রাখাল বিষ্ময় বোধে ধ্যান মগ্নতায় কিছু আলগা হয়ে উঠলেও মাতৃরূপের দর্শন থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে না। অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এলে সবল দৃঢ়তা আলো স্বল্পতায় হারিয়ে গেলে বরং রাখাল পরম তৃপ্তিতে মা জননীর কোলে মাথা এলিয়ে দিতে পারে। মনে মনে বলে, তুমি আমাকে রক্ষা করো, সাহস যেন না হারিয়ে ফেলি। মা বলেন, তুই রাজা ভরতচন্দ্র, এই ভারতভূমির তুই স্বামী, দেবতাদের আশীর্বাদ তোর ওপর আছে বাবা। শুধু কখনো সত্য থেকে বিচলিত হবি না।
রাখাল অন্তর্গত স্বরে প্রশ্ন করে, সত্য কি ?
তোর মানব অস্তিত্বই সত্য। তোর বর্তমানই সত্য।
আমার অতীত ?
সত্য ছিল।
ভবিষ্যৎ ?
অপেক্ষায় ! তবে বর্তমানে নিহিত। বর্তমানকে সত্য করে তুলতে পারলে ভবিষ্যৎ বর্তমানে সত্য হয়ে উঠবে।
লৌহ ধাতবের তীব্র ঝঙ্কারে রাখালের ধ্যান ভগ্ন হয়, তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে রাজার সেই প্রশিক্ষিত সৈন্যদল। রাখাল সৈন্যদের ওপর চোখ বুলিয়ে আকাশে চোখ তুলে। এই অন্ধকার ফুঁড়েও সে দেখতে পায় মা জননীর মুখে আশ্বাসের হাসি, উন্নত করতল তার মস্তকশীর্ষে। এবার রাখালের ঠোঁটে হাসি ফোটে, কণ্ঠে কোনো আশঙ্কা বাজে না, বলে, বেশ, তোমাদের তলোয়ার, বর্শা. তীর আর বিশেষ শিক্ষা নিয়ে এই জনহীন প্রান্তরে নিরস্ত্র, প্রায় নগ্ন এই যুবককে হত্যা করো। এখনই করে রাজার কাছ থেকে ধন পুরস্কার আদায় করে নেও। সৈন্যগণ একে অপরের চোখে চোখ রাখে। খাঁচার মধ্যে পাওয়া একটি মেঠো ইঁদুরকে হত্যা করার এই মহা আয়োজনে নিজেরাই যেন কিছু কুণ্ঠিত হয়। তবু হুকুমের আর শিক্ষার দায়ে তলোয়ার উঁচু করে একাধিক সৈন্য রাখালের কাঁধে সজোরে কোপ বসিয়ে দেয়। রাখালের চোখ বন্ধ, সে তার মা জননীকে দেখছে। সৈন্যদের তলোয়ার পাথরে কোপ পড়ার মতো আওয়াজ তুলে ফিরে যায়, রাখালের কাঁধে তার স্পর্শ দাগও পড়ে না। বর্শা তার পেটে গেঁথে দিতে প্রশিক্ষিতরা কসরৎ করে, হয়তো তাদের সুতীক্ষè বর্শার ফলা বাঁকা হয়ে ফিরে যায়। তীরন্দাজের তীর রাখালের বুকে লেগে রাখালের পায়ের কাছে পড়ে কুর্ণিশ করে। সৈন্যরা পরষ্পর আবারো চোখে চোখ রাখে, বিস্ময় এবং অভিভূত তারা। অল্প পরে হতবিহ্বলতা চোখে ফুটিয়ে তোলে। মুহূর্তে তাদের বিহ্বলতা কেটে ভগবান দর্শনের অনুভূতি জাগে। লৌহ আচ্ছাদিত আপন আপন পোশাকের ভার নিয়ে কষ্ট করে হলেও রাখালের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত জোড়া লাগিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেপ্রভু আপনি কে, আমাদের ক্ষমা করে দিন, আমরা শুধু রাজার হুকুম পালন করতে এসেছিলাম। আমাদের আপনার পায়ে আশ্রয় দিন। রাখাল তখন মাতৃরূপ দর্শনে ব্যস্ত। এবার মাতৃদৃষ্টির মতো রাখালের চোখ ও ঠোঁট ঘিরে প্রশান্ত হাসি মুদ্রিত হয়। সে চোখ খুলে এবং ধীরপায়ে নিজ গৃহের দিকে এগিয়ে যায়। তার পিছনে হাঁটু ভেঙ্গে অপরাধ ও পাপবোধে দীর্ণ সৈন্যরা পড়ে থাকে।
রাত্রির প্রথম প্রহরেই এই দুঃসংবাদ রাজার কাছে পৌঁছে যায়। তীর সেনানী সব রাখালকে সত্যি সত্যি ভরত ভেবে ভগবান জ্ঞানে পূজা করে ফিরেছে। তাদের তীর বর্শা তলোয়ার নাকি ভগবানের তেজে বেঁকে গেছে। ক্রোধে রাজা ফেটে পড়তে চায়, এত সব কাপুরুষ, ইঁদুর পেঁচা রাজ কোষাগারের অর্থে লালন করে আসছি ! রাজা তলব করেন প্রধান সেনাকে। অর্জুনের মতো তীরের নিশানা অব্যর্থ। একই সঙ্গে তলব করেন মহারাণীকেও। মহারাণী পাল্টা অনুরোধ করে, প্রয়োজন হলে রাজা অনুগ্রহ করে অন্তপুরে দর্শন দিতে পারেন। মহাসেনাধ্যক্ষ যথাবিহিত সম্মান দেখিয়ে সৈন্যদের রেওয়াজ মতো তার উপস্থিতি ঘোষণা করে। ক্ষুব্ধ রাজা মুহূর্তে আদেশ দেন, এই রজনীর অন্ধকার দুনিয়া থেকে মিলিয়ে যাওয়ার আগে, আগামীকালের সূর্য উদয়ের আলো এই রাজ্য স্পর্শের আগে রাজবংশের সম্মান ঘাতিনী, রাজাপিতার মর্যাদার প্রতি উদাসীন গৌরবান্বিত বংশের কলঙ্ক রাজকন্যা লীলাময়ীকে হত্যা করে আসো। নিজ পাপিষ্ঠা আত্মজার রক্তে আমার অপমান ধুয়ে আগামী দিনের আগেই পঙ্কিলমুক্ত হতে চাই। সেনাধ্যক্ষের চোখে চেহারায় কোনো অভিব্যক্তি ফোটে না। রাজার আজ্ঞা পালনের প্রতিশ্র“তি দিয়ে প্রস্থানের অনুমতি চায়।
মহারাণী রাজার নির্দেশ তখনি জ্ঞাত হন। সময় ব্যয় করেন না। রাখালকে বার্তা পাঠান, সে যেন এখন রাজপ্রাসাদে এসে মহারাণীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। লীলাময়ীর জীবন বিপন্ন। তার হৃদয় উপড়ে নিতে রাজা আদেশ জারি করেছেন। রাখাল শান্ত চিত্তে বার্তা গ্রহণ করে, কোনো বিচলতা তার চলায় নেই। আজ্ঞা মতো রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে। আজ সব অন্যরকম। রাজার প্রহরী সেপাই নফর সব সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে রাখালকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় সম্ভ্রমে। রাখাল অবশ্য কিছুই ভ্রুক্ষেপ করে না। এই রাজপ্রাসাদ যেন তার চেনা, চিরকাল যাওয়া-আসার গৃহ তেমন স্বচ্ছন্দে এগিয়ে চলে। মহারাণী অপেক্ষাতেই ছিলেন। রাখালকে দেখতে পেয়ে ত্রস্ত তার কাছে ছুটে আসেন। রাখাল পূর্ণচোখে তাকিয়ে চমকে যায়। তার আত্মা কাঁপে, এই সেই রূপ যিনি আশীর্বাদে উন্নত করতল তার মস্তক আচ্ছাদন করে রেখেছিলেন। কোলে মাথা ডুবিয়ে শান্তি ও নিজেকে খুঁজে ফিরে দেখেছে। জেনেছে সত্য কি। রাখাল এবার তেমন তন্ময়তায় জানতে চায়, মা জননী, এসব কেন হয় ?
তোমার অস্তিত্বের সত্য এবং নিরঙ্কুশতা যে অস্বীকার করা যায় না। তুমি সত্যি, বর্তমানই সত্য মুহূর্ত।
রাখাল আর ভেবে দেখে না, এই সন্ধ্যায় রঙিন মেঘের সিংহাসনে বসে মা মেনকা এই উত্তর করেছিলেন। তখন তার রূপ এই মহিয়সী নারীর মতোই ছিল। অথবা ইনিই সেই মেনকা দেবী।
আমায় আপনি ডেকেছেন, আপনার আদেশের অপেক্ষা করছি।
যাও, তোমার লীলাময়ীর হৃদয় গ্রহণ করো, তার হৃদয় তোমার হৃদয়ে স্থান করে দেও।
মহারাণীর একান্ত সেবিকা লীলাময়ীকে রাখালের সামনে এনে উপস্থিত করে। মুহূর্তে চার চক্ষের মিলন ঘটে, তৃষ্ণার্ত চোখ সজল হয়। মহারাণীর আদেশ বর্ষিত চোখ রাখালের ওপর। রাখাল ত্বরিত দেয়াল থেকে তলোয়ার নামিয়ে নিপুণ শল্য চিকিৎসকের মতো লীলাময়ীর হৃদয় উন্মুক্ত করে পানপাতা হৃদয় দুই হাতে তুলে নেয়। দুই হাতের করতল জুড়ে লীলাময়ীর কম্পমান তপ্ত রক্তাক্ত হৃদয়। মহারাণী হাত বাড়িয়ে রাখালের হাত থেকে নিজে গ্রহণ করেন। রাখাল মুক্ত হাতে মুহূর্তে লীলাময়ীর হৃদয়হীন দেহ অবয়ব পুনরায় সেলাইবিহীন জোড়া লাগিয়ে দাঁড় করায়। মহারাণী বলেন, যাও লীলাময়ী, তোমার পিতা তোমাকে চান। তার অভিলাষ পূর্ণ হতে দেও। লীলাময়ী অভিব্যক্তিহীন, চোখে যেন দৃষ্টি নেই। নিষ্কম্প পায়ে রাজ পিতার দিকে এগিয়ে যায়। মহারাণীর ঠোঁটে আবার হাসি। এবার তার দৃষ্টি ও মুখাবয়বের সবল দৃঢ়তা নেই। বলেন, রাখাল, আমার রাখাল, এই নেও তোমার লীলাময়ী।
রাখাল হাত পেতে গ্রহণ করে লীলময়ীর হৃদয়।
রাণী বলেন, স্বামী ভার্যার ভিতর প্রবেশ করে পুত্র রূপে নিজেকেই সৃজন করেন, এজন্য ভার্যা বা স্ত্রীর নাম হয়েছে জায়া। তুমিই তো বলেছিলে না ? স্বামী পুত্রবতী ভার্যাকে তাই মাতার মতো দেখবেন। শাস্ত্রের এই বাণী লোকাচারের কথা বলে না, বলে প্রকৃতির সত্য কারণের কথা। ভার্যার সঙ্গে যদিও সম্পর্ক জৈবিক থাকবেই। এই বাণী লৌকিক নয়, প্রাকৃতিক। প্রকৃতির এই সম্পর্কই মূল সম্পর্ক। এজন্য দেখ মানুষ ছাড়া প্রকৃতির অন্য সব প্রাণী লৌকিক সম্পর্কে সীমায়িত নয়। পরিণত বয়সের সিংহ সিংহি তাদের সন্তানের মধ্যে কোথায় লৌকিক সম্পর্ক বজায় থাকে ! একই মাতৃজঠর থেকে তুমি রাখাল এবং লীলাময়ীর জন্ম হয়েছে। ভ্রাতা ভগ্নির লৌকিক সম্পর্ক তোমাদের জৈবিক, নারী পুরুষের প্রাকৃতিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। প্রকৃতি আগেই প্রাকৃত সম্পর্ক করে দিয়েছে। যাও রাখাল, তোমার লীলাময়ীকে হৃদয়ে স্থাপন কর।
পারদ স্বচ্ছ জলে রাখালের দৃষ্টি নক্ষত্রের মতো জ্বলে, কণ্ঠে আর্ত ধ্বনি নির্গত হয়, মা ! তুমিই আমার মা মেনকা !





কমেন্ট করুনঃ