মৌলি এভাবে আবীরকে ফাঁসিয়ে যাবে, আবীরের চিন্তায়ই আসেনি। কখনো ভাবলেও ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি সে। ভালোবাসলে কেউ এমন করতে পারে! ভালোবাসার মানুষকে এভাবে বিপদে ফেলে নিজে চলে যেতে পারে না-ফেরার দেশে।
মৌলি এমন করল কেন? তার চূড়ান্ত সর্বনাশ না করে মৌলি কি বিদায় নিতে পারত না! আবীর বিস্ময়াভিভূত। মৌলির কী এমন ক্ষতি হতো নীরবে সরে গেলে! ভালোবাসা না ছাই। একে কি ভালোবাসা বলে? এত দিন কাকে সে মনের মানুষ ভেবেছিল।
ক্রোধে আবীরের সর্বাঙ্গ জ¦লছে। প্রেশার নিশ্চিত চূড়ায় উঠেছে। সুগারও হয়তো বাড়তি। এ অবস্থায় নিজেকে স্থির রাখাটা তার জন্য কঠিন। এখন সে কী করতে পারে! কী করা উচিত! কিংকর্তব্যবিমূঢ় সে।
অনেকক্ষণ ধরে কলিংবেল চাপার পর যখন মৌলি দরজা খোলেনি, আবীর চোখে অন্ধকার দেখে। তার হাত-পা পেটের মধ্যে সেধিয়ে যায় যেন। মৌলি কি শেষ পর্যন্ত তার কথাই বহাল রাখল!
গতকাল রাতে ঝগড়া করে বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আবীর মৌলিকে একবারও ফোন করেনি; মৌলিও করেনি। এমনকি মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমোতে পর্যন্ত মেসেজ দেয়নি মৌলি। মৌলির যোগাযোগ না করাটা আবীরকে ফেলে দেয় ধন্দে।
এমন ঝগড়া আগে যে হয়নি, তা নয়। অনেকবার হয়েছে। মৌলিই বারবার কল দিয়ে, খুদে বার্তা পাঠিয়ে অনুনয়-বিনয় করে তাকে ফিরিয়ে এনেছে।
মৌলির আহ্বানকে আবীর শেষ পর্যন্ত ফেলতে পারত না। সত্যি বলতে, মৌলি ছাড়া কারও প্রতি সে এমন টান অনুভব করেনি। সুযোগও পায়নি।
এমন অনুভূতির নাম যদি হয় ভালোবাসা, তবে নিঃসন্দেহে সে মৌলিকে ভালোবেসেছে। আবীর বুঝতে পারত মৌলির ভালোবাসা নিখুঁত। আর তা এড়াতে না পেরে ফিরে আসত মৌলির কাছে। আবার মৌলির মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা সহ্য করাও তার পক্ষে কঠিন ছিল।
মানুষ বোধ হয় এমনই। সহ্যের সীমা থাকে। একটি নির্দিষ্ট সীমার পর ভালোবাসা সহ্য করার ক্ষমতা মানুষের থাকে না। হাঁপিয়ে ওঠে। নিজেকে মনে হয় খাঁচায় বন্দী পাখি। ছটফট করতে করতে সে নিষ্কৃতি খোঁজে।
দুপুরের পর থেকে আবীরের মন আর মানছিল না। ধড়পড় করছে বুক। জ¦রগ্রস্তের মতো শরীর কেঁপে উঠছে। আঁকড়ে ধরেছে অস্থিরতা। দিকপাশ না ভেবে মৌলিকে কল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। আর নয়, এবার সব ধরনের নাটকীয়তার অবসান ঘটাতে হবে।
কল দিলে রিং হয়; কিন্তু মৌলি ফোন তোলে না। বারবার কল দেওয়ার পরও একই অবস্থা। এমন তো হওয়ার কথা নয়। সে জানে, মৌলি তার কল পেলে রাগ-অভিমান ভুলে যাবে।
একটু একটু করে সন্দেহ ঘনীভূত হতে থাকে। মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে পুরোনো চিন্তা। তাকে অনেকবার কারণে-অকারণে মৌলি আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছিল; সে আমলে নেয়নি কখনো।
এবার মনে হচ্ছে, অবস্থা গুরুতর। যদি এমন কিছু মৌলি করে বসে। মানুষ যে কাজ বারবার করবে বলে ঘোষণা দেয়, একসময় সেটাই করে।
ঘণ্টাখানেক পর অনন্যোপায় আবীর তালা ভাঙার জন্য লোক নিয়ে আসে। দরজা খুলে আবীর কী দেখে! চোখ ছানাবড়া। মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে মৌলি। জানালা খোলা বলে হালকা বাতাসে নিথর দেহটা একটু একটু করে দুলছে। বের হয়ে আছে জিহ্বা।
আবীর নিজেকে সংযত রাখতে পারে না।
দুই.
মৌলি আবীরের স্ত্রী নয়। পাঁচ বছরের সম্পর্ক শেষে তারা লিভ টুগেদার করতে শুরু করে বছরখানেক আগে। একসঙ্গে থাকাটা আবীর বাধ্য হয়ে মেনে নিয়েছিল। তা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না। ওই সময় একসঙ্গে থাকতে রাজি না হলে মৌলি অনর্থ ঘটিয়ে ছাড়ত।
আবীরের আগে দুবার ডিভোর্স হয়েছিল। অথচ প্রতিটা বিয়ে করেছিল ভালোবেসে। তার কোনো সংসারেরই বয়স এক বছরের অধিক নয়। দ্বিতীয় সংসারের বয়স মাত্র সাত মাস। প্রেমিক হিসেবে সে যতটা সফল, স্বামী হিসেবে ঠিক ততটাই ব্যর্থ। কেন জানি, প্রেমিকার প্রতি মুগ্ধতা বিয়ের পর কেটে যায়। বেশি দিন লাগে না।
আবীরের প্রতিটি ডিভোর্সের কারণ স্ত্রীর প্রতি অমনোযোগ। বিয়ের পর সে ওই নারীর সঙ্গে সাবলীল থাকতে পারে না। কিংবা দিনরাত দুজন নারী-পুরুষের একসঙ্গে লেপ্টে থাকা তার ধাতে সইত না। একপর্যায়ে তার কাছে সম্পর্কটি বিরক্তিকর হয়ে ওঠে।
হয়তো আবীর নিজের মতো চলতে পছন্দ করে বলে যৌথ জীবনে মানিয়ে নিতে সক্ষম নয়। সবার আগে তার চাই স্বাধীনতা। স্বাধীনচেতা আবীরের মনে হতো সংসার মানে দিনের পর দিন জেলখানায় আটকে থাকা। এটা কেমন জীবন! ভালোবেসে নীড় বাঁধলেও সে চায় মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়তে। কিন্তু জীবনসঙ্গিনী হিসেবে জড়িয়ে যাওয়া নারীটি তা মানবে কেন? নারীর কাছে সংসার মানে পুরুষটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা। নইলে কিসের সংসার। এখানেই বিরোধের সূত্রপাত।
প্রেমিক প্রকৃতির আবীর সহজেই প্রেমে পড়ে; বেশি সময় লাগে না তার। মেয়েদের আকর্ষণ করার ক্ষমতা তার তুলনাহীন; সে জানে নারীর মন জয় করার বিভিন্ন ধরনের কৌশল। যেকোনো মেয়েকে অনায়াসে ফাঁদে ফেলে দিতে পারে কয়েক দিন কথা বলে।
মেয়েরাও সহজে ধরা দেয় আবীরের কাছে। মৌলির সঙ্গেও এভাবে সম্পর্কে জড়ানো। মৌলি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে এটা আবীরের স্বভাব। আর যখন আবীরকে সে পুরোপুরি বুঝতে পারে, তখন তার ফিরে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে।
মৌলিও ডিভোর্সি। সহপাঠী বন্ধুকে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছিল উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর; কিন্তু ছয় মাসের বেশি সংসার করা সম্ভব হয়নি। ফিরে এসেছিল বাবার বাসায়। আবেগ থিতিয়ে আসার পর বুঝতে পারে কত বড় ভুল করে ফেলেছে সে।
স্বামী আর শাশুড়ি মিলে টাকার জন্য মৌলির গায়ে হাত দেওয়া শুরু করলে সে আর থাকতে পারেনি। যার গায়ে কখনো একটি ফুলের টোকা পড়েনি, সে কী করে মেনে নেবে এমন অত্যাচার। যে যা-ই বলুক না কেন, অবশেষে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হয় তাকে।
আর বিয়ের পিঁড়িতে না বসলেও মৌলির জীবনে আবার বসন্ত এসেছিল। প্রতিবেশী অনিকের সঙ্গে প্রেম করেছে ছয় বছর। হঠাৎ অনিক বিদেশ পাড়ি দিলে একা হয়ে পড়ে সে। মৌলি ধারণা করতে পারেনি যে অনিক তাকে ছেড়ে যেতে পারে।
বিষণ্নতা মৌলিকে ঘিরে ধরে তখন; ভাবে আত্মহত্যার কথা। দিনের পর দিন মনমরা হয়ে থাকত সে। কারও সঙ্গে কথা বলত না। মুখ বুজে কেবল অফিসে আসা-যাওয়া করত। ওই সময়েই আবীরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। আবীরের আগ্রহের কাছে সে নিজেকে নিবেদন না করে পারেনি।
আবীর ও মৌলি সহপাঠী হলেও তারা বন্ধু ছিল না। দুজনের মধ্যে তেমন কথাও হয়নি কখনো। কিন্তু তাদের অনেক কমন বন্ধু ছিল, যাদের কাছে তারা পরস্পরের ব্যাপারে বিস্তারিত জানত। এভাবে একজন আরেকজনের সহমর্মী হয়ে ওঠে।
হঠাৎ মৌলি মেসেঞ্জারে নক দেওয়ায় চমকে উঠে আবীর। ফ্রেন্ডলিস্টে থাকলেও আবীর যেমন মৌলিকে কখনো নক দেয়নি, মৌলিও দেয়নি। নীরব প্রতিবেশীর মতো ছিল পারস্পরিক সহাবস্থান। নক পাওয়ার পর মৌলির প্রোফাইল ঘেঁটে বিস্মিত হয় আবীর।
মৌলিকে সে কৌশলে আহ্বান করলে মৌলিও দেরি না করে সাড়া দেয়। হয়তো মৌলিও তখন মনে মনে সেই আহ্বানের অপেক্ষায় ছিল।
ওই সময় আবীর দ্বিতীয় স্ত্রী সুপর্ণার নারী-নির্যাতন মামলার আসামি হয়ে ফেরারি। অফিস করতে পারছিল না। মৌলির সাড়া দেওয়া ছিল তার কাছে তপ্ত মরুভূমিতে ক্লান্ত পথিকের জন্য এক ফোঁটা জল। তারপর ধীরে ধীরে কেবলই এগিয়ে যাওয়া। মান-অভিমান, ভালোবাসা, খুনসুটি আর ঝগড়া-বিবাদে দুজনের দিন ভালো-মন্দ মিলিয়ে মোটামুটি কেটে যাচ্ছিল।
মৌলি চাইলেও আবীর বিয়ের বিরুদ্ধে ছিল; বাধা ছিল তার আগের দুইবারের অভিজ্ঞতা। সে আর বিয়ের ট্যাগ লাগানোর পক্ষপাতী ছিল না। কথাটি মৌলিকে বারবার সে জানিয়েছিল; কিন্তু ফল হয়নি, বরং মাঝে মাঝে সমাজের কথা বলে বিয়ের প্রসঙ্গ তুলত মৌলি।
অতিষ্ঠ হয়ে একপর্যায়ে আবীর বলল, বিয়ে না করে একসঙ্গে থাকতে পারি, তবে কেউ জিজ্ঞেস করলে বলব যে আমরা বিবাহিত। তার প্রস্তাবে মৌলি সম্মত হয় এবং একই ছাদের নিচে বসবাস শুরু করে।
আজ সে মৌলিই কিনা তাকে ঠেলে দিল বিপর্যয়ের মুখে। তার আগামী দিনগুলোকে ফেলে দিল গভীর সংকটে। অথচ দুজনের মধুর দিনগুলো, তাদের ভালোবাসা তো মিথ্যে নয়।
তিন.
যুগ-যুগান্তরের ওপার থেকে ভেসে এসেছিল তারা। জনম জনম ধরে যেন ছিল একে অপরের অপেক্ষায়। বিয়ে করে আবীর সম্পর্কটিকে নষ্ট করতে চায়নি। সে জানত বিয়ে মানে কিছুদিন পর আর ভালো না লাগা এবং যার পরিণতি নিশ্চিত বিচ্ছেদ।
আবীরকে প্রেমের জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়েছিল মৌলি। সে-ও ভেসে যেতে চেয়েছিল। ওই সময় তার মুক্তির অন্য কোনো উপায় ছিল না। সেই মৃত্যুকূপে ঝাঁপ দিয়ে আবীর বুঝতে পেরেছিল, এটাই জীবন। প্রেম ছাড়া মানুষ অচল পয়সার মতো।
মৌলি ভুলিয়ে দিয়েছিল তার আগের জীবনের দুঃখ-কষ্ট। এমনকি শক্ত হাতে সুপর্ণাকে মোকাবিলা করার সাহস জুগিয়েছিল মৌলিই। মৌলি পাশে না দাঁড়ালে হয়তো সুপর্ণার মামলায় তাকে জেলেই থাকতে হতো; তার জীবন-নদী প্রবাহিত হতো অন্য ধারায়।
নতুন জীবনে সেসব আবীর মনে আনতে চায়নি। নতুনভাবে মৌলি তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল; আঁকড়ে ধরেছিল অক্টোপাসের মতো। মৌলি তার জীবনে নিয়ে এসেছিল আকস্মিক সুখের অনুভূতি। এমন সুখ, এমন বেদনা আবার এমন আনন্দ, এমন বিষাদ একসঙ্গে আবীর কখনো পায়নি। এমন মিশ্র অনুভূতির সঙ্গে মৌলিই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তাকে।
প্রেমে পড়ার অনুভূতি আবীরের নতুন নয়। তবু মনে হয়েছিল ওটা নতুন। তার কোনো প্রেমের মেয়াদ ছয় মাসের বেশি দীর্ঘ হতো না। সে নিজেই সরে আসার জন্য উঠেপড়ে লাগত। ব্যতিক্রম কেবল প্রথম প্রেম। জীবনের এত দুর্বিপাক এত নাটকীয়তার মধ্যেও সে ভুলতে পারেনি রূপাকে।
স্কুলজীবন থেকে এমন হয়ে আসছে। প্রথমবার এইটে পড়ার সময়। বয়ঃসন্ধি চলছিল। এমন সময়ে রূপার আগমন। চুপিচুপি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কীভাবে যেন হয়ে গিয়েছিল। রূপাকে সে ছাড়েনি, বরং রূপাই তাকে ছেড়ে যায়। যদি অপর্ণা ওই সময় তার জীবনে না আসত, সেই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে হয়তো তার আরও সময় লেগে যেত।
অপর্ণার সঙ্গেও বেশি দিন সম্পর্ক ছিল না। মাত্র চার মাস। তারপর থেকে চলছে কেবল ভাঙাগড়ার খেলা। সীমা, মুক্তা, ঐশী, মিথিলা, শিল্পা, ইশিতা, অবনীসহ আরও অনেকে।
এভাবে চলতে চলতে একসময় জীবনের ওপর ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে ওঠে আবীর। মাস্টার্সে পড়ার সময় শান্তার সঙ্গে সম্পর্কের দুই মাসের মাথায় দুজন বিয়ে করে বসল মা-বাবাকে না জানিয়ে। বাধ্য হয়ে তা গোপন রেখেছিল প্রায় ছয় মাস। তারপর জানাজানি।
শান্তার মা-বাবা বিয়েটা মানতে পারেননি। তারা চাননি শান্তা আবীরের সঙ্গে সংসার করুক। ছয় মাসের মাথায় আবীরের অমনোযোগ ও মা-বাবার চাপের কারণে শান্তা তাকে ছেড়ে চলে যায়। রোমান্টিক প্রেমিক আবীরের কাছে স্বামীর দায়িত্বশীলতা আশা করে শান্তা ঠকেছিল।
মাঝে বছর দুয়েক সিঙ্গেল থাকলেও সহকর্মী সুপর্ণার সঙ্গে অকস্মাৎ সম্পর্কে জড়িয়ে যায় আবীর। সুপর্ণার চাপে মাস তিনেকের মধ্যে আবার সে বিয়ের পিঁড়িতে বসল। সেই সুপর্ণাও নানা কাণ্ড ঘটিয়ে তাকে ফেলে চলে যায় বছরখানেকের মধ্যে।
এভাবে একে একে দুজনের ছেড়ে যাওয়া তাকে যেমন কষ্ট দিয়েছিল তেমনি মিলেছে মুক্তির স্বাদ। প্রতিবারই মনে হয়েছে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। অবশ্য সুপর্ণা বেশ ঝামেলা পাকিয়েছিল। তার কাছ থেকে দশ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত করেছিল।
শেষ পর্যন্ত পাঁচ লাখ টাকায় দফারফা হয়েছিল। সে টাকাটা পেয়েছিল তার বাবার কাছ থেকে। মৌলিও তখন তাকে রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। সে জন্য মৌলির প্রতি তার কৃতজ্ঞতার অন্ত ছিল না।
চার.
ঘটনা ঘটতে ঘটতে কিংবা ঘটাতে ঘটাতে জীবনকে যখন আবীর সামনের দিকে টেনে নিচ্ছিল, তখনই মৌলি তাকে ঠেলে দিল আরেক বিপদের সমুখে। যেনতেন বিপদ নয়; একেবারে জীবনমরণ সংকট। হয়তো এটা তার কর্মফল অথবা ভুল সিদ্ধান্তের পরিণাম।
আবীর যেন আবার চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে। তবে কি এবার জীবনে নেমে আসবে আরেক বিভীষিকা? এখান থেকে কি তার মুক্তি মিলবে। নাকি আবার কোনো চক্রে আটকে যাবে আবীর? আত্মরক্ষার কি কোনো উপায় নেই? হয়তো আছে; সে জানে না সেই পথের দিশা।
আশার কথা এই, মৌলি সুইসাইড নোটে আবীরকে দায়ী করে যায়নি। সে লিখেছে, আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। জীবনের কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। চারদিকে অন্ধকার দেখছি। বেঁচে থেকে আর কী হবে! এমন হতাশামূলক আরও কিছু কথা।
মৌলির বাবা কিন্তু এটিকে ইস্যু করতে চেয়েছিল। মৌলিকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন তিনি। বিভিন্নভাবে বলতে চাচ্ছেন যে আবীর তাকে জোরপূর্বক আটকে রেখেছিল। তার মেয়ের মৃত্যুর জন্য আবীরই দায়ী। মামলা করার হুমকি দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
আবীর তটস্থ। কোথাকার জল যে কোথায় গড়ায়! হয়তো কিছু হবে না। তবু ভয় লাগছে। তার মনে হচ্ছে চরম কোনো বিপদ নেমে আসবে, যা সামাল দেওয়ার সামর্থ্য তার নেই।
কিছুদিন আগে তাদের পাড়ার প্রীতম নামের এক ছেলে, বয়স বড়জোর কুড়ি হবে, প্রেম করতে গিয়ে ফেঁসে গিয়েছিল। বেশ চাউর হয়েছিল ঘটনাটা। মিডিয়া লুফে নিয়েছিল সেই সংবাদ। পত্রপত্রিকা ফলাও করে প্রচার করেছিল। অবশ্য এসব এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এই যুগে প্রেম বলতে কিছু নেই। যেসব বোকা ছেলেমেয়ে সিরিয়াস হয়ে যায়, বিপদটা ঘটে তাদের বেলায়। আর যারা হেসেখেলে রিলেশন করে ও ছ্যাকা খায় কিংবা ছ্যাকা দেয়, তাদের বেলায় কিছু হয় না; বেঁচে যায় তারা।
প্রীতম সম্পর্কচ্ছেদ করায় মেয়েটি তাকে মেসেঞ্জারে ভিডিও কলে রেখে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে পড়েছিল। পরে পুলিশ প্রীতমকে ধরে নিয়ে যায়।
প্রীতমের বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই একই। আত্মহত্যায় প্ররোচনা। প্রীতমের বিষয়টি আবীরকে এই মুহূর্তে বিব্রত করছে। বারবার মনে পড়ছে প্রীতমের ঘটনা। যদি তার বেলায়ও এমন কিছু ঘটে। তখন কীভাবে সে উদ্ধার পাবে। নিশ্চিত জেলের ঘানি টানতে হবে।
পাড়ার লোকজন, আত্মীয়স্বজন, সাংবাদিক, পুলিশ, মিডিয়ার লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে তাদের বাসায়। পাড়াজুড়ে চলছে কানাঘুষা। মা-বাবা জানলে কী ভাববে! তারা ভীষণ কষ্ট পাবেন। তা ভেবেই তার কষ্ট হচ্ছে বেশি। নিজেকে অসহায় লাগছে।
আবীরের মনে হচ্ছে মৌলির সঙ্গে তারও আত্মহত্যা করা উচিত। এই জীবন রেখে কী হবে, যে জীবনে কোনো সম্মান নেই। ধুলায় লুটাচ্ছে মান-ইজ্জত। প্রীতমের খবরের মতো হয়তো পত্রিকাতেও সব চলে আসবে। আসবে ঘটনার আদ্যোপান্ত। সঙ্গে থাকবে নানা মুখরোচক গল্প।
আবীর অনুমান করতে পারছে, সবাই তার জীবন নিয়ে রসাল গল্প বানিয়ে রটাচ্ছে। কয়বার বিয়ে হলো, কয়টা ডিভোর্স হলো, কয়টা মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি।
পাঁচ.
মৌলি হত্যার তদন্তের ভার পড়ে সহকারী পুলিশ কমিশনার রূপার ওপর। রূপা নবীন পুলিশ অফিসার। তদন্তে এসে আবীরকে দেখে সে স্তম্ভিত।
এই আলোচিত মামলার আসামি সেই আবীর, যে রূপাকে প্রেম শিখিয়েছিল। কত স্বপ্ন ছিল তাদের। একজন অন্যজনকে ছেড়ে যাবে না। পরস্পরের পাশে থাকবে। সুখের নীড় বাঁধবে। দেশে-বিদেশে ঘুরবে। পাখির মতো ডানা মেলে উড়বে দিকদিগন্তে। আরও কত কিছু করবে।
সে যেন গতজন্মের ঘটনা। প্রথম প্রেমের প্রবল জোয়ারে ভেসে যায় আবীর-রূপার জীবন-নদীর তটভূমি। বন্ধুবান্ধবরা জেনে গিয়েছিল তাদের কথা। সবার মুখে মুখে ছিল তাদের প্রণয়কাহিনি। কেবল রূপার মা ছিলেন সেখানে পর্বতসম বাধা।
মায়ের কারণে ঝড় ওঠে তাদের জীবনে। একদিন রূপাকে শাসিয়ে মা বলেন, আবীরের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে তিনি রূপার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবেন না। যে কোনো একদিকে তাকে থাকতে হবে। মায়ের এমন কথায় কিশোরী রূপা হকচকিয়ে যায়। তারপর দুজন দুদিকে ছিটকে পড়ল। তবে আবীরকে সে মন থেকে মুছতে পারেনি। সংগোপনে লালন করেছে আবীরের স্মৃতি।
এটা কীভাবে সম্ভব হলো। ব্যাপারটি কি কাকতাল! আবীরের অবস্থা রূপাকে বিস্মিত করে। তাদের দুজনের জীবন যেন এক সূত্রে গাঁথা। প্রায় একই রকম তাদের জীবনকাহিনি। অকস্মাৎ আবীরের জন্য রূপার প্রাণ কেঁদে ওঠে। সে আবীরকে এমন পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়নি তো!
আবীরের মতো রূপার জীবনও নাটকীয়তায় ভরপুর। দুইবার বিয়ে হয়েছিল তার। প্রথম বিয়ে মা-বাবাই দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক টিকল না। স্বামীর বদ স্বভাবের কারণে ছয় মাসের মাথায় ফিরে আসে বাবার বাসায়। দ্বিতীয় বিয়ে নিজের ইচ্ছায় করলেও কিছুদিন পর টের পেল, অঞ্জন তাকে ভালোবাসে না। বিয়ে করেছিল তার বাবার সম্পত্তির জন্য। কারণ রূপা ধনী মা-বাবার একমাত্র সন্তান।
দ্বিতীয় ডিভোর্সের পর রূপা ক্যারিয়ার গড়ায় মনোযোগ দেয়। ক্ষমতা লাগবে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা লাগবে। বিসিএসে সাফল্যের সঙ্গে কৃতকার্য হয়ে পুলিশের চাকরি বেছে নেয়। বাকি জীবন একা থেকে জীবনকে উপভোগের সিদ্ধান্তে রূপা অটল।
রূপার মধ্যস্থতায় মৌলি হত্যার বিষয়টি প্রবাহিত হয় ভিন্ন ধারায়।
ছয়.
দিনে দিনে বদলে যেতে থাকে রূপার ধ্যান-ধারণা; ভাবনায় আসে পরিবর্তন। রূপা আবার ফিরে যেতে চায় সেখানে, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল তার জীবন।
রূপার মনে হলো, আবীর ছাড়া তাকে কেউ কোনো দিন বুঝতে পারেনি। আবীরকে বাদ দিলে তার জীবন অর্থহীন।
একান্তে সময় কাটানোর জন্য রূপার আগ্রহই বেশি। একদিন তারা ঘুরতে বের হয় পদ্মার পাড়ে। কথায় কথায় রূপা আবীরকে বলল, আগামী দিনে তুমি থাকবে তো আমার হয়ে।
রূপার কথায় আবীর বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যায়। হ্যাঁ কিংবা না কিছুই বলতে পারে না। রূপার মুখপানে চেয়ে থাকে কেবল। আর রূপা আবীরের চোখে দেখতে পায় আশ্রয়ের আকুতি।





কমেন্ট করুনঃ