ঘন অরণ্যে বিশাল আকারের পাথর আর পাহাড়, এর মধ্যে রয়েছে সুপেয় জলের ধারা। জায়গাটা বিশ্রামের জন্য অতি উত্তম হবে। এমন ভেবে ভগবান শিব সবাইকে নির্দেশ দিলেন, আজ আমরা এখানেই অবস্থান করবো। রাত পোহানের পূর্বেই অর্থাৎ পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠার আগেই সবাইকে প্রস্থান নিতে হবে কাশীর উদ্দেশ্যে। এর ব্যত্যয় ঘটলে সাত্যিয়ানাস (অকল্যান) হয়ে যাবে। সঙ্গে থাকা এক কোটি দেবদেবী সেদিন ভগবান শিবের কথায় সাড়া দিয়ে জলদি শুয়ে পড়েছিলেন সেই ঘন অরণ্যের মাঝে। নিদ্রায় বিভোর সেই দেবদেবীর মধ্যে কেবল ঠিক সময়ে উঠতে পেরেছিলেন ভগবান শিবশর্মা। আর বাকিরা তাঁর অভিশাপে সেই ঘন অরণ্যের মধ্যেই পাথর হয়ে আজ অবধি গেঁথে আছে কোটি মানুষের দর্শনদিতে।
সেদিন ভগবান শিব একাই কাশীর পথে রওনা দিয়েছিলেন, আর তার থেকেই এই অরণ্য ঘেরা জায়গাটার নাম হলো ঊনকোটি। সবাই এক কম ঊনকোটি বললেই এর আসল কারনধরতে পারে।

হিন্দু পুরাণে এই গল্প কোটি বছর থেকে চলে আসছে। ঊনকোটিতে এসে যখন প্রকান্ড পাথরে খোঁদাই করা শিবের অবয়ব দেখলাম, আমি নিজেই স্তম্বিত হয়ে ছিলাম। এক অপার বিস্ময়ের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, কি করে এই সৃষ্টিকর্ম রাতারাতি হয়ে যেতে পারে! এত প্রাচুয্য নিয়েভারী পাথরগুলো যুগের পর যুগ দাঁড়িয়ে আছে নিরবধি। প্রতিটাপাথরের গায়ে যেন একেকটাপৌরাণিক কাহিনীর গল্প বলা হয়েছে। দেব-দেবীরা যেন এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভক্তকূলের ভক্তি নেবার জন্য।

প্রাচীণ এ অরণ্যের মাঝে খচিত প্রকান্ড দেবতাদের পূজা দিতে ভক্তগন চলে আসেন দূরদূরান্ত থেকে। পাহাড়ের চুড়ায় , প্রকান্ড এক বটবৃক্ষের নিচে গেঁড়ুয়া পোষাকে একজন ঋষি বসেছিলেন, পূণ্যার্থীরা মাথা ঠুকে সেখানে দক্ষিণা দিয়ে যাচ্ছেন। অবশ্য উঁচু সিঁড়ি বেয়ে যারা ওই চূড়া পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে তারাই কেবল আশীর্বাদ এর পূণ্যপ্রাপ্তি হবে।

সেই চূড়াতে আরেকটা বড় ঘর আছে, যেখানে বেশকিছু দেবদেবীর মূর্তি তালাবন্ধি করে রাখা আছে। আরো একটি প্রকান্ড বটগাছ এই ঘরটার উপর তার শাখা-প্রশাখা বিছিয়ে রেখেছে। জায়গাটা বেশ শুনশান আর গা ছমছমে। গুটি কয়েক পূণ্যার্থীদের আনাগোনা দেখা গেলো সেখানটায়।
আমাদের যেতে যেতেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। এরমধ্যে আবার সন্ধ্যের আগেই ফিরতি পথ ধরতে হবে।পথ রয়েছে অনেকখানি। আগরতলা থেকে প্রায় ১৭২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এই ঊনকোটিতে চলে এলাম। সারাবেলার ভ্রমণ সূচিতে কেবল রঘুনন্দন পাহাড়ের জঙ্গলে ঢাকা এই ঊনকোটি কেই দেখে নেওয়া যাবে। তাতেই বেলা বয়ে যাবে। এখানে এলে বেশিরভাগ পুর্ণাথ্যী বা টুরিস্ট রাতটা থেকে যায়। এবারে আমাদের হাতে সেই সময়টা নেই।
আগরতলায় এসেছিলাম মূলত ভারত-বাংলা পারিয়াতন (পর্যটন) উৎসব ২০২০ এর আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় অতিথী হয়ে।বাংলাদেশ ট্র্যাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আমরা বেশ কয়েকজন ভ্রমণ লেখক আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম সেই উৎসবে।তাদের আতিথেয়তায় আমদের ঠাই হয়েছে রাষ্ট্রীয় অতিথীশালা গীতাঞ্জলী রেষ্ট হাউজে। আজ আমরা ঊনকোটি থেকে সেখানেই ফিরে যাবো। আমাদের নেমতন্ন ছিল ২১শে ফেব্রুয়ারীতে। আগারতলার পথে এবারের প্রভাতফেরী আমাদের কাছে বিশেষ ভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ত্রিপুরা ট্যরিজম বোর্ডের দুইদিন ব্যপী নানা আয়োজন শেষ করে আমরা ঠিক করলাম, এলাম যেহেতু ত্রিপুরা ঘুরে দেখবো নিজেদের মত করে। দল পাকালাম তিনজনা মিলে। তিন তারে নাকি সূর হয়। আখতার ভাই, আব্দুল্লাহ আর আমি সেই তিন তার হয়ে গীত গাইতে গাইতে পথ ধরলাম । এই ভ্রমণের প্ল্যান ত্রিপুরা ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধানের কাছে চলে গেলো। তিনি আমাদের সত্যি অবাক করে, সকাল বেলাতেই সুসান্ত দাদাকে পাঠিয়ে দিলেন টয়োটা ইনভা ক্রিসটা গাড়ি সমেত। তাতেই রওনা হলাম ঊনকোটির দূর পথে।
গাড়িটা বেশ আরামদায়ক, আয়েস করে তিনজনে বসেছি। আখতার ভাই সুসান্ত দাসের পাশে বসলো, তিনি একজন দক্ষ চালক। অনেক বার এই পথে নানা দেশের ট্যুরিস্ট নিয়ে ঊনকোটি গেছেন। এছাড়াও সরকারি কর্তাব্যক্তিদের নিয়ে ত্রিপুরার আনাচে কানাচে তার ঘোরা হয়েছে। আমাদের আইজল যাবার ইচ্ছে ছিল তাই আখতার ভাই সুশান্ত দার থেকে বেশ খুটিয়ে জেনে নিচ্ছে- কত সময় লাগবে, কিভবে যাওয়া যায়, গাড়ি ভাড়া, পারমিশন কিভাবে নিতে হবে, ইত্যাদি!
ত্রিপুরাতে নিজের দেশেই আছি এমন একটা আনুভুতি কাজ করে, তার কারন তাদের ভাষার টান। যা একেবারে আমাদের ব্রাক্ষনবাড়িয়া অঞ্ছলের অবিকল। বাংলাদেশের উত্তর-দক্ষিন সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে ত্রিপুরা রাজ্যবিসৃত।কিছুক্ষন চলা শুরু হলে ঢুকে পড়লাম সবুজ অরণ্য আর পাহাড়ি আকা-বাঁকা পথে।সঙ্গে গান চলছে -এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হবে বলতো।
একজায়গায় বিরতি দিলাম কিছু খাবারের খোঁজে। বান্দারবানের মতই এখানে পাহাড়ি জনপদের মানুষরা তাদের জুমের সবজি আর ফল নিয়ে রাস্তার ধারে মাচাং করে বসে আছে। এছাড়াও সাজিয়ে রেখেছে তাজা শামুক, সসা, রান্না করা শূকরের মাংস , সিদ্ধ করা ডিম, আরও এক ধরনের তরকারি।
কিছু নেওয়া যায় কিনা দেখার জন্য গাড়ি থেকে নেমে গেলাম। খুব ভালো লাগার যে জিনিসটা বলবো, তা হল তাদের পরিবেশ সচেতনতা। ডাবের পানি খাওয়ার জন্য এখন আমাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও প্লাস্টিকের পাইপ ব্যবহৃত হচ্ছে আর এখানে তারা বাঁশের চিকন কঞ্চি কেটে তা পাইপ আকারে বানিয়ে রেখেছে। দেখতেও খুব সুন্দর লাগে, আবার পরিবেশেরও কোন ক্ষতি হয় না। চোত্তাখোলা এর ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রি উদ্দ্যানে আমাদের আপ্যায়নের সময় এই বাঁশের পাইপের পরিবেশন দেখেই বেশ পুলকিত হয়েছিলাম। খেয়ে তা সংগ্রহ করে রেখেছিলাম। আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের মতন তারাও দাবা খায়, যা বাঁশের লম্বা হুকার মধ্যে নল বানিয়ে পানির বাষ্পে হুক্কা সাজানো হয়।
গাড়ি চলা শুরু হলো পাহাড়ের পর পাহাড় পেচিয়ে কুমারঘাট জেলার দিকে এঁকেবেকে। কৈলাশ্বর এর পথ ধরতে হবে । সুশান্ত এর ফোন বেজে উঠল, পর্যটন দপ্তর থেকে জানিয়ে দিল আমাদের যেন ঊনকোটি সার্কিট হাউজে নিয়ে যায়, দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা সেখানে করা হয়েছে বাংলাদেশের এমপি মহোদয় মোহাম্মদ আব্দুস শহিদ সাহেবের লটবহরের সঙ্গে।
রাষ্ট্রীয় অতিথি হবার ঠেলা সামলাও এবার, কারন এদিকেত আমাদের সময় সব চলে যাচ্ছে পথিমধ্যেই।
ঊনকোটি সার্কিট হাউজটা বেশ সিমসাম, আমরা এমপি সাহেবের আসার আগেই পৌঁছে গেলাম। বাহারি খাবারে টেবিল সাজানো আছে, কিন্তু তারা না এলে আমরা খেতেও পারছি না। সার্কিট হাউজে গিয়ে একদিকে ভালো হল, পরিচিত হলাম অনিমেষ ধর এর সঙ্গে। তিনি ত্রিপুরা সরকারের ডেপুটি কালেক্টর এবং এডমিনিস্ট্রেশন ডিপাট্মেন্টের মেজিট্রেট হিসেবে কর্মরত আছেন। তরুণ এই মেজিট্রেট বেশ আগ্রহ নিয়ে আমাদের সাথে কথা বললেন, তার ফটোগ্রাফির হাত খুব ভালো এবং ত্রিপুরাতে বেশ কিছু এ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন বলে আমাদের সাথে অনেক কিছু শেয়ার করলেন। ঊনকোটি আর বেশ কয়েকটা সুন্দর জায়গার কথা বললেন যেখানে ঝরনা আছে। এমপি সাহেব আসলে আমাদেরও ডেকে নেওয়া হলো, সৌজন্যতা দেখিয়ে বিদায় নিয়ে আমরা আগেভাগে খেয়েই রওনা হলাম।

পেঁচিয়ে থাকা পাহাড় বেয়ে আমাদের গাড়ি অনেক খানি উপরের দিকে উঠে গেল, এরপর চোখে পড়লো ঊনকোটি এর প্রকাণ্ড দ্বার। ট্যুরিজম বোর্ডের মেহমান বলে আমাদের গাড়িটি ভেতরে ঢুকতে অনুমতি পেল। গেটে টিকিট কাটার ব্যবস্থা রয়েছে এবং প্রবেশ এর পরেই সুপেয় জল আর প্রক্ষালনের সুষ্ঠ আয়োজন। পর্যটকদের জন্য এধরনের পরিসেবা প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রেই জরুরি ভিত্তিতে থাকা প্রয়োজন।
ওয়াকয়ে ধরে একটু খানি উপরের দিকে গেলে ঊনকোটির বিশালতার দেখা পাওয়া যাবে। পাহাড়ের গায়ে এত বিশালাকার গণেশার মূর্তি দেখে সত্যি অবাক বনে গেলাম যে, এ কি করে সম্ভব কোন মানুষের পক্ষে এই পাহাড়ের গা বেয়ে এতো সুন্দর স্থাপনা খোদাই করা। যায়গাটা কিছুটা ভ্যালী এর মতো, উপর থেকে নিচে নেমে এর পর আবার উপরে উঠতে হয়।
সুন্দর সিড়ি করে দেওয়া আছে শুরুতেই, তা বেয়ে নিচে নামতে নামতেই ঊনকোটীশ্বর শিবের কাছাকাছি পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য খোদাই করা দেবদেবীর মূর্তি চোখে পড়ছে।
সিঁড়ি দিয়ে আরও কিছুটা নামার পর পৌঁছে গেলাম ঊনকোটিশ্বর শিবমূর্তির কাছে। পাহাড়ের গায়ে খোদাই করে শুধু শিবের মুখ এবং শিরোভূষণকে রূপ দেওয়া হয়েছে আর তাতেই সম্পূর্ণ ভাস্কর্যটির উচ্চতা দাঁড়িয়েছে কমবেশি চল্লিশ ফুট। পাহাড়ের ওপর থেকে একটি জলধারা নেমে এসে ঊনকোটীশ্বর শিবের সামনে সীতাকুন্ড নামে একটি ছোট কুন্ডের সৃষ্টি করেছে। পূজার পরে পূর্ণাথীদের রেখে আসা কিছু সামগ্রী চোখে পড়লো কুণ্ডের সামনে। শিবেরমুখ পার হয়ে আর একটা খাড়া সিড়ি উপরের দিকে উঠে গেলো, আমরা সেই পথ ধরলাম।
বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে, তাই হয়ত আজ মানুষও কম মনে হচ্ছে। যায়গাটা এবার একটু ঘুরে দেখার চেষ্টা করলাম। কিংবদন্তীতে জানা যায় যে, ভগবান শিব কাশি যাওয়ার পথে এইখানে রাত্রিবাস করেছিলেন এবং তার সঙ্গের অন্যন্য দেবতাদের বলেছিলেন সূর্যোদয়ের পূর্বে নিদ্রাভঙ্গ করে কাশীপথে যাত্রা শুরুর কথা। কিন্তু একমাত্র ভগবান শিব ছাড়া আর কারোরই নিদ্রাভঙ্গ হয়নি এবং তিনি তখন বাকি সকল দেবতাদের অভিশাপ দিয়েছিলেন পাথরে পরিনত হয়ে যাওয়ার জন্য। এই কিংবদন্তীর স্মৃতিরক্ষার্থে উনকোটি একটি পবিত্র তীর্থস্থানে পরিণত হয়।
পাহাড়ের এই উঁচুতে একটা ছোট মন্দির এর মত স্থাপনা দেখলাম যেখানে, অনেক টুকরো টুকরো কিছু ভাস্কর্য রয়েছে। এখানে প্রাপ্ত যেমন চতুর্মুখলিঙ্গ, কল্যাণসুন্দরমূর্তি, বিষ্ণু, হর-গোরী, হরি-হর, নরসিংহ, গণেশ এবং হনুমান ইত্যাদি ভাস্কর্যগুলি এই সংরক্ষিত স্থানে রাখা আছে। এখানকার কিছু স্থাপত্য মন্দিরের উপস্থিতি এটা ইঙ্গিত করে যে প্রাচীনকালে এ স্থানে একটা অনেক পৌরাণিক কোন মন্দির ছিল। পাহাড়ের গায়ে বিভিন্নধরনের দেবি এবং দেবতার যে মূর্তি খোদিত আছে তাদের মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য আছে শ্রেণীবদ্ধভাবে অনুতপ্ত ভগবান শিব পার্বতী এবং হিড়িম্বার প্রতিমা ইত্যাদি। আরো কিছু উল্ল্যেখযোগ্য ছবি বলা যায় যেমন, দুটো দন্ডায়মান হস্তীর মস্তিষ্কের মাঝে অবস্থিত গণেশের মূর্তিটি কিন্তু এখানে গণেশের শারীরিক গঠন অপেক্ষাকৃত অনেক ক্ষীণ যা পূরাণের বর্ণানানুসারী নয়।
ইতিহাস থেকে যেটুকু জানতে পারি, কোটি থেকে এক কম অর্থাৎ উনকোটি- মাহাত্ম্যে দেবী কালীর কোটি তীর্থের পরেই এর স্থান। ৪৫মি উঁচু রঘুনন্দন পাহাড় কেটে খোদিত অ প্রোথিত মূর্তিময় পুণ্য হিন্দুতীর্থ ঊনকোটি। তারও আগে নাম ছিল এর ছাম্বুল। শাল, সেগুন, দেবদারু আর অগুরু-তে ছাওয়া বৌদ্ধ অ হিন্দু আমলের(৮ম থেকে ৯ম শতক) অরণ্যময় এই শৈব তীর্থে পুরো পাহাড়টাই ভাস্কর্যময়। মূর্তি হয়েছে শিব, হরগৌরী, সিংহবাহিনী দুর্গা, পঞ্চমুখী শিব, বিষ্ণুপদ, ভারতের বৃহত্তম ব্যাস রিলিফ ভাস্কর্য ৩০ ফুট মুখমণ্ডলের বিশালাকার কালভৈরব-বাসুদেব, রাম-লক্ষ্মণ, হ্নুমান, গণপতি ছাড়াও নানান পৌরাণীক দেব-দেবীর সারা পাহাড় জুড়ে।
এই ইতিহাসের আবার দ্বিমতও রয়েছে। রাজ পরিবারের ইতিহাস রাজমালায় মেলে- স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে স্থানীয় ভাস্কর কালু কামার এক রাতের মধ্যে রঘুনন্দন পাহাড়ে ১ কোটি দেবমূর্তি করে নব কাশীধাম গড়তে গিয়ে কম থেকে যায় এক। আর্য- অনার্য দেবতারা মিলেমিশে এক হয়েছেন এখানে। ভিন্ন মতও আছে নানান। কেউ বলেছেন পাল যুগের শৈবতীর্থ ঊনকোটি। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক পীঠভূমি ঊনকোটি আজ ধ্বংসের কাল গুনছে।
১২মি উঁচু জটাজুটধারী শিব এখানে কালভৈরব নামে খ্যাত। অনুপম ভাস্কর্যের নিদর্শন ৩ মি দীর্ঘ শিবের নিখুঁত জটা আজো অনবদ্য। শিবের বাহন ৩ ষাঁড়ের মূর্তি মাটি ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে। এলাকা থেকে পাওয়া নানান শিলামূর্তিও রয়েছে পাহাড় চুড়ায়। তেমনি বেগবতী ঝর্নার ধারা নামছে পাহাড় থেকে। ঝর্ণার জলে সৃষ্ট শিব, সতী ও ব্রক্ষ্মা- তিন কুন্ডর জলে স্নানে পুণ্য হয়। পৌষ সংক্রান্তিতে যাত্রী আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। আর আছে উষ্ণ প্রস্রবণ এক। বসন্তে মেলা বসে অশোকাষ্টমী তিথিতে। শিবরাত্রি, মকর সংক্রান্তিতেও পুণ্যার্থীরা আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। অদুরে গহন জঙ্গলে ৩ ফুট উঁচু চার মুখের শিব রয়েছেন।
আবার কারো কারো মতে সেন রাজাদের গড়া ঊনকোটির এই অমর ভাস্কর্য। তবে, ১৮৯৭ ও ১৯৫০এর ভূমিকম্পের সাথে নানান প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক পীঠভূমি ঊনকোটি আজ ধ্বংসের কাল গুনছে।
ঘুরে-ফিরে দেখে বেড়িয়ে আসার পথে কলকাতার দুটি পরিবারের সঙ্গে আলাপ হলো। তারা বাংলাদেশ ভ্রমণে গিয়েছিল, তারপর থেকে আমাদের গল্প শুরু হলো। সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলে সবার প্রস্তানের সময় হলো। ঊনকোটির কথা অনেক দিন মনে গেঁথে থাকবে, পাহাড়ের গায়ে এমন বিস্ময়কর ইতিহাস আর দেবতাদের আর্শিবাদ মাথায় নিয়ে লম্বা পথে ফিরে এলাম।
পরদিন আমরা নীরমহলের পথে রওনা হলাম।অনিন্দ সুন্দর আর ঐতিয্য ইতিহাসের রাজকীয় একগল্প নীরমহল। আমাদের নির্ধারিত গাড়িতে করে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন থেকে সকালে তুলে নিলো।রুদ্রসাগার হ্রদ এর সামনে এসে গাড়ি থামলো। আগরতলা থেকে দূরুত্ত ৫৩ কিলোমিটার। জায়গার নাম রাজঘাট, মেলাঘর, সিপাহীজলা, ত্রিপুরা। এখান থেকে টিকিট কেটে নৌকায় করে নীরমহলে যেতে হবে। নীরমহল মানে হলো “জল প্রাসাদ”। বিশাল জলরাশির ঠিক মাঝ বরাবর এই মহল।দূর থেকে দেখলে বেশ মহনীয় মনে হবে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নীরমহলে বেশ কয়েকবার থেকেছেন।ত্রিপুরা রাজ্যের মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুর ১৯৩০-এর দশকে রুদ্রসাগর হ্রদের মাঝখানে এই মহল নির্মিত হয়। পূর্ব ভারতের নিজস্ব ধরনের বৃহত্তম এবং একমাত্র প্রাসাদ এই নীরমহল।ত্রিপুরায় রাজন্য স্থপত্যের অপূর্ব নিদর্শন এই ‘জল মহল’। রাজস্থানের জলমহলের আদলে তৈরি এটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। প্রায় ৫.৩ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত এই প্রাকৃতিক জলাশয়ের নাম রুদ্রসাগর যার বুকে ভেসে আছে এই অপূর্ব কীর্তি। রাজাদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ কাটানোর জন্যই এই জল মহল তৈরি হয়েছিল।

১৯৩০ সালে ত্রিপুরার শেষ মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্যদেব বর্মন এর নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে অপরূপ শিল্প সুষমা মন্দিত এই স্থাপত্যের নির্মাণ কাজ শেষ হয় এবং ১৯৩৮ সালের ১২ইমে এর উদ্বোধন হয়। এই কাজটি সম্পন্ন করেন মার্টিন এন্ড বার্ন কোম্পানি এবং এতে খরচ হয় আনুমানিক ১০ লক্ষ টাকা। এই প্রাসাদ একদিকে যেমন রয়েছে বীর বিক্রমের সঙ্গীত সাহিত্য ও শিল্প মনের পরিচয় অন্য দিকে রয়েছে হিন্দু ও মুঘল স্থাপত্যের সংমিশ্রণ। নীরমহল ভারতের দ্বিতীয় এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একমাত্র জলমহল। এই মহলটিতে রয়েছে ২৪ টি কক্ষ যথা রাজ দরবার, নাচমহল, আনন্দমহল,অতিথি শালা, রাজা ও রানী থাকার জায়গা, ওয়াচ টাওয়ার, সেনা বেড়াক, জেনারেটর ঘর, রান্নাঘর, ফুলের বাগান, শৌচালয় ইত্যাদির সন্নিবেশিত এই মহল। মহলটি ১৯৬৮ সালে রাজ পরিবার কর্তৃক ত্রিপুরা সরকারের রাজস্ব দপ্তরের অধীনে হস্তান্তরিত হয় এবং রাজস্ব দপ্তর কর্তৃক ১৯৭৮ সাল থেকে তথ্য সংস্কৃতি এবং পর্যটন দপ্তর দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। পর্যটকদের থাকার জন্য ত্রিপুরা পর্যটন উন্নয়ন নিগম রূদি জলার পাশে নির্মাণ করেছেন পর্যটক আবাস ‘সাগর মহল’।

প্রাসাদটি মহারাজার সেরা পছন্দ এবং মধ্যযুগীয় হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণে তার আকর্ষণীয় ধারণার প্রতিষ্ঠার নমুনা।
প্রাসাদটি দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রাসাদের পশ্চিম দিকের অংশটি অন্দর মহল নামে পরিচিত। এটি রাজপরিবারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। পূর্ব দিকে একটি উন্মুক্ত থিয়েটার রয়েছে যেখানে মহারাজা ও তাদের রাজপরিবারের বিনোদনের জন্য নাটক, থিয়েটার, নৃত্য ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।নীরমহলের ভিতরে দুটি সিঁড়ি রয়েছে যা রুদ্রসাগর হ্রদের জলে অবতরণ করে। মহারাজারা ‘রাজঘাট’ থেকে হাতে চালিত নৌকায় করে প্রাসাদে যেতেন।

১৩০৬বঙ্গাব্দে সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আগরতলায়আসেন। ইতিহাস থেকে জানা যায় ঠাকুর পরিবারের সাথে ত্রিপুরার রাজবংশের অত্যন্ত গভীর সম্পর্কছিল। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন ত্রিপুরার মহারাজ কৃষ্ণকিশোর মাণিক্যেরখুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মহারাজ বীরচন্দ্র মানিক্যের সময়কাল হতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গেত্রিপুরার যোগাযোগ ছিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ত্রিপুরার বুকে সাতবার পদার্পণকরেন। ত্রিপুরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও রাজপরিবারের গভীর আত্মীক সম্পর্ক বরাবর রবীন্দ্রনাথঠাকুরকে আগরতলায় নিয়ে আসতো। ত্রিপুরারমহারাজ বীরচন্দ্রমানিক্য, রাধাকিশোর মানিক্য, বীরেন্দ্রকিশোর মানিক্য এবং বীরবিক্রমমানিক্যের সঙ্গে কবিগুরুর এক গভীর নিবিড়তম সম্পর্ক ছিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরছিলেন তৎকালীন মহারাজদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, সংগীত, নৃত্যকলা প্রসারে একজনসৎ পরামর্শদাতা।
ত্রিপুরাররাজপরিবারের শুধুমাত্র একজন মহারাজা নয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরপর তিনজন ত্রিপুরার মহারাজাদেরভালবাসা এবং আন্তরিক আনুগত্য জয় করে নিয়েছিলেন।১৮৬৯ হতে ১৮৯৯ সালে প্রথমে বীরচন্দ্রমাণিক্য এবং ১৮৯৯ হতে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত তাঁর পুত্র রাধাকিশোর মাণিক্য এবং শেষ পর্বেতাঁর পুত্র বীরবিক্রম কিশোর দেববর্মণের আনুগত্য লাভ করেন। এঁদের পরিবারের আমন্ত্রনেইরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বার বার ত্রিপুরায় এসে বাস করেছেন এবং দুইটি স্থাপত্যকীর্তিতে নজরকাড়েন। এর একটি হলো, আগরতলা শহরের জয়ন্ত প্রাসাদ, অর্থাৎ বর্তমানের উজ্জয়ন্ত প্যালেস(রাজবাড়ী)।অন্যটি১৯২১ সালে রুদ্রসাগরের মাঝে তৈরি হওয়া নীরমহল প্রাসাদ, যা রাজস্থানের উদয়পুর ছাড়া ভারতেরএকমাত্র লেক প্যালেস।
নীরমহলের ভেতরটা দেখে ছবি তুলে মন ভোরে গেলো। জলের মাঝখানে এত সুন্দর প্রাসাদ। আমাদের যেনো তৃপ্তি মেটে না। বার বার যেনো ত্রিপুরা আসতে পারি তাই কিছুটা অতৃপ্ত থেকেই ফিরে আসলাম। একসাথে সবকিছু দেখে ফেলা এক জীবনে সম্ভবপর হয়না। মন ভোরে দেখার আকাক্ষাই পরের ভ্রমণের জন্য তাড়া দিতে থাকে ক্ষণে ক্ষণে।





কমেন্ট করুনঃ