প্যারিসের দ্বিতীয় দিন আজ। সকালে নাস্তা সারতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম কাফে,বিস্ত্রো আবার ব্রাসারি এই তিন ধরণের নাম জুড়ে আছে রেস্টুরেন্ট গুলোর সাইন বোর্ডে। ক্যাফে টা মোটামোটি বোঝা গেলেও বাকি দুই টা সমন্ধে জানতে চাইলে বললো বিস্ত্রো হল ক্যাফের বড় ভাই । বিস্ত্রোতে অপেক্ষাকৃত বড় বার সহ একত্রে বহু লোকের বসার জায়গা থাকে।
মজার ব্যাপার হলো বিস্ত্রো শব্দটা এসেছে রাশিয়ানদের কাছ থেকে। ১৮১৪ সালে অধিকৃত প্যারিসে ক্ষুধার্ত সৈন্যরা দোকানে ঢুকে উচ্চারণ করেছিল বিস্ত্রো বিস্ত্রো যার অর্থ তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি। সেই থেকে নামটা থেকে যায়। কি দারুন না ? তেমনি এক বিস্ত্রো থেকে নাস্তা সারলাম ক্রসে আর ফ্রেঞ্চ ওনিয়ন স্যুপে। ফ্রান্সে এসে ফ্রেঞ্চ অনিয়ন সুপ না খেলে হলো ? এই অনিয়ন সুপের সৃষ্টি কিন্তু ফ্রান্সে না ৮ হাজার বছর আগে রোমানরা তা আবিষ্কার করেছিল l ধীরে ধীরে গরিব ফরাসিরা তা খাওয়া শুরু করে কারণ মাঠে-ঘাটে বনে জঙ্গলে সব জায়গায় প্রচুর পেঁয়াজ পাওয়া যেত l কিন্তু একদিন রাজা কিং লুই XVI শিকারি যেয়ে কোন খাবার না এই অনিয়ন সুপ ট্রাই করে l রাজা এসে এর গল্প করলে সবাই খাওয়া শুরু করে এবং নাম হয়ে যায় ফ্রেঞ্চ অনিয়ন সুপ ! আমাদের নেহেরির ইতিহাসটাও নাকি সেরকমই !
প্যারিসের আজ দিন কাটাবো দারুন এক মিউজিয়াম দেখে। নাম ডা ওরসে। মূলত ইম্প্রেশনিস্ট দের কাজ নিয়ে এই মিউজিয়াম টা সাজানো। গত বার লুভে ইম্প্রেশনিস্ট দের কাজ খুঁজতে গিয়ে একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম আমার ধারণা ছিল ফ্রেঞ্চ যাবতীয় কাজের কিছু সংগ্রহ হয়তো লুভে থাকবে কিন্তু প্রিয় ভানগঘের মাত্র কাজ আছে একটি তাও আবার দেখা যাবে ওন রিকোয়েস্টে। এটা কিসু হলো ! কিন্তু ডা ওরসে তে মন ভরে ইম্প্রেশনিস্ট দের কাজ দেখা যায়।
এই মিউজিয়াম নাকি একসময় একটা ট্রেন স্টেশন ছিল। মিউজিয়াম না বলে একে রাজ প্রাসাদ বললেও মনে হয় কম বলা হবে। এখানে ইম্প্রেশনিস্ট ও পোস্ট ইম্প্রেশনিস্ট আর্টিস্ট দের দারুন সংগ্রহ আছে। এখন থেকে প্রিয় কিছু ছবি দিলাম এবং কেন ভালো লাগলো তা লিখলাম।

Poppy Field- Monet দারুন এই ছবিটা মনের আঁকা। মনে তার স্ত্রী জঁ কে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন হলেন্ডে। লালা লাল পপি ফুল ফুটেছিলো হলুদ সবুজ মাঠে। মনে আঁকতে শুরু করলেন ধূসর রঙের ভিতর লাল লাল পপি। নিসর্গে রঙের ঝলকানিতে এঁকেছেন পপি , শুধু আলোর খেলায় । এটাই ইম্প্রেসনিজম। আর মনে তার রাজা। এই ছবিটার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়েছিলো প্রিয় মানুষ রনিত ভাই , তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

Le Déjeuner Sur l’Herbe- Manet ছবিটার সুন্দর একটা বাংলা নাম আছে,দিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় “ঘাসের উপর মধ্যাহ্নভোজ”। জঙ্গলের মধ্যে ঘাসের উপর বসে আছে দুজন সম্পূর্ণ সুসজ্জিত পুরুষ কিন্তু তাদের তাদের পাশে একটি রমণী সম্পূর্ণ নগ্ন। একটু দূরে আর একটি পাতলা জামা পড়া রমণী জলে পার হচ্ছে। দুজন সম্পূর্ণ পরিচ্ছদ প্রবাহিত পুরুষের পাশে নগ্ন রমণীকে যাবতীয় কৌতূহলয়ের কারণ। যদিও ছবিটার মধ্যে অশ্লীলতা আভাস নেই।পোশাকে বিচার করা যায় না অশ্লীলতা ফুটে ওঠে ভঙ্গিতে। ১৮৬৩ র এক্সিবিশনে মানে সম্পর্কে চেচিয়ে বলা হতে লাগলো “পাগল লোকটা বদমাশ অশ্লীল ছবি এঁকেছে। এই ছবি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলা উচিত!” অথচ ১৫০ বছর পর একথা কেউ স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারে ?

L’Angélus -Millet কি সুন্দর একটা ছবি ! চার্চের ঘন্টা শুনে কাজ বিরতিতে আছে দুই জন কৃষক। তারা প্রার্থনা করছে। গোধূলি লগ্ন। চারিদিকে সংসার নীরবতা। নীরবতা টের পাওয়া যাচ্ছে। ছবির নাম দা এঞ্জেলাস । খ্রিস্ট নিয়মে প্রার্থনার এই রীতিকে এঞ্জেলাস বলে।

Bal du moulin de la galette-Renoir রেনোয়ার তুলিতে রং নয় যেন আলো থাকে। মোমার্তের একটি ডান্স ভেন্যু তে সবাই নাচছে। তাদের যেন আঁকা হয়েছে আলো দিয়ে। রঙের সে কি গতি ! যেন রং ই নাচছে। ১৮৭৭ সালে ছবিটা তৃতীয় ইম্প্রেশনিস্ট এক্সিবিশনে স্থান পেয়েছিলো। দুঃখজনক হলো সেদিন এই শিল্পকর্ম কোনো তৎপর্যবহ চিত্র বলেই গণনায় ধরেনি কোনো দর্শক। তবে তা ইতিহাস হতে আরো কয়েক বছর লেগেছিলো।

La classes de danse-Dega দেগার এই বিখ্যাত ছবিটার নাম ব্যালে ক্লাস।ছবিটা ক্লাস শেষ হওয়া ঠিক পরের সময়। ছবির মাঝখানে একটা লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন ব্যালে শিক্ষক জুলে পেহো।তিনি ছিলেন দেগার বন্ধু। তিনি সহৃদয় হয়ে ডগাকে ছবি আঁকার জন্য তার ক্লাসে ঢুকতে দিতেন। তার আরো অনেক ছবিতে এই ভদ্রলোক লাঠি হাতে দেখতে পারবেন। পেছনে একজন ব্যালোরিনা আনমনে নখ কামড়াচ্ছে। ডান দিকে আরেক ব্যালেরিনা উল্টোদিকে ঘুরে কাপড় ঠিক করে নিচ্ছে। পেছনে তাদের মা রা অপেক্ষা করছে।সাধারণে অসাধারণ। কি সুন্দর !

Self portrait-Van Gogh ভিনসেন্ট যখন এই পোর্ট্রেটটা আকে তখন সে স্যা রেমি-দ প্রভাস নামে একটি পাগলাগারদে চিকিসাধীন।ভাবা যায় ? আমার কাছে এটা তার সবচেয়ে সুন্দর পোর্ট্রেট। আকাশি আর ফিরোজা রঙের ব্যাকগ্রাউন্ড ভিনসেন্টের নিজের প্রতিকৃতি সর্পিল আবেগে যেন প্রতিনিধি হয়ে আছে। ভিনসেন্ট তার জীবদ্বশায় মাত্র একটি ছবি বিক্রি করতে পেরেছিলো। অর্থের অভাবে সারা জীবন কেটেছে চরম হতাশা আর অনিশ্চয়তায়।

Arearea- Gauguin মাঝে মাঝে আমাদের মনে হয় না সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে চলে যাই ? বিরক্ত লাগে এই সংসার ? গগ্যার ও লেগেছিলো এবং তিনি তা করেছিলেন সব ছেড়ে ছুড়ে তাহিতি দ্বীপে চলে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ দিন থেকেছেন ,আদিমতার সাথে মিশেছেন , প্রেম করেছেন আর নিজের মনে শুধু ছবি এঁকেছেন। এই ছবিটা তাহিতি তে আঁকা। ১৮৯১ সালে দুই জন তাহিতি নারী বসে আছে একজন বাঁশি বাজাচ্ছে। পিছনে কিছু তাহিতিয়ান পূজা করছে। লাল,হলুদ আর সবুজের দুর্দান্ত সম্ভার।আকাশ দেখা যাচ্ছে না।সামনে একটি লাল কুকুর। ১৮৯৩ এ তাহিতির এই ছবিগুলো নিয়ে এক্সিবিশন হয় প্যারিসে এবং যথারীতি দর্শক বিরক্ত হয়। শোনা যায় লাল কুকুর টি নিয়ে হাসা হাসি করতেও তারা ছাড়েনি।বলেন তো বেটা বিরক্ত হৰে না কেন ?

Bather-Cézanne জীবন সবচেয়ে বেশি গালাগাল খেয়েছে নাকি এই শিল্পী ! ১৮৩৪ এর এক্সিবিশনের পর তাকে বলা হয়েছিল সেজান কি গাঁধার লেজ দিয়ে ছবি এঁকেছে ! সেজান সেই দুঃখে প্যারিস ছেড়ে চলে আসেন এবং আর ফিরে যান নি। তারপর সে ইম্প্রেশনিস্ট ভাবে আঁকা ও ছেড়ে দিলেন। তিনি বলতেন “ইমপ্রেশনিস্টরা ছবির পোশাকি দিকটার উপর বেশি নজর দেন। ছবির গভীরত্ব ,ওজন ,অস্তিমজ্জা র কথা ভাবছেন না তারা শুধু চামড়ার উপর রং মাখছেন।”সেজানের ছবি দেখলে গভীর একটা ভাব আসে lনিজেস্স একটা ফর্ম আছে বস্তুর ,প্রকৃতির এমন কি মানুষের। গোসলের এই ছবিটা দেখলে বুঝা যায় তা কত ব্যাতিক্রম। তার এই ভাবনা ভবিষ্যত কিউবএজম সৃষ্টি করেছিল। স্বয়ং পিকাসো তাকে বলতো My only master ! পোস্ট ইম্প্রেশনিস্ট এই শিল্পী শেষ জীবনে সন্যাসি হয়েছিলেন !

The snake charmer-Rousseau-ছবিটা দেখে প্রথমে যে লাইন টা মনে আসলো
নাগ নাগীনির খেলা,
সর্পরাজের খেলা
বিষধর তোলে ফনা,
ছোবলে বিষের জ্বালা
কিন্তু এটা তা না ,এখানে ইভ বাসি বাজিয়ে সাপ বশ করছে গার্ডেনে অব ইডেনে ,কি দারুন !

The hells gate-Rodin নরকের দরজা। পাপী দের আর্তনাদ যেন শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। যেন সতর্ক করছে, ঢুক না এ দরজা দিয়ে।দরজার উপর বসে আছে দান্তে।চিন্তা করছে এই নরক নিয়ে।মূলত দান্তের ডিভাইন কমেডি থেকে ইন্সপায়ার হয়ে রোদা এই গেট বানিয়েছিলেন।ভয়ঙ্কর সুন্দর !

দুপুরের খাবার সারলাম এসকার্গো দিয়ে।এসকার্গো হলো শামুক দিয়ে তৈরি একটি খাবার। ফরাসিরা শামুক খাওয়া শিখেছিলো রোমানদের থেকে। রোমানদের কাছে তা ছিল এলিট ফুড। তারপর মিডল এজে চার্চ এসে ফতোয়া দেয় শামুক হারাম। তখন কমে যায় এর খাওয়া। ১৮১৪ সালে বুর্গানডির এক রাজকীয় ভোজে শেফ নতুন কিছু করার জন্য বাগানের শামুক তুলে রসুন ধনে পাতা আর মাখন দিয়ে রান্না করে একে । রয়েল কোর্টে দারুন জনপ্রিয় হয় এই খাবার। তারপর থেকে চলতে থাকে সাধারনের মাঝে।সাথে ছিল লাল দ্রাক্ষারস !

বিকেলে দীর্ঘ সময় কাটালাম শপিং রোড ধরে। ছোট বড় পারফিউমের দোকান দিয়ে ভরা পুরো শহর। সুনীলের লেখাটা মনে পড়লো “মধ্যযুগের ফরাসিদের অত সাঁজ পোশাকের বাহার, অত সুন্দর্য চর্চা আড়ম্বর অথচ তাদের শরীরে যে কি পরিমান নোংরা থাকতো তা কল্পনা করতেও কষ্ট হয় ।বহু মেয়ে সারা জীবনে একবার ও স্নান করত না ,অর্থাৎ সর্বাঙ্গে জলস্পর্শ বিনাই সেইসব সুন্দরীরা স্বর্গে চলে যেত ।অনেক পুরুষ জীবনে একবার অন্তত স্নান করতে বাধ্য হত কারণ সেনাবাহিনীতে ভর্তি হবার সময় তাদের সম্পূর্ণ নগ্ন করে জলের চুবিয়ে শরীরটা পরীক্ষা করে দেখা হতো ।” তাই হয়তো এতো মাতামাতি এই পারফিউম নিয়ে।
চলবে…
প্রথম পর্বের লিংক





কমেন্ট করুনঃ