‘বাবুদের ব্রিফকেস’ কিংবা ‘গৃহিনীদের সোনার নেকলেস’। এসব চুরি হলেই, জীবনবাদী শিল্পী নচিকেতা বলছেন, ‘সকলে সমস্বরে, একরাশ ঘৃণাভরে, চিৎকার করে বলেন চোর চোর চোর চোর চোর।’ কিন্তু শিল্পীর আক্ষেপ, উঁচু উঁচু ইমারত গড়ে বিকেলের সোনারঙ যারা চুরি করে কিংবা শিশুদের শৈশব চুরি করে যে ‘গ্রন্থকীটের দল’, তাদের তো কেউ চোর বলি না। এই লেখায় আমরা অবশ্য আরেক ধরনের চোরের সঙ্গে পরিচত হব। এঁরা হলেন ‘চিন্তা চোর’।
এঁরা আপনার মনোসৃজিত চমৎকার কোনো চিন্তার কথা শোনার পর অন্যের কাছে ওই ভাবনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যে, শ্রোতা ধরেই নেবেন, এই আইডিয়া এই ভদ্রলোকেরই। এমনকি, কখনো কখনো এসব ভদ্রচোর নিজের মুখেই দাবি করেন, তিনি অনেক ভেবেচিন্তে এমন একটা আইডিয়া বের করতে পেরেছেন।
কখনো কখনো এমনও হতে পারে, আপনার কাছ থেকে শোনা আপনারই আইডিয়া আপনার সামনেই সভ্যদের কোনো এক ভরা বৈঠকে একজন সহকর্মী বা জ্যেষ্ঠ পদধারী কোনো কর্তা এমনভাবে উপস্থাপন করলেন, উপস্থিত সবাই ধরে নিলেন এটি উনারই চিন্তাপ্রসূত। তখন আপনি যে বিরক্ত হবেন, আপনার মেজাজ যে বিগড়ে যাবেন এটাই স্বাভাবিক। অন্তত নিজেই লজ্জা পাওয়া এবং বিড়ম্বনায়-পড়েছি বলে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
কিছু মানুষ কেন নিজে মৌলিক চিন্তা না করে অন্যের চিন্তা চুরি করে? কেউ কেউ কেন অন্যকে স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য করে? তাঁরা কি এমনটা করেন নিজের অজান্তে ও অনিচ্ছায়, শুধু স্বভাবজাতভাবে, নাকি সচেতনভাবেই? এসব বিষয়ে মনোবিদরা কী বলেন? এমন মননের আর্থ-সামাজিক রূপটি কেমন? মেধাস্বত্ব আইনই বা কী বলে?
চিন্তা চোরেরা জীবনে কোনোদিন মৌলিক বা প্রকৃত কিছু করতে পারেননি। তারা কেবল অন্যকে হুবহু অনুকরণই করে চলেছেন। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এঁরা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সৃজনশীল ক্ষেত্রে চোর-স্বভাবী ছিলেন। সেই অভ্যেসটা পেশাজীবনেও বাদ দিতে পারেননি। চিন্তা চুরি বা অন্যের কাজকে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবৃত্তিটা এমনভাবে এঁদের আচরণে গেঁথে যায়, তাঁরা এমনকি অবচেতনভাবেই এর পুনারবৃত্তি করতে থাকেন।
নতুন আইডিয়া বের করা অত সোজা নয়। মানুষমাত্রই কল্পপ্রিয়, কিন্তু মানবকূলের মধ্যে কজনই বা কল্পনাশক্তিপ্রবণ? বিশেষ করে সৃজনশীল চিন্তা করার মতো সক্ষমতা না থাকলে, লোকে অন্যের আইডিয়া চুরি করে। আর এই চোরকূলের মধ্যে যাঁরা একটু-আধটু নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন, অন্যকে ফাঁকি দিতে তাঁরা কয়েকজনের আইডিয়াকে একত্রে করে নতুন রূপে তা উপস্থাপন করেন।
আলোচনার সময় ভালো আইডিয়ার প্রশংসা হয়। সেজন্য সস্তায় কদর পাওয়ার লোভে কদর্য কার্য করতে কারো চিন্তা চোরদের তেমন একটা বাধে না। আবার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিযোগিতার ব্যাপার তো আছেই। সৃজনশীল মানুষ ভালো কিছুর জন্য ভাবনার সাগরে ডুব দিয়ে থাকেন, জ্ঞানসায়রে অনুসন্ধান করতে থাকেন উত্তরণের উপায়। আর চৌর্যজীবীরা সজাগ থাকেন শুধু অন্যের চাষ করা ফসল নিজের গোলায় তোলার জন্য।
কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর আইডিয়াকে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতার একটি চিত্র উঠে এসেছিল ২০১৫ সালের এক জরিপে। যুক্তরাজ্যে এক হাজার কর্মীর ওপর জরিপটি চালিয়েছিলেন লেখক ও বক্তা অ্যান্ডি হ্যারিংটন। জরিপে অংশ নেওয়া কর্মীদের ৪৬ শতাংশ দাবি করেছিলেন, তাঁদের আইডিয়া সহকর্মীরা চুরি ছিনতাই করেন প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেদের অধিক যোগ্য বলে প্রতীয়মান করার জন্য। জরিপে ম্যানেজারেরাও অংশ নিয়েছিলেন। প্রত্যেক ম্যানেজার স্বীকার করেছিলেন, পেশাজীবনে তাঁরা একবার হলেও অধীনস্ত কর্মীর আইডিয়া চুরি করেছেন। প্রতি পাঁচজন ম্যানেজারের একজন স্বীকার করেছিলেন, তাঁরা অধীনস্ত কর্মীদের আইডিয়া নিয়মিতই চুরি করেন।
সৃজনশীল বা সাহিত্যকর্মের স্বত্বাধিকার সুরক্ষায় দেশে দেশে কপিরাইট আইন আছে, বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। ভৌগলিক ও সংস্কৃতি ভেদে বিভিন্ন দেশের প্রণীত আইনগুলোর নাম ও ধারায় পার্থক্যসূচক ভিন্নতা থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু মোটা দাগে, মৌলিক বিচারে এসব আইনের মূলকথা একই : কর্মটির প্রণেতার অধিকারকে স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দেওয়া। বাণিজ্যিক বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তো, কপিরাইটের সঙ্গে তিনটি অধিকার জড়িয়ে থাকে : কর্মের মালিকানার অধিকার, রচয়িতার নৈতিক অধিকার এবং পার্শ^ অধিকার। এই যে দ্বিতীয় অধিকার তথা ‘নৈতিক অধিকার’, এটি খুবই মৌলিক বিষয়। চিন্তা চুরির ক্ষেত্রে এই মৌলিকত্বকেই উপেক্ষা ও অপমান করেন চিন্তা চোরগণ।
মনোবিদরা দেখেছেন, অন্যের বা নিজের পুরনো আইডিয়া বা স্মৃতিকে নতুন ও নিজের বলে চালিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কারো কারো বেলায় অবচেতন মনোস্মৃতি কাজ করে। এ ধরনের প্রবৃত্তিকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ক্রিপ্টোমনেসিয়া।
এ বিষয়ে বেশ পুরনো একটি গবেষণা আছে। ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন মেথোডিস্ট ইউনিভার্সিটির অ্যালান ব্রাউন ও ডানা মারফির গবেষণা প্রবন্ধটি প্রকাশ হয়েছিল। তাঁরা গবেষণার স্বেচ্ছাসেবকদের চতুষ্পদী প্রাণী, ক্রীড়াসামগ্রী, বাদ্যযন্ত্র ও পোশাক। এসবের নাম দলভুক্ত হয়ে ভাবতে বলেছিলেন। এরপর প্রতিটি শ্রেণির চারটি করে নাম লিখতে বলা হলো। দেখা গেল, শতকরা ৭৫ ভাগ স্বেচ্ছাসেবক দলের অন্য ব্যক্তির মুখ থেকে শোনা নামগুলো নিজের তালিকায় যোগ করেছেন। এটাকে গবেষকরা অবচেতন চুরি বলতে রাজি।
কোন আইডিয়া বেশি চুরি হয়? ১৯৯৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মূল আইডিয়াটি কার বা কোন সূত্র থেকে উদ্ভূত, সেই ব্যক্তি বা সূত্রের গ্রহণযোগ্যতার ওপর আইডিয়া চুরির হার নির্ভর করে। মানে, অধিক গ্রহণযোগ্য ও পদধারী ব্যক্তির আইডিয়া বেশি চুরি হতে পারে।
আবার আইডিয়ার মানের ওপর নির্ভর করতে পারে সেটি চুরি যাওয়ার হার। খারাপ আইডিয়ার চেয়ে ভালো আইডিয়া বেশি চুরি হয় বলে ২০০৭ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে।
গবেষণায় এও দেখা গেছে, আপনি কথা বলার পর যে ব্যক্তি কথা বলবেন, আপনার আইডিয়াকে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়ার ঝোঁক তাঁর ভেতরেই বেশি থাকবে।
এজন্য দেখবেন, কোনো আলোচনা সভায় তুলনামূলক কম সৃজনশীল ব্যক্তি বক্তব্য রাখার সময় বলবেন, ‘আমি আর কী বলব, আমার কথা তো অমুক বলেই দিয়েছেন…।’ দেখবেন, এই ‘অমুক’ হয় তাঁর ঠিক আগে আগে বক্তব্য রাখা ব্যক্তি কিংবা সভায় উপস্থিতদের মধ্যে অধিক গ্রহণযোগ্য কেউ।
কিন্তু কর্মক্ষেত্রে অন্যের আইডিয়াকে নিজের বলে চালিয়ে দেন যাঁরা, তাঁরা কি আদোতে অবচেতন মনে এই চৌর্যবৃত্তি করেন?
কেউ কেউ আছেন, অকারণে-অপ্রয়োজনেও শুধু স্বভাবের দোষে অন্যের বিষয়াদি এবং চিন্তা, কথা, লেখা ইত্যাদি চুরি করতে থাকেন। এই মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধিতে ভোগা লোকদের বলা হয় ক্লেপ্টোম্যানিয়াক বা চৌর্যোন্মাদগ্রস্ত।
তবে, যাঁরা সচেতনভাবে অন্যের চিন্তা, লেখা, কথা ও কাজকে নিজের বলে চালিয়ে থাকেন, তাঁরা কি এই যুক্তির ধারব ও বাহক যেখানে দাবি করা হয়, পৃথিবীতে কোনো আইডিয়াই মৌলিক নয়, সুতরাং অন্যের আইডিয়া আপন বলে চালিয়ে দিতে বাধা কোথাও নাই!
ও হ্যাঁ, এই লেখাটির চিন্তা প্রথম আমার মাথা থেকে প্রসূত হয়নি। আমার সহকর্মী, আমাদের সময়ের সহযোগী সম্পাদক প্রমিত হোসেন লেখার এই আইডিয়া দিয়েছেন। আর আমি এই লেখা তৈরির সময় রিসার্চ গেট, সাইকোলজি টুডে ও বিবিসি ওয়ার্কলাইফের সাইট ঘেঁটে তথ্য-উপাত্ত নিয়েছি। তাঁদের সবার কাছে কৃতজ্ঞতা।





কমেন্ট করুনঃ