লোকটির সাথে আমার পরিচয় বিশ বছর অতিক্রম করেছে। তাঁর নাম কমল কুমার সাহা। তাঁকে আজ ফোন করার পর আমার মাথায় বিশ বছরের অংকের হিসাবটা জেগে ওঠে। তবে কত বছরের সম্পর্ক এমন বিষয়ে আমি কখনো ভাবিনি। ভাবার মত তেমন পরিস্থিতি দেখা দেয়নি। দুপুরে মোবাইলে ফোন দিয়ে কমল কুমার সাহাকে আমার পরিচয় দিলে তিনি বিনয়ের সাথে বলেন; দাদা আপনার নাম আমার মোবাইলে বিশ বছর আগে সেভ করা। আপনার নাম বলার দরকার নেই। তাঁর কথায় আমি খানিক শব্দ করেই হাসলাম। ওপাশ থেকে কমল কুমার সাহাও হা হা শব্দ করেই হাসলেন।
তারপর কমল কুমার সাহা বললেন; তো কি খবর দাদা?
আমি আর ভনিতা না করে সহজ করে বলার চেষ্টা করলাম; আপনার পরিবারের একটি আনন্দের খবর পেয়ে অভিনন্দন জানাতে ফোন করলাম।
তিনি বললেন; কোন খবর দাদা?
আমি বললাম; জানতে পারলাম ক’দিন আগে আপনি দাদু হয়েছেন! আপনাকে অভিন্দন। নাতির জন্য আশির্বাদ।
মনে হলো তিনি আমার কথায় ভালবাসায় জড়ানো নির্মল আনন্দের হাসি হাসলেন। পরক্ষণেই কমল কুমার সাহা নিজ থেকেও আশির্বাদ চাইলেন নাতির জন্য। তাঁর বংশের এক মাত্র প্রদীপ এই নাতি। বেচারার একটিই মাত্র ছেলে। আর কোন সন্তান নেই। এক মাত্র ছেলের পিতা তিনি। ছেলেটির নাম রাম কুমার সাহা। বাবার অনেক চেষ্ঠা থাকার পরও রাম শিক্ষাদীক্ষায় তেমন এগুতে পারেনি। ছেলেটি খানিকটা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বলে বিবেচিত। রামের বয়স বিশের কোটায় থাকতেই মা বাবার শখ হলো তাকে বিয়ে দিতে। ছেলে বিয়ে দেয়ার আগে নানারকম ভাবনা তাঁদের মাথায় ভিড় করেছে। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছেলে বিয়ের পর কোন লঙ্কাকাণ্ড ঘটায় তা নিয়ে স্বামী স্ত্রীর দুশ্চিন্তার শেষ ছিলনা। তাই বুঝ-বিবেচনা করে ছেলের জন্য পাত্রী খুঁজে বের করতে হবে। যাতে কোন রকম কেলেংকারি ঘটানোর সম্ভাবনা না থাকে। কমল কুমার সাহা ও তাঁর স্ত্রী বুঝ-বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়, গ্রামের দরিদ্র পরিবারের কিছু লেখাপড়া জানা মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দেবে। তাঁদের পরিকল্পনা অনুযায়ীই ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। বৌ মা হলেন গ্রামের অতি সাধারণ এক পরিবারের কন্যা। তবে বৌমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আছে মন্দ না। কলেজ পর্যন্ত পা রেখেছিল।
রামের বিয়েটা হয়েছিল দারুণ ঘটা করে। দুমদাম হৈচৈয়ের কমতি ছিল না। কেনই বা দারুণ দুমদাম করা হবে না? প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি কমল কুমার সাহার এক মাত্র ছেলে। তাঁর তো আর কম নেই! ধন-সম্পদ বলতে যা বুঝায়, তাতো সব এই ছেলেরই থাকবে। কোথাও কোন অভাব নেই তাঁর। একাধিক মিল কারখানা। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সবই কমল কুমার সাহা নিজের মেধা, পরিকল্পনা ও পরিশ্রম দিয়ে গড়ে তুলেছেন। এইসব কমল কুমারের পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া কোন সম্পদ নয়। যা করেছেন নিজের রক্ত পানি করে-ঘাম ঝড়িয়েই করেছেন।
সেই কিশোর বয়সে গ্রাম থেকে রিক্ত হাতে শহরে আসেন কমল। তখনও নামের সাথে কুমার আর সাহা যোগসন্ধি ঘটেনি। কমলের সাথে কুমার ও সাহা যোগ হয়ে প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাঁর পুরো নাম রূপ লাভ করে ‘কমল কুমার সাহা’। সে যাই হোক গ্রামের বালক কমল জীবিকার সন্ধানে শহরে এসে কোন এক বাণিজ্যিক এলাকায় দোকানের কর্মচারি হন। কর্মচারি অবস্থায় ব্যবসায় বেশ মনোনিবেশ করেন তিনি। অল্প বয়সেই ব্যবসা বুঝার ক্ষমতা দেখা দেয় কমল কুমার সাহার ভেতর। মনে হয় ব্যবসায়িক মেধা তাঁর ভেতর সুপ্ত অবস্থায় লুকিয়ে ছিল। দোকানের কর্মচারি থাকা অবস্থায়ই কয়েক বছরের মধ্যে ব্যবসায় নিজেকে একটু শক্ত পোক্ত করে গড়ে তোলেন। এমন দক্ষতা যারতার ক্ষেত্রে হয় না। কিন্তু কমল কুমার সাহা তা পেরেছেন। একারণে মালিকেরও সুনজর ছিল কমলের প্রতি। মালিকের নিকট থেকে অধিক স্নেহ ভালবাসা পেত কমল। তারপর একটা সময় আসে মালিকের সম্মতি নিয়ে তিনি দোকানের চাকরি ছেড়ে দেন। চাকরি ছেড়ে সুতার বাজারে ব্রোকারি শুরু করেন। তখন তিনি মুক্ত বা স্বাধীন। কারো অধীন¯’ নন, কর্মচারি নন। প্রতি পাউন্ড সুতায় পাঁচ পয়সা দশ পয়সা লাভ করেই টাকার অংক অনেক বড় হয়ে যায় কমল কুমার সাহার। আর সেভাবেই নিজের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হতে থাকেন কমল কুমার সাহা। এভাবে চলতে চলতে একটা সময় নিজস্ব গদি করার সামর্থ অর্জন করেন তিনি। গদি মানে বসার জায়গা। আর ব্যবসায়ীদের বসার জায়গা মানে দোকান। তাঁর দোকানে একাধিক কর্মচারিও রাখা হয়। শনৈ শনৈ করে ব্যবসায় উন্নতি হতে থাকে কমল কুমার সাহার। আর দশজন ব্যবসায়ীর মত তিনিও এই ব্যবসা নিয়েই থাকতে পারতেন। অন্যদের মত বাড়ি গাড়ি এই ব্যবসার আয় থেকে না হওয়ার কোন কারণ নেই। কিন্তু সহসাই এমন বিলাস তিনি চাননি। বিলাসী জীবন গড়তে হবে, তা হবে আরো আরো উপরে উঠে। তাই বাড়ি গাড়িতেই তিনি থেমে থাকতে চাননি। তাঁর ইচ্ছে ভিন্ন রকম। আরো অনেক সিঁড়ি পেরিয়ে উপরের দিকে। তাঁর চোখের নজর প্রসারিত হয়ে যায়। বেড়ে যায় উপরে ওঠার মানসিকতা। তাতে তিনি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সহায়তাও পান। তাঁর সততা নিষ্ঠা ও বাণিজ্যিক কৌশলের কারণে একাধিক ব্যাংক তাকে সহায়তা করতে দ্বিধাহীন মানসিকতায় এগিয়ে আসে। আর সেই সুযোগও কমল কুমার সাহা হাতছাড়া করেন না। লুফে নেন সোনালী সুযোগ।
নারায়ণগঞ্জ জেলার বাইরে ঢাকার সাভার এলাকায় কমল কুমার সাহা জায়গা খরিদ করেন। ধীরে ধীরে সুপরিকল্পিত ভাবে সেখানে নির্মাণ করেন সুতা তৈরির কারখানা। যা স্পিনিং মিল নামে পরিচিতি লাভ করে। ত্রিশের কোঠায় এসে কমল কুমার সাহার একাধিক স্পিনিং মিল। রাজধানীর ভিআইপি এলাকায় ও নিজ শহর নারায়ণগঞ্জে একাধিক বহুতল বিশিষ্ট বাড়ির মালিক তিনি। পাশাপাশি বিদেশ ঘুরে তাঁর হৃদয়ে একটি স্বপ্নও তৈরি হয়। সেই স্বপ্নও তিনি বাস্তবায়ন করেন পাশের জেলায় কয়েক একর জমি নিয়ে আধুনিক একটি বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণের মধ্যদিয়ে। বিনোদন কেন্দ্রে কয়েকটি কটেজও নির্মাণ করেছেন। কটেজগুলো খুবই মানসম্পন্ন। উন্নত দেশের কটেজের আদলে নির্মাণ করা। সিআইপি ছাড়াও সেখানে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রধানগণও পরিবারসহ রাত যাপনের ব্যবস্থা কমল কুমার সাহা করে থাকেন। যখন যে সংস্থায় যিনি প্রধান হয়ে আসেন তখন তাকেই সেই কটেজে অবস্থান করার আমন্ত্রণ জানানোর রেওয়াজ রয়েছে তাঁর মধ্যে।
কমল কুমার সাহার স্বপ্নের ওই বিনোদন কেন্দ্রেই পুত্র রমা কুমার সাহার বিয়ের সমস্ত অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেয় দেশের প্রথম শ্রেণির ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ব্যবসা ও শিল্প সংগঠনের নেত…বৃন্দ। এমপি, মন্ত্রী, সচিব, পুলিশ ও র্যাব বাহিনীর টপ কর্মকর্তার পরিবার, সাংবাদিক পরিবারবর্গসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ।
কমল কুমার সাহা যখন সাধারণ ব্যবসায়ী, স্থানীয়ভাবে তখন একটি বা একাধিক সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়ে থাকতেন তিনি। সে সময়ে আমার মাধ্যমে টেলিভিশনে মুখ দেখানো এবং কথা বলার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। আর সেই সুযোগটি ছিল কমল কুমারের জন্য ঈশ্বরের আশির্বাদ। সেই থেকে তিনি সরকারি বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে সংযোগের সিঁড়ির সন্ধান খোঁজতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে সময়ের বাস্তবতায় তা পেতেও থাকেন। কমল কুমার সাহার সুযোগ হয় সরকার প্রধানের সাথে বিভিন্ন দেশে সফর সঙ্গী হতে। দেশে আরো শত শত ব্যবসায়ী শিল্পপতি রয়েছেন, কিন্ত বিদেশ ঘুরতে ক’জনের সুযোগ হয় প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গী হতে? এমন সুযোগ বিরল সম্মানের ব্যাপার নয় কি? যে কারণেই হোক সম্মানের সেই বিরল সম্মানের সুযোগটি কমল কুমার সাহার হয়ে আসছে।
এখন বাজারে চাউর হয়েছে, পৃথিবীতে নাতির আগমন উপলক্ষ্যে ব্যাপক আয়োজনে মিষ্টি বিতরণ শুরু করেছেন কমল কুমার সাহা। নাতির আনন্দবার্তা নিয়ে এক জেলা থেকে অন্য আর এক জেলায় মিষ্টি যাচ্ছে। সরকারি বেসরকারি উঁচু লেভেলের অনেকের ঘরেই নাতির আশির্বাদ প্রত্যাশিত মিষ্টির ভান্ডার উন্মুক্ত হয়েছে।





কমেন্ট করুনঃ