শার্ল বোদলেয়ার অনেকের কাছেই আধুনিক কবিতার জনক। সমকালীন ইউরোপিয় সমাজের গোঁড়ামী, ধর্মান্ধতা, প্রথাগত ভাবনা ও শিল্প-কবিতা সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে চরমদ্রোহী এক কবি। এ বছরটি বোদলেয়ারের দ্বি-শততম জন্মবর্ষ। তাঁর মূল বিচরণ কবিতায় হলেও প্রবন্ধ, শিল্প সমালোচনা ও অনুবাদের জন্যও তিনি বিশেষ ভাবে আলোচিত। মার্কিন কবি, গল্পকার, সমালোচক, যুক্তরাষ্ট্রে রোমান্টিক ধারার প্রবক্তা এদগার এ্যলেন পো (১৮০৯-১৯৪৯) এর প্রথম ফরাসি অনুবাদক তিনি। বহু সমালোচক মনে করেন, কবি না হলেও এ্যালেন পো’র ফরাসি অনুবাদের কারণেই তিনি ফরাসি সাহিত্যে স্থায়ী আসন পেতে পারতেন। বোদলেয়ারের মৃত্যুর চার বছর পর তাঁর সম্পর্কে ফরাসি কবি ও প্রতীকবাদী আন্দোলনের পুরোধা আর্তুর র্যাবো (১৮৫৮-১৮৯১) বলেছেন, ‘প্রথম দ্রষ্টা, কবিদের রাজা, কবি ও কবিতার প্রকৃত ঈশ্বর’, আর টি. এস এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫) বলেছেন, ‘যে কোন ভাষার আধুনিক কবিতার তিনি শ্রেষ্ঠতম কবি।’
উনিশ শতকের বিশ্বে শিল্পের আঙ্গিক-প্রকরণ ও সমাজে বিরাজমান বাস্তবতার সাথে এর সম্পর্ক ও দ্বন্দ্ব নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। এর শুরুটা চিত্রকলা থেকে হলেও পরে সাহিত্য-কবিতা, নাটক, সংগীত ও শিল্পকলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তা ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এ আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি ফ্রান্স, কিন্তু দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়ে ইয়োরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। উনিশ শতকের শুরুতে ফ্রান্সে নেপোলিয়ন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে প্রাচীন রোম ও গ্রিসের প্রভাবে শিল্পী জোসেফ ভিয়েন (১৭১৬-১৮০৯) ফরাসী শিল্পে নব্য ধ্রুপদীবাদের আবির্ভাব ঘটান এবং শিল্পী জাঁক লুই দাভিদ (১৭৪৮-১৮২৫) ধ্রুপদীবাদকে প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রচলিত ফরাসী রীতির বিপরিতে তাঁদের আকর্ষণ ছিল প্রাচীন রোমান ঐতিহ্য। গ্রিক ও রোমান রূপকথা তাঁদের শিল্পের বিষয়। ১৮৩০ সালে ফ্রান্সে দ্বিতীয় জুলাই-বিপ্লব শুরু হলে প্যারিসের রাস্তায় রাস্তায় সম্রাটের সৈন্যদের সাথে প্যারিসবাসীর যুদ্ধ শুরু হয়। ফরাসী শিল্পে তখন ধ্রুপদীবাদীদের একচেটিয়া আধিপত্য হুমকীর মুখে পড়ে। শিল্পী ভিক্তর ইউজেন দেলাক্রোয়া (১৭৯৮-১৮৬৩) তখন ‘মুক্তি জনসাধারণকে চালিত করে’ Liberty Leading the People) শিরোনামে একটি ছবি আঁকেন। ছবিটি এঁকে তিনি বললেন, ‘ধ্রুপদী রীতি হয়ে উঠেছিল চিত্রশিল্পের সবরকম প্রগতির বিরুদ্ধে জগদ্দল পাথর। একে উৎপাটন করতেই হবে।’ এ ছবিকে বলা হল মুক্তি বা স্বাধীনতার দূত, ধ্রুপদী রীতির অত্যাচার থেকে রোমান্টিসিজমের মুক্তির সনদ। ধ্রুপদী রীতি কখনোই সাধারণের ভালোবাসা পায়নি, এই ভালোবাসা পেয়েছে রোমান্টিক রীতি। কিন্তু তারপরেও রোমান্টিক ধারার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধ্রুপদীধারা শুধু ফ্রান্স নয় গোটা বিশ্বেই টিকে থেকেছে। বিশেষকরে সাহিত্য এর উজ্জ্বল উদাহরণ।
বোদলেয়ার যখন কবিতা লেখা শুরু করেন তখন ফ্রান্সে সর্বত্র রোমান্টিকতার জয়জয়কার এবং সাহিত্যে রোমান্টিকদের পুরোধা ভিক্তর হুগো (১৮০২-১৮৮৫) গৌরবের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। রোমান্টিসিজমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বোদলেয়ার বললেন- ‘তা মূলত একপ্রকার অনুভূতি এবং বিশেষত অন্তরঙ্গতা, আধ্যাত্মিকতা, বর্ণবৈভব, অসীমের উৎকাঙ্খা।’ এসব ব্যাপারে রোমান্টিকদের কৃতিত্ব অস্বীকার করার তাঁর কোন ইচ্ছা ছিল না। বরঞ্চ সৃজন-কল্পনার ক্ষেত্রে মহৎ পূর্বসুরীদের সমকক্ষ হতে পারবেন কি-না সে বিষয়ে তাঁর নিজের মনে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। বোদলেয়ার তাঁর কবিতায় ধ্রুপদী রীতিকে অস্বীকার না করেও রোমান্টিক ও প্রতীকবাদকে ভিত্তি করেছেন। আবার তিনি রোমান্টিকতার আদল থেকে বেরিয়ে এর বিরোধিতাও করেছেন। কিন্তু তার পরেও তাঁর কবিতা একাধারে রোমান্টিক, ধ্রুপদী ও প্রতীকবাদী সকলকেই বিমোহিত করেছে। বোদলেয়ার সুন্দর-অসুন্দর, স্বর্গ-নরক, সত্য-অসত্য, দুঃখ-আনন্দ- প্রভৃতি বিষয়ে প্রচলিত ধারণাকে ভেঙ্গে দিয়ে নতুনতর এক ধারণা হাজির করলেন। তিনি নরকের মধ্যে বীভৎস, কুৎসিত পাপকে দেখলেন না; দেখলেন অনাবিল সৌন্দর্য্য ও স্নিগ্ধ আলোর ঝর্ণাধারা। নিকষ কালো-অন্ধকার আর বীভৎসের মধ্যে বোদলেয়ার দেখলেন স্বর্গীয় সৌন্দর্য আর নিঃসীম-আনন্দ। কল্পনাশক্তির দূরবীক্ষণ, সৃজনশীলতা, চিত্রকল্পের বিস্তৃত পটভূমি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞান বোদলেয়ারের কবিতাকে যেমনি মহিমান্বিত করেছে, তেমনি তাঁকে করেছে অনন্য। আর তাই বোদলেয়ারের রোমান্টিকতাও অন্য কবিদের থেকে আলাদা, রোমাঞ্চকর। এ যেন, ‘আমি বেরিয়েছি অসীমের সন্ধানে-একা আমি, গুরু নেই, নেই কাণ্ডারী বা উপদেষ্টা, পাল পর্যন্ত নেই আমার তরীতে।’ তিনি বলেন, ‘দুঃখ এসো, হাত রাখো হাতে।’
পাশ্চাত্য-সাহিত্য যেভাবে তার প্রাচীনতম সাহিত্যসমগ্রকে ধারণ করে প্রবাহিত হয়েছে, বাংলা সাহিত্যে তা হয়নি। সেখানে গ্রীক বা লাতিন সাহিত্যের ক্লাসিকগুলোর প্রচুর অনুবাদ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। হোমার, সফোক্লিস, অ্যারিস্টোফেনিস বা য়ুরোপিডিস এর লেখা অনুবাদের ফলে তার যে বিপুল প্রভাব সমস্ত পাশ্চাত্য-সাহিত্যে পড়েছে তাই তাকে রেনেসাঁর মতো একটি নবজাগরণের দিকে নিয়ে গেছে। ক্লাসিক এর বৈশিষ্ট হচ্ছে, সময় ও সমাজ ভিন্ন হলেও এর প্রাসঙ্গিকতা ও আবেদন বদলায় না। কারণ এর ভেতর মানবিক আবেগ ও অনুভূতি ছুঁতে পারার মতো বৈশিষ্ট এমন ভাবে বিদ্যমান থাকে, যা অনুবাদের মাধ্যমেও ক্ষুণ্ন হয় না। বুদ্ধদেব বসু’র (১৯০৮-১৯৭৪) মেঘদূত এর অনুবাদ বাংলা সাহিত্যে সেই অভাব অনেকটা পুরণ করতে সচেষ্ট হয়েছে। মেঘদূতের অনুবাদ আমাদের প্রাচীন সাহিত্যের প্রাচুর্যের সাথে নিঃসন্দেহে একটি সেতু নির্মাণ করেছে। বাঙালি পাঠকদের কাছে বোদলেয়ারকে প্রথম পরিচয় করিয়েছেন বুদ্ধদেব বসু। পরবর্তী সময়ে বা এখন যদিও অনেকেই তাঁর কবিতা অনুবাদ করছেন কিন্তু এ ক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসু অগ্রগণ্য। এর আগে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২-১৯২২) বোদলেয়ারের তিনটি কবিতা ও একটি কবিতার অংশ বিশেষ, মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২) ‘সন্ধ্যার সুর’ নামে একটি কবিতার অনুবাদ ও পরে ‘গরীবের মৃত্যু’ নামে বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮২) একটি কবিতার অনুবাদ করেছিলেন। বলা চলে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মোহিতলাল মজুমদার ও বিষ্ণু দে’র অনুবাদগুলো বোদলেয়ারের পরিচয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না। আর তাই বুদ্ধদেব বসুর ‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’ (ক্লেদাক্ত কুসুম) এর অনুবাদ প্রকাশের পর বোদলেয়ার সম্পর্কে যেমনি একটি সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হল, সাথে বাংলা কবিতার ক্ষেত্রেও এইটি একটি বিশেষ ঘটনা হয়ে রইল। এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড (১৮০৯-১৮৮৩) ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’-এর ইংরেজি অনুবাদ করলে ইংরেজি কবিতায় যেমনি হইচই শুরু হয়ে যায়। বাংলা কবিতাতেও ‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’-এর অনুবাদটি ছিল তেমনি এক ঘটনা।
বুদ্ধদেব বসু বোদলেয়ার অনুবাদের ক্ষেত্রে কবিতার মূল সুরটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। এ অনুবাদ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘ফরাসী ভাষায় বলে থাকে যে অনুবাদ জিনিষটা মেয়েদের মতো, রূপসী হ’লে সতী হয় না, সতী হ’লে কুরূপা হয়। উভয়-গুণের সমন্বয়কেই আদর্শ বলে মানতে পারি এমন আদর্শ যা বাস্তবে কখনো ধরা দেবে না, কেননা একটু ভাবলেই বোঝা যাবেÑ‘আক্ষরিক অনুবাদ’ সোনার পাথর বাটির নামান্তর। কোন কবিতার আক্ষরিক মূর্তি শুধু সে নিজেই, সে এক ও অনন্য অনন্ত কালের মধ্যে ঠিক ঐ কবিতা দ্বিতীয়বার সৃষ্টি হবে না। ছন্দের বিধান, ধ্বনির বিধান, বিভিন্ন ভাষা ও প্রকরণের বিধানÑ এই সমস্ত চীৎকার ক’রে ব’লে দিচ্ছে যে ‘আক্ষরিক’ ও ‘অনুবাদ’ এ-দুটি ধারণা পরস্পরবিরোধী, ভাষান্তরে নিতে গেলেই কিছু না কিছু পরিবর্তন অনিবার্য বিশেষ্য বদল হবে বিশেষণে, কিংবা বিশেষণ বিশেষ্যে, কথা বাদ যাবে, যোগ হবে, আগের পংক্তি চ’লে আসবে পরে, শব্দের অনুক্রম এক থাকবে না।’ যার ফলে বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে ÔmystiqueÕ কোথাও হয়েছে ‘অতীন্দ্রিয়’, কোথাও ‘রহস্যময়’ আবার কোথাও ‘অলৌকিক’। এখানে ‘ফাউস্ট’ এর ফরাসি অনুবাদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৮২৮ সালে জেরার দ্য নের্ভাল (১৮০৮-১৮৫৫) জার্মান কবি, কথা সাহিত্যিক ভোলফ ফন গ্যাটের (১৭৪৯-১৮৩২) ট্র্যাজেডি ‘ফাউস্ট’ এর প্রথম খণ্ড অনুবাদ করলে, গ্যাটে নের্ভালকে লিখেন, ‘আপনার অনুবাদ পড়ে আমার অভূতপূর্ব আত্ম-উপলব্ধি ঘটেছে।’ তিনি বলেন, ‘এখন আর আমার জার্মান ভাষায় ‘ফাউস্ট’ পড়তে ইচ্ছে হয় না, কিন্তু ফরাসি অনুবাদটিকে নতুন ও জীবন্ত ব’লে মনে হয়।’
।।দুই।।
দু’শ বছর আগে ১৮২১ সালের ৯ এপ্রিল প্যারিসে বোদলেয়ারের জন্ম। সে বছরই নভেম্বরে রাশিয়াতে ফিওদর দস্তয়েভস্কি (১৮২১-১৮৮১)’র জন্ম, আর ব্রিটিশ রোমান্টিক কবি জন কিটস (১৭৯৫-১৮২১) এর অকাল মৃত্যু। বোদলেয়ারের পুরো নাম শার্ল পিয়ের বোদলেয়ার। বাবা জোসেফ ফ্রাঁসোয়া বোদলেয়ার (১৭৫৯-১৮২৭) একজন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা, সাবেক ধর্মজাজক এবং সৌখিন চিত্রশিল্পী, মা ক্যারোলিন দ্যুফে (১৭৯৪-১৮৭১)। জোসেফ ফ্রাঁসোয়া ষাট বছর বয়সে নিজের চেয়ে ৩৪ বছরের ছোট ২৬ বছর বয়সের সুন্দরী এবং অনাথ ক্যারোলিনকে দ্বিতীয় বারের মতো বিয়ে করেন। তখন জোসেফ ফ্রাঁসোয়ার প্রথম স্ত্রীর ১৬ বছরের এক পুত্রসন্তান। কিন্তু জোসেফ ফ্রাঁসোয়া পুত্র বোদলেয়ারকে ভিষণ ভালোবাসতেন। বাবার কাছেই বোদলেয়ারের প্রথম শিল্পের হাতেখড়ি। কিন্তু তাঁর বয়স যখন মাত্র ছয় বছর তখনি জোসেফ ফ্রাঁসোয়া মারা যান। এর পরের বছর তাঁর বিধবা মা ক্যারোলিন ফরাসী সেনা-বাহিনীর কর্মকর্তা কর্নেল জ্যাক অপিককে বিয়ে করেন। সৎবাবা অপিকও বোদলেয়ারকে খুব ভালোবাসতেন, কিন্তু তার পরেও বোদলেয়ার মায়ের সাথে অপিকের এ বিয়েকে মেনে নিতে পারেন নি। বোদলেয়ারের জীবনীকারদের ধারণা মায়ের মনোযোগ তাঁর নিজের দিক থেকে অপিকের দিকে পরিবর্তীত হওয়ায় অসীম এক বিষন্নতা ও দুঃখবোধ তৈরী হয় শিশু বোদলেয়ারের মধ্যে। মনোজগতের এ পরিবর্তন জীবনের শেষাবধি তিনি বয়ে চলেছেন। এ অমৃত-যন্ত্রণাই তাঁকে কবিতা ও শিল্পে সারাবিশ্বে ভিন্নতর এক উচ্চতায় সমাসীন করেছে। তাঁর জীবন দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে, আঘাতে-অভিঘাতে প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণে ক্ষতবিক্ষত, সৌন্দর্যমণ্ডিত। তিনি একে উপভোগ করেছেন। দুঃখকে ভালোবেসেছেন, যন্ত্রণাকে শিরোধার্য করে জীবনের আকর করেছেন। জীবনে বিভৎসতা, ভয়াবহতাকে স্বাগত জানিয়েছেন। দুর্বিষহ জীবনকে ভালোবেসেছেন। ঈশ্বরের আকাঙ্খায় তিনি শয়তানকে আলিঙ্গন করেছেন। কথা বলেছেন হেডিসের অন্ধকার থেকে। ‘শয়তানের স্তোত্র’ কবিতায় তিনি বলেছেন-
মহান শয়তান, করুণা করো তুমি আমার শেষহীন দুঃখে!
যে- তুমি সমতায় বিলাও বর, একই রতির লিপ্সায় পেতে ফাঁদ,
অধম চণ্ডাল, কুষ্ঠরোগীকেও ক্ষণিক স্বর্গের আস্বাদ,…
মহান শয়তান, করুণা করো তুমি আমার শেষহীন দুঃখে!
যে-তুমি মাতালের অবশ বুড়ো হাড় নম্য করো জাদুবিদ্যায়
যখন রাজপথে ঘোড়ার খুর তাকে মাড়িয়ে দিয়ে বুঝি চ’লে যায়-
মহান শয়তান, করুণা করো তুমি আমার শেষহীন দুঃখে!
মানুষ ক্ষীণ আর দুঃখী ব’লে, তাকে পরম সান্ত্বনা জানাতে
লবণ গন্ধক মিশিয়ে কৌশলে শেখালে গোলাগুলি বানাতে,
মহান শয়তান, করুণা করো তুমি আমার শেষহীন দুঃখে!
যে তুমি বেছে নাও কুবের যত আছে করুণাহীন আর ঘৃণ্য,
ললাটে এঁকে দিতে, হে কূট সহযোগী, তোমার তিলকের চিহ্ন
মহান শয়তান, করুণা করো তুমি আমার শেষহীন দুঃখে!
যে তুমি মেয়েদের নয়ন আর মন এমন ক’রে পারো জাগাতে,
নিছক জঞ্জালে বিলিয়ে ভালোবাসা, আরতি করে তারা আঘাতে-
মহান শয়তান, করুণা করো তুমি আমার শেষহীন দুঃখে!
বাস্তুহারাদের যষ্টি তুমি, আর আবিষ্কারকের দীপালোক,
ফাঁসিতে ঝোলে ষড়যন্ত্রী যারা, হয় তোমারই মন্ত্রে বীতশোক,
মহান শয়তান, করুণা করো তুমি আমার শেষহীন দুঃখে!
সকলে তারা মানে তোমাকে পিতা ব’লে, যাদের স্বর্গের উদ্যান
অন্ধ আক্রোশে পৃথিবী পার ক’রে দিলেন আদি পিতা ভগবান,
মহান শয়তান, করুণা করো তুমি আমার শেষহীন দুঃখে!
(শয়তানের স্তোত্র, অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)
বোদলেয়ারের সৌন্দর্য উজ্জ্বল হয়েও বিষণ্ন, আকর্ষণীয় হয়েও দুর্বোধ্য। বাঁচবার তীব্র আকাঙ্খা নিয়েও তাঁর প্রবণতা ছিল আত্মঘাতী। ১৮৪৫ সালের জুন মাসে একবার তিনি আত্মহননের পথেও পা বাড়িয়েছেন। পরে মায়ের কথা ভেবে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসেন। তিনি এক চিঠিতে লিখেছেন, `I am killing myself because I am useless to others and dangerous to myself…because I am mental and because I hope to point out to her (to jeaune) my dreadful example and how disorder of mind and life to some desparl and complete an halation.’
পিতা জোসেফ ফ্রাঁসোয়ার মৃত্যুর পর, মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত আঠারো মাস মায়ের সাথে বোদলেয়ার প্যারিসে বাস করেছেন। শৈশবের এ সময়টি ছিল বোদলেয়ারের জন্য খুবই আনন্দের। পরবর্তীতে এ সময়টি নিয়ে তিনি তাঁর মাকে লিখেছেন, ‘তখন তুমি একান্তই আমার ছিলে, আমি তোমার মধ্যেই বেঁচে ছিলাম; তুমি ছিলে একাকী এবং সম্পূর্ণ আমার।’
কর্নেল জ্যাক অপিক পরে জেনারেল পদে উন্নিত হন। তিনি দ্বিতীয় নেপোলিয়নের অধীনে অটোমান সাম্রাজ্যের ফরাসী রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন, এবং তৃতীয় নেপেলিয়নের সময় সিনেটর নিযুক্ত হন। ১৮৩৬ সালে অপিক বোদলেয়ারকে একটি বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করে দেন। যদিও শৈশবে মায়ের কাছে বোদলেয়ারের ইংরেজি শিক্ষার হাতেখড়ি, কিন্তু স্কুলে ভর্তি হয়ে তিন বছর তিনি ইংরেজি-চর্চায় মনোনিবেশ করেন। এ-সময়ে তিনি ফরাসি ও ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। বলা চলে সেখানেই বোদলেয়ারের কবিতা লেখা শুরু। কিন্তু ইতিহাস ছিল বোদলেয়ারের কাছে ‘অর্থহীন এক বিষয়’। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলো পড়াশোনায় মেধাবী হলেও একগুয়েমী, বেপরোয়া, স্বেচ্ছাচারিতা ও বিভিন্ন কারণে শিক্ষকরা ছাত্র বোদলেয়ারের ওপর ছিলেন বিরক্ত। স্কুল কর্তৃপক্ষ ১৮৩৯ সালের এপ্রিল মাসে তাঁকে স্কুল থেকে বহিস্কার করেন। স্কুল-জীবন সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘হাতাহাতি, শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে অনবরত বিরোধ ও সংগ্রাম, মাঝেমাঝেই অবসন্ন-বিষাদের ছায়া পড়ত মনের উপর।’ স্কুল থেকে বহিস্কৃত হয়ে তখনই বোদলেয়ার সেন্ট-লুইস কলেজে ভর্তি হন এবং সে বছরই আগস্ট মাসে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। স্নাতকোত্তর পাশের পর বোদলেয়ারের মা ও সৎবাবার ইচ্ছে ছিল বোদলেয়ার সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হবেন। কিন্তু বোদলেয়ার কোনভাবেই সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হতে রাজি হলেন না।
পরবর্তী দু’বছর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে লাতিন কোয়ার্টারে বাসা নিয়ে থাকতে শুরু করেন তিনি। ফলে দ্রুতই প্যারিসের অন্যসব ছাত্রদের মতো উচ্ছৃঙ্খল জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। আফিমসহ নানা নেশা ও এক পতিতার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। বোদলোরের এ পরিণতি দেখে সৎপিতা জ্যাক অপিক তাঁকে বিদেশ পাঠাবার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বোদলেয়ার প্রথমে প্যারি ছাড়তে রাজি না হলেও পরে ১৮৪১ সালের ৯ জুন তিনি ‘দক্ষিণ আকাশ’ নামে এক জাহাজে চড়ে সমুদ্র পথে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু সাগর পথে ঝড়ে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্থ হলে আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপ মরিশাসে তা নোঙর করে। জাহাজের অন্যসব সহযাত্রীদের বোদলেয়ারের পছন্দ না হলেও মরিশাসের লোকজনদের তাঁর ভালোলাগে। সেখানে সাহিত্যপ্রেমী কিছু তরুণের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি যে বাড়িতে উঠেন সে বাড়িরওয়ালার স্ত্রীর প্রেমে পরে যান। এ ভ্রমণ তাঁকে যেমনি আনন্দ দিয়েছে, পাশাপাশি স্বদেশ সম্পর্কে তাঁর মধ্যে নতুনতর এক ধারণা ও চৈতন্যবোধ তৈরী করেছে। তিনি ফ্রান্সে ফিরে আসার জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠেন। এ ভ্রমণের বহু বিচিত্র ও ভালো অভিজ্ঞতার কথা তিনি পরবর্তীতে উল্লেখ করেছেন। হাতীর পিঠে চড়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে আলোড়িত করেছে। এ ভ্রমণ নিয়ে তিনি তাঁর বন্ধুদের কাছে বিভিন্ন সময় গর্ব করতেন এবং L’ Invitation au Voyage (পূর্ব জীবন), খ’ ওহারঃধঃরড়হ ধঁ ঠড়ুধমব (ভ্রমণে আমন্ত্রণ), A une Dame creole (একজন ক্রিওল রমণীর কাছে) সহ কিছু কবিতায় তিনি তা উল্লেখ করেছেন।
বোদলেয়ার বিশ্বাস করেন যে, বস্তুর অস্তিত্ব আছে। কারণ তা আমাদের মননে প্রোথিত। তিনি মনে করেন যে, পৃথিবীর সব কিছুই বস্তুত বর্ণমালার চিত্রলিপি- আর শিল্পীর কাজ তার রহস্য উদ্ঘাটন করা। একমাত্র কবিরাই রহস্য উদ্ঘাটনে সক্ষম। বস্তুর সৌন্দর্যের সার্থকতা নেই, যদিনা কবি সেই সৌন্দর্যকে তাঁর সৃষ্টিতে ধরতে সক্ষম হন। সৌন্দর্য হচ্ছে আগুনের শিখা, শক্তির লাভা। তিনি মনে করেন, প্রকৃত কবি তিনিই, যাঁর কবিতায় আধ্যাত্মিক ভাবনার উত্তরোত্তর পরিণতি এবং নির্মাণ কৌশলে তার সুস্পষ্ট ছাপ রাখতে সমর্থ হবেন। বোদলেয়ারের এই ভাবনাই পরবর্তী শতাব্দীর ফরাসি কবিতাকে পুরোপুরি বদলে দেয়।
১৮৪২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বোদলেয়ার ভ্রমণ শেষে ফ্রান্সে ফিরে আসেন। এর পরবর্তী দু’বছর বোদলেয়ারের জীবনে নানাভাবে গুরত্বপূর্ণ। এ-সময়েই তাঁর সাথে পরিচয় হয় জান দ্যুভালের (১৮২০-১৮৬২/৭০)। পরবর্তী সময়ে দ্যুভাল বোদলেয়ারের জীবনকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছেন। ‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’র অধিকাংশ কবিতা তিনি এই সময়টিতেই রচনা করেন। এ-বছর তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তেওদর দ্য বাঁভিল’ (Theodore de Banville) প্রকাশিত হয়, এবং এ বছরই এপ্রিল মাসে তিনি আইনত ভাবে সাবালক হয়ে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। এ সময় তাঁর জীবনযাপনে ব্যপক পরিবর্তন আসে। তিনি ধনাঢ্য ব্যক্তির জৌলুসে-জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর সস্তা লাতিন কোয়ার্টার ছেড়ে উঠে আসেন অভিজাতদের হোটেল ‘পিমদাঁ’য়। তিনি গাঁজা, আফিম সহ বিচিত্র ধরণের মদের নেশায় মেতে উঠেন। ঘরের মেঝেতে বিছান দামি গালিচা, ঘর সাজান প্রাচীন কবিদের সোনা-বাঁধানো মূল্যবান দ্রব্য-সামগ্রী দিয়ে, তিনি কেনেন বহু নামী শিল্পীদের চিত্র ও শিল্পকর্ম। চিত্র ও অন্যান্য শিল্পদ্রব্যের সমাহারে ভরে ওঠে বোদলেয়ারের বাসগৃহ। তিনি বিভিন্ন পরিচিত বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে ধার করে কেনেন বহু চিত্র ও শিল্পকর্ম। এ-সবের জন্য জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁকে ঋণের বোঝা টানতে হয়েছে। অবশ্য বোদলেয়ার নিজেই তাঁর এ নির্মম পরিণতিকে সাদরে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ধারণা ছিল এরকম- ‘অদৃশ্যকে দেখতে হবে, অশ্রুতকে শুনতে হবে, ইন্দ্রিয়সমূহের বিপুল ও সচেতন বিপর্যয়ের মধ্যদিয়ে পৌঁছাতে হবে অজানায়, জানতে হবে প্রেমের, দুঃখের, উন্মাদনার সব প্রকরণ; খুঁজতে হবে নিজেকে, সব-গরল আত্মসাৎ করে নিতে হবে, পেতে হবে নির্মম যন্ত্রণা, অলৌকিক শক্তি, হতে হবে মহারোগী, মহাদুর্জন, পরম-নারকীয়, জ্ঞানীর-শ্রেষ্ঠ। আর এভাবেই অজ্ঞেয় জগতে পৌঁছাতে হবে।’
কিন্তু পুত্রের এ উচ্ছৃঙ্খল ও অমিতব্যয়ী জীবন-যাপন দেখে মা ক্যারোলিন খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন। ছেলে যাতে সব টাকা-পয়সা উড়িয়ে নিঃস্ব হয়ে না পরেন তার জন্য তিনি অভিজ্ঞ আইনজীবী আঁসেলকে ছেলে বোদলেয়ারের আর্থিক ব্যস্থাপনার জন্য আইন সম্মত অভিভাবক হিসেবে নিযুক্ত করেন। ছেলে যেন মূলধনে হাত দিতে না পারেন তিনি তার ব্যবস্থা করেন। এর ফলে বোদলেয়ার প্রতিমাসে শুধু মূলধনের সুদটুকুই পেতে থাকলেন। কিন্তু বোদলেয়ার এ ব্যবস্থা কিছুতেই মানতে পারছিলেন না। বোদলেয়ারের জীবন আবার কঠোর দারিদ্র্যের মুখোমুখি হলো। হোটেল পিমদাঁর বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে পরের বছর বোদলেয়ার একটি সাধারণ বাড়িতে উঠে আসেন। লেখালেখি তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি চিত্রকলা নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৪০ সালে ইউজেন দেলাক্রোয়ার এক প্রদর্শনী দেখার পর চিত্রকলার প্রতি তাঁর আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। চিত্রপ্রদর্শনী নিয়ে তিনি সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখেন। প্রকাশিত হয় তাঁর কবিতা। লেখালেখির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু দ্রুতই হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি মা ক্যারোলিনকে অর্থ প্রদানের এ ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য বার বার অনুরোধ জানান। কিন্তু ক্যারোলিন কোনভাবেই তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে সম্মত হন না। এর জন্য মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বোদলেয়ার মায়ের প্রতি ছিলেন বিক্ষুব্ধ।
১৮৪৫-৪৬ সালে প্রকাশিত হয় বোদলেয়ারের নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থ ‘সালোন ডি’ (Salon de)। গ্রন্থটি। পরে প্রথম উপন্যাস (La Fanfarlo) প্রকাশিত হয় ১৮৪৭ সালে। যেখানে তিনি একজন আধুনিক চিত্রশিল্পীর আত্মপ্রতিকৃতি তুলে ধরেন। পরের বছর প্রকাশিত হয় এডগার এলেন পো’র গল্প ‘মেসমেরীয় উন্মীলনে’র অনুবাদ। এইটি তাঁর প্রথম পো’র অনুবাদ। নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে বোদলেয়ারের জীবনকে এ্যালান পো গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছেন। সাহিত্য নিয়ে তিনি যখন চরম হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই পো-র রচনায় তিনি নতুনভাবে অনুপ্রাণিত হন। ১৮৫৬ ও ১৮৫৭ সালে দু’খণ্ডে এ্যলেন পো’র গল্প ও প্রবন্ধের অনুবাদ প্রকাশ করেন বোদলেয়ার। পরে ১৮৫৮, ’৬৩ ও ’৬৫ সালে আরও তিন খণ্ডে এ্যলেন পো’র অনুবাদ প্রকাশিত হয়। বোদলেয়ার লিখেছেন, ‘আমি এমন একজন আমেরিকান লেখককে আবিষ্কার করেছি, যিনি আমার সহানুভূতিশীল আগ্রহকে অবিশ্বাস্য ডিগ্রীতে জাগিয়ে তুলেছেন।’ এ অনুবাদ সম্পর্কে বোদলেয়ারের বন্ধু লেখক আরমান্ড ফ্রেইস (১৮৩০-১৮৭৭) লিখেছেন, ‘অনুবাদগুলো এমনি উৎকৃষ্ট তা যেন পো এর মূল রচনা পাঠের মতো।’ এ্যলেন পো’র এই পাঁচ খণ্ডের অনুবাদ বোদলেয়ারকে অন্যতম এক উচ্চতায় নিয়ে যায়।
১৮৪৫ সালের দিকে প্যারিসে কিছু তরুণ শিল্পী লেখক প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁরা ‘বোহিমীয় দল’ হিসেবে পরিচিত হলেন। এঁদের নেতৃত্বে ছিলেন চিত্র শিল্পী গুস্তাভ কোর্বে (১৮১৯-১৮৭৭)। কোর্বের বাবা কৃষক। এ দলভুক্ত প্রায় সবাই কৃষক ও শ্রমিকের সন্তান। বোদলেয়ার এ দলে গিয়ে যুক্ত হলেন। তিনি প্রথম বারের মতো হত দরিদ্রের জীবন যাপনকে প্রত্যক্ষ করলেন। ১৯৪৮ সালে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজা লুই ফিলিপকে ক্ষমতাচ্যূত করে ফ্রান্সে দ্বিতীয় ফেব্রুয়ারির-বিপ্লব শুরু হলে কোর্বে সহ বোহেমীয় দলের সকলেই সে বিপ্লবের সাথে যুক্ত হন। তাঁদের সাথে বোদলেয়ারও সে বিপ্লবের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। অবশ্য জীবনে এই একবারই বোদলেয়ার বিপ্লবের নেশায় মেতে নিজেকে রাজনীতিতে জড়িয়ে ছিলেন। ১৮৪৯ সালে আবার পত্রিকা প্রকাশের দায়িত্ব নিয়ে বোদলেয়ার এক বছরের জন্য প্যারি ছেড়ে দিজঁ শহরে চলে যান। বছর শেষে আবার প্যারিতে ফিরে জান দ্যুভালের সঙ্গে একই বাসায় থাকতে শুরু করেন।
এমানুয়েল সোয়েডেনবর্গ (১৬৮৮-১৭৭২) ও জোসেফ দ্য মেস্তর (১৭৫৩-১৮২১) বোদলেয়ারের জীবনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছেন। সোয়েডেনবর্গ জীবনের দীর্ঘ সময় বিজ্ঞান নিয়ে কাটিয়ে পরবর্তীকালে একটি নতুন ধর্মতত্ত্ব প্রবর্তন করেন, আর দ্য মেস্তর ছিলেন দার্শনিক ও কূটনীতিক। তাঁদের বিপুল প্রভাব এসে পড়ে বোদলেয়ারের জীবনে। বোদলেয়ার তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ‘জোসেফ মেস্তর ও পো আমাকে চিন্তা করতে শিখিয়েছেন।’ এরই মধ্যে বালজাকের (১৭৯৯-১৮৫০) মিস্টিক উপন্যাসের সাথে পরিচয় হয় তাঁর। এক ধরণের অলৌকিকতায় সম্মোহিত হয়ে রচনা করেন ‘প্রতিসাম্য’ ও ‘পুনর্জন্ম’ শীর্ষক কবিতা।
বহু উত্থান-পতন আর সংঘাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় বোদলেয়ারের জীবন। বহু নারীর সংসর্গ ঘটেছে তাঁর জীবনে। কখনো অনাবিল আনন্দ, আবার এরই উল্টোপিঠে দুঃখের বিভিষিকা, যন্ত্রণা-আতঙ্ক। ‘সে রাতে ছিলাম’ কবিতায় তিনি লিখেছেনÑ
সে- রাতে ছিলাম কদাকার ইহুদিনীর পাশে,
পাশাপাশি দুটো মৃতদেহ যেন এ ওকে টানে ;
ব্যর্থ বাসনা ; পণ্য দেহের সন্নিধানে
সে-বিষাদময়ী রূপসী আমার স্বপ্নেভাসে।
মনে পড়ে গেলো সহজাত রাজভঙ্গি তার,
দৃপ্ত লরিতে সে-কটাক্ষের সরঞ্জাম,
গন্ধমদির মুকুটের মতো অলকদাম-
যার স্মৃতি আনে প্রণয়ের পুনরঙ্গীকার।
ও- বরতনুতে চুম্বনরাশি দিতাম ঢেলে,
শীতল পা থেকে কালো চুল পর্যন্ত
ছড়িয়ে গভীর সোহাগের মণিরত্ন,-
বিনা চেষ্টায় যদি এক ফোটা অশ্রু ফেলে
কোনো সন্ধ্যায় – নিষ্ঠুরতমা হে রূপবতী ! –
ম্লান করে দিতে ঠান্ডা চোখের তীব্র জ্যোতি ।
(One nuit- সে রাতে ছিলাম, অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)
বোদলেয়ারের ঋণগ্রস্থ জীবনের নানা আখ্যান দুঃখে, দ্বন্দ্বে জর্জরিত, বিচিত্র। বহু বছরের প্রেমিকা জান দ্যুভালের প্রতি এক সময় সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। প্যারিসে তখন ‘কনককেশিনী সুন্দরী’ নামে এক থিয়েটারের সোনালি চুল ও সবুজ চোখের উনিশ বছরের সুন্দরী নায়িকা ম্যারি দোব্র্যাঁর (১৮২৮-১৯০১) প্রেমে পড়েন। কিন্তু প্রেম নিবেদন করলে তিনি প্রত্যাখ্যাত হন। কারণ দোব্র্যাঁ ভালোবাসতেন অন্য একজনকে, পরে প্রত্যাখ্যাত বোদলেয়ার প্রেমের আশ্রয় খুঁজলেন সুন্দরী মডেল মাদাম সাবাতিয়ের (১৮২২-১৮৯০) কাছে। হোটেল পিমদাঁয় থাকাকালে সাবাতিয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল বোদলেয়ারের। বোদলেয়ারের কাছে সাবাতিয়ে ছিলেন স্বর্গীয়-অপ্সরী। তিনি তাঁর নাম দিলেন ‘শুভ্রভেনাস’। কিন্তু সুন্দরী সাবাতিয়ে প্রতি রোববার তাঁর নিজগৃহে প্যারির নামী শিল্পী-সাহিত্যিকদের নিয়ে আসর বসাতেন। বোদলেয়ার নিজেও সে আসরে নিয়মিত যোগ দিতে থাকেন। এই সাবাতিয়েকে নিয়ে দু’বছর ধরে বোদলেয়ার বহু কবিতা রচনা করেন। আর সে কবিতা তিনি সাবাতিয়ের ঠিকানায় বেনামে পাঠিয়ে দিতেন। ১৮৫৪ সালের মে মাসে বোদলেয়ার তাঁর শুভ্রভেনাসকে শেষ কবিতা পাঠান। বোদলেয়ারের সে কবিতা ভালোবাসায় উন্মুখ, প্রচণ্ড আবেগে কম্পমান, শ্রান্ত, উদ্বেলিত ভালোবাসার এক ঐকতান।
।।৩।।
১৮৫৫ সালে বোদলেয়ারের আঠারোটি কবিতা একসথে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ‘ল্য ফ্ল্যর দু মাল’ নামটি এই কবিতাগুচ্ছেই প্রথম ব্যবহার করা হয়। এর দুই বছর পর ১৮৫৭ সালে একশটি বাছাইকৃত কবিতা নিয়ে ‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রথমেই এক হাজার কপি প্রকাশ করা হয়। দাম রাখা হয় দুই ফ্রাঁ। বোদলেয়ার গ্রন্থটি উৎসর্গ করেন কবি, নাট্যকার, উপন্যাসিক ও শিল্পসমালোচক তেফোয়েল গোতিয়েকে (১৮১১-১৮৭২)। উৎসর্গপত্রে লিখলেন, ‘ফরাসি সাহিত্যের পরম জাদুকর আমার অতি প্রিয়, অতি শ্রদ্ধেয় গুরু ও বন্ধু তেফোয়েল গোতিয়েকে গভীরতম বিনয়ের অনুভূতিসহ এই ক্লেদাক্ত পুষ্পগুচ্ছ উৎসর্গ করলাম।’ ‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’ তাঁর পনের বছরের কাব্য-সাধনার ফসল। তাঁর কবিতার বিষয় হল বিতৃষ্ণা, বিষাদ। বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়, ‘নির্বেদ, কামনা-বাসনা, ইন্দ্রিয়বিলাস, পতিতের জীবন, মদ ও মৃত্যু।’ এতে তিনি সমাজের প্রচলিত চেহারার মুখোশটি খুলে ফেললেন। এর আগে কেউই এমনিভাবে ধর্মযাজকের ক্লেদাক্ত-নগ্নতা, অনাবৃত ভয়ঙ্কর চেহারা, সমাজের ভস্মাচ্ছাদিত প্রচণ্ড-অগ্ন্যুৎপাত ও যৌনতাকে কবিতায় দেখেনি। পদ্মফুলের চেয়ে তিনি কাদাকেই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেন।
‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’ প্রকাশের পর প্রচণ্ড আলোচনা-সমালোচনার কবলে পড়েন তিনি। এইটি যেমনি তাঁকে নিন্দিত করেছে আবার তিনি সবিশেষ নন্দিতও হয়েছেন। অশ্লীলতা ও ব্লাসফেমির অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। আদালত তাঁকে তিন’শ ফ্রাঁ ও এ গ্রন্থের প্রকাশক পুলে মালাসিকে (১৮২৫-১৮৭৮) দু’শ ফ্রাঁ জরিমানা করেন। একই সাথে গ্রন্থের ছয়টি কবিতা এক’শ বছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে আদালতের এ রায়ে বোদলেয়ারের পাঠকপ্রিয়তা বহু বেড়ে যায়, গ্রন্থটির প্রচার ও বিক্রি বেড়ে যায়। এর কিছু দিন আগেই গুস্তাভ ফ্লোবেয়ারের (১৮২১-১৮৮০) উপন্যাস ‘মাদাম বোভারি’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল ফ্রান্স-আদালত। ফ্লোবেয়ার এবার বোদলেয়ারকে অভিনন্দন জানিয়ে এক বাণী পাঠালেন। আবার উপন্যাসিক ও গল্পকার বার্বে দোর্ভি (১৮০৮-১৮৯৮) বললেন, ‘এই লেখকের কাছে দু’টি মাত্র পথ খোলা আছে: আত্মহত্যা, অথবা ধর্মীয় জীবন।’ বোদলেয়ার লিখেছেন
প্রিয়তমা, সুন্দরীতমারে,
যে আমার উজ্জ্বল উদ্ধার
অমৃতের দিব্য প্রতিমারে,
অমৃতেরে করি নমস্কার।
বাতাসে সত্ত্বার লবণে
বাঁচায় সে জীবন আমার,
তৃপ্তিহীন আত্মার গহনে
গন্ধ ঢালে চিরন্তন।
(Hymne- – স্তোত্র, অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)
এবং-
ইউ গাছের কালো ছায়ার খাপে
কোন বিদেশের দেবতা, প্যাঁচার দল,
ঘুরিয়ে লাল চক্ষু অবিরল
ফুলকি ছড়ায়। তারা কেবল ভাবে।
নিথর তারা অসাড় হয়ে কাটায়,
যতক্ষণে বিষণ্ন সেই যাম
হারিয়ে দিয়ে রবির সংগ্রাম
অন্ধকারের রাজত্ব না রটায়।
জ্ঞানীর চোখ, তা দেখে যায় খুলে,
হাতের কাছে যা আছে নেয় তুলে,
থামায় গতি, অবুঝ আন্দোলন;
হায় মানুষ, ছায়ার মোহে পাগল,
শাস্তি তার এ-ই তো চিরন্তনÑ
কেবল চায় বদল, বাসা-বদল!
(Les Hibux- প্যাঁচারা, অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)
বুদ্ধদেব বসু ‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’ এর প্রকাশ কালকে আধুনিক কবিতার জন্মক্ষণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘উনিশ শতকের প্রথমাংশে রোমান্টিকতার চেহারা ছিল বন্যার মতো; যেমন তা অনেক বাঁধ ভেঙে দিয়েছিল তেমনি টেনে তুলেছিল বহু আবর্জনা; মুছে দিয়েছিল উৎসাহের প্রথম নেশায় অনেক প্রয়োজনীয় ভেদজ্ঞান, যাকে ভেরলেন বলেছিলেন ‘নেহাৎ সাহিত্য’, তার সঙ্গে কবিতার পার্থক্যটিকে স্পষ্ট হতে দেয়নি। বাকি ছিল বোদলেয়ারের জন্য এই কাজ- রোমান্টিকতার পরিশোধন ও পরিশীলন; তার সব অবান্তরতা বর্জন করে কবিতাকেই সর্বস্ব করে তুললেন- তিনিই প্রথম। রোমান্টিকদের কবিতা ছিল কবিতামণ্ডিত রচনা, যার কোন কোন পঙ্ক্তি বা অংশ কবিতা হলেও অনেক অংশই কবিতা নয়; কিন্তু বোদলেয়ার কবিতা বলতে বুঝলেন এমন রচনা যার মধ্যে কবিতা ছাড়া কিছুই নেই, যার প্রতিটি পঙ্ক্তি ও শব্দ, মিল ও অনুপ্রাস রসের দ্বারা সমগ্র সুপক্ক ফলটির মধ্যে কবিতার দ্বারা আক্রান্ত। তাই যা কিছু কবিতা নয় তা থেকে কবিতার মুক্তির প্রথম দলিল ‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’ আধুনিক কবিতার জন্মক্ষণ ১৮৫৭।’
১৮৫৭ সালটি বোদলেয়ারের জীবনে বিভিন্ন দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। এ বছরই তাঁর সৎবাবা জ্যাক অপিক মৃত্যুবরণ করেন। এ সময়টিতে তিনি তাঁর কবিতায় বাঁক বদলান। তিনি গদ্যকবিতা লেখা শুরু করেন। সমাজের কঠোরতম গদ্যময় বাস্তবতা উঠে আসে তাঁর এ সময়ের কবিতায়। সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) যেমনি কবিতাকে ছুটি দিয়ে কবিতাকে আশ্রয় করেই গদ্যের সাথে আলিঙ্গন করেছেন, ‘এবার কঠিন কঠোর গদ্যে আনো,/ পদ-লালিত্য, ঝঙ্কার মুছে যাক/ গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!/ প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতায় কবিতা তোমায় দিলাম আজিকে ছুটি’- বোদলেয়ার এর শতবছর আগে এভাবেই কবিতার কাঠামো থেকে বেরোবার আহ্বান জানিয়েছেন কবিতারই আশ্রয়ে। তাঁর কবিতার বিষয় হয়ে ওঠে প্রাসাদ থেকে শুরু করে ফুটপাত, বৈভব থেকে বৈধব্য, প্রেম-অপ্রেম, যন্ত্রণা, পাপ, মৃত্যু সব। তাঁর ভাষা বদলে যায়, ছন্দ-মাত্রা, মিল-অমিল বদলে যায়। বোদলেয়ার এবার তাঁর কবিতায় গাইলেন কবির শ্রেষ্ঠত্বের গান, ‘সকলে জানবে না, জানতে পারবে না বা চাইবে না; কিন্তু কবিরা জানুক। কবিরাই ঈশ্বর। পঙ্কে তাঁরাই ফোটাতে জানেন পদ্ম। জীবনের পঙ্কিলতার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে সুন্দর।’ কিন্তু ১৮৬৭ সালের ৩১ আগস্ট বোদলেয়ার যে দিন মারা যান, সেই দিনই তাঁর এ গদ্যকবিতাগুলো ‘প্যারিস স্বপ্লীন’ (Le Spleen de Paris)) নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। তিনি ‘প্যারিস স্বপ্লীন’ উৎসর্গ করেন তাঁর বন্ধু কবি ও কথা-সাহিত্যিক আর্সেন উসেকে (১৮১৮-১৮৯৬)। এটিকেই বিশ্বের সর্বপ্রথম সাবঅলটার্ন বিষয়ক কাব্যগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি বললেন, মানুষই সবচেয়ে রহস্যময়, দুজ্ঞেয়। ‘প্যারিস স্বপ্লীন’ এর প্রথম কবিতা ‘অচেনা মানুষ’এ তিনি লিখেছেন-
বলো আমাকে, রহস্যময় মানুষ, কাকে তুমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো;
তোমার পিতা, মাতা, ভ্রাতা, অথবা ভগ্নিকে?
পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভগ্নি- কিছুই নেই আমার।
তোমার বন্ধুরা?
ওই শব্দের অর্থ আমি কখনো জানিনি।
তোমার দেশ?
জানি না কোন দ্রাঘিমায় তার অবস্থান।
সৌন্দর্য?
পারতাম বটে তাকে ভালবাসতেÑ দেবী তিনি, অমর।
কাঞ্চন?
ঘৃণা করি কাঞ্চন, যেমন তোমরা ঘৃণা করো ভগবানকে।
বলো তবে, অদ্ভুত অচেনা মানুষ, কী ভালোবাসো তুমি?
আমি ভালোবাসি মেঘ- চলিষ্ণু মেঘ- অই উঁচুতে-
আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল!
(ঝঢ়ষববহ- প্যারিস স্বপ্লীন, অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)
রোমান্টিক স্বর্গে বিশ্বাস নিয়েও বোদলেয়ার বাস করতে চেয়েছেন নরকে। পাপ ও নরকের ভেতর তিনি খুঁজেছেন সৌন্দর্য। বাতিঘর বানাতে চেয়েছেন নরককে। পাপ ও দুঃখকে আঁকড়ে ধরেছেন। ফরাসি কবি পল ভের্লেন (১৮৪৪-১৮৯৬) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, যথার্থ মহাকবি। ‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’ পড়ে পল ভের্লেন বলেছেন, ‘অলৌকিক শুদ্ধতাসম্পন্ন’, আর নোবেল জয়ী আঁদ্রে জিদ (১৮৬৯-১৯৫১) বলেছেন, ‘যে জীবন এক অভূতপূর্ব শুদ্ধতা আর পবিত্রতায় ঢেকে গিয়েছিল, তার প্রথম মন্ত্রোচ্চারণ শুরু হয়ে গেছে।’
১৮৬১ সালে নিষিদ্ধ ছয়টি কবিতা বাদ দিয়ে, নতুন পঁয়ত্রিশটি কবিতা সহ ১২৯ টি কবিতা নিয়ে ‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। কিন্তু দ্বিতীয় সংস্করণ আর্থিকভাবে কোন সফলতা আনতে পারে না। ১৮৬২ সালের শুরুতে মাদাম দ্যজয়ে নামে এক জাপানি নারী প্যারিতে শিল্পদ্রব্যের একটি দোকান করেন। চিত্রশিল্পী অ্যাদুয়ার মানে (১৮৩২-১৮৮৪) সহ প্যারির বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সেখানে আড্ডা দিতে আসেন। বোদলেয়ারও সেইসঙ্গে সে আড্ডায় যোগদিতেন। মানের সঙ্গে বোদলেয়ারের গভীর বন্ধুত্ব ছিল। তিনি মানেকে প্রশংসা করে দুটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। মানের আঁকা ‘ললা দ্যু ভাসেঁল’ দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি একটি সনেট রচনা করেন। আর এই সময়টিতেই মানে বোদলেয়ার এবং জান দ্যুভালের প্রতিকৃতি আঁকেন।
‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’র দ্বিতীয় সংস্করণ নিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে এর প্রকাশক পুলে মালাসি ১৮৬২ সালের শুরুতেই দেনার দায়ে কারারুদ্ধ হন এবং দেউলিয়া হয়ে পড়েন। পাওনাদারদের চাপে একসময় পুলে মালাসি বেলজিয়াম পালিয়ে যান। বোদলেয়ার নিজেও এই পুলে মালাসির কাছ থেকে পাঁচ হাজার ফ্রাঁ ঋণ নিয়েছিলেন। ফলে এতে পুলে মালাসির চলে যাওয়ায় বোদলেয়ার চিন্তিত হয়ে পড়েন। ১৮৬৩ সালে তিনি মাকে লিখলেন, ‘বন্ধুতা আর বিলাসিতার অভাবে দুঃসহ কষ্ট ভোগ করছি।’ প্রকাশকের ঋণ কিছুটা পরিশোধের জন্য বোদলেয়ার কিছু অর্থ সংগ্রহ করে ১৮৬৪ সালে বেলজিয়াম চলে যান। বোদলেয়ারের ইচ্ছে ছিল তিনি রাজধানী ব্রাসেলসে বক্তৃতা করে অর্থ উপার্জন করবেন এবং সেখানকার প্রকাশকদের সাথে চুক্তি করে নিজের লেখা গ্রন্থ প্রকাশ করবেন। তখন ফ্রান্সের দ্বিতীয় সম্রাটের অত্যাচারের কারণে ফ্রান্সের বহু লেখক ব্রাসেলসে নির্বাসিত ছিলেন। ফলে ব্রাসেলসের সাহিত্যাঙ্গন তখন বেশ রমরমা। কিন্তু বোদলেয়ারের সে ইচ্ছে সফল হলো না। তাঁর বক্তৃতা ব্রাসেলসে তেমন সাড়া জাগাতে পারল না। অন্যদিকে সেখানকার প্রকাশকরাও তাঁর লেখা প্রকাশে তেমন আগ্রহ দেখালেন না। সেখানে তিনি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং বাকশক্তি হাড়াতে থাকেন। কিছুটা সুস্থ হলে ১৮৬৫ সালের জুলাই মাসে প্যারিসে ফিরে আসেন। কিন্তু তিনি আর সুস্থ হতে পারেন নি।
মা ক্যারোলিন ছেলের দুরাবস্থা দেখে চিন্তিত হয়ে পরেন। কিছু অর্থ দেন। বোদলেয়ার আবার ফিরে যান ব্রাসেলসে। উদ্দেশ্য প্রকাশকদের কাছ থেকে কিছু অর্থ নেয়া, কিন্তু সেখানে কোনও সাড়া পেলেন না। অবস্থা এমন হলো যে চুল ছাঁটার বা জুতা পলিশ করারও অর্থ নেই। এভাবে বছর কেটে গেল। মাকে চিঠিতে লিখলেন, ‘এক সময় আমার উদ্যম ছিল, বাচন ছিল স্বাধীন। কখনো যদি সে-অবস্থা ফিরিয়ে আনতে পারি, তাহ’লে এমন সব রচনায় আমার বোধের পরিতৃপ্তি ঘটাবো যা পাঠকের মনে ভক্তি ও ত্রাস জাগাবে। আমার ইচ্ছে, সমগ্র মানবজাতিকে আমার বৈরী ক’রে তুলি।’ বেলজিয়াম থেকে নতুন কবিতার সাথে ফ্রান্সে নিষিদ্ধ ছয়টি কবিতা যুক্ত করে প্রকাশ করেন কাব্যগ্রন্থ ‘বেওয়ারিশ মাল’ (Les Epares)। ১৮৬৭ সালের শুরুতেই প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। মাকে চিঠিতে লিখলেন, ‘ডাক্তার “হিস্টিরিয়া” শব্দটি উচ্চারণ করলেন। তার মানে : আমি হাল ছাড়লাম।’ বন্ধুরা চাঁদা তুলে ট্রেনের কামরা রিজার্ভ করে তাঁকে প্যারিসে পাঠিয়ে দিলেন। পুরোনো বন্ধুরা স্টেশন থেকে তাঁকে একটা নার্সিংহোমে নিয়ে গেলেন। সেখানে তাঁর বই আনা হলো, দেয়ালে ছবি টাঙানো হলো। তাঁর বন্ধুরা শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তরে অর্থ সাহায্যের জন্য আবেদন করলেন। মন্ত্রীর দপ্তর থেকে ৫০০ ফ্রাঁ মঞ্জুর হলো। মে মাসে অবস্থা এমন হলো যে, বোদলেয়ার আয়নায় নিজেকে চিনতে পারেন না। অপরিচিত ভেবে সালাম দিতেন। নিজের নাম মনে করতে পারেন না। শুভ্র হাত দু’টি কোলে নিয়ে সারাক্ষণ বসে থাকেন। মা ক্যারোলিন নার্সিংহোমে আসেন। কিন্তু তখন তিনি সংজ্ঞাহীন। ৩১ আগস্ট সকালে মায়ের কোলে মাথা রেখে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
।।৪।।
লেখক ও শিল্প-সমালোচক হিসেবে বোদলেয়ারের খ্যাতি সত্ত্বেও তাঁর আর্থিক অবস্থা এতটাই দুর্দশাগ্রস্থ ছিল যে, অধিকাংশ সময় তিনি থাকতেন অসুস্থ, ক্ষুধার্ত, পীড়িত। বাবা-মায়ের প্রচুর অর্থসম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও চরম দারিদ্র্যে, নিগ্রহে, দুঃসহ-কষ্টে বোদলেয়ারের মৃত্যু হয়। অজানা অনন্তে পৌঁছানোর জন্য দৈহিক বন্ধন থেকে মুক্তির জন্য বোদলেয়ারের প্রার্থনা ছিল- ‘ঈশ্বর, দাও সেই শক্তি ও সাহস, যেতে পারি দেখে নিতে আমার শরীর বিতৃষ্ণাছাড়া।’ বোদলেয়ারের জীবনীকার ফ্রেডারিক উইলিয়াম জন হেমিংসের (১৯২০-১৯৯৭) মতে, ১৮৪৭ থেকে ১৮৫৬ সালের সময়টিতে তাঁর অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, ‘তিনি ছিলেন গৃহহীন। ঠান্ডা, ক্ষুধা ও যন্ত্রণার সাথে ছিল তাঁর নিত্য সহবাস।’ তিনি দুঃখকে প্রাজ্ঞ হবার আহ্বান জানিয়েছেন-
হে আমার দুঃখ, তুমি প্রাজ্ঞ হও, স্থৈর্য নাও শিখে।
চেয়েছিলে সন্ধ্যারে; আসন্ন সে যে, এই তো আগতঃ
ধুমল মণ্ডল এক নগরীকে ক্রমে দেয় ঢেকে,
শান্ত কারো মন, আর অন্য কেউ দুশ্চিন্তায় নত।
এখনই ছুটুক ওরা- ক্ষমাহীন জল্লাদ,প্রমোদ,
চালায় চাবুক মেরে যে-কুৎসিত, ক্লিন্ন জনগণে,
ফুর্তির গোলামি ক’রে অনুতাপে তার প্রতিশোধ
দিক তারা ;- দুঃখ,এসো,হাত রাখো হাতে। চলো দুইজনে
যাই বহুদূরে। চেয়ে দ্যাখো, আকাশের বারান্দায়
নিঃশেষ বৎসর সব ঝুঁকে আছে প্রাচীন সজ্জায়;
দন্তময় মনস্তাপ জল থেকে ধীরে তোলে মাথা;
এদিকে মুমূর্ষু সূর্য শয্যা নেয় মেঘের তোরণে;
আর, যেন পূর্বাকাশে দীর্ঘায়িত শবাচ্ছাদ পাতা,
সেইমতো, শোনো প্রিয়, রাত্রি নামে মধুর চরণে।
(Recueillement:- আত্মস্থতা, অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)
‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’ এর তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকায় তিনি লিখেন, ‘কোনো কোনো বিখ্যাত কবি, বহুকাল ধরে কাব্যজগতের পুষ্পিত জায়গাগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগজোখ করে নিয়েছেন, কিন্তু আমি পাপ থেকেই নিংড়ে বেরকরে এনেছি সৌন্দর্য- তা যেমনি কৌতুহলোদ্দিপক তেমনি কঠিন ও দুর্বোদ্ধ, আর তাই তা অধিক গ্রহণযোগ্য ও সুন্দর। পরম নিষ্পাপ গ্রন্থ কোনো কাজে আসবে না কখনো। আমি এটি রচনা করেছি আর কোনো উদ্দেশ্যে নয়, শুধু নিজের বিনোদন জোগাতে, আর দুরূহের প্রতি আমার তীব্র অভিরুচির তৃপ্তির জন্য।’ তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৮৬৮ সালে, তাঁর মৃত্যুর পর। বিতৃষ্ণা আর বিষাদের বেদনা বোদলেয়ারকে ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর দিকে নিয়ে গেছে। তিনি লিখেছেন-
বেলা যায়! কবর অপেক্ষমাণ; ক্ষুধিত মরণ
তোমার জানুতে মাথা, অপসৃত ললাটের বলি
মনে আনি তপ্ত, শাদা নিদাঘের বিষণ্ন স্মরণ
এবং হলুদ, নম্্র হেমন্তের আলোর অঞ্জলি।
(Chat D Automne- হেমন্তের গান, অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)
বোদলেয়ার তরুণ বসয় থেকে এক অতিশয় পীড়াদায়ক, গ্লানিকর দুরারোগ্য সিফিলিস রোগে ভুগেছেন। তাঁর জীবন ছিল অদ্ভুত ও বিচিত্রগামী। প্রথাগত প্রচলিত পথকে তিনি সবসময়ই অপছন্দ করেছেন। রোমান্টিকতার সন্ততি হওয়া সত্ত্বেও প্রকৃতিগতভাবেই বোদলেয়ার হলেন রোমান্টিকতাবিরোধী। তিনি সব সময় ‘অন্যকিছু’র অন্বেষণ করেছেন। তাঁর এ ‘অন্যকিছু’ই ছিল রোমান্টিকতার বিরোধিতা করা, প্রচলিতর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, বরাবরের বাইরে গিয়ে অন্যপথে চলা, অন্যভাবে বলা। এইটি তাঁর স্বভাবজাত। বোদলেয়ার প্রেমিক ছিলেন কিন্তু মেয়েদের সহ্য করতে পারতেন না। তিনি আভিজাত্যের পক্ষে ছিলেন কিন্তু শাসকশ্রেণিকে সহ্য করতেন না। বোদলেয়ার জাত বিপ্লবী কিন্তু জনতার নাদ কখনোই তাঁর ভালো লাগতো না। তিনি ধার্মিক ছিলেন কিন্তু ধর্ম-জাজকদের পছন্দ করতেন না। তিনি বলেন, ‘ঈশ্বরে আমি বিশ্বাস করি, কিন্তু স্বর্গরাজ্যের ঐ রক্তাক্ত প্রবেশ মূল্য দিতে আমি রাজী নই।’ ধর্মপ্রিয়েরা বোদলেয়ারকে ঘৃণা করতেন। র্যাঁবো বলেছেন, ‘রোমান্টিকরা যা জানতেন না তা বোদলেয়ার জেনেছিলেন- যে কবি বক্তা বা প্রবক্তা নন, দ্রষ্টা। অর্থাৎ বিশ্বজগতে লুক্কায়িত সম্বন্ধসমূহের আবিষ্কারক, যে তাঁর স্বকীয় ও অনন্য দৃষ্টির কাছে একান্ত, বিনীতভাবে আত্মসমর্পণ করাই তাঁর স্বধর্ম।’ বোদলেয়ার অবহিত ছিলেন, যে যুগে তিনি বাস করছেন সেটি অবক্ষয়ের যুগ। প্রাচীন আভিজাত্যের পতন হয়েছে, নতুন সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা স্থান নিতে পারছে না। এই মধ্যবর্তী সময়ে উদ্গত হচ্ছে নানা অশুভ প্রবৃত্তি, একটা বিশাল ভবন ভেঙে পড়লে তার ইটের পাঁজায় যেমন জন্মায় অসংখ্য আগাছা। যে সময়কার অব্যবস্থিত শিল্প বিস্তার, মারমুখী বিপ্লবী হাওয়া, অনিয়ন্ত্রিত নগর পত্তন, উত্তাল জড়বাদ প্রভৃতির প্রতিক্রিয়ার গভীর জৈবনিক ও আত্মিক সঙ্কটের সূচনা হয়। বোদলেয়ার এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন, শুধু কবিতার ভেতর দিয়ে নয়, জীবনযাপনের ভেতর দিয়েও। এটা সম্ভব হয়েছিল বোদলেয়ারের বেলায়, কারণ জীবন, জগৎ ও কবিত্বর মধ্যে কোন দূরত্ব তাঁর জানা ছিল না। কবিত্বের সঙ্গে জীবনকে তিনি মিশ্রিত করে নিয়েছিলেন এবং এ ব্যাপারে যতো না ছিলেন তিনি রোমান্টিক তার চেয়েও বেশি বাস্তবিক।
বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, ‘স্বর্গে সব বৈপরীত্য অবসিত হয় বলে বোদলেয়ারের কাব্যে স্বর্গের উপস্থিতি নেই; নেই ‘গীতাঞ্জলী’র মতো ঈশ্বরের সঙ্গে মিলনের উন্মাদনা; কিন্তু তাঁর সমগ্র দেহ থেকে, মেঘের মধ্য দিয়ে বিদ্যুতের মতো, তীব্র, প্রোজ্জ্বল ও পৌনঃপুনিক, এই সত্যটি বিচ্ছুরিত হচ্ছে যে, মানুষ অমৃতকে আকাঙ্খা করে এবং সেই আকাঙ্খাই তার মনুষত্বের পরম অভিজ্ঞান। দান্তের কাব্যে কাঙ্খিত লোকে পৌঁছানো আছে; আর বোদলেয়ারে পাই অলব্ধের জন্য অসহ্য বেদনাবোধ, যা আমাদের মনে হয় আরো বেশী মানবিক ও মনস্তত্ত্বের অনুগামী। বোদলেয়ারের দুঃখ, সর্বশেষ বিচারে, অমৃতের জন্য বিরহ বেদনা ছাড়া আর কিছুই নয়- মানুষের সব দুঃখই মূলত তা-ই আর সেই জন্যই, গভীরতম আধ্যাত্মিক অর্থে, তাঁর দুঃখ মূল্যবান; শুধু প্রেম বা সৌন্দর্য নয়, তার দ্বারা প্রজ্ঞাও লভ্য। ‘হে আমার দুঃখ, তুমি প্রাজ্ঞ হও’ এই পবিত্র দীর্ঘশ্বাস শেলি অথবা বায়রনে আমরা শুনি না এবং বোদলেয়ারে শুনি বলেই বুঝতে পারি তাঁর দুঃখ সাধনা কতো সার্থক।’
টি. এস এলিয়ট বলেছেন, ‘নিগ্রহ ভোগ করার অসাধারণ শক্তি ছিল তাঁর। যন্ত্রণার প্রতি তিনি যেন চুম্বকের মতো আকর্ষিত হতেন; এবং অসাধারণ সহনশীলতা নিয়েই তিনি যন্ত্রণাকে বিশ্লেষণ করতে পারতেন।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘সমাজের চোখে এবং ব্যক্তিগত যাবতীয় ব্যাপারে বোদলেয়ার অত্যন্ত বিকৃতস্বভাব, অসামাজিকতা ও অকৃতজ্ঞতার অসাধারণ ক্ষমতা নিয়েই জন্মেছিলেন; তাঁর মেজাজ যেমন তিরিক্ষি ছিল তেমনি যে-কোন পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে নিজের পক্ষে অসহনীয় করে তোলার জেদ ছিল অদ্রভেদী।’ বোদলেয়ারের এই বিশ্ব-বিতৃষ্ণা শুধু যে কেবল বিষয়গত তা নয়, এইটি বিষয়ীগতও। কবি নিজেও অবশ্য এ দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এমন শৈশবের দিন মাঝে মাঝে ফিরে আসে যখন প্রকৃতির রঙে ও রেখায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং নানা প্রতিকূল শক্তির আঘাত-সংঘাতময় মনুষ্যলোকে দেখতে পাওয়া যায় দিগন্তের পর দিগন্তের বিস্তার, নিত্য নব মহিমায় ভাস্বর।’ বোদলেয়ার নিজেই ছিলেন তাঁর কবিতার মুখ্য বিষয়। যুগ-যন্ত্রণাকে বা বিশ্ববেদনাকে তিনি নিজের মধ্যে ধারণ করে কবিতায় রূপান্তরিত করেছেন। তাঁর কবিতায় এসেছে এক সামগ্রিকতা। তিনি ক্রোধ, ঘৃণা, কামুকতা, বীভৎসতা, মদ ও গণিকার কথা বলেছেন। যার ফলে সাধারণ পাঠকের দৃষ্টিতে হয়ে গেলেন অশ্লীল। বোদলেয়ারের কবিতাকে প্যারিসের সাধারণ পাঠক বললেন, ‘অশ্লীল এবং জটিল, অতএব বর্জনীয়’। দিন ও মুহূর্তগুলো বোদলেয়ারের মতে কবির পক্ষে শুভ ছিল না। কারণ তা মিথ্যাশ্রয়ী; কবিকে নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, বাস করতে হবে সাধারণ দৈনন্দিন জীবনের ঘন কালিমার মধ্যে।
আবু সয়ীদ আইয়ুব (১৯০৬-১৯৮২) দীর্ঘ অভিযোগ উত্থাপন করে বলেছেন, ‘বোদলেয়ারের বিরুদ্ধে আমার সবচেয়ে বড় নালিশ এই যে তিনি প্রতিভাবান কবি অথচ তাঁর আশ্চর্য প্রতিভা ক্ষয় করেছেন নিজের এবং আমাদের সকলের সর্বনাশ ঘটাতে। বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক এমন কি ধর্মপ্রচারক- এঁদের সকলের অপেক্ষা শিল্পীর ভাবনা ও বেদনা অনেক বেশি সংগ্রাম। রোমান্টিকদের বলা হয় যৌবনের কবি; বোদলেয়ার হলেন জরার কবি। বীভৎসতাকে দেখবার মতো নির্ভীক চোখ বোদলেয়ারের ছিল। কিন্তু জগতের ও জীবনের পরম বিস্ময়বোধ করবার মতো মনের সজীবতা কোন ভুয়োদর্শনের বা আপ্তবাক্যের আওতায় পড়ে হারালেন তিনি? সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ এই যে বোদলেয়ারীয় ‘আঁনুই’-এর তন্বিষ্ঠ চর্চা আমাদের যুবকদের মনকেও যৌবনের প্রারম্ভেই জরাগ্রস্ত করে দিচ্ছে।’ ‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’ এর এক কবিতায় তিনি লিখলেন-
শুষে নিলো আমার পঞ্জর থেকে সব রক্তরস
মায়াবিনী, আর আমি লালসার আহ্লাদে অবশ,
চুম্বনে উদ্যত হয়ে চেয়ে দেখি, জীর্ণ পুটুলিতে
ভরা আছে পুঁজ, ক্লেদ অনুলিপ্ত ঘৃণ্য আঁটুলিতে।
(Les Metamorphoses du Vampire- পিশাচীর রূপান্তর, অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)
বোদলেয়ার ক্লাসিক ও রোমান্টিকদের চিরাচরিত দ্বৈতকে লুপ্ত করে দিলেন। তিনিই প্রথম কবি যাঁকে আমরা উপলব্ধি করি যে ক্লাসিক ও রোমন্টিকের ধারণা দু’টি অমোঘভাবে পরস্পর বিরোধী নয়, বরং পরস্পরের জন্য তৃষিত এবং একই রচনার মধ্যে দুই ধারার সংশ্লেষ ঘটলে তবেই কবিতার তীব্রতম মুহূর্তটিকে পাওয়া যায়। এক কঠিন রূপকল্পের মধ্যে তিনি সঞ্চারিত করেছেন রোমান্টিকতার আত্মা- এক দ্বন্দ্বপীড়িত আত্মভেদী চৈতন্য। তিনি ‘ভ্রমণের আমন্ত্রণ’ শিরোনামে এক কবিতায় লিখেছেন-
দয়িতা, কন্যা, বোন,
আমার স্বপ্ন শোন,
সে দূর দেশে কি মধুর হ’তো না সবাই,
অবসর, ভালোবাসা
মরণ সর্বনাশা,
অবিকল্প তোর তনুর প্রতিচ্ছবি!
ছিন্ন মেঘের ফাঁকে-
সজল সূর্য আঁকে
আমাকে ভোলাতে, তোর চাহনীর ছায়া;
যখন অশ্রুমেশা
রহস্যময় নেশা
বিলায় চোখের প্রবঞ্চনার মায়া।
সেথা কিছু নেই, যা নয় আলোর জ্বালা
শান্তি, বিলাস, উৎসব, শৃঙ্খলা।
(L’Invitation au Voyage- ভ্রমণের আমন্ত্রণ, অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)
বোদলেয়ার পরবর্তী সময়ে ফ্রান্সতো বটেই ইয়োরোপ, আমেরিকা সহ প্রাচ্যোর বহু কবিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছেন। ফরাসি কবি পল ভ্যালেরি (১৮৭১-১৯৪৫) বলেছেন, ‘‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’ না পড়লে ভেরলেন বা মালার্মে বা র্যাঁবো কেউই এত বড় কবি হতে পারতেন না।’ বোদলেয়ার জীবন-বিরোধী কবি ছিলেন না। তাহলে তিনি আত্মপরাজয় ও হতাশায় নিঃস্ব কবিতে পরিণত হতেন, তাঁর অনুসারি ও অনুরাগীর সংখ্যা হতো নগণ্য, এভাবে সর্বজনীন সংবেদন সৃষ্টি তাঁর সম্ভব হতো না। বোদলেয়ার তাঁর ডায়েরীতে সৌন্দর্য সম্পর্কে লিখেছেন, ‘আমি নিজের ইচ্ছেমতো সৌন্দর্যের একটি সংজ্ঞা তৈরী করেছি। সৌন্দর্য প্রখর ও বিষণ্ন, অস্পষ্ট- ফলে অনুমানের উপর নির্ভর করতে হয়। সামাজিক মানুষ যে জিনিসের প্রতি খুব আগ্রহী, ধরুন একটি মেয়ে মানুষের মুখ, তেমন কোন প্রাণময় বস্তুকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আমি আমার সংজ্ঞাটা বিশ্লেষণ করতে পারি। একটি মেয়ের প্ররোচনায় সুন্দর মুখ যে কাউকে স্বপ্নালু করতে পারে। কিন্তু আনন্দ ও বিষণ্নতা মিশ্রিত বলে সে স্বপ্ন মোটেই স্বচ্ছ নয়। সে মুখ বিষণ্নতা, দুর্বলতা বা বিপরীতভাবে তৃপ্তির উদ্রেক করে। জৈবনিক আকাঙ্খা ও উত্তাপ যেমন আছে, নৈরাশ্য বা বঞ্চনার তিক্ততাও রয়েছে সেখানে তেমনি। দুর্জ্ঞেয়তা ও শোচনা দুই-ই সৌন্দর্যের শরীর ধৃত।’ উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিক থেকেই কবিতার পালাবদলের যে সূচনা হয় তার প্রাণশক্তি আহরণের জন্য বোদলেয়ার যেন অপরিহার্য হয়ে পড়েন। দেখা যায় কাব্য চর্চার নতুন সম্ভাবনাকে তিনি বহুপূর্বেই অঙ্কুরিত করে রেখে গেছেন। বিশ শতকের শুরু থেকেই মানসিক বিক্ষোভ কবিদের আলোড়িত করে তোলে।
একটি অবক্ষয়ের ভিতর বোদলেয়ারের জন্ম ও বসবাস- এর বিরুদ্ধে জীবন-আচরণে ও কবিতায় ক্ষুব্ধ বোদলেয়ার তাই অনায়াসেই বিশ শতকের ক্ষুব্ধ কবিদের অনুসরণীয় হয়ে উঠলেন। অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ বোদলেয়ার অবক্ষয়েই আকণ্ঠ নিমজ্জিত রইলের স্বইচ্ছায়, স্বজ্ঞানে। যে বুর্জোয়া মূল্যবোধকে তিনি ঘৃণা করেছেন সেগুলোকেই আবার আঁকড়ে ধরেছেন। জ্যাঁ পল সার্ত্র (১৯০৫-১৯৮০) বলেছেন, ‘বোদলেয়ার স্বেচ্ছায় নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। নিজের সম্পর্কে তাঁর দ্বৈত ভাবনা ছিল। আসলে নিজে তিনি যা তার বিপরীতটা দেখতে তাঁর ভালো লাগতো। তাঁর জীবন এই ব্যর্থতার কাহিনী মাত্র। জীবনের সত্য মানবিক দিকগুলোকে গভীরভাবে অনুভব করা সত্ত্বেও তিনি সেগুলোকে কঠোরভাবে নিজের কাছ থেকে গোপন করে রাখতে চাইতেন। আসলে বোদলেয়ার বিপ্লবী ছিলেন না, বিপ্লবাপন্ন ছিলেন মাত্র। তিনি বেছে বেছে কুপ্রবৃত্তিগুলোকে প্রশ্রয় দিতেন। তিনি আত্মবঞ্চনা করেছেন। মঙ্গলবোধকে লঙ্ঘন করার জন্যই তিনি তাকে স্বীকার করতেন এবং অমঙ্গলকে স্বীকার করে নিয়ে কেবলই তাঁর দোষের বোঝা বাড়াতেন।’ এমনি বৈপরীত্যকে তিনি সাদরে স্বাগত জানিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) মৃত্যুকে শ্যামের সাথে তুলনা করেছেন, অমৃতের সাথে তুলনা করেছেন, মৃত্যুকে স্বাগত জানিয়েছেন, আর বোদলেয়ার তাকে স্বাগত জানিয়েছেন; তবে তিনি তাকে পূত-পবিত্র শ্যাম বলে মনে করেন নি। তিনি তাকে আহ্বান জানিয়েছেন গরলের নেশায়, অগ্নিস্নানে উজ্জীবনী বিভার আকাঙ্খায়
হে মৃত্যু, সময় হলো! এই দেশ নির্বেদে বিধুর।
এসো, বাঁধি কোমর, নোঙর তুলি, হে মৃত্যু প্রাচীন!
কাণ্ডারী ,তুমি তো জানো, অন্ধকার অম্বর,সিন্ধুর
অন্তরালে রৌদ্রময় আমাদের প্রাণের পুলিন।
ঢালো সে-গরল তুমি, যাতে আছে উজ্জীবনী বিভা!
জ্বালো সে-অনল, যাতে অতলান্তে খুঁজি নিমজ্জন!
হোক স্বর্গ,অথবা নরক, তাতে এসে যায় কী-বা,
যতক্ষণ অজানার গর্ভে পাই নূতন-নূতন!
সে-রাতে ছিলাম-
সে-রাতে ছিলাম কদাকার ইহুদিনীর পাশে,
পাশাপাশি দুটো মৃতদেহ যেন এ ওকে টানে ;
ব্যর্থ বাসনা ; পণ্য দেহের সন্নিধানে
সে- বিষাদময়ী রূপসী আমার স্বপ্নে ভাসে।
মনে প’ড়ে গেলো সহজাত রাজভঙ্গি তার,
দৃপ্তললিতে সে-কটাক্ষের সরঞ্জাম,
গন্ধমদির মুকুটের মত অলকদাম-
যার স্মৃতি আনে প্রণয়ের পুনরঙ্গীকার।
ও-বরতনুতে চুম্বনরাশি দিতাম ঢেলে,
শীতল পা থেকে কাল চুল পর্যন্ত
ছড়িয়ে গভীর সোহাগের মণিরত্ন,
ডবনা চেষ্টায় যদি এক ফোঁটা অশ্রু ফেলে
কোনো সন্ধ্যায়- নিষ্ঠুরতমা হে রূপবতী!-
ম্লান ক’রে দিতে ঠাণ্ডা চোখের তীব্র জ্যোতি।
(Hymne- ৮, অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) অন্তর্গত রক্তের ভেতর এক বিপন্ন বিস্ময়কে উপলব্ধি করেছেন। নায়ক তাঁর আত্মঘাতী হয়েছেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-১৯৬০) বলেছেন, ‘মৃত্যু, কেবল মৃত্যুই ধ্রুব সখা।’ এ সব উপলব্ধি বোদলেয়ারেরই অনুররণ। গত শতকের ত্রিশের দশক থেকে বাংলা কবিতাকে বোদলেয়ার যে ভাবে প্রভাবিত করেছেন, তা বিস্ময়কর। বোদলেয়ার বলেছেন, ‘আমি যেন রাজা, যার সারা দেশ বৃষ্টিতে মলিন/ ধনবান, নষ্টশক্তি, যুবা, তবু অতীব প্রবীণ/ শিক্ষকের নমস্কার প্রত্যহ যে দূরে ঠেলে রেখে/ শিকারি কুকুর নিয়ে ক্লান্ত করে নিজেই নিজেকে।’ বোদলেয়ার অশুভ, ভয়ঙ্কর, অসুন্দর ও দুর্ভাগ্যকে আকাক্সক্ষা করেছেন। নজরুল (১৮৯৯-১৯৭৬) যেখানে জাহান্নামের আগুনে বসে পুষ্পের হাসি হাসতে চেয়েছেন, বোদলেয়ার সেখানে বীভৎস চিৎকার করতে চেয়েছেন, অগ্নির দাবানলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না হয়ে দাবানলকে আলিঙ্গন করতে চেয়েছেন। বোদলেয়ারকে শূন্যতার মাঝখানে বিচার করতে গেলে বিস্তর অভিযোগ উত্থাপিত হবে নিঃসন্দেহে, তিনি অভিযুক্ত হবেন- কিন্তু একটি মহৎ সমাজে বোদলেয়ারের বসবাস ছিল না- যেখানে সবাই সাধুসন্ত একা বোদলেয়ারই কেবল পাপমগ্ন! বোদলেয়ার ব্যর্থ হতে চেয়েছেন! কিন্তু তিনি ব্যর্থ হতে ব্যর্থ হয়েছেন। ‘ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল’ বা আরও বারোটি কালোত্তীর্ণ গ্রন্থ তাঁকে ব্যর্থতার সাধ গ্রহণে বঞ্চিত করেছে।
সহায়ক :
*The Flowers of Evil (Les Fleurs du mal) : Charls Baudelaire, Translation : Keith Waldrop, Wesleyan University Press, Connecticut, 2007
*Paris Spleen : Charls Baudelaire, Translation : Louise Varese, New Directions Publishing Corporation, Yew York, 1970
*Art and Civilization : Bernard S. Myers, Paul Hamlyn, London, 1967
*Larousse Encyclopedia of Modern art, General Editor : Rene Huyghe, Paul Hamlyn, London, 1969
*শার্ল বোদলেয়ার তাঁর কবিতা : বুদ্ধদেব বসু/ দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ
*উত্তরাধিকার, বুদ্ধদেব বসু সংখ্যা, সম্পাদক : নীলিমা ইব্রাহিম/ বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৭৪
*বোদলেয়ারের ডায়েরী, প্রবন্ধ : করুণাময় গোস্বামী/ সমকাল, সম্পাদক : হাসান হাফিজুর রহমান, ঢাকা, আষাঢ় ১৩৮৩
*বুদ্ধদেব বসুর কবিতা, প্রবন্ধ/ জ্যোতির্ময় দত্ত, কলকাতা, ১৯৭৪
*ভিঞ্চি পিকাসো হুসেন সুলতান ও অন্যান্য : রফিউর রাব্বি, অপরাজিতা পাবলিকেশন্স, নারায়ণগঞ্জ, ২০১১
*বোদলেয়ারের কবিতা, ভাষান্তর : ড. সফিউদ্দিন আহমদ, মেধা পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ২০১৪
*ফরাসী বিপ্লব : প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, ১৯৭৯
*আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ : আবু সয়ীদ আইয়ুব/ দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৭৮
*ইন্টারনেট





কমেন্ট করুনঃ