১৮৯৬ এর ২৫ জানুয়ারি, চমৎকার একটি দিন শেষে প্যারিসের বুকজুড়ে নেমে আসে কাঁচের মতো স্বচ্ছ এক সন্ধ্যা। হলভর্তি দর্শক তারা এমন এক ছবির প্রদর্শনীতে এসেছে যা স্থির নয় বরং চলমান। মাত্র মাস খানেক আগে প্যারিসের মানুষ জেনেছে এই বিস্ময়ের নাম। সত্যিকারের মতোই সেই ছবির দৃশ্য একেবারে বাস্তব। পর্দায় একটি ট্রেন দেখা যাচ্ছিল। ট্রেনটি হঠাৎ পর্দা ভেদ করে দর্শকের দিকে ধেয়ে আসে। আতঙ্কে তারস্বরে চিৎকার করে ওঠে সবাই। প্রাণের মায়ায় ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালায় অনেকে, চোখে রাজ্যের বিস্ময় আর ঘোর নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে কেউ কেউ। মানুষের সেই ঘোর বুঝি আজো কাটেনি। এ যেন ছিল এক জাদু বাস্তবতা অথবা বাস্তবতার জাদু। বলছি চলচ্চিত্র ইতিহাসের প্রথম দিককার কথা। লুমিএর ভাইদের দেখানো সেই ট্রেনে চেপে আঁকাবাঁকা রেলপথ ধরে সোয়া শ বছরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চলচ্চিত্র পৌঁছে গেছে আজকের এই ত্রিমাত্রিক দুনিয়ায়। সেই ভ্রমন কাহিনী কম বেশি সবারই জানা। আরও জানা দুটি পক্ষের দ্বন্দের ইতিহাস, একটি পক্ষেও নাম শিল্প আরেকটি পক্ষের নামও শিল্প। ঠিক বোঝানো গেলো না। এ ব্যাপারে আমাকে ইংরেজি ভাষার সাহায্য নিতে হবে। একটি হচ্ছে Industry অর্থে আরেকটি Art অর্থে। এটা খুবই দুঃখের কথা যে যোজন যোজন ফারাকে অবস্থানরত দুটো ভাবের শব্দ দেখতে- শুনতে হুবহু একই রকম! কিন্তু চলচ্চিত্রের বাস্তবতাটি আসলে এরকমই, বিশেষ করে এই বাংলায়। লুমিএরদের চলচ্চিত্রের ট্রেন বাংলায় প্রথম যে স্টেশনে এসে থেমেছিল তার নাম হীরালাল সেন। অবিভক্ত বাংলার প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা, বিশ্বের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাতা, বিশ্বের প্রথম রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রথম সংবাদভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা, প্রথম বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা এবং প্রথম স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা, পুঁজির কাছে পরাজিত প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ শিল্পী। হীরালাল সেন জীবন পাঠে আমরা দেখব তার শেষ জীবনের চরম রিক্তাবস্থা এবং অন্যদিকে তারই নির্মিত চলচ্চিত্র ভারতবর্ষ জুড়ে প্রদর্শন করে তার ভাই মতিলালসেনের বিত্তশালী হওয়ার দৃশ্য। আমরা দেখব পুঁজিপতি যে এফ মেডানের পুঁজির কাছে শিল্পী হীরালালসেনের দীর্ঘায়িত পরাজয়। একদিকে পুঁজি আর অন্যদিকে ঔপনিবেশিক আগ্রাসনে ইতিহাস হীরালালসেনকে হারিয়ে ফেলে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। শিল্পের ওপর পুঁজির আগ্রাসন কিন্তু সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। বরং তা ক্রমবর্ধমান অবস্থায় এখনো বর্তমান এবং চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি জোরালো। বিশ্বের সব জায়গায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চলচ্চিত্র নিয়ন্ত্রিত হয়েছে পুঁজির দ্বারা। নির্মাতা সেখানে তার সমস্ত দক্ষতা আর সৃজনশীলতা নিয়ে ভূমিকা পালন করেছে শ্রমিকের মতো। সামিরা মাখমালবাফ ২০০০ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে তার লিখিত বক্তব্যে বলেছিলেন ”সিনেমাকে সবসময় রাজনীতির কৃপায় চলতে হয়েছে। বিশেষ করে পূর্বে, পশ্চিমে দ্বারস্থ হতে হয়েছে পুঁজির।“ অর্থাৎ চলচ্চিত্রকে শুধু যে পুঁজিই নিয়ন্ত্রণ করে তা নয়, রাষ্ট্র ও তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এমন অবস্থায় চলচ্চিত্র কি অর্থকরী পণ্য নাকি অন্যান্য সৃজনশীল শিল্পকলার
মতোই কোনো শিল্প এমন পুরনো বাহাসের চেয়ে এটা মুক্ত কিনা বা হলেও তা কতটুকু পরিমাণে, কারা একে বন্দি করে রাখতে চায় অথবা এর মুক্তি কোন বর্গের হুমকির কারণ হতে পারে এমন আলোচনাই আজকে অধিকতর গুরূত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্বাধীনতা বা মুক্তির আকাক্সক্ষা মানুষের আদিম সহজাত প্রবৃত্তি। সেই যে আদি গল্পের প্রথম মানব, মানবী তাদের প্রভুর নিষেধ উপেক্ষা করে নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেললেন বা জ্ঞান অর্জনে প্রলুব্ধ হলেন সেখান থেকেই তো শুরু। ফলে বলা যেতে পারে জ্ঞান অর্জনের জন্যও মুক্তি আবশ্যক। মুক্ত থাকার বা মুক্ত হওয়ার জন্য মানুষের লড়াই সংগ্রাম আর বিদ্রোহের ইতিহাস বেশ পুরনো। ঔপনিবেশিকতা, দখলদারিত্ব বা আগ্রাসনের বিরূদ্ধে যেমন মানুষ লড়েছে আবার ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণের বেড়াজাল থেকেও মুক্তির পথ খুঁজেছে আবহমান কাল ধরে। ফিলিস্তিনের কবি মাহমুদ দারবিশ তার জিদারিয়াহ কাব্যে বললেনঃ
“আমি নিজেকে হাজির পেয়েছি জমজমাট গায়েবানায়।
এবং যখনি আমি আমার নিজেকে খুঁজেছি অন্য কিছু পেয়েছি আমি ।
এবং যখনি আমি তাদেরকে খুঁজেছি আমার ভিনদেশী নিজেকে ছাড়া আর কিছুই তাদের মাঝে পাইনি,
না আমি কোন অসাধারণ জনতার ঝাঁক।“
তারও অনেক আগে বাগদাদ থেকে মনশুর হাল্লাজ করেছিলেন তার সাহসী উচ্চারণ:
“সকল কিছুর হে সমগ্র, তুমি আমি ছাড়া আর কেউ নও।
তবে নিজের জন্য, নিজের কাছে কী দোষ স্বীকার করব আমি?“
আমাদের এই অঞ্চল থেকেও কি একি কথা বলেননি সহজিয়া বাউলগণ? তারা গাইলেনঃ
“ও তোর কিসের ঠাকুর ঘর?
যারে ফাটকে তুই রাখলি আটক তারে আগে খালাস কর”।
তারা হুলুল ধারণায় বা নিজেকে ঈশ্বর ধারণায় বিলীন করে দিয়ে মূলত ঈশ্বরের কর্তৃত্ব থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছেন, ঈশ্বরের ডিক্টেটরশিপকে অস্বীকার করেছেন। ভেঙে চূর্ণ করে দিয়েছেন দাস – প্রভুর সম্পর্ক।
মুক্ত চলচ্চিত্র বা স্বাধীন চলচ্চিত্রকে সংজ্ঞায়িত করতে হলে আমাদের আগে জানতে হবে স্বাধীনতা কি? যদিও স্বাধীনতার পথ বেয়েই চিন্তা ঐতিহাসিকভাবে বিকশিত হয়েছে এবং স্বয়ম্ভু স্বত্বা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কিন্তু ব্যক্তিক পর্যায়ে তার চিন্তাই মুক্তির পথে সর্বাগ্রে বাঁধা প্রাপ্ত হয়। আমরা যেহেতু স্বাধীন দেশে বসবাস করি এবং মতের অমিল হলেই এখানে কাউকে হত্যা করা যায়, পণ্যমুল্য বৃদ্ধি করে বাড়তি মুনাফা ভোগ করা যায় কিংবা কোনো রকম জবাবদিহিতা ছাড়াই ব্যাপকতর দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদশালী হওয়া যায় বা ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার্থে জাতীয় অমূল্য সম্পদ ধ্বংস করা যায়, ফলে সেটাও স্বাধীনতার একটা সংজ্ঞা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এবং যদি হয়েই যায় তবে সেটা হবে খুবই ভয়ংকরতম সংজ্ঞা। কাজেই ব্যক্তিস্বাধীনতা যেন ব্যাক্তিতান্ত্রিকতায় পর্যবসিত হয়ে না যায় সদিকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে সংগায়নেরও যেহেতু রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রবণতা রয়েছে ফলে সমাজের যে অংশটি প্রতিনিয়ত নিষ্পেশিত হচ্ছে, স্বল্প মূল্যে শ্রম বিক্রি করে চড়া দামে জীবন-ধারণের উপকরণ ক্রয় করছে বা করতে পারছে না তাদেরকেই আবার নতুন করে স্বাধীনতার সংজ্ঞায়ন করতে হবে। সেটা এমন হতে পারে যে প্রশ্ন করতে পারাটাই স্বাধীনতা! অর্থাৎ আমার শ্রমের মুল্য এত কম কেন? আবার আমারই সেই শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের মুল্য এত বেশি কেনো? সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে যে রুটিটি দিয়ে নাস্তা করে কাজে যাই সেটা নিরাপদ অর্থাৎ ভেজালমুক্ত কিনা? আবার এসব দেখভালের দায়িত্ব যার ওপর ন্যস্ত সে তা ঠিক মতো পালন করছে কিনা? বা সেই দায়িত্ব তাকে আদৌ দেয়া হয়েছে কিনা? এমনসব হাজারটি প্রশ্ন করতে পারার অবস্থায় উন্নীত হওয়ার নাম হতে পারে স্বাধীনতা। আবার কোনো একটি প্রশ্নের সহজ বা জটিল উত্তর হয়তো কারো জানা, কিংবা কোনো ভাবের উন্মেষ ঘটতে পারে কারো মনে, সেসব সর্বজনে প্রকাশ করতে পারার নাম ও স্বাধীনতা। তবে তা অবশ্যই অন্যের স্বাধীনতাকে খর্ব করে নয়। কান্ট আলোকায়নের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বাধীনতা সম্পর্কে বলেছিলেনঃ “সর্ব-সাধারণের জীবনে যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রকাশ্য ব্যবহার হতে হবে সবসময়েই মুক্ত বা স্বাধীন। শুধু এই একটি বিষয় একাই মানুষের জীবনে আলোকায়ন নিশ্চিত করতে পারে। যদিও ব্যক্তিগত জীবনে এই স্বাধীনতা মাঝে মাঝেই অনেক সংকীর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে, অন্যের আলোকায়ন বা স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার সংগ্রামকে বাধাগ্রস্থ না করে”। অর্থাৎ অপরের স্বাধীন সত্ত্বার পরিগ্রহণও স্বাধীন প্রত্যয়ের পরিপন্থী।
তাহলে বলা যেতে পারে যে চলচ্চিত্র (অন্যের স্বাধীনতা বা মুক্তির আকাক্সক্ষাকে বাধাগ্রস্থ না করে) প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে পারে বা কোন একান্ত ব্যাক্তিগত অনুভুতি কিংবা মতামত কোন রকম বাহ্যিক প্রভাবমুক্ত হয়ে প্রকাশ করতে পারে তাই মুক্ত বা স্বাধীন চলচ্চিত্র। অর্থাৎ নির্মাতার স্বাধীন চিন্তার বয়ান হচ্ছে মুক্ত চলচ্চিত্র। একজন মুক্ত মানুষই আসলে মুক্ত চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারে। এই মুক্তির যুদ্ধে তাকে প্রথমেই যে পরাশক্তির মোকাবেলা করতে হয় তা হচ্ছে পুঁজি। চলচ্চিত্র যেমন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গণমাধ্যম আবার অত্যন্ত ব্যায়বহুল মাধ্যম ও বটে। একজন কবি ইচ্ছে হলেই যেমন একটি কবিতা লিখে ফেলতে পারেন, একজন শিল্পী সামান্য খরচেই সৃষ্টি করতে পারেন মহান শিল্পকর্ম কিন্তু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা চাইলেই তা পারেন না। তাকে ভাবতে হয় বিপুল পরিমাণ অর্থের যোগান নিয়ে। ফলে অধিকাংশ নির্মাতা কোন পুঁজিপতি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোন গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। আর এমন ক্ষেত্রে নির্মাতাকে অর্থ লগ্নিকারি পক্ষের স্বার্থের কথা চিন্তা করতে হয়। নিদেনপক্ষে তাদের স্বার্থ যেন ক্ষুন্ন না হয় সে দিক বিবেচনায় রাখতে হয়। আবার যেহেতু লগ্নিকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে হবে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা বহুগুণে ফিরিয়ে আনতে হবে ফলে সেখানে শিল্প বিবর্জিত নানা উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে নির্মাতাকে তার ইচ্ছার বাইরে গিয়েও তা করতে হয়, আবার অধিক মুনাফার লোভ ও নিয়ামক হসেবে কাজ করে। পুঁজিতন্ত্রের চরম বিকাশের এই যুগে পুঁজি তার সুগন্ধি আফিমে প্রায় প্রতিটি মানুষকেই আসক্ত করে ভোগবাদী এক অভূতপূর্ব সমাজের আত্নপ্রকাশ ঘটিয়েছে। এই সমাজে প্রকৃতপক্ষে না আছে প্রলেতারিয়েত
শ্রমিকশ্রেণি আর না আছে সাধক শিল্পীশ্রেণি। প্রায় সবাই ধনিকশ্রেণি হওয়ার নেশায় কেবল ছুটছে। একজন নির্মাতা যখন এই দৌড়ে অংশ নেয় তখন সে তার নির্দিষ্ট লক্ষে হয়তো পৌঁছুতে পারে ঠিকই তবে সে আর মুক্ত থাকেনা। নানান ধরনের আপোষকামিতার মধ্য দিয়েই তাকে তার লক্ষে পৌঁছুতে হয়। অনেকের ধারণা রাষ্ট্রীয় অনুদান বুঝি মুক্ত চলচ্চিত্র নির্মাণ সহায়ক। এ বিষয়ে বলার আগে সাম্প্রতিক ২০১৯ সালের অনুদান প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ঘটনাগুলোর একটু পর্যালোচনা করে নেয়া যাক।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে অনুদানপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য ৮টি চলচ্চিত্র হলোঃ সাধারণ শাখায়- রাত জাগা ফুল, বিধবাদের কথা, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, ১৯৭১ সেইসব দিন, এই তুমি সেই তুমি, ও স্বপ্ন মৃত্যু ভালোবাসা। প্রামাণ্যচিত্র শাখায়- বিলকিস এবং বিলকিস, মেলাঘর। শিশুতোষ শাখায়- নসু ডাকাত কুপোকাত। সে বছর অনুদানপ্রাপ্ত ৫টি স্বর্ল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হলো- খিজিরপুরের মেসি, মিঠুর একাত্তর যাত্রা, রূপালী কথা, শেকল ভাঙার গান ও ময়না। অনুদান প্রাপ্ত চলচ্চিত্রের তালিকা ঘোষণার পরপরই অনুদান প্রক্রিয়ার নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ প্রসঙ্গে ২৯ এপ্রিল ২০১৯ প্রথম আলো পত্রিকার রিপোর্টটি উল্লেখ করা যেতে পারে-
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা হিসেবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছেন আটজন পরিচালক। তবে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অনুদান বাছাই কমিটির সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েও অনুদান পায়নি ’হীরালাল সেন’ চলচ্চিত্রটি। এ বঞ্চনার প্রতিকার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছেন পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন।
গত বছর ২৪ ডিসেম্বর পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অনুদান বাছাই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আজহারুল হকের নেতৃত্বে ২২টি চলচ্চিত্রকে নম্বরের ভিত্তিতে চূড়ান্ত অনুদান কমিটির কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু দেখা গেছে, শিশুতোষ শাখায় সর্বোচ্চ নম্বর ৬৬ দশমিক ২৯ নম্বর পাওয়া নূরে আলমের কুড়কুড়ির মুক্তিযুদ্ধ ছবিটিকে অনুদান না দিয়ে ৬২ দশমিক ২৯ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আবু রায়হান মো. জুয়েলের নসু ডাকাত কুপোকাত ছবিটিকে অনুদানের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।
একইভাবে প্রামাণ্যচিত্র শাখায় সর্বোচ্চ নম্বর (৭৫ দশমিক ৪৩) পাওয়া মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের হীরালাল সেন চলচ্চিত্রটিকে অনুদান দেওয়া হয়নি। এই শাখায় অনুদান পেয়েছে হুমায়রা বিলকিসের বিলকিস বিলকিস ও পূরবী মতিনের মেলাঘর ছবি দুটি। বাছাই কমিটি এ ছবি দুটিকে দিয়েছেন যথাক্রমে ৫৫ দশমিক ৭১ এবং ৪৭ দশমিক ৮৬ নম্বর। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে গত ২৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি দিয়েছেন মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। চিঠিতে তিনি জানান, ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও অনুদানের প্রতিযোগিতায় শীর্ষে অবস্থান করলে, সে বছরও তাঁকে অনুদান দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান নির্বাহী মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েও অনুদান না পাওয়ার এ ঘটনা প্রমাণ করে, প্রক্রিয়াটিতে ঝামেলা রয়েছে।
তবে চূড়ান্ত অনুদান কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কোনো নম্বরযুক্ত তালিকার ভিত্তিতে অনুদানের সিদ্ধান্ত নেননি তাঁরা। শুরুতে নম্বরযুক্ত তালিকা দেওয়া হলেও সেটার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিতে চাননি তাঁরা। নম্বর যুক্ত হলে তাঁদের তেমন কিছুই করার থাকে না। নম্বরের বদলে বরং ছবিটি কেন অনুদান পাওয়ার যোগ্য, সেই মন্তব্য সহ বিবেচনার জন্য চূড়ান্ত কমিটিকে দেওয়া যেতে পারে। এ বছর সেভাবেই তাঁদের সামনে দেওয়া হয়েছে।
তাঁদের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো চলচ্চিত্র এ বছর অনুদান পেয়েছে কি না, জানতে চাইলে ওই সদস্য বলেন, পেয়েছে। এ ছাড়া আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলচ্চিত্রে অনুদান দেওয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই বাছাই কমিটির নম্বরের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় চূড়ান্ত কমিটি। তবে এবারই প্রথম নম্বরবিহীন তালিকা চেয়েছিল চূড়ান্ত কমিটি। ফলে তালিকার নিচের দিকে থাকা ছবিও মনোনয়ন পেয়ে গেছে।
অনুদানের সাধারণ শাখায় যৌথভাবে তৃতীয় স্থান পেয়েছিল তৌকীর আহমেদের অদ্ভুত আঁধারে এবং জাহিদুর রহিম অঞ্জনের ছবি মেকআপ বক্স। কিন্তু এ ছবি দুটির বদলে অনুদানের জন্য বিবেচনা করা হয়েছে অষ্টম অবস্থানে থাকা আকরাম খানের বিধবাদের কথা ও একাদশ অবস্থানে থাকা হোসনে মোবারক রুমির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ছবি দুটি।
ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের সাধারণ সম্পাদক বেলায়াত হোসেন মামুন বলেন, ”অনুদানের সিদ্ধান্ত অনেকটা ব্যক্তিনিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছে। এ অবস্থা বিরাজমান থাকলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে অনুদান চালু করা হয়েছে, সে উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হবে না। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের অনুদানের ক্ষেত্রেও এ ধরনের অভিযোগ শোনা যায়। অনুদান দেওয়া উচিত চিত্রনাট্যের মান ও মেধার ভিত্তিতে। চাপের ভিত্তিতে নয়।”
চলচ্চিত্রশিল্পে মেধা ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করা এবং বাংলাদেশের আবহমান সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখতে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবীয় মূল্যবোধসপন্ন জীবনমুখী, রুচিশীল ও শিল্পমানসমৃদ্ধ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে এ অনুদান চালু করেছে বাংলাদেশ সরকার।
এবং তার মাস খানেক পর ২৭ মে ২০১৯ তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক পজ্ঞাপন জারি করে শমী কায়সারের স্বপ্ন মৃত্যু ভালবাসা চলচ্চিত্রটিকে অনুদান প্রাপ্ত চলচ্চিত্রের তালিকায় যুক্ত করা হয় অথচ এই চলচ্চিত্রটি অনুদানের জন্য জমাই দেয়া হয়নি। এই ঘটনাগুলো প্রমান করে যে অনুদান প্রাপ্তির জন্য একজন নির্মাতাকে যে সব বিষয়ে আপোষ করতে হয় তা হল সরকার পক্ষের এজেন্ডা পুরনে সহায়ক চিত্রনাট্য রচনা করা, বা তাদের মুল আদর্শের সাথে সাংঘর্সিক এমন চিত্রনাট্য রচনা থেকে বিরত থাকা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের সুযোগ নেয়া বা অবৈধ লেনদেনের সহায়তা নেয়া। ফলে সরকারি অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্রে শিল্প মান বজায় থাকলেও সে তার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় অনুদান মুক্ত চলচ্চিত্র নির্মাণ সহায়ক কোন বিষয় ততক্ষন পর্যন্ত নয় যতক্ষণ পর্যন্ত না এই ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। ফলে একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে ব্যক্তিগত তহবিলের উপরই নির্ভর করতে হয়। তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে পরিবার পরিজন বা গন অর্থায়ন ও বিশেষ ভাবে বিবেচিত হতে পারে।
সে যাই হোক, পুঁজির এই পর্বত বাঁধা অতিক্রম করে নির্মিত চলচ্চিত্রটিকে এরপর পরতে হয় সেন্সরবোর্ডের কাচির তলে। পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে এই ধরনের কোন বোর্ডের অস্তিত্ব নেই। যেটা আছে তা হল চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড। এর কাজ হল চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু ও দর্শকের বয়সসীমা ও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় এনে তদনুযায়ী সার্টিফিকেট প্রদান করা। অর্থাৎ কোন সিনেমা সকল বয়সের দর্শকের দেখার উপযোগী হলে তাকে UNIVERSAL, প্রতীকী ভাবে U’ সার্টিফিকেট প্রদান করে। আবার কোনটিতে যদি আঠারো বছরের কম বয়সের দর্শকদের ভেতর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার সম্ভাবনা থাকে তাহলে সেটিকে ADULT সংক্ষেপে A’ প্রতীকে সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। এর মধ্যে যৌনতার বিষয়গুলো যেমন আছে তেমনি আছে ভৌতিক দৃশ্য,রক্তপাত, অশ্লীল বাক্য ব্যবহার ইত্যাদি ও। তাছাড়া সিনেমার পুরো গল্প বা গল্পের কোন অংশ যদি কোন নির্দিষ্ট জাতি, সংস্কৃতি, ধর্ম, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যায় তবে সেন্সরবোর্ড উপযুক্ত কারণ দর্শীয়ে উক্ত সিনেমার কিছু অংশ কর্তন বা সম্পূর্ণ সিনেমা আটকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু এদেশের সেন্সরবোর্ড এযাবতকাল পর্যন্ত কোন সিনেমাকেই অ সার্টিফিকেট দেয় নি বরং যৌন দৃশ্য, রক্তপাত, অশ্লীল বাক্য সম্বলিত শত শত চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে, টেলিভিশনে প্রদর্শিত হয়েছে। অন্যদিকে উচ্চমান সম্পন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য সম্বলিত চলচ্চিত্রের টুটি চেপে ধরা হয়েছে অহরহ। উদাহরণ স্বরূপ সেই জহির রায়হানের ’জীবন থেকে নেয়া’ থেকে তারেক মাসুদের ’মাটির ময়না’ বা সম্প্রতি রাজিবুল হোসেনের ’হৃদয়ে রংধনু’ কিংবা চাকমা ভাষার প্রথম চলচ্চিত্র অং রাখাইন এর “মর থেংগাড়ি” এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। একি দিনে একি প্রজ্ঞাপনে তারেক মাসুদ নির্মিত মাটির ময়না ও মোহাম্মদ হোসেন এর ফায়ার চলচ্চিত্রদুটি নিষিদ্ধ করা হয়। এই চলচ্চিত্রদুটি সম্পর্কে ধারণা না থাকলে যে কেউ চলচ্চিত্র দুটিকে একি মানদন্ডে দাঁর করিয়ে দিতে পারে। পরে অবশ্য সেন্সর বোর্ডের অসংখ্য সেন্সর যোগ্য দৃশ্য সম্বলিত ও শিল্পমান বিবর্জিত ফায়ার চলচ্চিত্রটি মহাসমারোহে মুক্তি পেয়ে ব্যবসায়িক সফলতা পায় কিন্তু বাংলার মুক্তি সংগ্রামের পটভূমিতে রচিত জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের সিনেমা মাটির ময়নাকে আলোর মুখ দেখতে হয় ভিন্ন দেশের পেক্ষাগ্রিহে। রাজিবুল হোসেন আমলাদের কিছু টাকা ঘুষ আর চলচ্চিত্রের দুয়েকটি দৃশ্যের কর্তন এমন শর্তে তার হৃদয়ে রংধনুর মুক্তির নিশ্চয়তা পেলেও আদর্শিক জায়গায় বিন্দু মাত্র ছাড় না দিয়ে লড়াই করে গেছেন তার চলচ্চিত্রের নিঃশর্ত মুক্তির জন্য। এই পরিস্থিতিতে অনেক মেধা সম্পন্ন কিন্তু আপোষকামী চলচ্চিত্রকার নির্মাণের আগেই তার চলচ্চিত্রকে এক ধরনের শেল্ফ সেন্সরশিপের পর্যায়ভুক্ত করে ফেলেন। ফলে ভ্রুণ হত্যার স্বীকার হয় অসংখ্য সম্ভাবনাময় চলচ্চিত্র। বাংলাদেশে শিল্পমান সম্পন্ন রাজনৈতিক চলচ্চিত্র সঙ্কটের এটিও একটি বিশেষ কারন। ১৯৮৪ সালে মোরশেদুল ইসলাম আগামী র মধ্যদিয়ে যে সম্ভাব্য বিপ্লবের গল্প শোনাতে চেয়েছিলেন তা তিনি পারেননি বরং বিদ্রোহের হাত চেপে ধরেছেন অজানা আশংকায়। বিদ্রোহ থামিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি বিপ্লবের পক্ষে। তিনি চান বিপ্লব ঘটুক, তবে তা অন্যকারো হাত ধরে। গল্পের পক্সগু মুক্তিযোদ্ধা যেন নির্মাতা নিজেই, যিনি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন কিন্তু সে পথে ধাবিত হতে পারেন না এবং তার পরবর্তী প্রজন্মকেও বিদ্রোহী হতে বাঁধা দেন। এটা সময়ের চিত্র। সবাই শোষণ- নিপীড়নের অবসান চায়, বিপ্লব চায় কিন্তু বিপ্লবী হতে চায় না। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আমাদের অবচেতন শাসক শ্রেণীর প্রতি যে ভয় পোষণ করে এসেছে তা এই গল্পের বুননে বিদ্যমান । বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড ও তার সহায়ক চলচ্চিত্র বিষয়ক আইনসমূহ নির্মাতাদের ভেতরও সেই ভয় প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছে। যা শুধু চলচ্চিত্রকেই সেন্সর করছে না সাথে সাথে নির্মাতার মগজকেও শাসন করছে। ফলে একজন নির্মাতা তার চলচ্চিত্রের জন্য এমন কোন গল্পই বেছে নেন যা সেন্সর প্রশ্নে আপোষকামী। আমরা দেখেছি মোরশেদুল ইসলাম তার আগামী’র সম্ভাবনাকে পেছনে ফেলে চাকা হয়ে কিভাবে আঁখি ও তার বন্ধুরায় পৌঁছুলেন। এবার আসুন, চলচ্চিত্রকে সেন্সর করার জন্য বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনগুলো একটু দেখে নেয়া যাক। মেকি গণতান্ত্রিক অবস্থায় আইনের যাহেরি মর্ম জানার পাশাপাশি এর বাতেনি মর্মোদ্ধার আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা চলচ্চিত্র বিষয়ক আইন হোক বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এখানে বলা কর্তব্য যে বেলায়েত হোসেন মামুন রচিত স্বাধীন চলচ্চিত্র নামক গ্রন্থ থেকে আইনগুলোর এই সুবিন্যস্ত ধারাক্রমটি আমি ধার করেছি। স্বাধীন চলচ্চিত্র চর্চার সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে বেগবান রাখায় মুহম্মদ খসরু, বাদল রহমান, তারেক মাসুদ বা তানভীর মোকাম্মেল এর পরই বেলায়েত হোসেন মামুন এর নাম উল্লেখযোগ্য।
১। সিনেমাটোগ্রাফ আইন-১৯১৮
এই আইনটিকে বলা যেতে পারে চলচ্চিত্রের দমনমূলক সকল আইনের জননী। ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এই ভূখণ্ডে চলচ্চিত্র প্রদর্শনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এর জন্ম এবং আজো এই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে এটি বলবৎ আছে।
২। সেন্সরশিপ অব ফিল্ম অ্যাক্ট- ১৯৬৩
পাকিস্তান শাসনামলে প্রণীত এই আইনের ক্ষমতাবলে “ফিল্ম সেন্সর বোর্ড” গঠিত হয় যা আজো চলচ্চিত্রের ওপর রাষ্ট্রীয় পুলিশি নজরদারিত্তের ভুমিকা পালন করছে।
৩। দ্য বাংলাদেশ সেন্সরশিপ অব ফিল্মস রুলস- ১৯৭৭
১৯৭৭ সালে গেজেট আকারে প্রকাশিত এই আইনটি মুলত বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ড কর্তৃক চলচ্চিত্রের নিয়ন্ত্রণকে আরও শক্তিশালী ও বৈধতা দান করে।
৪। ফিল্ম ক্লাব (রেজিস্ট্রেশন এন্ড রেগুলেশন) অ্যাক্ট- ১৯৮০
সত্তরের দশকে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে উঠলে ১৯৮০ সালে তৎকালীন সামরিক সরকার কর্তৃক এই আইনটি প্রনয়ন করা হয় যা চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীদের কাছে “কালা কানুন” হিসেবে পরিচিত। আইন বলে রাষ্ট্রের ব্যাপক দমন পীড়ন আর নানা রকম হয়রানীতে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পরে। পরবর্তীতে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ২০১১ সালে এর আংশিক সংস্কার করে প্রণয়ন করা হয় চলচ্চিত্র সংসদ নিবন্ধন আইন-২০১১।
৫। দ্য কোড ফর সেন্সরশিপ অব ফিল্মস ইন বাংলাদেশ-১৯৮৫
১৯৮৫ সালের স্বৈরশাসন আমলে ১৬ নভেম্বর সমাজ, রাষ্ট্র, সরকার ও ধর্মের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি বিদেশী “বন্ধুরাষ্ট্র” এর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এই আইনটি প্রণীত হয় যাকে বলা হয়ে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের নিকৃষ্টতম দমনমূলক আইন। এই আইনে সংযোজন করা হয় যে “বন্ধুরাষ্ট্র” বিব্রত হতে পারে এমন কোন বিষয় বা বক্তব্য চলচ্চিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।
৬। দ্য সেন্সরশিপ অব ফিল্মস (অ্যামেন্ডমেন্ট ) অ্যাক্ট ২০০৬
চলচ্চিত্রের উপর সর্বাধিক নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দিয়ে ১৯৬৩ সালের সেন্সরশিপ অফ ফিল্মস অ্যাক্টকে সংশোধন ও সংযোজন করে ২০০৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়। এই আইনে চলচ্চিত্রের প্রচার সংশ্লিষ্ট যেকোন উপকরণ যেমন চলচ্চিত্রের আলোকচিত্র , পোষ্টার, হ্যান্ডবিল, বিজ্ঞাপন, এমনকি চলচ্চিত্রের নাম সেন্সরবোর্ডের অনুমোদনের আওতায় সংযুক্ত করা হয়। অর্থাৎ ২০০৬ সালে চলচ্চিত্রের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও দমনমূলক কর্মকান্ডের সর্বোচ্চ পদক্ষেপটি গ্রহন করা হয়।
পরবর্তীতে জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালা ২০১৭ এবং উপরোল্লিখিত আইনগুলোর প্রত্যেকটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে অটুট রাখার মূল উদ্দেশ্যকে ধারণ করে মূলত স্বাধীন ও সৃজনশীল চিন্তা চর্চায় চলচ্চিত্রের গতিপথ রুদ্ধ করার নিমিত্তে সৃষ্টি হয়েছে। সেন্সরবোর্ড বিলোপের দাবীতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদগুলোর দীর্ঘদিনের আন্দোলনে ২০১৯ সালে বিদ্যমান এই সব ধারার কোন রকম পরিবর্তন না করেই বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ড কে “ফিল্ম সার্টিফিকেশন বোর্ড” এবং এই মর্মে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন আইন ২০১৯ এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়। এই আইনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত চলচ্চিত্রের বয়সভিত্তিক সার্টিফিকেট প্রদান । ফলে এটা ধারণা করা যায় যে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের জাল থেকে সহজেই বা খুব কাছাকাছি সময়ের মধ্যে চলচ্চিত্রের মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। আর একটি অনুচ্চারিত বা গুপ্ত সেন্সরশিপের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায় যা বিশেষ করে সাহিত্যের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করে। সেটি হচ্ছে নো রিকগনিশন থিওরি বা অস্বীকৃতির পদ্ধতি। এই ব্যবস্থায় কোন একটি সরকারী প্রোপাগান্ডামূলক বা পুজিতান্ত্রিক সমাজ বলয়ের বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী সাহিত্য কিংবা চলচ্চিত্রের ব্যাপক মিডিয়া কাভারেজ ও পুরস্কৃত করণ এবং অন্যদিকে অত্যন্ত শক্তিশালী শিল্পমান সমৃদ্ধ কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য সম্বলিত সাহিত্য বা চলচ্চিত্রকে মিডিয়া,সরকার ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অঘোষিত বয়কট করণ। এটি একটি পার¯পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ত্রিপক্ষিয় অন্তর্জালিক কার্যক্রম যাকে অনেকে বলেন “ব্যবসা-সরকার-গণমাধ্যম বন্ধন”।
চলচ্চিত্রকে বন্দী করার জন্য এই যে এতো আয়োজন, তার কারন চলচ্চিত্র খুব সহজে সাধারণের কাছে পৌঁছে গিয়ে এমনকি বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারে। ফলে রাষ্ট্র সবসময় সিনেমাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে এবং সেই উদ্দেশ্যেই চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে অস্বীকার করে একে তথ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রাখা হয়েছে। অথচ বিজ্ঞান, দর্শন এবং শিল্পের সমন্বিত উন্নয়নের ধারায় আধুনিক সিনেমার অসাধারন ক্রমবিকাশে আশ্চর্যান্বিত হয়ে প্রখ্যাত শিল্প সমালোচক আর্নল্ড হাউসার চলচ্চিত্রকে আধুনিক শিল্পের দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন:
The agreement between the technical methods of the film and the character of the new concept of time is so complete that one has the feeling that the time category of modern art must have arisen from the spirit of cinematic form, and the one is inclined to consider film itself as the stylistically most representative (though qualitatively perhaps not the most fertile) genre of contemporary art. (27)
Arnold Hauser, “The Social History of Art”, Volume 4, 1958
তারও আগে ১৯৩৫ সালে ওয়াল্টার বেঞ্জামিন তার “যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পকলা” বিষয়ক প্রবন্ধে বুর্জোয়া নন্দনতত্ত্ব অর্থাৎ কলাকৈবল্যবাদ এর ধারণাকে অস্বীকার করে মূলত মার্কসীয় নন্দন তত্ত্বের আলোকে এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন যে, যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের এই যুগে চলচ্চিত্রই হচ্ছে একমাত্র শিল্পকলা যা আধুনিক সমাজ বিকাশের সাথে সাথে মানুষের পরিবর্তিত নন্দনতাত্ত্বিক জীবনবোধে পূর্ববর্তী শিল্প সমূহের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। আবার কান্টের নান্দনিকতার দর্শন অনুযায়ী শিল্প তখনই শিল্প যখন সে স্বাধীন ভাবে নির্মিত অন্যথায় তাকে আর্ট না বলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্ট বলা যেতে পারে। সেই অর্থে আর্ট ফিল্ম নামে বাজারে যে সব চলচ্চিত্র আমরা দেখতে পাই যা দর্শক চাহিদার কথা মাথায় রেখে কিছুটা হলিউড কিছুটা ইতালীয় নিওরিয়ালিজম এর ধারার সংমিশ্রণে, সেন্সর প্রশ্নে আপোষজনক অবস্থানে কারখানার চৌহদ্দির ভেতরে নির্মিত তার সবই সত্যিকার অর্থে আর্ট ফিল্ম নয়। আবার অমিতাভ রেজার “আয়নাবাজি” কিংবা অনম বিশ্বাসের দেবী অথবা গিয়াসউদ্দিন সেলিমের “মনপুরা”এর মত কমফোর্ট জোনে নির্মিত বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রগুলো গল্প. স্টার কাস্টিং কিংবা আধুনিক বাজারজাতকরণ পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে কিছুটা বাণিজ্যিক সফলতা পেলেও স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রগুলো পরিবেশকের অভাবে বেশি দূর যেতে পারে না। তাছাড়া ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে সারা দেশে সক্রিয় সিনেমাহলের সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০ টি। দিনদিন তা আরও কমছে । যেগুলো আছে তার দু একটি ছাড়া বাকি সবগুলো বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনেই বেশি আগ্রহী। এমনটা নয় যে হলমালিক ভালোবেসে প্রদর্শন করছে এই সিনেমাগুলো বরং পুঁজির নিশ্চয়তা বিধানই এখানে মূল লক্ষ। পুঁজিকে কেন্দ্রে রেখে কলাকুশলী, পরিচালক – প্রযোজক, বিপণনকারী হল মালিক এমনকি সেন্সর বোর্ডের আমলাদের একটি বৃহদাংশের চলচ্চিত্র শিল্প কারখানায় যে হেজিমনি জারি আছে অনেকে যাকে বলছে “চলচ্চিত্রের মাফিয়া তন্ত্র” তা কিন্তু রাতারাতি তৈরি হয়ে যায়নি। বরং তার বুনিয়াদ তৈরি হয়েছিল বলতে গেলে স্বাধীনতার অব্যাবহিত পরেই বিএফডিসি বা বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন থেকে যা ১৯৫৭ সালে নাজির আহমদ ও জব্বার খানদের প্রচেষ্টা এবং তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের শিল্পমন্ত্রী শেখ মজিবুর রহমান এর উদ্যোগে “পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন” বা ইপিএফডিসি নামে এই অঞ্চলের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের লক্ষ্যে চলচ্চিত্রের প্রধান কেন্দ্র রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে এই কর্পোরেশন স্থাপনের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে বি-উপনিবেশায়নের প্রক্রিয়ার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। যদিও অনেকেই বলে থাকে বাংলা চলচ্চিত্রে বি-উপনিবেশায়নের কাজটি করেছে মূলত সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রগুচ্ছ কিন্তু তারা এটা ভেবে দেখেননি যে সত্যজিৎ এর চলচ্চিত্রগুলো মূলত ইতালীয় নব্যবাস্তববাদ থেকেই বেরিয়ে আসতে পারেনি অর্থাৎ এই চলচ্চিত্রগুলো নিজেই ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের শিকার। তাছাড়া বাস্তবতার স্বরূপ সন্ধানে তা কতটুকু সমর্থ হয়েছিল তার ভিন্ন তর্ক তো রয়েইছে। সেই দিক থেকে জহির রায়হানের “জীবন থেকে নেয়া স্থানিক আবেগ আর সমসাময়িক জীবনবোধের মেলোড্রামার ভেতর দিয়ে রাজনৈতিক বি-উপনিবেশায়নের উদ্বোধন বেশ প্রশংসিত হয়েছিল । যদিও এর নানা সীমাবদ্ধতা বিশেষ করে লৈঙ্গিক বৈষম্যের দৃষ্টিভঙ্গি আর মধ্যবিত্ত আবেগ-অনুভুতির নাটকীয় উপস্থাপন বেশ সমালোচিত ও হয়েছিল। তবে এই মধ্যবিত্ত আবেগের উপস্থাপনা এস্থেটিকে সমালোচিত হতে পারে কিন্তু সমাজে এর উপস্থিতি মোটেই অস্বীকার করার জো নেই। না তখনকার সময় না এখনকার সমাজ বাস্তবতায়। উদাহরণ স্বরূপ সাম্প্রতিক ভাইরাস জনিত অতিমারী সময়কার সমাজ চিত্র একটু সংক্ষেপে উপস্থাপন করা যেতে পারে। মহামারী পরিস্থিতিতে যখন দেশে অচলাবস্থার সৃষ্টি হল এবং একটি অংশের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় নুন্যতম খাদ্যের সঙ্কট দেখা দিল তখন আমরা প্রত্যক্ষ করলাম সমাজের আরেকটি অংশ বেঁচে থাকার নানা উপকরণ নিয়ে সহযোগিতায় এগিয়ে আসলেন। সাংগঠনিক বা ব্যাক্তিগত পর্যায়ে এই সহযোগিতা কার্যক্রম অব্যাহত থাকল। অনেকেই আবার তা মহৎ কর্ম হিসেবে ব্যক্তিগত ভাবে প্রচার প্রচারণায় অনুপ্রাণিত হলেন কিন্তু এই পরিস্থিতিতে প্রত্যেক নাগরিকের খাদ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তা খুব কম সংখ্যকই উচ্চারণ করলেন আর এই দায়িত্ব যথাযথ পালনে রাষ্ট্রকে চাপ প্রয়োগ না করে বরং বেশির ভাগই রাষ্ট্রের এই দায়িত্বকে নিজের কাঁধে তুলে নিতে উৎসাহিত হলেন যখন সরকারের মদদপুস্ট জনপ্রতিনিধিগণ ত্রাণসামগ্রী আত্নস্থকরণেই বেশি আগ্রহী ছিল। জনগণের এরূপ প্রশংসনীয় ও মানবিক কর্মকান্ড রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে কি নেতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে এবং সরকার এই কর্মকান্ডে কেন উৎসাহ প্রদান করে তার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অন্যত্র করা যেতে পারে কিন্তু আমি এখানে যে বিষয়টিকে সামনে আনতে আগ্রহী সেটা হচ্ছে আবেগ বা আরও ¯পষ্ট করে বললে যাকে বলে মধ্যবিত্ত আবেগ যা জনগণের বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এই কর্মকান্ডের একমাত্র অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়ে থাকে রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেখানে অকার্যকর সমাজ সেখানেই কার্যকরী হয়ে ওঠে, বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি তারই উদাহরণ। আর সমাজ ব্যবস্থা কার্যকরী হওয়ার প্রচ্ছন্ন নিয়ামক হচ্ছে ব্যক্তিগত আবেগ। ফলে চলচ্চিত্রে স্থানিক আবেগের বিশ্লিষ্টকরণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাংস্কৃতিক উপনিবেশায়নের প্রত্যক্ষ প্রভাব বলে বিবেচিত হতে পারে।
একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়াকে যেহেতু পুঁজি, রাষ্ট্রীয় সেন্সর, ব্যক্তিগত সেন্সর, মাফিয়া তন্ত্র, পরিবেশকের অভাব, বিশ্বায়নের নামে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আগ্রাসন ইত্যাদি নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে ধাবমান থাকতে হয় এবং যখন ১৯৫০সালের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাজ্যে লিন্ডসে এন্ডারসন, ক্যারল রেইজ, টনি রিচার্ডসন, লরেঞ্জা মাযেতি প্রমুখদের ফ্রি সিনেমা মুভমেন্ট অথবা বাংলাদেশে মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, বাদল রহমান, সালাউদ্দিন জাকি, জাহিদুর রহিম অঞ্জন প্রমুখদের শর্ট ফিল্ম আন্দোলন কিংবা চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন ইত্যাদি উদ্যোগগুলো এক জায়গায় দানা বাঁধে না ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জমে ওঠে যে মুক্ত চলচ্চিত্র অভিধাটি আদৌ বাস্তবসম্মত কোন প্রত্যয় কিনা, নাকি কোন ইউটপিয়া যখন পুঁজি একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান এবং সেন্সরবোর্ড বিলুপ্তির কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ভেতর আমরা এখনো প্রবেশ করিনি? এসব প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলো আমাদের বলীরেখার ভাঁজে গভীরতা সৃষ্টি করে কারণ মুক্ত চলচ্চিত্র কেবল মাত্র একটি তত্ত্ব নয় বরং এটি এমন এক রাজনৈতিক-দার্শনিক আন্দোলন যা নির্মাতার জীবনবোধ, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সততা আর স্বাধীন চিন্তার উপর বেগবান থাকে। আমরা যদি ইরানের চলচ্চিত্রের দিকে নজর দেই তাহলে দেখব প্রচন্ডভাবে রক্ষণশীল এক সেন্সর ব্যবস্থার মধ্যে ১৯৭৯-১৯৮২ সালে বিপ্লবের আগে ও পরের সময়ের এই চার বছরে নির্মিত ২২০৮ টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ১৯৫৬ টিই নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে সেন্সরশিপ এর একটি লিখিত নির্দেশনা জারি হয়। নির্দেশনায় বলা হয় চলচ্চিত্রে নারীর আঁটসাঁট পোশাক, মুখমন্ডল ও হাত ছাড়া অন্য অঙ্গ প্রদর্শন, নারী – পুরুষ শারীরিক ¯পর্শ, পুলিশ- সামরিক বাহিনী ও পরিবারের ঐক্য সম্পর্কে বিদ্রুপাত্তক দৃশ্য, বিদেশি বা উত্তেজনামূলক সঙ্গীত ও দাড়িবিশিষ্ট কোনো নেতিবাচক চরিত্র প্রদর্শন করা যাবে না। এমন বিরূপ পরিস্থিতি ও পুঁজি প্রবাহে সঙ্কট থাকা স্বত্বেও আব্বাস কিয়েরোস্তামি, দারিউস মেহেরজুই, মহসিন মাখমালবাফ, জাফর পানাহি, সামিরা মাখমালবাফ, ফারহাদি, মাজিদ মাজিদি প্রমুখ নির্মাতাগণের সৃজনশীলতায় ইরানী চলচ্চিত্র এক ভিন্ন উচ্চতায় অবস্থান করে নিয়েছে। আবার চরম অর্থনৈতিক সঙ্কট, সরকার গুলোর আত্নকেন্দ্রিকতা আর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক উপনিবেশায়নের মধ্যেও আফ্রিকায় উসমান সেমবেন, ইউসেফ শাহীন, সুলেমান সিসে, কোয়া আনসা, ওলা বেলোগুণ, সাফি ফাইয়ে, অ্যান মুঙ্গাই, সিসি ডেঙ্গারাম্বগা, জিব্রিল দিয়প ম্যামবেতি, ফ্লোরা গোমেজ, গাস্ত কাবোর, ফান্টা রেজিনা ন্যাক্রো এর মত নামগুলো জন্ম নিয়েছে। যদিও বাংলা চলচ্চিত্রে ওপারে ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, সত্যজিৎ রায়, বুদ্ধদেব দাস গুপ্ত আর এপারে তারেক মাসুদ, সালাউদ্দিন জাকি, মারশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল পর্যন্ত বলা যায়। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশী করে তোলে যখন দেখি তরুণ স্বাধীন নির্মাতা অন্তু আজাদ তার ব্যক্তিগত পুঁজির নির্মিত চলচ্চিত্র আহত ফুলের গল্প পরিবেশকের অভাবে নিজেই উদ্যোগী হয়ে নিজ গ্রামের বন্ধ হয়ে যাওয়া পেক্ষাগ্রিহটি ভাড়া নিয়ে তার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। সিনেমা হলটিকে সংস্কারের মাধ্যমে দর্শকোপযোগী করা, প্রচার প্রচারণা থেকে শুরু করে কাউন্টারে বসে টিকিট বিক্রি করা ইত্যাদি সব কাজই তিনি নিজ হাতে সম্পন্ন করেন। আরেক তরুণ স্বাধীন নির্মাতা মোহাম্মদ নুরুজ্জামান নিজ জেলায় সিনেস্কোপ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন যেন স্বাধীন চলচ্চিত্রগুলো প্রদর্শিত হতে পারে। এর আগে আমরা দেখেছিলাম স্বাধীন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ তার চলচ্চিত্রের ফেরী করে বেড়িয়েছেন গ্রামে গঞ্জে, নিজ উদ্যোগে হাঁটে মাঠে প্রদর্শন করেছেন তার চলচ্চিত্র। তাছাড়া ডিজিটাল প্রযুক্তি ও বিপণনের নয়া পাটাতন চলচ্চিত্রের মুক্তির যাত্রাকে আরও সুগম করছে। জ্যা ককতো যেমন বলেছিলেন তেমন কাগজ বা পেন্সিলের মতই সস্তা হয়ে যাচ্ছে চলচ্চিত্র নির্মাণ উপকরণ। ব্যয়বহুল ক্যামেরা এখন চলে এসেছে নির্মাতার পকেটে আর নির্মিত চলচ্চিত্র নিমেষেই পৌঁছে যাচ্ছে দর্শকের সামনে। এই নয়া প্রাযুক্তিক ব্যবস্থা চলচ্চিত্রকে কারখানা থেকে বের করে শিল্পীর কর্মশালায় স্থান করে দেয়ার প্রয়াস পেয়েছে। যে চলচ্চিত্র শুরুর দিকে ছিল কেবলই এক প্রাযুক্তিক আবিস্কার আর মাঝে বিনোদন ও বানিজ্যিক উপকরণ তা আজ প্রতিবাদের নান্দনিক ভাষা নির্মাণ আর অনন্যপর বৈশিষ্ট্য অর্জনের মাধ্যমে শিল্প যাত্রায় সামিল হয়েছে। আজ যখন আমরা এখানে “মুক্ত চলচ্চিত্র” নিয়ে আলোচনা করছি তখন হয়ত বিশ্বের কোনো এক প্রান্তে আরও বৃহৎ পরিসরে আলোচিত হচ্ছে “চলচ্চিত্রের মুক্তি” প্রসঙ্গে।





কমেন্ট করুনঃ