রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে আলোকপাত করার আগে বা রবীন্দ্রনাথ কেন আমার এ বিষয়ে বলবার খাতিরেই রবীন্দ্রনাথের মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে Umashankar Joshi এর মন্তব্য শুরুতেই তুলে ধরতে চাই-
“Tagore is the poet of the viswa-manava, not merely
the universal man but the man-in-the-universe, or
shall we call him the All-MAN, the whole man, for
he alone who partakes of wholeness becomes whole.
Of man Tagore was never tried of singing. His
Farewell to Heaven is an eloquent homage to life on
this
আমার রবীন্দ্রনাথ কিংবা আমি রবীন্দ্রনাথকে সংগোপন করেছি একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি-পাঠক সাধারণ যে যার মতো করে রবীন্দ্র রচনার মর্ম উদঘাটন, মর্ম গ্রহন, মূর্ত বা স্বমুক্ত থাকতে পারেন। এভাবে রবীন্দ্রনাথ নানা বিষয় হয়ে উপলব্ধির অন্তরে জায়গা করে নিয়েছে আমার আর একারণেই তিনি কখনো স্বভাবতই হয়ে যান পাঠকের আপনার উপলব্ধি বিশেষের শিল্পি, কবি তথা তার নিজের রবীন্দ্রনাথ।
শৈশবে রবীন্দ্রনাথের সংগে আমি বেড়ে উঠেছি এবং রবীন্দ্রনাথ আমার সঙ্গে বেঁচে বেঁচে আজ যৌবনে পদার্পণ করেছে। তিনি আমাকে জড়িয়ে রয়েছেন-আমি তাঁকে ছেড়ে যেতে পারি না। এখন রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই হাঁটছি, বসছি, দেখছি, তাঁকে ঘিরেই আয়োজনের নানা অনুষঙ্গ। ঘুমানোর সাথি হয়ে বাইরের জগতের সাথি এমনকি বন্ধুবান্ধবের তুমুল আড্ডায় আমার সাথে রবীন্দ্রনাথ থাকেন। একথা ঠিক যে রবীন্দ্রনাথ আমার মানস জগতের এক সুবিশাল জায়গা স্থায়ীভাবে দখল করে আছেন। রবীন্দ্র রচনাবলি কেবল বাঙালি জীবনের সমগ্রতার আদর্শ নয়, ভারতবর্ষীয় এমনকি বিশ্বসংস্কৃতিতেও অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠেন। একারণেই রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করবার কোনো সুযোগই থাকে না। রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন নানা চেতনায়। তিনি কেবল আমার সব শুভচেতনায় জুড়ে বিরাজই করেন না জীবনের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে আমার ঐতিহ্যমগ্ন হয়ে নিজে পরিণত হয়েছেন ব্যক্তিগত ঐতিহ্যে-আমাদের ঐতিহ্যে। বাঁচার তাগিদ, জীবনের মোহ, অসীম জীবন প্রীতিসহ মৃত্যুবোধ যখন অবিচ্ছেদ্য চেতনায় আমাকে প্রমুক্ত করে তখন রবীন্দ্রনাথ বলেন-
মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।
এই চরণ দুটো রবীন্দ্রকাব্যের বিদগ্ধ পাঠকবৃন্দের কাছে নয় রবীন্দ্র কবি মনীষার শাশ্বত সনদ হিশেবে পরিচিত ও সমাদৃত হয়েছে আর এরই মাঝে রবীন্দ্রনাথের তামাম কাব্যশিল্পের মূলীভূত সত্য অর্থাৎ মানবতাবোধে মৃদু জয়ধ্বনি শোনা যায়। তিনি নিজেও এ প্রসঙ্গে ভাবতে গিয়ে বলেছেন-
“এই আমার প্রথম কবিতার বই (‘কড়ি ও কোমল’) বই যার মধ্যে
বিস্ময়ের বৈচিত্র এবং বহির্বিশ্বের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আর প্রথম
আমি সেই কথা বলেছি যা পরবর্তী আমার কাব্যের অন্তরে অন্তরে
বারবার প্রবাহিত হয়েছে।”
রবীন্দ্রনাথের এই অভিমত দিবালোকের মতো পরিস্কার করে দেয় যে, কড়ি ও কোমলের যুগেই প্রকৃত প্রস্তাবে কবিমনে অসীম জীবন প্রীতির বলিষ্ঠ উন্মেষ-ধারা রবীন্দ্রকাব্যে পাঠক মাত্রেই অনুভূতিকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে। রবীন্দ্রনাথ আমার হয়ে যান।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাঠ করে যে জীবন আবিষ্কার করি তা কখনো বুঝে উঠতে পারি না, কিংবা তার অভিপ্রায় আমার উপলব্ধিতে সহজ হয়ে ওঠে না। শুধু মনে হয় আমি কবিতাটি লিখিনি কিন্তু কবিতাটি আমার। মনোভাবটি এমন যে, আমিই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছি। তাঁর নিজের কথা নয় আমারই কথা। বস্তুত এই উপলব্ধিজনিত সম্মিলন প্রায় সব রচনাতেই লক্ষ করা যায়। রবীন্দ্রনাথের কাব্যশিল্প অর্থাৎ তাঁর কবিতা ও গান আমাকে বিভান্বিত করে অলৌকিকের দরজা সাহিত্যচিন্তা ও বৈচিত্র্য পাঠ খুলে দেয়। আমি তাঁর কবিতা ও গানের হাত ধরে তাঁর অন্দরমহলে প্রবেশ করি। সেখানে কী আছে, কী নেই, তা নিজেকেই সনাক্ত করে নিতে হয়। নিজের শিল্পবোধ ও প্রবল অনুভব শক্তি দিয়ে কারো দূতালি সেখানে কাজ দেয় না। বিষয়টি বোধগম্যতাজনিত সমস্যা নয়, যে আমি বুঝতে অপারগ তাই আর কেউ এসে বুঝিয়ে দিক। আসল ব্যাপার, রসভোক্তার অনুভবে ও বোধে তার অনুরনন জাগছে কি না এটাই কথা। অর্থাৎ কারো মধ্যস্থতা নয়, পণ্ডিত বিশ্লেষক বা সমালোচকের প্রয়োজন সরাসরি ও সোজাসুজি প্রত্যক্ষ অন্তও বিনিময়ের-শিল্পবস্তু ও শিল্পভোক্ত উভয় দিক থেকেই। আর সেজন্যই শিল্প উপভোগ করতে হয় নিজস্ব ভঙ্গিতে, নিজস্ব চিন্তায় এবং ব্যক্তিগত প্রণোদনার অন্তর্গত চেতনা থেকে।
যে কেউ স্বাভাবিক ও সঙ্গত প্রশ্ন তুলতেই পারে। ব্যক্তি মানুষ কোন রবীন্দ্রনাথকে দেখেন? সোজাসাপটা সরল জবাব দেয়া যায় তিনি যেমন দেখতে চান। এর ভেতরে যে কথাটি লুকিয়ে থাকে তা একশো এক রকমে দেখা সম্ভব, তুমি ঠিক কোনো রূপটি দর্শনের ইচ্ছায় রাখো আগে তা ঠিক কর। এই বাঙালি কবি পুরুষটি যেন শতঝুরি বট, একনজরে চট্ করে সবটুকু কখনোই প্রকাশ্য নয়, দেখতে হলে নানান স্থানিক দূরত্বে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, কৌণিক অবস্থান ঠিক করে নিতে হবে একেবারে নিজের মতো করে। এটুকু নিতান্তই মানা যায় যে, দাঁড়িয়ে দেখার স্থান নির্দিষ্ট হয় যদি এবং সেই জায়গাটি দাঁড়ালে সকলে মনে হয় একই জিনিস দেখতে পাবে। কিন্তু সবাই একই স্থানে দাঁড়াবে কেন? এভাবেই রবীন্দ্রনাথ আমার হয়ে ওঠেন। এখানে আমার রবীন্দ্রনাথ এর দাবি যুক্তিসিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। আমার রবীন্দ্রনাথ তোমার নাও হতে পারে, তোমার রবীন্দ্রনাথ আরেকজনের নাও হতে পারে। তবে কি ‘নির্বিশেষ’ ‘সাধারণ’ রবীন্দ্রনাথ-যা সকলের যৌথ সম্পত্তি, এমন কিছু থাকবে না? থাকবে না কেন, অবশ্যই থাকবে। একেক জনের একেক রূচি ও অভিরূচি; সেখানে তো বাধ সাধার কিছু নেই। আসলে শিল্পের কাছে, শিল্পির কাছে যেতে হলে বা যাওয়া উচিত নিজের আন্তরপ্রেষণার তাগিদেই। শিল্পের ক্ষেত্রে এই তৃষ্ণাস্বরূপ যথার্থই নান্দনিক ক্ষুধা।
নিজস্ব আপনের অন্বেষণেই শেষ পর্যন্ত রবীন্দনাথ নিজের হয়ে যান। তা হতে হবে খোঁজার দরজা খোলার চাবি ‘রবীন্দ্রনাথ আমার’। এই ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ কিংবা কবি রবীন্দ্রনাথ বা শিল্পি রবীন্দ্রনাথ খুব সহজেই মানুষের ও পরের। বিচ্ছিন্ন মানুষের আমার রবীন্দ্রনাথকে শেষ পর্যন্ত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সত্যে স্থিত করানোর দায়ভার আমারই হয়ে যায়। তাই ব্যক্তির ওপরেই এই দায় ভার এবং ব্যক্তি থেকে সমাজে স্বাভাবিক গতিতে প্রবাহিত হওয়াই প্রত্যাশিত ব্যাপার। আমার রবীন্দ্রনাথ তাঁর জ্ঞানে প্রকাশিত হয়েছে আমার কাছে আত্মোৎসর্গের ধারণায়। রবীন্দ্রনাথ সেই ঐতিহ্যে সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন, সবার উর্দ্ধে উঠে এসে এবং লোভহীন দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে সাধারণ রবীন্দ্রনাথ। আর আমরা আলোকিত হয়েছি আত্মোশুদ্ধতার পথ ধরেই রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের প্রভাবে। আমার রবীন্দ্রনাথের সমকক্ষে এসময়ও কেউ নয়, একেই বলে রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ কবিতা গানে সহজ, স্বচ্ছ শব্দেই সৃষ্টি করেন অনির্দেশ্য ভাবনা ও অনিশ্চয়তার উচ্ছলন, তাঁর প্রকাশধর্ম কল্পনাকে এই শব্দবোধির চেতনায়-আলোয় উজ্জ্বল করে আবার তাঁর শিল্পি চেতনার গভীরতা অন্য প্রতীতিতে ভরিয়ে দেয় অন্তর। পরবর্তী কবিতাসমূহে ব্যক্তি রবীন্দ্রচেতনার প্রকাশধর্মই আমার কাছে প্রবল হয়ে ওঠে, প্রচ্ছন্ন হয়ে পড়ে নিজ্ঞানের স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনধর্মের উদ্ভাসন। আর তাঁর হাতেই রচিত হয় আমার ধ্রুপদি এক ব্যঞ্জনাধর্মী সাহিত্যিক ভাষা। আমার রবীন্দ্রনাথ ক্রমে ক্রমে চেতনার ও প্রজ্ঞার আলোর দীপিত করে তোলেন উপলব্ধির অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ ব্যক্তিজগতের ছবি ও ছন্দে। আত্ম-আমি থেকে সমাজবিশ্ব, পরমত্বে চলে যান এবং বদলে দেন ‘আমি’র সংকীর্ণ অহংকে বিশ্ব-আমি’র রূপে।
প্রকাশ ও সৃজনের দ্বৈতাদ্বৈত রবীন্দ্রনাথের What is art? I The Religion of Man রচনায় আমি খুজে পাই-সৃজনীশক্তির এক অমিয় উৎস, ‘উদ্বৃত্ত শক্তি’। অর্থাৎ জাগতিক দৈনন্দিন জীবনের অতিরিক্ত উৎকর্ষ। কল্পনাবৃত্তি কান্ট-পরবর্তী বিজ্ঞানবাদ ও রোমান্টিক দর্শনভিত্তিক মানবতন্ত্রের পরিশ্রুত রূপ। যার ভেতর জীবনচর্চা, যুক্তির বাঁধন ও মানবিয়তা। রবীন্দ্রনাথের এই যুক্তিশীল মানবতন্ত্রই অনুসৃত ও চর্চিত। তিনি কল্পনার সৌন্দর্যভিসারের দিকে ফিরিয়ে আনেন গভীর চেতনাবোধে। আমার সপ্রাণ প্রকৃতিকে ভালোবাসার অনুভূতির সৌন্দর্যচেতনায় রবীন্দ্রনাথ স্বতঃদ্বন্দ্বোত্তীর্ণ ও প্রগাঢ় প্রেমে বেঁচে থাকেন। একে কল্পনার আরেক প্রান্তে আধ্যাত্ববোধ, ব্যক্তিগত ঈশ্বরচিন্তা, ঈশ্বরচিন্তার স্বাধীনতা, ব্যক্তির আত্মোলোক বিভিন্ন মিথস্ক্রিয়ায় অনন্য নন্দনে উজ্জ্বল
‘আমায় নইলে তোমার প্রেম হত যে মিছে’; এই ‘তুমি’ এখানে অসম্পূর্ণ, আমি অহংমুক্ত ও পূর্ণসত্তাধারী হয় না এই ‘তুমি’ বিনে। ফলে ‘আমি’ সেই ‘চিরঅধরা’। রবীন্দ্রনাথের এরকম বিপুল সম্ভার বাঙালির এখনো অন্যতম মহৎ উত্তরাধিকার বলে মনে করা যায়। কেননা যে শুদ্ধ মানুষের আত্মবোধ এবং আত্মীয়-বোধে, এক হবার যে অনুভব, এটা সভ্যতার উষালগ্নের আদর্শর কল্পনার অনুসরণ করে। দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ জোর দেন অন্তরের পথের ওপর। ‘সে যে তার অন্তরের পথ’, তা ‘চিরস্বচ্ছ’ সহজ বিশ্বাসে সে যে করে তাকে চির সমুজ্জ্বল। জীবনের অন্তিম বেলায় রবীন্দ্রনাথের বলার প্রায় শেষ কথা। বলা যায় শুরু থেকে রবীন্দ্রনাথকে উজ্জ্বীবিত করেছে মানুষের অবিভাজ্য সত্তা। ‘সর্বে ভবস্ত সুখিন’:- ‘সবাই সুখি হোক’ কবি বার বার উচ্চারণ করেছেন। হৃদয়কে নাড়া দেয় মনের সৌকর্যে-তাই রবীন্দ্রনাথ আমার হয়ে অকুণ্ঠে গান- ‘যুক্ত করো হে সবার সংগে, মুক্ত করো হে বন্ধু’। অর্থাৎ জীবনের পূর্ণতাকেই তিনি স্পর্শ করতে চেয়েছেন। একজন শুদ্ধ মানুষের যে আত্মবোধে এক হবার যে অনুভব এই কল্পনার সংলগ্ন বিচ্ছিন্নতার সংবদ্ধতা ঘটান মানবিক চিন্তাবোধে। তাই কবি মহুয়ায় ‘সবলা’ কবিতায় উচ্চারণ করেন-
‘যাব না বাসরকক্ষে বধূবেশে বাজায়ে কিঙ্কিনি- ‘আমার প্রেমের বীর্যে
করো অশঙ্কিনী’। তিনি সততা ও নৈতিকতায় দেহের শূচিতাকে এক
সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন-যা শরীর ও আত্মবোধের সমষ্টিতে প্রতিষ্ঠিত থাকে।’
আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ এক ধরণের অপার বিশ্বাসকে উন্মোচিত করে দেয়। আর সেই বিশ্বাসেই রচিত হয় বিবিধমুখি রবীন্দ্রপাঠান্তরে। একই সঙ্গে তা গানে এবং কবিতায়। অনেক সময় আমিও আবু সাঈদ আইয়ুবের মতো রবীন্দ্রনাথকে ভেঙে ভেঙে এগোই সত্যিকারের নিষ্পত্তিতে পৌঁছাতে। তবে ঐ-যে ব্যক্তির বা মনের কোণের ডাক তা তো জীবনের, জীবনাবিদার। শেষ পর্যন্ত তাই রবীন্দ্রকাব্যের আলো, প্রাণ-আনন্দ আমাকে পৃষ্ঠপোষকতা যোগায় ক্ষণে ক্ষণে। সুরের আগুন যেন সবকিছুকে নির্বাপিত করে কিন্তু রবীন্দ্রনাথ স্বীকার্য থাকে। আবার উপর্যুক্ত চরণমালায় তৃপ্ত আশাবাদটি অনেক পথশ্রান্ত প্রতিরোধী সংশোধিত প্রতিশোধিত রবীন্দনাথ হয়ে যান। বিশেষণে প্রেম-প্রণয় মলয়প্রবণ আছে, চিরায়িত ধারণাসূত্রে; পরিশ্রুত সংস্কৃতির আরাধ্যতায় তা অনেকটা পৌরাণিক গন্ধজাত অনেক রূপে-বহু কৌণিক-বিশ্বজগৎ বিভাজাড়িত। তবে এ জীবনে প্রাকৃতিক বিধানের সত্যেই বেশি গৃহীত; যেখানে বৈদিক নৈতিক বিধান অগৃহীত-আধুনিক অগ্রগতিতে তা পরিলক্ষিত ফলে মঙ্গলবিধানের মাত্রাটি দৃঢ়তর নয়। তবুও বিশ্বয়করতা তো স্বীকার্য। এরূপে প্রায়োগিক সত্যে ক্লাসিক হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ। মানুষরূপ কায়েম হয় আরও সময় পরিচয়ের সিংহাসনে। যেমনটি বলছি প্রকৃতি-প্রণয় বিশ্বাসের কথা, ঐরূপ ঐতিহ্যচিহ্নিত কথা, কেন্দ্রে মনের মানুষ স্বীকারোক্তি পরাভব মানেননি-আমার প্রতিশ্রুতিশীল রবীন্দ্রনাথ। মূলত রবীন্দ্রনাথকে আবিস্কার করতে হলে তাঁর শব্দপ্রয়োগের মধ্যে যে শব্দপ্রয়োগ দ্বারা তিনি একটি রসাবেস সৃষ্টি করেছেন তাঁর কুশলী চিন্তায়। আমরা রবীন্দ্রনাথকে বিচার করতেই অগ্রসর হই বা দৃষ্টি দেই তার কাব্যদর্শনে। তিনি প্রায়ই আবেগকে ব্যবহার করেছেন নান্দনিক রূপে-কাব্যকুশলীর চেতনাবোধে। ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
‘তুমি নিজেকে কিছুতেই গোপন করতে পারবে না কেননা যে হৃদয়কে
তুমি আড়াল করতে চাচ্ছো সে হৃদয় তোমার চোখে ধরা পড়েছে।’
কবিতাটি এভাবে লেখা-
‘আপনারে তুমি করিবে গোপন
কী করি।
হৃদয়ে, তোমার আঁখির পাতায়
থেকে থেকে পড়ে ঠিকরি।’
আবার চোখের অনুভূতির চেতনায় সম্মিলিত হয়ে রূপলাভ করেছে তাঁর অন্য কবিতাগুলো। যা দৃশ্যের উন্মোচন করেছে এবং অনুভূতিকে নাড়া দিয়েছে ভিন্নভাবে। যেমন-
‘দেখো চেয়ে গিরির শিরে
মেঘ করেছে গগন ঘিরে,
আর করো না দেরি,
ওগো আমার মনোহরণ,
ওগো দ্বিগ্ধ ঘনবরণ,
দাঁড়াও, তোমার হেরি।’
কবি এখানে হৃদয়কে সৃষ্টির অশেষ অনুভবে প্রকাশিত করেছেন। এরকম অনেক উদাহরণ, শত শত উদাহরণ দেখানো সম্ভব ভালোলাগার রবীন্দ্রনাথে।
রবীন্দ্রনাথের কবিতায় অনেক উপকরণ খুঁজে পাই। কোনো উপকরণের জন্য আমি একজন পাঠক হিশেবে গ্রহন করি তা বলা কঠিন। অনেকেই কবির অনুভূতির বিশ্বস্ততাকে স্পর্শ করতে সক্ষম হন না। তারা হয়তো কবির শব্দগত কাব্যযোজনায় মুগ্ধ হন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে কবি তার ‘সেনসেশন’ বা সংবেদনশীল অনুভব করতে সক্ষম হন। কবি তাঁর বিশেষ এই সংবেদনটি নিঃসন্দেহে অনুভবযোগ্য অপরিহার্য।
রবীন্দ্রনাথ আমার পাশে হাঁটেন, কিন্তু আমি কখনো তাঁকে দেখি না, কখনো দেখতে চাই, কিন্তু তাঁকে অনেক সময় আমি গোপনে রাখি। আমি যখন কথা বলি তখন তিনি ধীর প্রশস্ত ভঙ্গিতে নির্বাক। আমি যখন মরে যাবো তখনও তিনি প্রকম্পিত দাঁড়িয়ে থাকবেন আমারই হয়ে। এমন হিমেনেস অস্তিত্বের প্রকাশ সর্বদাই তাঁর কাব্যে মুগ্ধ হই। আধুনিক কবিরা এখনও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে আশ্রয় খোঁজেন। আমিও বাঁচার তাগিদে ভালোবাসার তাগিদে রবীন্দ্রনাথকেই খুঁজে ফিরি সর্বক্ষণ। রবীন্দ্রনাথ বাঙালিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তাঁকে আমরা বাঙালি বলি যে বাঙলা ভাষার ব্যবহার করেন তাঁকে বাঙালি বলাই আমার কাছে অকৃত্রিম সত্য। রবীন্দ্রনাথ এখনও সমসাময়িক এবং আমাদের সমসাময়িকতার পুনরুদঘাটনে আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় মুক্তির পথকে উন্মোচিত করেছেন।
আজকে যারা রবীন্দ্রনাথ থেকে সরে গেছেন, সরে যাচ্ছেন এই সরে যাওয়া মানেই রবীন্দ্রনাথকে প্রত্যাখ্যান করা নয়। বরং আরোও বেশি তাঁকে অনুসরণ করা। রবীন্দ্রনাথ চিরকাল শুভচেতনা ও মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। যে মুক্তি নিজের-আমার। এভাবে দেখলে অরাবীন্দ্রিক চেতনার বাইরে কাউকেই নির্দিষ্ট করা যায় না।
আমার কাছে কাব্যের ব্যক্তিগত উচ্ছ্বাসের প্রাবল্যের চেয়ে ব্যক্তিসমাজের নিহিত ভাষা বিনিময়ের আর্তিই হচ্ছে আধুনিক কাব্যের মূল প্রেষণ। আর এই চেতনার নিজস্ব কাব্যভাষায় আসতেই হয় রবীন্দ্রনাথের মাঝে বারবার ফিরে আসে তৃপ্তির-অতৃপ্তির অধরা আবেগে। তাই বলি-যদি আমার রবীন্দ্রনাথকে অনেক তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় আমার অর্জিত জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে আরও বিস্তৃত করে লিখতে পারতাম তাতে হয়তো আমার ভালোলাগার রবীন্দ্রনাথকে বলা হতো না। জটিল করে উপস্থাপন করা যেত বটে কিন্তু আমার সহজ সরল রবীন্দ্রনাথ প্রকাশিত হতো না। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে তাঁর শিল্পচেতনা বিজ্ঞানমনস্কতায় গানের মূর্ছনায় আমি স্নাত হয়ে থাকতে চাই সবরকমের রবীন্দ্রনাথের সঙি হয়ে আমার জীবনে।





কমেন্ট করুনঃ