সাহিত্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কখনো নির্ভরতা অনেক বেশি হলেও কোনো কোনো চলচ্চিত্রকার যেমন গোদার সাহিত্যকেই চলচ্চিত্রনির্ভর করে দেন। দর্শকের মুখাপেক্ষী না থেকে গোদার দর্শকদেরই মুখাপেক্ষী করেছেন …
কবি, গল্পলেখক, চলচ্চিত্রকর্মী সাকিরা পারভীন আলাপচারিতার ভেতর গোদার সম্পর্কে মত জানতে চেয়েছিলেন তাঁর সম্পাদনায় প্রস্তাবিত গোদার গ্রন্থের জন্য। অনিবার্য কিছু কারণে গ্রন্থটি আর প্রকাশিত হয়নি। ছোট কাগজ ‘ধাবমান’-এর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশের অন্যতম কারণ হয়তো ধাবমানের প্রকাশন-সম্পাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন আমার বন্ধু, যিনি সাংবাদিকতা, মিডিয়া এবং চলচ্চিত্র বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। গোদার বিষয়ে আলাদা করে ভূমিকা লেখার প্রয়োজনীয়তা সম্পন্ন হয় আলাপচারিতায়।
First there was Greek civilization. Then there was the Renaissance. Now we’re entering the Age of the Ass.
-Jean-Luc Godard
চলচ্চিত্রের নিবিড় পাঠক হিসেবে গোদারকে কীভাবে পাঠ করেন
চলচ্চিত্রের ভাষা, ভাবনা এবং নির্মাণের বিপ্লবী শিল্পী গোদার। শুরু থেকেই নির্মাণ পথে ধ্বংস করেছেন সংস্কৃতির পুরোনো ধারণা। তিনি জানতেন ওই সংস্কৃতি সাম্রাজ্যবাদীদেরই ধরন, অজুহাত। প্রতিষ্ঠান এবং মূলধন বিনিয়োগকারীর মূল লক্ষ্য স্থিতিশীলতা, নির্বিঘ্নে মুনাফার আয়োজন, বিতর্ক বা বিপ্লব নয়, সফল ব্যবসা। এর জন্য প্রয়োজন প্রচলিত ব্যবস্থার কোনো ত্রুটি খুঁচিয়ে না তোলা। কিন্তু গোদারের ছবি নির্মাণে তেমন কোনো উদ্দেশ্য নেই; উদ্দেশ্য আছে অবশ্য সত্যের উন্মোচন এবং তার পরের …In my cinema, there are never any intentions … I don`t want to say anything, I try to show or to get feeling across or to allow something else to be said after the fact.গোদারের ছবির পাঠের লক্ষ্য হলো তাঁর নির্মাণ, ভাষা ও কৌশল বুঝে উঠতে উঠতে জানতে হবে তাঁর চলচ্চিত্রের ভাবনা ও দর্শন কী। শিল্পকর্মের সৃষ্টি বা নির্মাণই কখনো কখনো মুখ্য হয়ে ওঠে। কারণ নির্মাণের মধ্যে আছে স্রষ্টার দর্শন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি।

চলচ্চিত্র শুধু নয়, সব শিল্প বা কলা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে কতগুলো অনিবার্য বিষয়। মানুষের শরীরের গঠনে যেমন রক্ত, মগজ, অস্থি, মজ্জা ও রং—তেমনি কলারূপের নির্মিতি, স্রষ্টার শিল্পবোধ, জীবনদর্শন, সময়, সমাজ ও মানুষকে, প্রকৃতিকেও দেখবার দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন বিষয়। চারপাশের সবকিছুর ভেতর কার্যকারণ সম্পর্কগুলো বুঝে দেখবার সংবেদনশীল মন শিল্পী বা তাঁর সৃষ্টির জাতকে চিনিয়ে দেয়।
চলচ্চিত্র বিষয়ে গোদারের নিজস্ব পাঠ আলোচনায় দেখব গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক জুড়ে তাঁর প্রস্তুতির পথে অন্তত ছয়টি ছোট আয়তনের ছবি তোলা থেকে ‘আ বু দ্য সুফল’ (ব্রেথলেস) পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে গোদার চলচ্চিত্রের মাধ্যমটিকে বা এই কলারূপটিকে তাঁর করে বুঝে উঠেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ১৯২৯ সনে নভেম্বর মাসে একটি চিঠিতে চলচ্চিত্র বিষয়ে তাঁর ভাবনার কথা অথবা তিনি তখন পর্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে চলচ্চিত্রশিল্পের যাত্রাপথে সৃষ্টি যে কয়েকটি ছবি দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, তার ভেতর থেকেই তাঁর যে ভাবনা গড়ে ওঠে, সেসবই ওই ছোট চিঠিতে লেখেন। গোদারের জন্ম (১৯৩০) তখনও হয়নি।
ওই চিঠি থেকে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করব এই জন্যই যে, গোদারের ছবির দর্শক হিসেবে, নিবিড় পাঠক হিসেবে কথা বলাটা সহজ হয়ে উঠবে। সাকিরা, আপনি নিজেও একজন সৃজনশীল লেখক ও চলচ্চিত্রকর্মী হয়ে বুঝে উঠতে চাইবেন ছবিগুলোর নির্মাণে গোদার যে কৌশল ব্যবহার করেছিলেন, যেভাবে বিশেষ প্রয়োজন থেকে উদ্ভাবিত টেকনিক গোদারের নিজস্ব হয়ে উঠল, তাঁর সৃষ্টিকে স্বতন্ত্র করে তুলল, তার কারণ কী হতে পারে!
আবার তাঁর শিল্পসৃষ্টির কিছু ভাবনা রবীন্দ্রভাবনা ও আশঙ্কার সঙ্গেও মিলে যায়। পুঁজি ও প্রযুক্তিনির্ভর চলচ্চিত্র মাধ্যম শুধু সৃজনশীলতানির্ভর নয়। রবীন্দ্রনাথ গোদারের জন্মপূর্ব সময়ে বলছেন, ‘ছায়াচিত্রের আয়োজন আর্থিক মূলধনের অপেক্ষা রাখে, শুধু সৃষ্টি শক্তির নয়।’ কারণ সাহিত্য, সংগীত বা চিত্রকলায় উপকরণ দুর্লভ, দুর্মূল্য নয় বলেই তিনি মনে করতেন।
তিনি বলেছেন, ‘উপকরণের বিশেষত্ব অনুসারে কলারূপের বিশেষত্ব ঘটে।’ তিনি বলেন, চলচ্চিত্রের মূল অর্থাৎ ‘ছায়াচিত্রের প্রধান জিনিসটা হচ্ছে দৃশ্যের গতিপ্রবাহ। এই চলমান রূপের সৌন্দর্য বা মহিমা এমন করে পরিস্ফুট করা উচিত যা… আপনাকে সম্পূর্ণ সার্থক করতে পারে।’
এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আরও একটি মোক্ষম পর্যবেক্ষণ উল্লেখ প্রয়োজন। আমরা জানি, কলারূপের অন্য সব মাধ্যমের চেয়ে চলচ্চিত্র অনেক বেশি দর্শকমুখাপেক্ষী। প্রচুর মূলধন বিনিয়োগ শেষেও যদি দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেয়! চলচ্চিত্রের এই একটি জটিল বিপ্রতীপ অবস্থা—একদিকে তার শিল্প হয়ে ওঠা, অন্যদিকে সেই শিল্প দর্শকের মনোগ্রাহী করে তোলা। আর তা না হলেই স্রষ্টার সৃষ্টিকর্মে চরম বিপর্যয়।
এজন্য চলচ্চিত্রে কলারূপের বদলে সহজ বিনোদন সৃষ্টির মশলা ছবির প্রাবল্য বাড়ে। রবীন্দ্রনাথ সেই ১৯২৯ সালেই এই সংকটের প্রসঙ্গটি তুলেছেন। তিনি বলেছেন…
‘রূপের চলৎপ্রবাহ কেন একটি স্বতন্ত্র সৃষ্টিরূপে উন্মেষিত হবে না? হয় না যে সে কেবল সৃষ্টিকর্তার অভাবে এবং অলসচিত্ত জনসাধারণের মূঢ়তায়। তারা আনন্দ পাবার অধিকারী নয় বলেই চমক পাবার নেশায় ডোবে।’
গোদারের ছবি পাঠে এই কথাগুলোর প্রাসঙ্গিকতা বুঝতে পারছি না! রবীন্দ্রনাথ কেন এই চিঠি লিখেছিলেন?
২৬ নভেম্বর ১৯২৯ তারিখে নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ীর ছোটোভাই মুরারি ভাদুড়ীকে লিখেছিলেন। কারণ মুরারি চলচ্চিত্র বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মতামত জানতে চেয়েছিলেন। যাইহোক, এটি বড়ো কথা নয়। আপনার প্রশ্নটি হলো এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। যে শিল্পমাধ্যমটি দর্শকমুখাপেক্ষী, অথবা বাজারমুখাপেক্ষী, তখন যে সংকট শিল্পীর সামনে এসে পড়ে তা হলো মূলধনের জোগান এবং ওই ব্যাপক মূলধনের বিনিয়োগ শেষে মুনাফার সাফল্য। এই সাফল্যের অভাবেই চলচ্চিত্রের স্রষ্টা হতোদ্যম হয়ে পড়বেন। চমক পাবার আশা যে সব দর্শকের, তাদের কাছ থেকে একজন প্রকৃত শিল্পী কী প্রত্যাশা করতে পারেন।
এ ছাড়াও চলচ্চিত্রের আয়োজন এবং উপকরণের দুর্মূল্যতা—রবীন্দ্রনাথের এই পর্যবেক্ষণ ও বিবেচনাসমূহ থেকে লক্ষ্য করবেন, গোদারও তাঁর প্রথম ছবি থেকেই নির্মাণব্যয় যে যে ভাবে কমিয়ে আনা যায় তার সবগুলো পরীক্ষা করে নিয়েছেন। গোদারের ছবি দেখার যে অভিজ্ঞতা, তার প্রধান একটা দিক হলো ওই সব পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো। কী ছিল সেই নিরীক্ষা, অথবা ওই সব নিরীক্ষা ও টেকনিক কীভাবে গোদারের চলচ্চিত্রভাষা সৃষ্টির নিজস্ব পথ হয়ে উঠল! এবং ওই নিজস্ব ভাষা সৃষ্টির জন্যই গোদার চিত্রভাষার ব্যাপারে বিপ্লবের পুরোধা হয়ে উঠলেন। এই মতটি আপনি জানেন, সত্যজিৎ রায়সহ অনেকেরই।
তো জাঁ লুক গোদার লোকসানের ভয়ে চমক দেওয়ার বায়োস্কোপ না বানিয়ে খরচ কমিয়ে কীভাবে শিল্পসফল ছবি তোলা যায় তার নজির একের পর এক সৃষ্টি করে গেলেন। শিল্পবহির্ভূত বা শিল্পের সঙ্গে আপস করার ফর্মুলাগুলো উপেক্ষা করে কম খরচে সৃষ্টি করলেন ব্রেথলেস।

ছবিতে খরচের ক্ষেত্রে গোদার বিবেচনা করলেন দুটি বিষয়—এক ধরনের খরচ করতেই হবে, অন্য ক্ষেত্রের খরচ কমিয়ে আনা সম্ভব। যেমন ক্যামেরার ভাড়া এবং ল্যাবরেটরির ভাড়া কমানোর সুযোগ কম হলেও, মোট খরচ কমানোর সুযোগ সেখানেও আছে। অতিরিক্ত ফিল্ম ব্যবহার না করে তিনি পেশাদার আর্টিস্টদের দিয়ে যথাযথ অভিনয় করিয়ে নিতে পারলে ফিল্মের খরচ ও ক্যামেরার দীর্ঘ সময়ের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা যায়। একই দৃশ্যের বহুবার শট নেওয়ার জন্য ওই দুটি খরচই বেড়ে যায়।
ব্রেথলেস-এর মূল অভিনেতারাই পেশাদার ছিলেন। আবার Tracking shot-এর নিয়মমতো লাইন পেতে ট্রলিতে বা গাড়িতে শট নেওয়ার খরচ অনেক। প্রথমত সময়সাপেক্ষ, দ্বিতীয়ত শ্রম ও সরঞ্জামের ব্যয়। গোদার এই রকম খরচ হতে দিলেন না। তিনি ক্যামেরাম্যানের কাঁধে হাতে ক্যামেরা ধরিয়ে দিলেন, নির্দেশনামতো হাঁটিয়ে প্রয়োজনীয় Tracking shot নিলেন। সময় বাঁচল অনেক। শুটিংয়ের ক্ষেত্রে সত্য হলো-টাইম ইজ মানি।
হাতে ক্যামেরা নিয়ে শট তুলতে গেলে হাত কাঁপবে, কাঁপবে ইমেজ। এভাবেই তিনি সারা ছবিতে শটগুলো নিলেন। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলব—পারফেকশন বা নিটোল নির্মাণের যে ধারণা প্রচলিত আছে, গোদার তা উপেক্ষা করেই নতুন এক চিত্রভাষা তৈরি করলেন। কারণ চলচ্চিত্র এমন এক মানবসৃষ্ট শিল্প, তা সম্পূর্ণ মেশিনে তৈরির ফিনিশিংয়ের প্রয়োজন আছে কি?

ব্রেথলেস তৈরি করার আগে বেশ কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি বানিয়ে হাত পাকিয়েছেন শুধু নয়—ফিল্ম অ্যাডিক্ট গোদার ব্যাপক ছবি দেখার পাশাপাশি নিজের চলচ্চিত্রপাঠ ও আলোচনা লিখে চলেছেন। সাধারণভাবে আমরা যাকে চলচ্চিত্র সমালোচক বলে থাকি, সেই আলোচনায় তিনি বিশিষ্ট হয়ে উঠেছিলেন। Cahiers du cinema-র অন্যতম আলোচক, প্রেরণা পেয়েছেন, একসঙ্গে কাজ করেছেন কিংবদন্তিতুল্য চলচ্চিত্রবোদ্ধা আলোচক Andre Bazin-র।
গোদার তখন ওই পত্রিকায় একসঙ্গে কাজ করেছেন ত্রুফো, শাব্রল, রিভেত প্রমুখ বিখ্যাত আলোচক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে। এই প্রসঙ্গটি এই জন্যই বললাম, গোদার কিন্তু চলচ্চিত্রশিল্পের নির্মাণভাষা ও পারফেকশন বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন।
যাইহোক, এই প্রসঙ্গ আর বড় করব না। শুধু বলব তাঁর ভাষা ও টেকনিকের আরও দুটি ক্ষেত্রের কথা—ডিজলভ এবং ফেড-ইন অথবা ফেড-আউট মূলত ল্যাবরেটরির রাসায়নিক প্রক্রিয়া। অবশ্যই ব্যয়সাপেক্ষ। দৃশ্যান্তর বা ভাবান্তরের ক্ষেত্রে ডিজলভ এবং ফেড-এর ব্যবহার এখন অনস্বীকার্য। আপনি দেখেন, ১৯৫০-৫১ সালে তোলা সত্যজিৎ রায় তাঁর পথের পাঁচালীতে কী সফলভাবে এই ডিজলভ ও ফেড ব্যবহার করেছেন, আর ১৯৫৯-৬০ সালে ব্রেথলেস নির্মাণের সময় এই বহুচলিত পথটি তিনি পরিহার করে শুধুমাত্র কাটের সাহায্যে এক দৃশ্য থেকে অপর দৃশ্যে গেলেন।
এতে ছবিতে এক নতুন হোঁচট এল। মসৃণ ফিনিশিংয়ের পরিবর্তে লাফিয়ে লাফিয়ে যাওয়ার মতো, বলা হলো ‘Jump cut’ পরে এই Jump cut গোদারের ভাষা হয়ে উঠল।
ডিপ ফোকাসসহ আরও অনেক বিষয়, বিশেষ করে ছবিতে তাঁর কথা বলা, বলার বিষয় এবং কাহিনির ভেতর মার্ক্সীয় চিন্তা তিনি যেভাবে চিত্রভাষায় ব্যবহার করেছেন, সেসব নিয়ে আমাদের আলাপচারিতায় কিছু কথা হতে পারে। এই প্রসঙ্গে Dziga vertov Group নিয়েও কথা হবে।
Dziga vertov Group !
আপনি জানেন, সাকিরা, ১৯৬০ দশকের মাঝামাঝি পর্যায়ে ফরাসি সংস্কৃতিতে ভোগবাদী পুঁজিতন্ত্রের বড়ো উৎপাত শুরু হয়। মার্ক্সীয় দর্শনে ঋদ্ধ, সমাজের প্রকৃত সত্যানুসন্ধানী গোদার তখন সিনেমা হলমুখী ফিচার ফিল্ম তৈরিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ১৯৬৭ সালে উল্লেখযোগ্য ছবি ‘উইকেন্ড’-এর পর আর বাণিজ্যিক ছবি তুলবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেন।
সেই সময় বন্ধু সহ-চলচ্চিত্র নির্মাতা Jean Pierre Gorin মিলে গড়ে তোলেন Dziga, গোরিনও ছিলেন র্যাডিক্যাল লেফটিস্ট। ফুকো, লাকাঁর মতো দার্শনিকদের শিষ্য। গোদারের সঙ্গে প্রথম সখ্য তৈরি হয় ১৯৬৬ সালে। বারো-তেরো বছরের ছোট গোরিন এবং গোদার মিলে ১৯৬৮ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত মূলত মাওবাদী মার্ক্সবাদী প্রেরণায় নির্মিত সব ছবির একটি যৌথ সংগ্রহ তৈরি করেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৬৭ সালে প্যারিসে মাওবাদী তরুণদের কার্যক্রম ও চিন্তাভাবনা কেন্দ্রিক চিত্রনাট্য তৈরি করেন গোদার। এই সময়ে গোরিনের সঙ্গে এই ছবি La chinoise-কে কেন্দ্র করে বিস্তর আড্ডায় সখ্য বেড়ে একটি গ্রুপ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

Dziga vertov (১৮৮৬-১৯৫৪) ছিলেন মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী র্যাডিক্যাল রাশিয়ান চলচ্চিত্রকার এবং একজন চলচ্চিত্র-তাত্ত্বিক। cinema verite স্টাইল প্রভাবিত হয় Dziga-র প্রামাণ্য ও সংবাদচিত্র নির্মাণের ভঙ্গিতে। Dziga-র তত্ত্ব kino-pravda ফরাসি দেশের cinema verite বা Truthful cinema-র মূল প্রেরণা।
যাইহোক, আমাদের কথা নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। আসলে গোদারকে ভালোভাবে বুঝতে সেই সময়ের চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি, ইতিহাস, রাষ্ট্রের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা উচিত। তা না হলে আমরা বুঝব কীভাবে আলোকচিত্রের একটি সত্যের পাশে সিনেমার এক সেকেন্ডে ২৪টি সত্য উন্মোচিত হয়। তাঁর ভাষায়—Photography is truth, The cinema is truth 24 times per second।
কথাসাহিত্যিক হিসেবে গোদার-পাঠ আপনার কাছে জরুরি মনে হয়েছে কেন? তাঁর নির্মাণভঙ্গি কোনোভাবে প্রভাবিত করেছে কি না?
গোদার কেন জরুরি এবং তাঁর প্রভাব নিয়ে আপনার প্রশ্নের উত্তরে গোদারের মনের গঠন এবং চলচ্চিত্র-দর্শনের বিষয়টি বুঝে নিতে হবে। লক্ষ্য করবেন, গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১২ মিনিট, ১৩ মিনিট, ১০ মিনিট, ১৭ মিনিট—এমন দৈর্ঘ্যের ছোট ছবিগুলো নির্মাণের পাশাপাশি চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। তাঁর চলচ্চিত্র-আলোচনার মধ্যেই আমরা তাঁর মনোভঙ্গি আবিষ্কার করতে পারি।
প্রথাগত নৈতিকতা-নির্ভর গল্পগাথার অন্তঃপ্রদেশের ফাঁকা আওয়াজ, মিথ্যা ভাষা, অতিকথন এবং সত্যকে আড়াল করার প্রয়াসকে তিনি তীব্র সমালোচনা করেন। প্রথম থেকেই গতানুগতিক নির্মাণ এবং প্রথাগত চিত্রভাষার তিনি কড়া সমালোচক। বাক্বন্দী সব ধারণার অথবা প্রথা ও ঐতিহ্যের প্রতি তিনি প্রকাশ করেন ব্যাপক অনাস্থা।
গোদার প্রথাগত ভাষার বিরোধী শুধু নয়, নতুন পথ তৈরির প্রকৌশলী, শিল্পী। ব্রেথলেস নির্মাণের সময়ই নিয়মে বাঁধা সূত্র, ধারণা ইত্যাদির কবর রচনা করে নতুন চিত্রভাষা তৈরি করলেন। শিল্প এবং পারফেকশনের নতুন ধারণায় আলাদা মাত্রা দিলেন।
এই গোদারের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ আয়োজিত Film appreciation course-এ ১৯৮৪ সালে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় অথবা ৩য় বর্ষের ছাত্র। তারেক মাসুদও সে বছর এই কোর্সে ছিলেন। ফিল্ম অ্যাডিক্ট গোদার তাঁর প্রথম ছবি দিয়েই আলোড়ন তুললেন চিন্তার জগতে।
সাহিত্যের প্রচলিত গল্প ও নির্মাণের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও আস্থা বিকল করে দিতে গোদারের বেশ কয়েকটি ছবি, যেমন Week-end, Alphaville, Masculin Feminin, Pierrot Le Fou—হয়ত যথাযথ।
আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বইয়ের দশকে চলমান নানা অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর্ব থেকে লক্ষ্য করবেন ব্যাংক, বিমাসহ নানা প্রতিষ্ঠানের বেসরকারিকরণ, ব্যক্তি মালিকানায় ব্যাংকসহ বহু স্কুল তৈরি হতে থাকে, যার ভাষা ইংরেজি। ইন্টারনেট এবং কম্পিউটার প্রযুক্তির প্রসার—এসবই আমাদের প্রচলিত মূল্যবোধ, প্রথাগত রীতিনীতির পাশে নতুন দৃষ্টির সুযোগ এনে দেয়।
ঠিকই, কিন্তু এসব বাহ্যিক বিষয়ের চেয়ে একজন চলচ্চিত্রকর্মী হিসেবে মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র-ভাবনায় গোদারের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, অপ্রচলিত পথ ও নতুন কৌশলের আবিষ্কার স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল মনে প্রভাব ফেলবে।
Pierrot Le Fou-তে দেখান দাম্পত্য জীবনে একজন অসুখী মানুষ ফার্নিদাদের ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার গল্পে কতগুলো নতুন জগতের উন্মোচন ঘটে। প্রথমত, Pierrot.. একটা রোড ড্রামা। প্যারিস থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এই যাত্রার সঙ্গী করে নিলেন এমন এক তরুণীকে, যাকে খুঁজছে উগ্রবাদপন্থি টেরোরিস্ট OAS। এই OAS আলজেরিয়াকে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীন হতে দেবে না; তাদের কথা, আলজেরিয়া ফ্রান্সের এবং ফ্রান্সেই থাকবে।
তাহলে অসুস্থ সম্পর্ক, দমবন্ধ হওয়া অভ্যাস, সামাজিকতা থেকে ফার্নিদাদ মুক্তির স্বাদ চায়। সঙ্গী মারিয়া। একটি রোমান্টিক রোড ড্রামাকে অন্য এক মুক্তির ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে কেমন নতুন মাত্রায় স্বাধীনতার ব্যঞ্জনা তৈরি করলেন।
Masculin, Feminin ছবিটি হতে পারত নিউ ওয়েভ মুভমেন্টের অন্যতম কাণ্ডারী গোদারের নারী-পুরুষের ভালোবাসা এবং পুরুষের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব, নারীর নিগ্রহ ইত্যাদি ইত্যাদির গল্প। অথচ গোদার এই ছবিতে নারীর অসহায়ত্ব, বিপন্নতার গল্পটিকে চরিত্রসমূহের সংশ্লিষ্টতা, পপ কালচার, ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং মার্ক্সীয় দর্শনের আলোকে ক্ষমতা এবং মিডিয়ার তৎপরতার মধ্যে সময়ের অন্তর্লীন বাস্তবতাকেই সরব করে তোলেন।

অর্থাৎ শিল্পী হিসেবে গোদারের চিন্তা কখনো আপস করছে না। গোদারের শিল্প-দর্শনের ভেতর রাজনৈতিক দর্শন উপেক্ষিত না হয়েও স্বতন্ত্র এবং প্রবল একটি চলচ্চিত্রের ভাষা গড়ে ওঠে। প্রথা এবং ব্যবসার কাছে মুনাফা-স্বার্থের বদলে সমষ্টির স্বার্থ কখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না।
গোদারের নির্মাণের বিশিষ্ট ভঙ্গির সঙ্গে শিল্পের আত্মা যেভাবে, যতভাবে তির্যক হয়ে ওঠে, প্রচলিত প্রথাকে, প্রাচীন নৈতিকতাকে যেভাবে উপেক্ষা করে যেতে পারে, তা নিশ্চয়ই উত্তরকালের সংবেদনশীল লেখক-শিল্পীদের প্রভাবিত করবে।
লক্ষ্য করার মতো একটি চিত্রভাষা এই Masculin, Feminin-এ প্রয়োগ করেন। সিনেমা ভেরিতে অথবা তথ্যচিত্রের নির্মাণভঙ্গি অনুসরণ করে শিল্পীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ। মনেই হতে পারে, মধ্য ষাটের দশকে পুঁজিবাদী সংস্কৃতির চরম বিকাশের সময়ে তরুণদের প্রেম, ভালোবাসা, বিপ্লব, সংগীত নিয়ে তিনি স্যাটায়ারধর্মী তথ্যচিত্র তৈরি করছেন। কারণ তিনি বলছেন— ‘There is no point in having sharp images when you have fuzzy ideas’ ।
পুঁজিবাদী এবং তারও আগের সামন্ত সমাজ থেকে চলমান শিল্প সম্পর্কে যেসব শুদ্ধ ধারণা লালন করা হয়, নন্দনতাত্ত্বিক সেসব ধারণার বিপরীতে প্রয়োজনে নতুন শিল্পী নতুন করে শিল্পকে দেখাবে। কারণ তিনি চান—-‘ What I want above all is to destroy the idea of culture. Culture is an alibi of imperialism.’
অব্যবস্থা, বৈষম্য এবং পুরোনো ধ্যানধারণা—তা শিল্প বা রাষ্ট্র যাই হোক না কেন—তিনি তার নিষ্ঠুর সমালোচনায় আগ্রহী। একসময় Cahiers du cinema-এর পাতায় লিখে সমালোচনা করতেন, পরে চলচ্চিত্রকার হিসেবে ছবিতেই তাঁর সমালোচনাকে মুখ্য করে তোলেন। তাঁর ভাষায়, ‘I`m still as much of a critic as I even was during the time of cahiers du cinema, the only difference is that instead of writing criticism, I now film it.’ সাহিত্যের সবগুলো শাখাকেই গোদার তাঁর নির্মাণকৌশলে আমলে নিয়েছেন, বিষয়টি সম্পর্কে আপনার বাহাস অথবা ব্যাখ্যার জায়গা কী রকম!
সব কালেই প্রকৃত সৎশিল্পী শিল্প সম্পর্কে নিজস্ব ভাষা, ধারণা, দর্শনের চর্চা করেন। জাঁ লুক গোদার তেমন শিল্পীদের মধ্যে উজ্জ্বল। এখানে বাহাস বা কনফ্রন্টের সুযোগ কম, বরং উপলব্ধি এবং পাঠই ঠিকঠাক পথ। শিল্প নির্মাণের পথ ও ধারণার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। শিল্পীর স্বাধীন চিন্তা বাধাগ্রস্ত হয় শুধু কূপমন্ডূক সমালোচকের ষড়যন্ত্রে।
চলচ্চিত্রের দর্শক, সমালোচক থেকে নির্মাতা হয়ে উঠতে উঠতে এই মাধ্যমটির সামাজিকতা, শক্তি, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গোদার ধারণা করে নিয়েছিলেন। নিউ ওয়েভের শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ গোদার, কিন্তু সাত-আট বছর পরে অর্থাৎ ১৯৬৭ সালেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। দূরত্ব বাড়ে বন্ধু ত্রুফো, শ্যাব্রলের সঙ্গে, ঘনিষ্ঠতা হয় মিলিট্যান্ট ছবির নির্মাতা, মার্ক্স-মাও দর্শনের অনুরাগী তরুণ Jean pierre Gorin-এর সঙ্গে। গড়ে তোলেন Dziga vertov group এবং ১৯৬৭ সালের শেষ থেকে নির্মিত ছবিগুলো এই গ্রুপের দর্শনে আলোড়িত।
La chinoise (১৯৬৭) থেকে ১৯৭২-এর মধ্যে নির্মিত ছবিগুলোকে ketov গ্রুপের জন্য বিবেচনায় নিতে হয়। অর্থাৎ একজন স্বাধীন শিল্পী হিসেবে, সক্রিয় জীবন্ত শিল্পী হিসেবে সময়-কাল-প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত চিন্তা ও শিল্পরুচির নতুন প্রস্তাবনা তৈরি হয়।
দর্শক, পাঠকের এবং চলতি সমাজের বাজারচাহিদা মতো শিল্প-পণ্য সরবরাহ করে সাহিত্য ও সিনেমার ব্যবসায়ীরা। বাজারি লেখক-শিল্পী (!) দর্শককে চমক, বিনোদন দেওয়ার ফর্মার বাইরে যেতে পারে না।
গোদার সিনেমাকে যেভাবে বুঝতে চান, তাঁর নির্মাণ সেই পথ ধরেই এগোয়। সুরধ্বনিময়, সুললিত, নিপুণ ইমেজ গেঁথে গেঁথে গোল একটি আরামদায়ক সিনেমা নির্মাণের শিল্পী নন গোদার। তাঁর কাছে তথাকথিত সম্পাদনা হলো মিথ্যা তৈরির কৌশল- ‘Every edit is lie.’
তাঁর এই বক্তব্যের মূল কথা হলো, স্বতঃস্ফূর্ত চলমানতাকে থামিয়ে পরিচালক নিজের চিন্তামতো নতুন সম্পাদনা করে ইমেজ জোড়া লাগিয়ে লাগিয়ে সত্যের বিনাশ করেন।
গোদার ছবিতে কবিতা বা সংগীত সৃষ্টি করেন না, বরং চলচ্চিত্র তাঁর কাছে যতটা গল্প, তার থেকে অনেক বেশি প্রবন্ধ। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে নতুন চিত্রভাষা, বৈজ্ঞানিক রীতি প্রবর্তিত হয়েছে, তার নেতৃত্বে গোদারই আছেন মুখ্য ভূমিকায়।
চলচ্চিত্র শুধু শিল্প-শোভন বিনোদন নয়, গোদারের কাছে একটা গল্পের বুননের ভেতর দিয়েই চলে বুদ্ধিদীপ্ত আক্রমণ। গোদার বলছেন, ‘My aesthetic is that of the sniper on the roof’ এইভাবে ইতিহাস, সাহিত্য, অর্থনীতি, সমাজনীতির বিশ্লেষণ চলে তাঁর ছবিতে। যথাযথই বলেন, ‘I thing of myself an essayist producing essays in novel form or nobeI in essay form only instead of writing I film them.’
প্রবন্ধধর্মিতা শুরু থেকেই তাঁর ছবিতে থাকলেও ১৯৬৮ সালে গঠিত Dziga vertov group-এর অন্তর্ভুক্ত ছবিগুলোতে প্রবন্ধ রচনার প্রয়াস যেন বেশি স্পষ্ট।
সাহিত্যের সব শাখা, অন্যভাবে শিল্পের সব রূপেরই সমন্বয় ঘটে চলচ্চিত্রে। তবে সাহিত্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কখনো নির্ভরতা অনেক বেশি হলেও কোনো কোনো চলচ্চিত্রকার, যেমন আমাদের গোদার, সাহিত্যকেই চলচ্চিত্রনির্ভর করে দেন।
সিনেমার ফর্মকে তিনি এমন বিভিন্নমুখী, বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত করে আঙ্গিকের একটি নতুন প্রস্তাবনা, অর্থাৎ ফিচার ফিল্মের প্রথাগত স্বরূপের নতুন রূপ সৃষ্টি করেন। সমালোচনা, দর্শক, বিতর্ক, গল্প, সাক্ষাৎকার, প্রবন্ধ মিলিয়ে যেন নতুন এক শিল্পরূপ। আঙ্গিক সম্পর্কে প্রথাগত ধারণার বদল ঘটে।
গোদারের প্রবন্ধ-চলচ্চিত্রের মতো সাহিত্যে নতুন রূপের বিকাশ ঘটেছে—গল্প-প্রবন্ধ, গল্প-প্রতিবেদন, সাংবাদিক-প্রতিবেদনে। গল্প-প্রবন্ধ, গল্প-প্রতিবেদন নির্মাণের উদাহরণ এখন বিরল নয়। গল্প-প্রবন্ধ, গল্প-প্রতিবেদন, উপন্যাস বা আখ্যান-প্রবন্ধে চরিত্র সৃষ্টি ও আখ্যানের আবহ সৃষ্টি করে সিরিয়াস প্রবন্ধের নির্মাণ হয়।
এই রীতি ষাটের দশকের শেষ দিকে গ্যাব্রিয়েল মার্কেস শুরু করেন সফলভাবে। গল্প-প্রবন্ধ ও আখ্যান-প্রবন্ধের কয়েকটি গ্রন্থ আমারও রয়েছে।
গোদারের প্রবন্ধ-চলচ্চিত্রের মুখ্য কেন্দ্রে থাকছে চিন্তাশীলতা, চিন্তার উদ্রেক, প্রশ্নের উত্থাপন এবং বিতর্কসহ দর্শককে বিব্রতকর অবস্থায় দাঁড় করানো। তাঁর চলচ্চিত্র চিন্তা করে এবং চিন্তা করতে উসকে দেয়, দানা বাঁধে প্রশ্ন।
ব্রেথলেস থেকেই নিপুণ গল্প বলার বদলে চিন্তাশীল প্রবন্ধের বীজ লক্ষণীয়। কারণ শিল্পের বুর্জোয়া ধারণা বা নিখুঁত সম্পাদনার মাধ্যমে এক গল্প গড়ে তোলা—চলচ্চিত্রের এই তথাকথিত এসথেটিক গোদারের নয়। তাঁর কাছে— Cinema is the most beautiful fraud in the world.
গত শতকের, বিশেষত ষাটের দশকের যে জীবনচিত্র বিবিধ সিনেমায় তিনি উপস্থাপন করেছেন, পরবর্তী ষাট বছর পরেও সে সব থেকে সমাজ, রাষ্ট্র, মানুষ বের হয়ে আসতে পেরেছে?
লক্ষ্য করুন, গোদারের ছবির বিষয় ও ভাবনার ক্ষেত্রগুলো নিজদেশ ফ্রান্স হলেও গ্লোবাল। গোদারের ভাবনার প্রাসঙ্গিকতায় কোনো পার্থক্য ঘটে না। প্রেম, ভালোবাসা ও ভালোবাসায় প্রতারণা, ভোগবাদিতা, যুদ্ধ, রাজনৈতিক দর্শন, দেশে দেশে বিপ্লব, শোষণ, জনপ্রিয় সংস্কৃতি, নারীর অবদমন, পুরুষের আধিপত্যবাদী মনোভাব—এই সব উপাদান বা অবস্থার কোনো পরিবর্তন কি আদৌ ঘটেছে? না, ঘটেনি; বরং আরও তীব্রতর হয়েছে।
সোভিয়েত ব্যবস্থা ভেঙে গেছে, সমাজতান্ত্রিক আদর্শ, লিবারেলিজম পশ্চিমের বড়ো বড়ো রক্ষণশীল রাজনৈতিক দলের কাছে অত্যন্ত নিন্দনীয়। তাদের প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার অস্ত্র হিসেবে বলে—ওরা Left, ultra left, liberal ইত্যাদি।
তো জীবনচিত্র, রাষ্ট্রচিত্রের পরিবর্তন নেই একেবারেই, ঘটেছে প্রসারণ। সমাজ, চিন্তা, রাষ্ট্র বদলের ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের ভূমিকা যে বর্তমানে আরও অকার্যকর, তা নিজেও বলেছেন। তাঁর কাছে চলচ্চিত্র হলো ‘Beautiful fraud,’ এবং তিনি মনে করেন- ‘It is over there was a time maybe when cinema could have improved society, but that time was missed’.
এই জন্য গোদারের মতো সত্যানিষ্ঠ, সাহসী শিল্পীর প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায় না; বরং নতুন প্রজন্মকে সাহসী করে, নতুন করে দেখবার চোখ সৃষ্টি করে।
গোদার কেন আপনার প্রিয়?
সাহিত্যের প্রধান উপকরণ ভাষা, চলচ্চিত্রের তেমন ইমেজ। এখন ভাষার মধ্যে যখন থাকে রূপ ও অর্থ পরিবর্তন করার ক্ষমতা, একাধিক বিকল্প শব্দের ব্যবহারের সুযোগ, সত্য ও কল্পনাকে ভাষায় গুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও—তাহলে সেই ভাষা স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে। ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে পারে, মতলববাজ নিজের মতলবমতো ভাষাকে প্রয়োগ করতে পারে।
একইভাবে প্রযুক্তির কারসাজি ছাড়াও চিত্রনাট্য ও গৃহীত চিত্রের ইচ্ছামতো সম্পাদনা করে ইচ্ছাপূরণের গল্প শোনাতে পারে সিনেমার পরিচালক। হয়তো সিনেমায় বর্তমানে এই সুযোগ আরও বেশি তৈরি হয়েছে।
তো এই সম্ভাবনা এবং ক্ষমতার কথা গোদার স্পষ্টই জানতেন বলে সতর্ক করেছেন। ফটোগ্রাফিতে একটি সত্য ঘটলেও সিনেমায় এক সেকেন্ডে ২৪টি সত্য উন্মোচনের সুযোগ যেমন আছে, তেমনি এর উল্টোটিও আছে এবং ঘটেছে, ঘটছে।
সৎ এবং নিষ্ঠুরভাবে সত্য বলার শিল্পী গোদার মুনাফা এবং স্টাবলিশমেন্টের কাছে আত্মসমর্পণ বা সমঝোতার পথে না গিয়ে নিজের কাজটি করেছেন। দর্শকের মুখাপেক্ষী না থেকে দর্শকদেরই মুখাপেক্ষী করেছেন।
পুরাতন এসথেটিকস এবং নির্মাণপথ শুধু উপেক্ষা করেছেন তাই নয়, নতুন পথ তৈরি করে ভবিষ্যতের শিল্পীকে পুরাতন ডেফিনেশন থেকে বের করে নতুন মুক্ত রূপের সন্ধান দিয়েছেন।
শুধু ফ্রান্সের নয়, চলচ্চিত্রের যত ধারণা ছিল, গোদার তার পাশে প্রবলভাবে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছেন। তাঁর ছবি তাই কখনো বিতর্কিত, কখনো অনুপ্রাণিত এবং সব সময়ই নতুন; যা খুব বেশি প্রভাবিত করে সেই সময়ের তরুণদের, যারা নতুন ভাষা খুঁজছেন। কেউ তাঁর বয়সে বড়ো, সমকালীন কেউ, কেউ ছোট- যেমন Pier paolo pasolini, Bernardo Bertolucci, Martin Scorsese, Wim Wenders প্রমুখ।
গোদারের ছবিতে আরও একটি ভালো লাগার দিক হলো শক্তি বা এনার্জি। আপনি তা ফিল করবেন। তবে এও সত্য, গোদারের ছবি ঠিকঠাক বুঝতে একাধিকবার দেখতে হয়। অভ্যাস আমাদের প্রথম বাধা। এর উত্তরণ ঘটে অভ্যাসের ব্রেকে পা দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়ায়।





কমেন্ট করুনঃ