অস্তিত্বের গহন বনে বৃক্ষপতন, চেতনা এবং অমীমাংসিত আলাপ

ফন্ট সাইজ-+=

ফুয়াদ আহমেদ তন্ময়

গহীন অরণ্যে যদি বৃক্ষ ভেঙে পড়ে— সেটি শোনার জন্য কোনো সচেতন সত্তা না থাকে, তবে কি সত্যিই কোনো শব্দের সৃষ্টি হয়?

দর্শন আর বিজ্ঞানের এই দ্বৈরথ আমাদেরকে অস্তিত্বের গভীরতম রহস্যের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। উত্তরটি সরল মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে জগৎ দেখার এবং বুঝার কৌতূহলোদ্দীপক দৃষ্টিভঙ্গি। ‘শব্দ’ বলতে যদি আমরা কেবল বায়ুমণ্ডলের কম্পনই বুঝে থাকি, তবে উত্তর সঠিক। কারণ পতনের সেই মুহূর্তে বৃক্ষটি তার চারপাশের বাতাস ঠিকই আলোড়িত ও কম্পিত করে। এটি একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যা আমাদের উপস্থিতি ছাড়াই জগতে আপন প্রকারে বিদ্যমান।

আবার ‘শব্দ’ বলতে যদি আমরা সেই সচেতন শ্রবণ-অভিজ্ঞতা বুঝি, যা কেবল বায়ুমণ্ডলের প্রকম্পনের সঙ্গে ইন্দ্রিয়যন্ত্রের (Sensory apparatus) মিথস্ক্রিয়ায় তৈরি হয়, তবে সেখানে কোনো প্রাণসত্তার অনুপস্থিতি ভিন্ন বাস্তবতাকে নির্দেশ করে। নির্জন অরণ্যে বৃক্ষপতনের সেই মুহূর্তে যদি শোনার মতো কেউ না থাকে, তবে বাতাসের কম্পনের সঙ্গে ঘাত-প্রতিঘাত ঘটানোর মতো কোনো ইন্দ্রিয়ও অবশিষ্ট থাকে না। ফলে কোনো প্রকার সচেতন শব্দানুভূতি বা ধ্বনির বিকাশ তখন অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই ধাঁধার সমাধান নির্ভর করে আমরা ‘শব্দ’ বিষয়টিকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছি তার ওপর। শব্দকে যদি ‘বায়ুমণ্ডলের প্রকম্পন’ হিসেবে ধরি, তবে পতনের মুহূর্তে বৃক্ষটি অবশ্যই শব্দ সৃষ্টি করে। কিন্তু শব্দ যদি হয় একটি ‘সচেতন উপলব্ধি’, তবে নির্জন অরণ্যে নিঃসঙ্গ সেই বৃক্ষপতন কোনো শব্দেরই জন্ম দেয় না। মনে হতে পারে, ধাঁধার জট বুঝি খুলে গেল। না। এই গভীর প্রশ্নের অবতারণার উদ্দেশ্য কেবল একটি চটজলদি উত্তর খুঁজে নিয়ে তাকে ধামাচাপা দেওয়া নয়। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ‘শব্দ’ শব্দটির দুটি ভিন্ন সংজ্ঞার মধ্যে অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতা বা টানাপোড়েনকে সামনে আনা।

কেউ যখন দ্বিতীয় সংজ্ঞাটি নিয়ে ভাববেন, তখন উপলব্ধি করবেন, এর পরিধি কেবল শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সত্তার যাবতীয় অভিজ্ঞতা— যা কিছু আমরা দেখি, শুনি, ঘ্রাণ নিই কিংবা স্পর্শ ও স্বাদের মাধ্যমে অনুভব করি— তার প্রতিটিই ইন্দ্রিয়যন্ত্র তথা আমাদের নিজেদের ওপর নির্ভরশীল। অস্তিত্ব বাদ দিয়ে অভিজ্ঞতাসমূহের কোনো বাস্তব সত্তা থাকত না। ষোড়শ শতাব্দীর মহান জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি এই সত্যটিই উচ্চারণ করেছিলেন:

“স্বাদ, ঘ্রাণ, বর্ণ এবং এই জাতীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর অবস্থান কেবল চেতনার অন্দরেই। যদি জগত থেকে সকল জীবন্ত প্রাণসত্তাকে সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে এই গুণাবলিগুলোও চিরতরে মুছে যাবে এবং ধুলোর মতো বিলীন হয়ে যাবে।”

আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে যদি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, তবে অভিজ্ঞতার এই বৈচিত্র্যময় জগৎ বর্ণহীন, শব্দহীন, গন্ধহীন ও স্বাদহীন শূন্যতায় বাঁধা পড়বে। আমরা না থাকলে এই চরাচরে আর কী-ই বা থাকে? মূলত এই ধাঁধা আমাদের এক গভীরতর জিজ্ঞাসায় দাঁড় করিয়ে দেয়: যদি কোনো সচেতন প্রাণের অস্তিত্ব না থাকত, তবে কি এই ভৌত মহাবিশ্বের আদৌ কোনো অস্তিত্ব থাকত?

মজ্জাগত সংস্কার থেকে হয়তো উত্তর আসবে, ‘অবশ্যই থাকত’। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে পুনরায় ভাবা প্রয়োজন: যদি কোনো সচেতন সত্তাই না থাকে, তবে কোনো অভিজ্ঞতারও জন্ম হবে না। ফলে আমরা যাকে ‘ভৌত অস্তিত্ব’ মনে করি, তার কোনো অবশিষ্ট থাকবে না। সেখানে কোনো রঙ থাকবে না। থাকবে না কোনো শব্দ, ঘ্রাণ, স্বাদ কিংবা স্পর্শের অনুভূতি। এমনকি দৃশ্যমান বস্তু কিংবা স্থান-কালের বোধও তখন অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে।

অস্তিত্বের এই বিচিত্র রূপ নিয়ে ভেবে বিশ্বের বহু চিন্তকই প্রায় একমত হয়েছেন— চেতনা সম্ভবত সেই ‘বস্তু’র চেয়েও অনেক বেশি মৌলিক, যা এই চেতনা অনুভব করে। ১৭১০ সালে প্রকাশিত কালজয়ী গ্রন্থ ‘এ ট্রিটিজ কনসার্নিং দ্য প্রিন্সিপলস অব হিউম্যান নলেজ’-এ দার্শনিক জর্জ বার্কলি সচেতন মনের বাইরে জগতের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের ধারণাকে এক প্রকার অসংগতি বা বাতিল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, কোনো সচেতন মন যদি সেই বৃক্ষটিকে প্রত্যক্ষ না করে, তবে বৃক্ষটির অস্তিত্ব থাকাই অসম্ভব।

অন্যদিকে, অষ্টাদশ শতাব্দীর দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট যুক্তি দিয়েছিলেন, ‘কর্তা’ (Subject) ছাড়া ‘বিষয়’ (Object)-এর কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না; এই দুটি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। জগৎ থেকে ‘কর্তা’ (অর্থাৎ আমাদের) বিচ্ছিন্ন করে এর স্বরূপ বোঝা অসম্ভব। সুতরাং, কেবল বৃক্ষপতনের শব্দই এখানে প্রশ্নের সম্মুখীন নয়; বরং একজন সচেতন পর্যবেক্ষক ছাড়া বৃক্ষ, বাতাস, এমনকি স্থান ও কালের সমগ্র কাঠামোটিই ভেঙে যায়।

উপলব্ধি এবং বাস্তবতার এই টানাপোড়েনের সমাপ্তিতে ১৯৩০-এর দশকে নোবেলজয়ী কোয়ান্টাম পদার্থবিদ ম্যাক্স প্লাঙ্কের একটি মন্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক:

“আমি চেতনাকে মৌলিক হিসেবে গণ্য করি। আমার মতে, বস্তু হলো চেতনারই একটি উপজাত বা উদ্ভূত রূপ। আমরা চেতনাকে অতিক্রম করে অন্য কিছুতে পৌঁছাতে পারি না। যা কিছু নিয়ে আমরা আলোচনা করি, যা কিছুকে বিদ্যমান বলে মনে করি— তার প্রতিটিই অস্তিত্বের পূর্বশর্ত হিসেবে চেতনাকে দাবি করে।”

বিজ্ঞান এবং দর্শনের এই অভিন্ন মোহনায় দাঁড়িয়ে আমরা বুঝতে পারি, জগৎ হয়তো কেবল জড় পদার্থের সমাহার নয়, চেতনার এক অন্তহীন বিস্তার। আমাদের ইন্দ্রিয় কি কেবল জগতকে দেখে, নাকি দেখার মাধ্যমেই জগতের অস্তিত্ব তৈরি করে— সেই অমীমাংসিত তর্কেই কি নিহিত মানব অস্তিত্বের সার্থকতা?

কমেন্ট করুনঃ

Scroll to Top
Copy link