কিন্তু পুঁজিবাদ-কোকাকোলাইজমের কাছে সবকিছুই পণ্য। আলু-ছোলা থেকে গণসংগীত, সবকিছু বেচা যায়, শুধু বুঝে নিতে হবে কখন কোথায় কোনটার কাটতি হবে। যে কেউই গণসঙ্গীত গাইতে পারেন, গান গাওয়া নিয়ে বিরোধীতা করবার কিছু নাই। কিন্তু কোন কনটেক্সটে, কার স্বার্থে গানটি গাওয়া হচ্ছে, সেটা নিয়ে সতর্ক থাকা খুবই জরুরী বিষয়। আর যখন চোখে পরে, ‘প্রগতিপন্থী’ সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও কেউ কেউ আহা উহু করছেন, বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন কোক স্টুডিওর ‘হেই সামালো’ গান নিয়ে, তখন চিন্তিত হতে হয়। কালচারাল পলিটিক্সের বাহ্যত নিরীহ কিন্তু জটিল চেহারাটা এখানেই লুকিয়ে থাকে। আমরা দেখলাম খুবই চমৎকার সঙ্গীত আয়োজনে ‘হেই সামালো’ আর ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গান দুটো ব্লেন্ড করা হলো। জনপ্রিয় শিল্পীদের কন্ঠে পরিবেশন করা হলো, তার সাথে ব্যয়বহুল ভিডিওগ্রাফি। তো এমন প্রোডাক্ট তরুণ শ্রোতা কেন লুফে নিবেনা! তারা যাতে লুফে নেয় সে জন্যেইতো এতো কোটি কোটি টাকার আয়োজন। কেউ কেউ ভাবছেন এতে ক্ষতি কি? যে ছেলেমেয়েরা সলিল চৌধুরী, আব্দুল লতিফের নামটাও জানেনা, কোক স্টুডিও তাদের কাছে এই গান পৌঁছে দেয়ার মহান দায়িত্ব পালন করলো। আচ্ছা দাদারা বলেন তো, কোক স্টুডিও কি তেভাগা বা ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করে? কিংবা ‘হেই সামালো’র মূল রেকর্ডে হেমাঙ্গ, সলিলরা তেভাগার প্রেক্ষাপটকে উল্লেখ করে যেভাবে গানটি আমাদের শোনান, কোক স্টুডিও কি তা করেছে? তাহলে এই গান একজন তরুণ শ্রোতার গান শোনার অভিজ্ঞতায়, মিউজিক কম্পোজিশন, সাউন্ড-কালার ছাড়া আর অন্য কিছু, মানে তেভাগা আন্দোলনের মতাদর্শকি যুক্ত করবে? এই দায়িত্ব কি কোক স্টুডিও নিবে? নেবার কোনো কারন নেই। যে কোনো গানকে কেবল মাত্র চিত্ত বিনোদনের প্রোডাক্ট বানানো ছাড়া তার আর কোনো দায়িত্ব নেই। গণসঙ্গীত শুনে তরুণ শ্রোতার চিত্ত বিনোদিত হলে দোষের কিছু নাই, আনন্দের বটে। কিন্তু এই গান শুধু চিত্তকে বিনোদিত করবার পুঁজিবাদী প্রোডাক্ট হিসেবে তৈরি হয়নি, হয়েছে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সংগ্রামের ময়দান থেকে। এই গান গাইতে হলে সেই রাজনৈতিক ময়দানের সাথে শ্রোতার পরিচয় ঘটানোর দায়িত্ব রয়েছে শিল্পীর। ফলে ‘হেই সামালো’ কেবল মাত্র সুর-তাল-লয়ের চমৎকারিত্ব নয়, মার্কক্সবাদী ভাবাদর্শের একটি গণসংগীত।
কোকাকোলাতো সারাদুনিয়াতে পুঁজিবাদী আগ্রাসনের রীতিমত প্রতীকে পরিণত হয়েছে, কোক স্টুডিও তার সাংস্কৃতিক চেহারা। সেই কোক স্টুডিওকে কেনো গণসংগীত, ভাষা আন্দোলনের গান গাওয়াতে হলো? আচ্ছা কোক স্টুডিও পাকিস্তান, কোক স্টুডিও ইন্ডিয়া হতে পারলে, কোক স্টুডিও বাংলাদেশ না হয়ে ‘কোক স্টুডিও বাংলা’ হলো কেন? তারা নাকি দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মিলন ঘটাতে চান তাই ‘কোক স্টুডিও বাংলা’, এমনটাই শুনেছিলাম কারো কাছে। তা কিভাবে? তারা শান্তি নিকেতন ফেরৎ শিল্পীদের নেতৃত্বে, আরো অনেক পপুলার শিল্পীদের সার্ভিসে ‘সেক্যুলার’ ‘বাঙ্গালী’ আধিপত্যবাদী প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করে যাবেন। অর্থাৎ ‘পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙ্গালী’ সংস্কৃতি যে সকল সাংকৃতিক উপাদানকে স্বীকৃতি দান করে, যার সাথে বাংলাদেশের অধিকাংশ ‘মুসলিম জনগোষ্ঠী’কে দূরে সরিয়ে রাখার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ‘অপর’ করে রাখবার মূর্খতা যুক্ত, তাকে বলা হবে ‘সেক্যুলার বাঙ্গালী সংস্কৃতি’। সেই ভাবাদর্শিক প্রকল্পেরই অংশ বানাতে চেয়েছেন তারা ‘হেই সামালো’ আর ‘ওরা আমার মুখের ভাষা’ গান দুটিকে। আর যারা এই ভাবাদর্শিক প্রকল্পের অংশ, তারাতো কোকাকোলার বিজ্ঞাপন প্রচারে কোক স্টুডিওকে বাহবা দিয়ে যাবেনই। কিন্তু এই প্রকল্পে কোকাকোলার স্বার্থ কি? চীন আর উত্তর কোরিয়া ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই কোকাকোলা সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে। সারা দুনিয়াব্যাপী অন্য যেকোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মতো কোকাকোলারও একটাই স্বার্থ, ব্যবসা। ফলে কোক স্টুডিও যখন যে দেশে যাবে, সেদেশের ক্ষমতা কাঠামোর সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়েই কাজ করবে। বাংলাদেশে এখন ‘সেক্যুলার-বাঙ্গালী’ ভাবাদর্শ রাষ্ট্রক্ষমতায়, এখানে সে এই ভাবাদর্শ প্রচারের দায়িত্ব নেবে, নির্বিঘ্নে পুঁজির বিকাশের, মুনাফার স্বার্থে। অর্থাৎ কোক স্টুডিও এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিষ্ঠিত সরকার, পরস্পর পরস্পরের স্বার্থ রক্ষার মধ্যদিয়ে সমাজের গভীরে প্রোথিত হতে থাকে সাংস্কৃতিক, ক্ষমতাশীন ভাবাদর্শের শিকড়-বাকড়।
হেই সামালো গানের শিল্পীরা
আচ্ছা কোকাকোলার বিজ্ঞাপন প্রচার করেও যদি ‘ভালো কিছু গান’ হয় তাতে দোষের কি আছে? এমন মন্তব্য বা চিন্তাকে আপাত নিরীহ মনে হলেও আসলে তা মোটেও নিরীহ নয়! ‘আপাতদৃষ্টিতে যে প্রতিষ্ঠান বা অভিব্যক্তিগুলোকে রাজনৈতিক বলে মনে হয় না, সেগুলোর ভিতর দিয়েই ক্ষমতার রাজনীতি সবচাইতে বেশি ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে’ (মিশেল ফুকো)। তাহলে কোকাকোলার কোক স্টুডিও হচ্ছে সেই নিরীহ চেহারা, যা তরুণ সমাজের মাঝে সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আদিবাসী গান থেকে গণসংগীত, সকল গানের ধারক-বাহক হবার সম্মতি আদায় করে নেয়। যে সম্মতি, এলিট ভাবমূর্তি একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে কোক স্টুডিও তথা কোকাকোলার জনপ্রিয়তাকে বহুগুন বাড়িয়ে দেয়। অথচ এই পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থেকে মুক্তির লড়াইয়েরই গান ‘হেই সামালো’ এবং ‘ওরা আমার মুখের কথা’। যাদের বিরুদ্ধে এই গান, তাদের কে এই গান গাইবার অধিকার কে দিয়েছে?
এ অধিকার কোকাকোলাইজম কেড়ে নিতে জানে, আমরা শুধু জানিনা তাকে কিভাবে মোকাবিলা করতে হবে। পুঁজি প্রত্যক্ষ শ্রমশোষণ ছাড়া আরো যেসব রাস্তায় হাঁটে তার উপস্থিতির অধিকাংশই জনগণ প্রাথমিক ভাবে টের পায় না। কেননা সে তার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, প্রতীক গুলোকে টাকায় কিনতে পারা শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের মাধ্যমে সর্বজনগ্রাহ্য করে তোলে। তারা এমন প্রগতিপন্থী চেহারা, পরিচয় নিয়ে জনতার সমাজে হাজির হয় যে তার আড়ালে পুঁজির আগ্রাসন-আধিপত্য স্বাভাবিক রীতি-প্রথায় রূপান্তরিত হয়। আর এটাই হচ্ছে আজকের কালচারাল পলিটিক্সের দুনিয়ায় সবচাইতে কঠিনতম লড়াইয়ের ময়দান। শ্রমিকের দাবি-দাওয়া আদায়ের সংগ্রাম খুব স্বচ্ছ-স্পষ্ট বিষয়, কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল, লড়াইয়ের ময়দানে সবই প্রত্যক্ষ। শত্রু-মিত্র চিনা যায় রাজপথে লড়াইয়ে অভিজ্ঞতায়। কিন্তু কালচারাল পলিটিক্সে জনতার সামনে শত্রুকে চিহ্নিত করা বড়ো কঠিন কাজ। যেমন এই যে আমি কোক স্টুডিও নিয়ে এতো কথা বলছি, একবার কোক স্টুডিওর গানের সম্ভারে ঢুকে পড়লে কোন তরুণ শুনবে আমার কথা? সুরের মুর্ছনায় ভেসে যাবে সে। এ.আর. রহমানের মতো কতো কতো মিডিয়া বিখ্যাত শিল্পীরা কাজ করেছেন এখানে। এমন ফাইনেস্ট মিউজিক্যাল প্রোডাক্ট তরুনদেরকে কয়জন দিতে পারে! ফলে খুব, খুব কঠিন সেই তরুণদেরকে কোকাকোলার রাজনীতি বুঝানো। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ ভোক্তারা যেকোনো কোমল পানীয়র কোম্পানীর জন্য ভীষন আকর্ষণের-লোভের। পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই সফল ভাবে ব্যবসা করে আসা কোকাকোলা নিশ্চয়ই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশেও প্রথম স্থানেই থাকবার কথা। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে দেশীয় বেশ কিছু কোমল পানীয় বাজারে বেশ সফল ভাবে বিচরণ করছে। কোকাকোলাতো আর যা তা বিষয় নয়, মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানী। দুই শতাধিক দেশে দৈনিক ১৯০কোটি একক পণ্য বিক্রি হয় কোকাকোলার। সেই কোকাকোলা এই বিরাট তরুণ ক্রেতার বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা করতে চাইবেই। তারই একটি লক্ষণ-চিহ্ন বাংলাদেশে কোক স্টুডিওর আগমন।
এবার ‘ছোটমুখে’ কয়েকটা সাধারণ কথা বলতে চাই কোক স্টুডিও বাংলার ‘হেই সামালো’, ‘ওরা আমার মুখের কথা’ গানের গায়কী, পরিবেশনা, সংগীত আয়োজন প্রসঙ্গে। আমার বা আমাদের মুখ কেনো ‘ছোটমুখ’, কারণ কোক স্টুডিওর কালচারাল হেজিমনি এটা প্রতিষ্ঠিত করে যে, কোক স্টুডিওতে যারা কাজ করে তারা অনেক ‘বড়ো মুখধারী’ শিল্পী। তারা গান নিয়ে যা করবে সেটাই অথেনটিক, অনুকরণীয়। আপনি অমল আকাশ এইসব নিয়ে কথা বলতে আইছেন, আপনি ফিউশন মিউজিকের কি বোঝেন? আপনেরে কেডায় চিনে? জীবনে এরকম মিউজিক বানাইতে পারবেন? এই প্রশ্ন, মন্তব্য, চিন্তা কিন্তু কোক স্টুডিওর করতে হবেনা, কোক স্টুডিওর শ্রোতারাই চিন্তার ‘ঔপনিবেশিক’ দায়িত্ব পালন করবে। তো এই ‘বড়ো মুখের’ দাদাদের লিরিকের বিষয়ে আরো একটু যত্নবাণ হওয়া উচিৎ ছিলো, ক্রসচেক করা দরকার ছিলো। এতো বিশাল বাজেটের কাজে কেন তারা এই যত্নটুকু নিবে না? সলিল চৌধুরীর গানে তারা গাইছেন ‘ধার জমিতে লাঙ্গল চালাই’,এখানে হবার কথা ‘তার জমি যে লাঙ্গল চালায়’(সুত্র: সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত গণসংগীত সংগ্রহ)। অর্থাৎ সলিল এখানে বলতে চেয়েছেন, লাঙ্গল যার জমি তার। কিন্তু এই লাইনটাকে ‘ধার জমিতে লাঙ্গল চালাই’ গাইলে সলিল যে অর্থ প্রকাশ করতে চেয়েছেন তা পাল্টে যায়। আরেক জায়গায় তারা গাইছেন ‘সাদা হাতির কালা মাহুত তুমি নও’, এখানে হবার কথা ‘তুমিই না’ (সুত্র: সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত গণসংগীত সংগ্রহ)। শিল্পী আব্দুল লতিফের ‘ওরা আমার মুখের কথা’ গানের অংশে তারা ‘ঢপ কীর্তন’ এর জায়গায় গাইছেন ‘জপ-কীর্তন’। ‘ঢপ গান’ বা ‘ঢপ কীর্তন’ ছিলো বাংলার এক জনপ্রিয় কীর্তনাঙ্গের গান, বিশেষ করে বৈষ্ণব কীর্তনের, যার এখন খুব একটা প্রচলন দেখা যায় না। আর ‘জপ’ হচ্ছে ভগবানের/গুরুর নাম জপ। বলতে পারেন এইসব ‘ছোটখাটো’ ভুলে গানের বড়ো কোনো ক্ষতি হয়না। এসব নিশ্চয়ই তাদের ইচ্ছাকৃত কোনো ভুল নয়। তারা যে সকল সোর্স থেকে লিরিক সংগ্রহ করেছে, সেখানেই হয়তো সমস্যা গুলো ছিলো। কিন্তু ঐযে বললাম, বিশাল বাজেটের কাজে এই খুঁত গুলো থাকবে কেন? থাকবে এই কারণে যে, তাদের মূল মনোযোগ ফিউশনে, মিউজিকের তেলেসমাতিতে, পোশাকের রঙ বাহারে! মিউজিকের তেলেসমাতি দেখাতে তারা শুরুতেই প্লুং বাঁশির সুরে আমাদের পাহাড়ে নিয়ে যায়, সেখান থেকে হেই সামালো হেই সামালো গাইতে গাইতে সমতলে নিয়ে আসে। খুব সুরেলা, মিহি সুরের কাজ, কান জুড়ায়। কিন্তু কেন প্লুং বাঁশির ব্যবহার এখানে? পাহাড়ের জুম চাষিদের সাথে তেভাগা আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক আছে কি?
তারপর অর্ধেক গানের মাঝখানে ঢুকানো হলো ‘ও আমার মুখের কথা’, কেন? এই দুইটা গানকে মেসআপ করা যায়? ‘হেই সামালো’ সাম্যবাদের মতাদর্শে রচিত গান, যেখানে বলা হচ্ছে লাঙ্গল যার জমি তার। দেশ ভাগের পর পূর্বপাকিস্তান নতুন করে জাতীয়তাবাদের রাস্তায় হাঁটা শুরু করেছে, তারই এক পর্যায় আমাদের ভাষা আন্দোলন, যার প্রেক্ষাপটে আব্দুল লতিফের ‘ওরা আমার মুখের কথা’ গানটির সৃষ্টি। সাম্যবাদী মতাদর্শের সাথে জাতীয়তাবাদের ব্লেন্ড যে করতে চান করেন, আমাদের কিছু বলার নাই। কিন্তু সলিলতো তা করতে চান নাই। আমাদের কি এখতিয়ার আছে তার মতাদর্শিক গানকে এভাবে জগাখিচুড়ির ডেকচিতে রান্না করার? কমপ্লিট একটা গান একটা কমপ্লিট ভাব, চিন্তাকে প্রকাশ করে। সে জন্য বক্তব্য নির্ভর গানকে এভাবে কাটাছেঁড়া করতে হয়না, করলে সে পরিবেশনায় গানের অন্তর-শক্তি নষ্ট হয়। একটা গান শেষ করে তারা আর একটা গান ধরতে পারতো। না তাহলেতো মিউজিকের তেলেসমাতিটা দেখানো হবেনা! অর্থাৎ মিউজিকের তেলেসমাতি দেখাতে যেয়ে যদি গানের দর্শন ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাতে তাদের বিশেষ কিছু আসে যায় না। ঐ দর্শনটুকুর বিষয়েইতো তাদের সবচাইতে অনাগ্রহ, অসস্তি¡! হেই সামালো যারা গাইছেন তাদের জীবনের সাথে ‘হেই সামালো’ গানের দর্শনের ছিটেফোঁটা কোনো সম্পর্ক নাই। তাদের কাছে এই গান সলিলের একটি ‘কম্পোজিশন’ ছাড়া আর কিছুই নয়। ফলে তাদের গায়কীতে অনেক ধরণের ফ্যান্টাসি দেখতে পাওয়া যায়। যেমন, গানের ৪ মিনিট ৬ সেকেন্ড থেকে ৪ মিনিট ৩৬ সেকেন্ড অর্থাৎ ৩০ সেকেন্ডে ধরে বাংলা ঢোলের বোল মুখে মুখে ‘…কুড়া কুড় তা কুড়া কুড়…’ ব্যাপক ফূর্তিতে কোরাসে উচ্চারিত হতে থাকে। অথচ শিল্পীরা বুঝতেই পারতেছেন না, এরপরপরই তার যে লাইন দুটো গাইবেন তার সাথে তাদের এই মুড যায় কিনা! এইসব ‘তা কুড়া কুড়ের’ পর তারা ধরছেন, ‘মোরা তুলবো না ধান পরের গোলায়/মরবো না আর ক্ষুধার জ্বালায় মরবো না..।’ কোক স্টুডিওর শিল্পীদের আহ্লাদে আটখানা, হাসিখুশি চেহারা গুলো দেখে সত্যিই আপনাদের মনে হবেই, ইনারা কোনোদিন ক্ষুধার জ্বালায় মরবেন না। আচ্ছা গণসঙ্গীতের মাঝখান দিয়ে হঠাৎ এমন আচমকা হৃদয় কারা ঢোলের বোল বেজে উঠলে কার গালে টোল খাবে না! এই হচ্ছে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি বা ইন্ডাস্ট্রির মিউজিক। যে একটা গণসঙ্গীতকেও মিহি মোলায়েম সুরের চাদরে ঢেকে আবেদনহীন করে তুলতে পারে। যদিও পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন শিল্পীকে দেখছিলাম মুষ্ঠবদ্ধ হাত ছুঁড়ে ছুঁড়ে বিদ্রোহ, প্রতিবাদ বুঝাবার অপচেষ্টায় লিপ্ত। এ জন্যই আমরা বলতে চাই, চাইলেই যেকোনো ইন্ডাস্ট্রি শিল্পী মানুষের জীবনের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম থেকে জন্ম নেয়া কোনো গান মঞ্চে গাইতে পারে না। কারণ আর্ট কেবল পারফর্মিং এর বিষয় নয়, সামগ্রিক জীবন যাপন পদ্ধতি-দর্শনের বিষয়। যিনি যেই শ্রেণির মানুষ, তার আর্ট সেই শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করবে, এটাই স্বাভাবিক। কোক স্টুডিও সেই শ্রেণিরই প্রতিনিধিত্ব করে, যারা এখনকার পাহাড়ের মানুষের ‘মুখের কথা কাইড়া’ নিতেছে প্রতিদিন, যারা এখনো কেড়ে নেয় ক্ষুধার্ত মানুষের ধান। কোক স্টুডিওতে যারা কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই আমার পরিচিতজন, অনেকেই আছেন আর্থিক ভাবে খুব স্বচ্ছলও নন। ‘ক্ষেপ মারতে’ গেছেন কোক স্টুডিওতে। ইন্ডাস্ট্্ির এভাবেই সবকিছু, সবাইকে কিনে ফেলবার সাহস দেখায়। কারণ একটা আধিপত্যবাদী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবার পক্ষে সিনা টান টান করে লড়াই করা সম্ভব হয়ে ওঠে না, সবার সেই মতাদর্শিক প্রস্তুতিও থাকেনা। কিন্তু, তবুও এতো গুলো কথা বলার একটাই কারণ, তরুণ শ্রোতারা যাতে সত্যিকার সঙ্গীতকে চিনতে পারেন, কোক স্টুডিওর কালচারাল পলিটিক্সের বিষয়ে সজাগ থাকেন। কেবল সুরের মুন্সীয়ানা আর ফিউশন, এক্সপেরিমেন্টের নামে মিউজিকের দেখানেপনা, তেলেসমাতিকে গান বলেনা। লিরিকের অন্তরগত দর্শনের সাথে সুরের, যন্ত্রানুসঙ্গের ভাবের মিলন ঘটলে পরে তাকে আমরা একটা যথার্থ সঙ্গীত বলতে পারি। যে গান আপনার শরীর দোলাবে এবং অবশ্য অবশ্যই চিন্তার দরজাও খোলাবে, তাই হচ্ছে জীবনের গান। আসেন আমরা সেই নতুন জীবনের সঙ্গীত রচনা করি, যারা ইতিমধ্যে করছেন তাদের গানের শ্রোতা হই। পণ্যায়নের কালচারাল পলিটিক্সের বিপরীতে আমাদের চিন্তার চাতালে বিউপনিবেশায়নের লড়াই গড়ে তুলি, যা আমাদের রুচি, কানকে নতুন করে নির্মাণ করবে।
কমেন্ট করুনঃ