মুক্তির মিছিল দেখবে বলে

ফন্ট সাইজ-+=

[তিন]
তিন কি পাঁচ দিন গেল। মিরাজ মিয়া কোথাও যেতে পারে না। বাসা থেকে বের হতে পারে না। কলোনির গেটেও মিলিটারির পাহারা বসেছে। বের হতে-ঢুকতে গেলেই মিলিটারি জেরা করে। ভয় হয় যদি বের হলে আবার কলোনিতে ঢুকতে না দেয়। নারায়ণগঞ্জ শহরে মিরাজ মিয়ার ভাতিজা থাকে। তার নাম মগরেব আলী, ছোটবেলা থেকেই সবাই তাকে মগা বলে ডাকে। ওর বাসায় যাওয়ার জন্য মনটা অস্থির হয়ে আছে মিরাজ মিয়ার। কিন্তু বাশার কিছুতেই যুদ্ধের ডামাডোলে বাবাকে যেতে দিতে চায় না।
মিরাজ মিয়া নাছোড়বান্দা। ছেলেকে বলে, সব কিছু গুছিয়ে দেও, বউ মা আর নাতি-নাতকুড় নিয়ে বাড়ি যাব।
বাশার বলে, এই যুদ্ধের মধ্যে কীভাবে যাবা বাবা? চারদিকে যুদ্ধ চলছে। পদে পদে মৃত্যুর ভয়। এই অবস্থায় তোমাদের ছাড়ি কী করে?
মিরাজ মিয়া বলে, আমাদের গ্রামে এখনো মিলিটারি আসে নাই। বউ-মা আর নাতি-নাতকুড়রা নিরাপদেই থাকবে। তুমি আমাদের বাড়ি যাওয়ার বন্দোবস্ত করো।
বাবা-ছেলের বাদানুবাদে কয়েকদিন কেটে গেল। বাশারের মন ধীরে ধীরে পরিবর্তন হলো। সেও বউ-ছেলেমেয়েকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়াই সমীচীন মনে করল। ওদের বাড়ি পাঠানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। খোঁজ-খবর নিয়ে দেখল, নারায়ণগঞ্জ থেকে বাসে গুলিস্তান, গুলিস্তান থেকে টাঙ্গাইলের বাস ধরে বাড়ি যাওয়াই ভালো।
শরীফা মে মাসের শেষভাগে এক-দেড় মাস বয়সী শিশুপুত্রকে নিয়ে রওয়ানা হলো গ্রামের উদ্দেশে। বাশার সবাইকে গুলিস্তান পর্যন্ত এসে টাঙ্গাইলের বাসে তুলে দিল। শরীফ মানিক-রতন নীলু আর নবজাতক বিপ্লবকে নিয়ে শ্বশুরের সঙ্গে রওনা হয়েছে। শাপলা আর নান্টুও চলছে তাদের সঙ্গে। বাশার একা পড়ে রইল কলোনিতে। এ নিয়েই শরীফার পিছুটান রয়েই গেল। বাশার একা একা কীভাবে চলবে, রান্না করবে কীভাবে- এসব ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলছে শরীফা। কিন্তু মন পড়ে রইল পিছনে। আটজনের এই দল নিয়ে চলছে গ্রামের উদ্দেশে। অজানা আশঙ্কায় বুক কাঁপছে!
গাড়ি চলছে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে। এ গাড়ি কি আজ পৌঁছাবে? নাকি দিগন্তের দিকে চলবে চলবে চলবে, চলতেই থাকবে। কিন্তু গন্তব্যের দেখা মিলবে না। এমনি কত ভাবনা, অজানা বিপদের শঙ্কা কাজ করছে শরীফার মনে!
রাস্তায় অনেক জায়গায় মিলিটারির গাড়ি দেখছে। সেই তুলনায় সাধারণ মানুষের চলাচল কম। যানবাহন কম। রাস্তার দুই ধারে কৃষিজমি। কিন্তু আবাদের লক্ষণ নেই। দূরে দূরে দুয়েকজন কৃষক জমিতে কাজ করছে। অনেক দূরে আবছা আলোয় লম্বা ঘোমটা টানা নারীকে দেখা যাচ্ছে পুকুর থেকে জল নিচ্ছে। এই দেখে সে নিজের ঘোমটাটা আরো টেনে নেয়।
মিলিটারিরা টহল দিচ্ছে। গাড়ি থামিয়ে চেকিং করছে। আবার ছেড়ে দিচ্ছে। কিস্তু মিলিটারির নৃশংসতা সে নিজ চোখে দেখেনি। নৃশংসতার কথা অনেক শুনেছে। শুনেই ভয়ে আতঙ্কে অস্থির সারাক্ষণ। বারবার চেকিংয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। মিলিটারি গাড়ি থামালেই গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। মনে মনে দোয়া-দরুদ পড়ছে, মিলিটারির নৃশংসতা যেন না দেখতে হয়।
জয়দেবপুর চৌরাস্তা পার হতেই মিলিটারিরা গাড়ি থামাল। সবাইকে নামাল। লাইনে দাঁড় করাল। একে একে চেক করছে।
শরীফা দাঁড়িয়েছিল শ্বশুরের পাশেই, একেবারে গা ঘেঁষে। মিরাজ মিয়াকে মিলিটারির অফিসার জিজ্ঞেস করল- ইয়ে কওন হি? তুমহারা কেয়া লাগতা হে?
মিরাজ মিয়া বলল, আমার ছেলের বউ। আমার বেটির মতো। কোলের বাচ্চাটা আমার নাতি।
বাচ্চা কি উমর কিতনি হে?
মিরাজ মিয়া বলল, এক মাস।
উসে মেরে গোদ মে দে দো। মুল্ক মে মেরে ভি এক বেটি হে।
শরীফা উদু বোঝে না। হাতের ইশারা আর ভাবভঙ্গি দেখে ওর মনে হলো মিলিটারি অফিসার তার ছেলেকে কোলে নিতে চায়। শরীফার হাত সরছিল না। ও যেন পাথর হয়ে গেছে। একটুও নড়ল না। হাত বাড়িয়ে কোলেও দিতে পারল না।
মিলিটারির অফিসার নিজেই হাত বাড়িয়ে বিপ্লবকে কোলে তুলে নিল। তৎক্ষণাৎ তার ভ্রু কুচকে গেল।
শরীফা ওর গয়না একটা পুটলিতে বেঁধে নবজাতকের কাঁথার ভিতর লুকিয়ে নিয়েছিল। ওটার অবস্থান টের পেয়ে লোকটির ভ্রু কুচকে গেল। সে কাঁথার ভাজ থেকে পুটলি বের করে মিরাজ মিয়ার দিকে ছুড়ে দিল।
অফিসার ভয় আর আতঙ্কে কুচকে গেছে। সে ধমক দিয়ে বলল- ইয়ে কেয়া হে? ইস্কে আন্দার কেয়া হে?
এ ঘটনায় আকস্মিকতায় মিরাজ মিয়া স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে সম্বিত ফিরে পেয়ে চট করে পুঁটলিটি ধরে ফেলল। খুলে দেখাল, তাতে কিছু গয়না আছে।
মিলিটারির অফিসারটি গয়নাগুলো ছুঁয়েও দেখল না। পুটলি দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিল গ্রেনেড কিনা। সে বলল- ইয়ে সাব তুমহারে বেটে কী বিবি কো দে দো।
সবার লাইন থেকে কয়েকজনকে একটু দূরে আলাদা লাইনে দাঁড় করাল। অফিসারের কমান্ড শুনে কয়েকজন পাকিস্তানি সৈনিক বন্দুক তাক করল। বন্দুক তাক করা দেখেই শরীফা মুখ ঘুরিয়ে নিল, ভয়ে-আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেলল। এরপর অফিসার আবার কমান্ড দিলÑ ফা য়া র… মুহূর্তেই গর্জে উঠল এলএমজি। একসঙ্গে অনেকগুলো ঠা-ডা-ঠা-ড আওয়াজ। কয়েকটি দেহ পড়ে গেল মাটিতে। খানিকক্ষণ ছটফট করে পড়ে রইল কয়েকটি নিথর দেহ।
পাকিস্তানি মিলিটারির নারীর প্রতি যত লোভ হয়তো নারীর গয়নার প্রতি অত লোভ নেই। তাই হয়তো গয়নাগুলো ফেরত দিয়ে দিল। তারপর সবাইকে ছেড়ে দিল। গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচল। মনে হয় সবাই প্রাণ ফিরে পেল। ঘটনার আকস্মিকতায় শরীফা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ভয়ে এখনো হাত-পা কাঁপছে। বুক ধরফর করছে। মিলিটারিরা ওদের গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। গাড়ি চলছে, শরীফা অঝোরে কাঁদছে।
অনেক ঝুটঝামেলা করে গাড়ি অবশেষে করটিয়া পৌঁছাল। ওরা প্রায় সন্ধ্যায় করটিয়ায় বাস থেকে নামল। সারাপথে কিছু খাওয়া হয়নি। ছোট ছেলে-মেয়েগুলো ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছে। খাবে কীভাবে? যেভাবে জীবন হাতে নিয়ে আসতে হলো। খাবারের কথা মাথায়ই আসেনি। পোলাপানও পথে একবারও খাবারের কথা বলেনি। ওরাও পরিস্থিতি বুঝে গেছে। এখন পথে জীবনমরণ সমস্যা- এর সঙ্গে মানিয়ে চলা ছোটরাও শিখে নিচ্ছে। ছোটরা কি সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করতে পারে!
করটিয়া নেমেই ওরা প্রথমে ফতু ভাইয়ের দোকানে গেল। ফতু শরীফার প্রতিবেশী ভাই। করটিয়া বাজারে ওর হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকান। যুদ্ধের বাজার তাই ফতু সন্ধ্যাবেলায়ই দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যায়। ওরা গিয়ে দেখল ফতু ভাই দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
শরীফা ফতু ভাইয়ের একটা হাত জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল। ফতু ভাই শরীফার মাথায় হাত বুলিয়ে প্রবোধ দিচ্ছেনÑ কাঁদিস না, কাঁদিস না।
শরীফা কাঁদতে কাঁদতেই বলল, বাস থেকেই নামিয়ে আমাদের লাইনে দাঁড় করাল। সেই লাইন থেকে কয়েক জন কম বয়সী মানুষকে আলাদা লাইনে নিল। তারপর তাদের গুলি করে মেরে ফেলল।
ফতু ভাই বললেন, সারা দেশেই এই একই অবস্থা। কী করবি বল। কাঁদিস না। আল্লার কাছে বিচার দে। ওরা মুসলমান হয়ে মুসলমানের উপর এমন অত্যাচার করছে। আল্লাহ এর বিচার করুক।
এরপর ফতু ভাই একটু সুর পাল্টে অনেকটা ধাতস্ত হয়ে শরীফাকে বললেন- কী রে? এই ভরসন্ধ্যায় কোত্থেকে এলি?
শরীফা বলল, গুলিস্তানে বাসে উঠেছি সেই কোন সকাল বেলায়, আর এখন ভরসন্ধ্যা বেলায় নামিয়ে দিল করটিয়ায়?
পিছনে শরীফার শ্বশুরকে দেখে সালাম দিয়ে বলল, তালুই সাব কেমন আছেন?
শরীফার শ্বশুর বলল, দেশের যা অবস্থা! চারদিকে মিলিটারি। গোলাগুলি আর যুদ্ধ। এর মধ্যে কেমনে ভালো থাকি বাবা?
শরীফার ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে বলল, পোলাপানগুলো সারাদিন কিছু খায়নি বোধ হয়। তোরা দোকানে বস। আমি ওদের জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি।
কিছুক্ষণ পর ফতু ভাই কিছু বিস্কুট নিয়ে ফিরলেন। সবাই একটা-দুইটা বিস্কুট খেয়ে পানি খেল।
ফতু ভাই বলল, তালুই সাব চলেন, আজ না হয় আমাাদের গাঁয়ে থেকে যান। কাল সকালে বাড়ি ফিরে যাবেন।
শরীফার শ্বশুর বলল, তাই ভালো। আজ তোমাদের গ্রামেই থেকে যাই।
শরীফাদের গ্রামের নাম পৌলি। করটিয়া থেকে দুই-আড়াই মাইল হবে। ফতু ভাই দোকান বন্ধ করে সবাইকে নিয়ে পৌলির উদ্দেশে রওয়ানা হলো।
ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার। দুই-চার হাত দূরেও দেখা যায় না কিছু। ওরা কেউ কারো চেহারা দেখতে পাচ্ছে না! দেখে শুধু মানুষের আবছা অবয়ব। মাঝে-মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ জোনাক জ্বলে উঠে। দেশে যে আঁধার নেমেছে তাতে দেশের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় না দেশ। আর এ আধারে ওরা বাড়ি খুঁজে পাবে!
সবাই হাঁটছে; কিন্তু পথ আর ফুরায় না। মানিক-রতন তো ছোট। ওরা আর কত হাঁটতে পারে। কিছুদূর গিয়ে কান্নাকাটি শুরু করল। ওরা হাঁটবে না। শরীফার কোলে বিপ্লব। নীলুকে কোলে নিয়েছে শাপলা। নান্টুর কোলে রতন। মানিক হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু নানিবাড়ির দেখা তো পাচ্ছে না।
ফতুর রাতকানা রোগ আছে। রাতে ও চোখে দেখে না। কতবার যে সে রাতে অন্যের বাড়ি গিয়ে উঠেছে তার ঠিক নেই। সেই বাড়ির লোক তাকে বাড়িতে দিয়ে গেছে। আজও তেমনি ঘটেছে। বাড়ি ফেরার জন্য ফতু ভুল করে অন্য পথ ধরেছে। ভুলপথে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গেছে। কিন্তু বাড়ি পাচ্ছে না। এমন সময় গাছের আড়াল থেকে কেউ একজন বলে উঠলÑ ফতু ভাই, কই যাও?
ফতু ভাই বলল, বাড়ি যাচ্ছি। তুমি কে?
– আমি তালেব। তা তুমি এই পথে কেন?
– ফতু বলল, আমি কি পথ ভুল করেছি?
– তা তো করেছই। ভুল পথে অনেক দূর চলে এসেছ।
– তা এই ভর সন্ধ্যাবেলায় তুই এখানে কী করস?
– তালেব বলল, সন্ধ্যা কোথায়? এখন তো অনেক রাত।
তালেব একজন গেরিলা যোদ্ধা। সে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তথ্য আদান-প্রদানের কাজ করে, অস্ত্র আর গোলাবারুদের চালান পৌঁছে দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার-দাবার পৌঁছে দেয়। শহর থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে ক্যাম্পে পৌঁছে দেয়। সে জানতে চায়, তোমার সঙ্গে ওরা কারা?
ফতু বলে, শহর থেকে শরীফা এসেছে। সঙ্গে ওর ছেলেমেয়ে। শ্বশুর, দেবর-ননদ। তাই তুই এখানে কী করিস?
তালেব বলে, আমের-কাঁঠালের চালান আসবে। সে জন্য অপেক্ষা করছি।
ফতু বলে, কাল আসিস। ভালো কাঁঠাল থাকলে দিয়ে যাস।
তালেব বলে, সন্ধ্যায় আসব। ভালো জাতের আমও দিয়ে যাব।
এটা ওদের সাংকেতিক ভাষা। আম-কাঁঠালের চালান নয়, হয়তো অস্ত্র আসবে। তালেব মাস্টার তা পৌঁছে দেবে কোনো ক্যাম্পে। তালেব ফতুকে বাড়ি যাওয়ার পথ বাতলে দেয়। সেই পথ ধরে ফতু বাড়ির দিকে চলতে থাকে।
তালেব প্রাইমারী স্কুলে মাস্টারি করে। যুদ্ধ লেগে পরে মিলিটারিরা স্কুলে ক্যাম্প করেছে। তাই স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। তালেবের মাস্টারিও শেষ। এরমধ্যে তালেবের জীবনে অনেক অঘটন ঘটে গেছে। তালেবের ভাই নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। গ্রামের সবাই মনে করেছে তালেবের ভাই যুদ্ধে গেছে। পাকিস্তান পক্ষের নেতারা মিলিটারি নিয়ে বাড়িতে এসেছিল তালেবের ভাইয়ের খোঁজে। তালেবের ভাইকে না পেয়ে সন্দেহ করেছে সে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। এই সন্দেহ থেকেই তারা ক্রুদ্ধ হয়ে বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। বাড়ির পুরুষরা তো আগেই পালিয়েছে। বাড়ির মেয়ে-বউরা শিশুদের নিয়ে পালিয়ে যায়। তালেবের বউ ছিল সাত মাসের পোয়াতি। সে পালাতে গিয়ে আছাড় খায়। পেটে আঘাত পায়। এতে তার ডেলিভারি হয়ে যায়। অন্যরা দূরে চলে যায়। তাকে সাহায্য করার কেউ ছিল না। এ অবস্থায় সন্তান আর মা দুজনেই মারা যায়। তারপর তালেবও মুক্তির সঙ্গে যোগ দেয়।
তালেব ফতুর কাছে প্রায়ই আসে। বিভিন্ন রোগের উপসর্গ বলে ওষুধ নেয় মুক্তিদের জন্য। ফতু টাকা-পয়সা, খাবার দিয়ে গোপনে মুক্তিদের সাহায্য-সহযোগিতা করে। ফতুর আয় সামান্যই। যুদ্ধের বাজারে তাও কমে গেছে। তবুও ও মুক্তিদের সাহায্য করে। তার স্বপ্ন একটা স্বাধীন দেশ। নিজেদের একটি পতাকা। যে পতাকা আকাশে উড়বে পতপত করে।
ফতু রাতকানা রোগের কারণে প্রায়ই পথ ভুল করে। এ জন্য অনেকে ওকে ফতুকানা বলে ডাকে। তাতে ও রাগ করে না। রোগে-শোকে মানুষের পাশে তো থাকতে পারে। এটাই ওর শান্তি। সেই ফতু সবাইকে নিয়ে বেশ রাতে বাড়ি এসে পৌঁছল। শরীফাকে ওদের বাড়িতে রেখে নিজের বাড়িতে যায়। শরীফাদের পাশেই ওদের বাড়ি।
বাড়ি পৌঁছেই ফতু ভাই রেডিও অন করেছেন। যুদ্ধের খবরের জন্য তিনি অকাশবাণী শুনেন, ভয়েস অফ আমেরিকা, বিবিসি বাংলা খবর শুনেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবর, কথিকা শুনেন, উদ্দীপনাময় গান শুনেন। সেই গানের সুর শুনলে শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। রক্তে আগুন লেগে যায়। রক্ত যেন টগবগ করে ফুটতে থাকে। আজও খবরের জন্য রেডিও অন করতেই ভেসে আসছে এক কণ্ঠ। এম আর আখতার মুকুল পড়ছেন চরমপত্রÑ
“সামরিক সাহায্যের বদৌলতে আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অবস্থা এখন ছেরাবেরা বয়ে গেছে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে তীক্ষিত সাড়ে সাক কোটি বাঙালিকে পদানত করতে যেয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী এরকম একটা বিপযস্ত অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে। কুমিটোলা, ময়নামতী, যশোর, চট্টগ্রাম আর রংপুরের সামরিক ছাউনী এলাকার গোরস্তানগুলো পাকিস্তানী হানাদার জওয়ানদের কবরে ভরে গেছে। এ’ছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গন থেকে বহু হানাদারের লাশ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এদিকে ঢাকা থেকে প্রতিদিনই পিআইএ বিমানে নিহত পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক অফিসারদেও কফিন পশ্চিম পাকিস্তানে আত্মীয়স্বজনদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। লাহোর, সারগোদা, লায়ালপুর, মুলতান, শিয়ালকোট, কোহাট, পেশোয়ার, কোয়েটা, লারকানা, শুক্কর প্রভৃতি এলাকায় এসব কফিন যেয়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে গেছে।
মাত্র দু’মাসের লড়াইয়ে বাংলাদেশে হানাদার পাকিস্থানী সামরিক বাহিনীর অফিসারসহ কয়েক হাজারের মতো জওয়ান নিহত হয়েছে। এছাড়া বিপুল সংখ্যক পাক সৈন্য আহত হয়েছে। তাই আজ বাংলাদেশে হানাদার অধিকৃত শহরগুলোতে রোজইর সামরিক বাহিনীর এম্বুলেন্স রক্ত সংগ্রহের জন্য টহর দিচ্ছে।
মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বেপরোয়া হত্যালীলা চালিয়ে জেনারেল টিক্কা খান, জেনারেল মিঠ্ঠা খান আর জেনারেল পীরজাদার দল বাংলাদেশকে পদানত করাবার যে স্বপ্ন দেখেছিল, তা আজ ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেছে। সমগ্র বাংলাদেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধাদেও গেরিলা তৎপরতায় হানাদার সৈন্যের দল অস্থির হয়ে উঠেছে। অতর্কিত আক্রমণে প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৈন্য নিহত হচ্ছে। ……..”
যুদ্ধে শুধু বন্দুক হাতে লড়তে হয়, তা তো নয়। অনেকভাবেই যুদ্ধ করা যায়। কেউ যুদ্ধের খবর পাঠিয়ে যুদ্ধ করছেন। কেউ গান লিখে, কেউ গানে সুর দিয়ে যুদ্ধ করছেন। কেউ গান গেয়ে যুদ্ধ করছেন। কেউ কথিকা লিখে, কেউ কথিকা পড়ে যুদ্ধ করছেন। কেউ আবার মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার খাওয়াচ্ছেন, কেউ ওষুধ দিচ্ছেন। এভাবে যুদ্ধটা জনযুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

কমেন্ট করুনঃ

Scroll to Top
Copy link