সর্বপ্রাণ দুনিয়ার ছোড়ানি

ফন্ট সাইজ-+=

কাজল কানন

ফসলের থোড় উত্থান হলে ধরে নিতে পারি, নিকট কোথাও প্রাণ রয়েছে। তার ইশারা পৌঁছে গেছে ফুলে সমূলে। প্রাণ-প্রকৃতির এই আশেকি ক্রিয়েট, মহাপ্রাণ দুনিয়ার গঠকসত্তা। এই সত্তা অক্ষম করে দেওয়ার সকল আয়োজন জারি রয়েছে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায়। মুনাফাবাদীরা মাঠের একটি দুর্বাঘাসও কস্ট-ম্যানেজমেন্টের বাইরে রাখেনি। ফলে প্রাণ-প্রকৃতিবিনাশী কনভয় বুক চিতিয়ে ঠেকানোর হ্যাডম নিয়ে আগামী দিনের ভাবুকদের আগে বাড়তে হবে। একটি সর্বপ্রাণ দুনিয়া পুনর্রুদ্ধার ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই পৃথিবীর সামনে।

জগতের সকল বস্তু-ভাবের ন্যায্যতা সৃষ্টিই স্রষ্টার অমোচনীয় নৈপুণ্য। এই পন্থা সম্মুখ করে কবি জাকির জাফরান ক্ষেত-খোলায় হাল দিয়েছেন বিহঙ্গপালকের ছায়া মাথায় নিয়ে। মাটি আর আসমানি সংযোগ ঠিক রেখে দেখা ও দর্শনের উত্তম খরিদ তার কবিতা।

কবিতার কায়া-ছায়া চাষ হয় কবির ভেতরেই। সেই ভেতর পানিপথ হয়ে নামে জনে-বনে। দায় দয়া দয়াল এক ফসলের দানা করে জমিনে ছিটাতে পারেন কবি। তার নমুনাফল জাকির জাফরানের কবিতার নয়া ছোড়ানি- সর্বপ্রাণ কবিতার বনায়ন- শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারণার মনুষ্য-মড়ক তাড়ানিয়া ভেষজ। এই কবিতা সর্বপ্রাণ দুনিয়ার তালা খুলে দেয়। যার ভেতরে মানুষকেন্দ্রিক প্রকৃতির অন্যায্যতা জেরার মুখে পড়ে। কবিতা নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্ভব, মনে করি না। নদীস্বভাবে গড়ানো তার অবিরতি, ব্যাখায় বধ করার প্রক্রিয়া হিম্মতি কাজ নয়। কেবল কবিতার পদছাপ দর্শন করিতে করিতে নদীপাড় ধরিয়া কিছুপথ হাঁটিয়া আসিবার চেষ্টা হইতে পারে এইখানে।

তবে শ্রদ্ধেয় লেখক, আবদুল মান্নান সৈয়দ সমালোচনা শিরোনামের লেখায় বলেছেন- … সৃষ্টিকে যদি একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা যায়, সমালোচনা তার পাড়। পাড় ছাড়া নদীর ধারণাই সম্ভব না। সমালোচনা সৃজনকাজকে অন্তঃশীল গতি দ্যায়, রূপরেখা দ্যায়, অতীত ও ভবিষ্যতের সঙ্গে বর্তমানের শিল্পকলাকে মেলায়।’

আবদুল মান্নান সৈয়দের অবস্থানের পক্ষ-বিপক্ষ দাঁড় করানোর পথে আমি নেই। তিনি যেখানে যেতে চান, তার জন্য হয়তো তার মত সঠিক হতে পারে। ফলে কবিতা দুই ধরনের নদীই হতে পারে। আবার কোনো ধরনের নদীই সে না। তাতেও কবিতা কোথাও আটকায় না।

আটকায় পাঠকের মনে-

‘আজ বাবা অঙ্ক শেখাচ্ছিলেন

বললেন, ধরো, ডালে-বসা দুটি পাখি থেকে

শিকারির গুলিতে একটি মরে গেল

তবে বেঁচে থাকলো কয়টি পাখি?

অঙ্কের বদলে এই মন চলে গেল

বেঁচে থাকা নিঃসঙ্গ সে-পাখিটির দিকে

আর মনে এলো তুমি আজ স্কুলেই আসোনি।’

(বই- সমুদ্রপৃষ্ঠা, কবিতা- চিঠি)

এই যে অঙ্কের বাইরে মন, বে-হিসাবে মনপূরানোর আকুতি- এটি পাঠককে আটকে দ্যায়। এখানে প্রাণের মতো আরও এক প্রাণ যুক্ত করে। পাখিটি আর স্কুলগামীর শূন্যতার এমন সম্মিলন-গেরো কবিতা দুই প্রজাতির প্রাণে একই উদ্ভিদেও বাড়ন্ত যেন।

যতই অঙ্ক, স্কুল আর উচ্চতর আয়োজন থাকুক, নিঃসঙ্গতার কোনো আয়তন প্রকার সেখানে নেই।

আসুন এবার-

‘মুহূর্ত পোড়াই

জন্মপাঠক, অনিদ্রা নাও,

তোমাকে দৌহিত্র জানি, পত্রসম্ভবা,

তোমার এ-চোখে দ্যুতক্রীড়া

সবক’টি আঙুলে উপনিবেশ

পাতলা স্বপ্নের গান গাও যদিওবা।

(বই- সমুদ্রপৃষ্ঠা, কবিতা- পাঠক)

ভাষার কাছে কবিতার দায়, কবিতা দিয়ে ফেরাতে হয়। কবিতার ভাষাপ্রকার নির্ধারিত প্রথায় দায়বদ্ধ নয়। এটি তার সময় আর সময়ের পিঠে লতিয়ে ওঠা ভেষজ। ভাষার মধ্য দিয়ে কবিতার মুক্তি ঘটে। তাই কবিকে ভাষা বসানোর আগে গহিন উৎকর্ণ হওয়া প্রয়োজন। জাকির জাফরানের কবিতায় গহিন উৎকর্ণ থাকার প্রতিশ্রুতি বিস্ময়কর। এই যে ‘সব’টি আঙুলে উপনিবেশ।’এটি বহুরূপগ্রাহ্য ভাষাকৌশলের নমুনা হিসেবে সমসাময়িক কবিতায় অমোচনীয় চিহ্ন।

এবার একটি আস্ত কবিতা-

এসেছি শিরস্ত্রাণ পরে, দুটি চোখে পাখি,

চেনা যায়?

– কে গো তুমি?

আমি জাফরান, তোমার পশ্চাদভূমি

– কেন এলে?

আয়ুর কৌটায় দাঁত বসাতে এসেছি

– কিন্তু দাঁত তো ফেলে এসেছো বেদেনীর ঘরে

(কবিতা- অস্তিত্ব বিষয়ক)

কবিতা তখনই পড়ি, যখন সমস্ত বায়ুমণ্ডল আছড়ে পড়ে মাথার উপড়ে। তবদা লেগে যায় চোখে। দেখা যায় না আলিঙ্গন আর অর্ধনমিত জীবনতারার আলো- তখন। ঠিক তখন কবিতা লাগতে পারে মানুষের।  আর সেই যদি হয়- আয়ুর কৌটায় দাঁত বসানোর খায়েস পেয়ে বসতে পারে কখনো। কিন্ত দাঁত তো ফেলে এসেছি বেদেনীর ঘরে! এখন আয়ুর অধিগৃহীত যে জীবন টেনে আনছি, পররম্পরায় তার কোনো পেছনের ভূমি কি মন থেকে উগড়ে দিতে পারবো? পারবো কি আপন ছায়া মোছার কালি হাতে দৌড়াতে। তাই কি কবি অবমুক্ত করার পথ বলছেন না?

দেখুন কোথায় নিয়ে যায় কবিতা-

কার পথে গোধূলি ভাসিয়ে তুমি সূর্যাস্ত দেখেছ?

সে তো এক জন্মান্ধ আয়না।

… … … …

কবরের তল দিয়ে বয়ে যায় নদী।

লোকালয় দিয়ে কত বয়ে গেছে নদী।

প্রতিবেশী দেশ থেকে ধাওয়া করে নদী।

অর্থহীন পায়ে পায়ে মরুভূমি জাগে, তৃষ্ণার্ত হোসেন হায়!

কার জলে গোধুলি ভাসিয়ে তুমি সূর্যাস্ত দেখছ?

(বই- নদী এক জন্মান্ধ আয়না, কবিতা- নদী এক জন্মান্ধ আয়না)

আমার একটা সময় জেলেজীবন ছিল। ১০-১২ জনের একটি দল নৌকা নিয়ে সারারাত মাছ ধরে সকালে ফিরতাম। তার মধ্যে নুরু মামা ছিলেন। নুরু মামা বলতেন- ‘দেখ রে, জীবন থেকে নদীটারে দূর করতে পারলাম না। মা মরল রাতে, নদীতে ছিলাম। বাপ মরল রাতে তাও নদীতে ছিলাম। তারা দূরে গেল, নদীতো গেলো না।’

এখন এই নুরু মামার সঙ্গে নদীর যে বিরান খোয়াবি- তার স্মৃতি ও জলজ সিলসিলা, এটি তো আমাদের জনপদের বোল। তাই কবরের তল দিয়ে বয়ে যায় নদী’- এই কাব্যকরণ, মানুষের গৌন-মুখ্য সম্প্রসারণ নদীর লিঙ্গে বাঁধা- এই কথা কওয়া যাবে কি? কবরের তল দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী আমাদের জীবনই নয় মরণকেও বাঁচিয়ে রাখে- তাই কবিতায় এই হাঁক কবির না ঈশ্বরের, আমি জানি না।

কবিতার কাছে কী চাই-

‘বিশুদ্ধ বাতাস

পাওয়া গেল

মৃতদের হৃৎপিণ্ডে।’

(বই- অপহৃত সূর্যাস্তমন্ডলী, হাইকু ৭)

এমন কিছু লিখে ফেলার পর কবির নিশ্চয় অনেক ঘুম হয়েছে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে আমার বড় মামার কথা- তিনি আবার পরে আমার শ্বশুড়ও ছিলেন। মামা জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই ডাহুক শিকার করতেন। এটি তার পেশা ছিল। সেই বালকবেলায় অনেক সময় গিয়ে মামার সঙ্গে বসে ডাহুক ধরা দেখতাম। তো, তিনি শিকারি ডাহুকটি খাঁচায় রাখতেন। এরপর খাঁচাটি জঙ্গলে রেখে দিতেন। তার চারপাশে ফাঁদ পাতা থাকতো। তিনি দূরে এসে বসে থাকতেন। খাঁচার ডাহুকটি ডাকা-ডাকি করতে থাকতো। এক পর্যায়ে জঙ্গলের ডাহুক তার কাছে আসতে গিয়ে ফাঁদে ধরা পড়ত। তখন শুনতাম খাঁচার ডাহুকের স্বর বদলে যেতো। সে তখন একটানা ডাকতো না। থমকে থমকে ডাকতো। আর ফাঁদে ধরাপড়া ডাহুকটি ফাঁদ ছাড়াবার প্রাণপণ চেষ্টা করতো। তখন ডাহুক দুটির স্বর আলাদা করার একটাই উপায় জানা ছিল আমার- সেটি হচ্ছে না-জানার চেষ্টা করা। এই কবিতাও তাই।

পড়ুন-

একটা জীবন

একটা সবুজ গাছের ফুসফুসে কতকালই বা রাখা যাবে!

তারও তো স্বপ্ন আছে বনদস্যুকে চিঠি লিখবার।

বরং ফিরে যাও;

যেভাবে রক্তের মধ্যে ভেসে থাকে ব্যথা ও বিদ্রুপ

যেভাবে একটি আতাগাছ তিনটি যামিনী বিশ্রাম করে

তুমিও ভেসে থাকো, বিশ্রাম করো,

চাঁদ-ভাঙা বৃষ্টিতে পা দিয়ে ঠিক সেই মতো।

(বই- অন্ধের জানালা, কবিতা- বিশ্রাম)

একটি আতাগাছ তিনটি যামিনীকে আমরা কি নিজের গঠকসত্তা হিসেবে পরিসরে ঠাঁই দিয়েছি। আমরা কি ডেকেছি তাদের, যাদের নির্মোহ জাগরণ আমাদের সংসারে প্রাণ পাঠায়। কবি জাকির জাফরান তাদের স্বতন্ত্র মূল্যমান উচ্চারণ করেছেন। ইতিহাস বা অনৈতিহাস এখানে কবিকে ঠেলেছে বলে মনে হয় না, কবিতার প্রকার ও প্রকরণ নিয়ে এটি এই মাত্রায় হাজির হয় পাঠে।

আমরা যে ফুসফুস বহন করি, এই ফুসফুস আসলে কার! গাছের না মানুষের? এমন প্রশ্ন থেকে ফুসফুসকে দেহের ভেতর লালন করার একটি জানালা থাকতে পারে, যার মধ্য দিয়ে বাতাস আসা-যাওয়া করে। আর বন্যদস্যু কী, আজকে পিতা প্রপিতা গড়িয়ে সেই তর্জমাও কিন্তু আমাদের ঘাড়ে।

আর কোনও পরিচয় নেই

শুধু ছলছল

শুধু কবি আমি

আমি পাথরের পায়ে ধাক্কা খাওয়া জল।

… … …

তাই বলি, আমাদের আর কোনও পরিচয় নেই আজ,

আমাদের বুকে খলবল

আমরা শুধুই কবি

নিশ্চুপ পাথরের পায়ে যেন ধাক্কা খাওয়া জল।

(বই- অন্ধের জানালা, কবিতা- কবি)

আমাদের বিল-ডোবা মাঠগুলো যখন রাসায়নিকে পিত্তথলির পাথর নিয়ে ঘুরছে, বীজগুলো যখন মুণ্ডহীন মাছের নির্মম ঘূর্ণি, বিনা রাজস্বে খোলা মাঠের দিকে যাওয়া প্রায় অসম্ভব, মুনাফার মিহিন মদ গিলে সূর্যবর্ষীয় কড়া রোদের মধ্যে নদী নেই, নাব্য নেই জলায়াত্ব অতীত নেই, এমন তৃষিত তাম্রগগনতলে কবি পরিচয় দেন- নিশ্চুপ পাথরের পায়ে যেন ধাক্কা খাওয়া জল। পাথরের ভেতর জলের বাসা। এ যেন অলীক কবিতাকরণ! স্ববৈশিষ্ট্যে প্রগাঢ় শিল্পে চুম্বন। (চলবে)

কমেন্ট করুনঃ

Scroll to Top
Copy link