রনজিত কুমার: কবিতা হয়ে ওঠা মানুষ

ফন্ট সাইজ-+=

রইস মুকুল

রনজিত কুমার যার একটি ছায়া নামও আছে। একজর মানুষের নাম বুলেট, রনজিত কুমারের এই ছায়া নামটি আমি প্রথম শুনি ময়মনসিংহে বিক্ষণের এক অনুষ্ঠানে। আমার সমবয়সী হলেও তাকে দাদা বলেই ডাকতাম! এখন ডাকলে আর তিনি সারা দেবেন না চলে গেছেন, যেখানে গেলে আর কেউ সারা দিতে পারে না কারো ডাকে সেখানেই চলে গেছেন। তিনি ছিলেন মূলক বিপ্লব ভাবনার মানুষ। তবে কবিতাও ভাবতেন, তার কবিতা নিয়ে কথা বলতেই এ লেখার সূত্রপাত। তো তার কবিতা দিয়েই শুরু করি।

 

কবিতার অলঙ্কারের খোঁজে

আমি যখন আমলাপাড়ার গলি দিয়ে হেঁটে যাই

হারমোনিয়াম থেকে ভেসে আসা সুরের বদলে

শুনতে পাই কর্কশ কাকের আওয়াজ

(কবিতার খোঁজে/এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে)

 

রনজিত কুমারের একমাত্র কবিতার বই ‘এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে’ থেকে ‘কবিতার খোঁজে’ শিরোনামের কবিতার চার লাইন উদ্বৃতি করেই লেখা শুরু করলাম একজন রনজিত কুমারের কবিতা হয়ে ওঠা বিষয়ে। তবে এর আগে একটু ভূমিকা করে নেবার সুযোগ যে রইল না তা তো নয়! বিষয়টা হয়ত সকলেই জানি জন্মের পর থেকে বুদ্ধি বিকাশের ধারাক্রমে মানুষের জীবন বৈষম্যপূর্ণ সমাজে বেড়ে উঠতে থাকে মনে অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে। কিন্তু সকল জীবনের ভাবনা এবং প্রশ্নগুলো একই রকম হয় না। নিজের ভেতরের নিত্যনতুন সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজতে থাকে মানুষ তার আহরিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের দ্বারা তারপর কিছু কিছু মানুষ ঘুচাতে চায় সমাজে মানুষে মানুষে বৈষম্যকে। বৈষম্য ঘুচানোর এ সংগ্রামে সে অবস্থান করে কোনো রাজনীতিতে অথবা সংস্কৃতি হাতিয়ার করে, যদিও আমরা জানি সমাজে সংস্কৃতিকে সচল রাখে মূলত রাজনীতিই। যে কোনো সংগ্রামী রাজনৈতিকের প্রয়োজন হয় বাগ্মিতা এবং সামাজিক ইতিহাস পাঠ, সংস্কৃতিজনের প্রয়োজন হয় সামাজিক ইতিহাস পাঠের সাথে সাথে নিজস্ব সৃজনশীলতা যার দ্বারা বৈষম্যের কথা জানাবে, বুঝাবে আর প্রবুদ্ধ করবে সংগ্রামে আপন শ্রেণির মানুষকে। সৃজনশীল কাজগুলোর মধ্যে অধিকাংশ মানুষ জীবনে প্রথম সম্ভবত আকর্ষিত হন কবিতার দ্বারা। শ্রুতি-ধাবমানের দাদা রনজিত কুমারও সমাজের দুঃসহ বৈষম্য দেখে দেখে কৈশোরেই কবিতামুখি হয়েছিলেন যেÑ সেটা কেবল অনুমান নয় বরং সত্য হিসেবেই ধরা যায় পরিণত বয়সে তার কবিতার প্রতি অনুরাগ দেখে। যদিও একজন সৃজনশীল সাংগঠনিকের দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে রনজিত কুমার তেমন করে কবিতাচর্চায় থাকতে পারেননি। তাতে কী? আবৃত্তি শিল্পী ও প্রাবন্ধিক রনজিত কুমারকে তাই বলে আমরা কবি বলে সম্বোধন করবো না! রনজিত কুমার অবশ্যই কবি কিছু কিছু কবিদের কবি, সত্যিকার অর্থেই অনেককে তিনি হাতে-কলমে কবিতা লিখতে শিখিয়েছেন। পরবর্তীতে যারা কবি হিসেবে খ্যাতিও পেয়েছে।

 

এই লেখার শুরুতেই কবি রনজিত কুমারের যে কবিতার উদ্বৃতি করেছি সেখানে প্রথম লাইনটি হলো ‘কবিতার অলঙ্কারের খোঁজে’ পুরো কবিতাটি পড়তে পড়তে দেখা যায় কবি কবিতার জন্য অলঙ্কার খুঁজছেন, উপমা-অনুপ্রাস, চিত্রকল্প আর ছন্দ খুঁজছেন! কবিতাটি শেষ করে দেখা যায় কবি রনজিত কুমার বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামকেই কবিতা বানিয়ে নিয়েছেন আর সেই কবিতার অলঙ্কার, উপমা-অনুপ্রাস, চিত্রকল্প ও ছন্দকে করেছেন সংগ্রামকবিতার হাতিয়ারের উপমা। পরিশেষে রনজিত কুমার আহ্বান করছেন সকল কবিই যেন নিজে একটি কবিতা হয়ে উঠেন। কবিতার কাঠামো বিবেচনায় বোদ্ধা পাঠক এ কবিতাটিকে কতটা গ্রহণ করবেন সেটা তাদের বিবেচনার জন্যেই রাখলাম সাধারণ পাঠক হিসেবে আমরা কবিতাটিকে কোনোভাবেই ফেলে দিতে পারি কি? এখানে বলতেই হয়, কবি রনজিত কুমার সমাজ বদলের চিন্তার রাজনীতিকে হৃদয়ে ধারণ করা মানুষ, কাজেই তার কবিতার কাব্যময়তা একটু হেরফের হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। রনজিত কুমারের কবিতাও সংখ্যাও খুব বেশি নাÑ যতটুকু জানি ‘এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে’ প্রচ্ছদের ভেতর ৪৭টি কবিতাই কবির দীর্ঘ দিনের চর্চার ফসল, জীবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে বিভিন্ন সময়ে কবি রনজিত কুমার যখনই খুব বেশি কষ্টে আহত হয়েছেন, আনন্দে পুলোকিত হয়েছেন কিংবা কোনো কিছুর সৌন্দর্যে খুব বেশি মুগ্ধ হয়েছেন তখনই তাকে কবিতায় পেয়ে বসেছে সেটা বুঝা যায় তার কবিতা পড়াতে যেয়ে। তার কবিতার বইয়ের নামকরণ যে কবিতার শিরোনামেÑ ‘এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে’ বইয়ের প্রথম কবিতা। প্রায় পঞ্চান্ন লাইনের কবিতাটির প্রথম ও শেষের থেকে দুই লাইন করে উদ্বৃতি করলেই কবির বিষয়ে এবং তার কবিতার ভেতরটা পাঠক বুঝে ফেলবেন সহজে। মাঝখানে যা কিছু আছে তা কেবলই স্বপ্নভঙ্গ আর স্বপ্ন দেখার বয়ান, কথামতো উদ্বৃতি দিলাম

মোটামুটি ফল পাকার আগেই পেড়ে ফেলতে হলো

মোটামুটি গন্তেব্যে পৌঁছার আগেই ব্রেক কষতে হলো

………………………………………………………

………………………………………………………

শুধু আজ চুপচাপ আমার রিলে রেসের কাঠি চাই দিয়ে যেতে

সাহসী কেউ কি আছেন যিনি এ সমাবেশ থেকে এ মায়ার কাঠি শক্ত হাতে নেবেন।

(এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে/এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে)

 

উদ্বৃতির শেষাংশে দেখা যাচ্ছে কবি রনজিত কুমার ২০১৯ এর ২ জানুয়ারিতে না ফেরার রাজ্যে নির্বাসন নেয়ার অনেক আগে থেকেই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সাহসী উত্তরসূরি খুঁজতেছিলেন!

 

উপরের মাত্র দুটি উদ্বৃতি থেকেই স্পষ্টত বুঝা যাচ্ছে কেবলমাত্র সস্তা আবেগ বা রোমান্টিকতায় আক্রান্ত হয়ে রনজিত কুমার কবিতা ভাবেননি। মূলত তিনি মনে প্রাণে সারাক্ষণ সাংগঠনিক চিন্তায় থেকেছেন বলে কবিকেও ভেবেছেন সাংগঠনিক কর্মীরূপে আবার কখনো বা ভেবেছেন কবি নিজেই যেন হয়ে ওঠেন প্রতিবাদী একটি কবিতা।

আজলা ভরে যে ছোট গাছটিকে রোজ ঢেলে দিতাম স্নেহের জল

সে এখন ছায়ার বদলে মাথায় ভাঙে ডাল

যে ময়না ছানাটিকে সময় দিয়ে দিয়ে শিখিয়েছি বোল

সে এখন সুযোগ বুঝে বুকে বসায় মরণ-কামড়

(জবানবন্দী/এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে)

 

উদ্বৃতির এই চার লাইন কবি রনজিত কুমারের জবানবন্দী শিরোনামের কবিতার অংশ। পুরো কবিতা পড়ে কবির যাপিত সময়ের বিশেষ একটি কষ্টপূর্ণ খণ্ডচিত্র পাঠকের চোখের ওপর ছায়া ফেলে যা সত্যিকার অর্থেই খুব বেদনার! হলেও কবির দুর্মর বিপ্লব আকাক্সক্ষার সাহস আবার তাকে ঘুরে দাঁড়াবার জন্য যুগিয়েছে উদ্যম। তাই তিনি কবিতার শেষ প্যারায় কাজল নামের একজন সহযোদ্ধাকে বললেন নারে, এ জবানবন্দী জমা দেয়া যাবে না বরং আবার মহড়াকক্ষের ঘণ্টা বাজা, দ্যাখ চেয়ে জোনাকীর দল এস গেছে সুরের মূর্চ্ছনায়, দ্যাখ কেমন আলোয় আলোয় হেসে উঠছে মঞ্চটা। স্বপ্নদ্রষ্টা কবি এভাবেই পথভ্রষ্টা মানুষকে রোদ্দুরের ছাত্র ভেবে টেনে নেয় নতুন জীবনের দিকে। আর এক পরতা উদ্বৃতি দেয়া যাক তবে ভেবেছিলাম রনজিত কুমারের ‘রোদ্দুরের ছাত্ররা’ কবিতাটির থেকে উদ্বৃতি করবো কয়েক লাইন। যদিও কাঠামোবাদীদের কাছে এ কবিতাটি তেমন একটা কবিতা হয়ে উঠেনি বলে মনেই হবে কিন্তু লেখাটি বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে উল্লেখ্য করার মতোই, তবুও শেষতক সমালোচনার ভয়ে সেটা থেকে উদ্বৃতি না করে অন্য কবিতার দিকেই খেয়াল দিতে হলো

জীবনে জীবন যোগ করার শিক্ষা

পেছিলাম এই লৌহিত্য জনপদে।

 

এই জনপদের বুকে জড়ানো আছে মায়া

ছায়াবৃক্ষ শোনায় নির্ভরতার গান।

(জীবনের গান/এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে)

 

উদ্বৃতির চার লাইন কবির ‘জীবনের গান’ নামের কবিতা থেকে। রনজিত কুমার তার জীবনের দীর্ঘ সময় ময়মনসিংহ শহরে কাটিয়েছেন, এখানকার মানুষের অনেকের সাথে তার গভীর সম্পর্ক ছিল যারা তার বিপ্লবী চিন্তার সহচর ছিলেন। তারাই সংগ্রামী নক্ষত্রের মতো আলোকিত হয়ে উঠেছেন এ কবিতায় এবং পরিশেষে ময়মনসিংহ শহরকে তার দ্বিতীয় জন্মভূমি বলে পরিচয় দিয়েছেন। পূর্বেই বলেছি কবি রনজিত কুমার জীবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে বিভিন্ন সময়ে যখনই কোনো কিছুতে খুব বেশি কষ্টে আহত হয়েছেন, আনন্দে পুলোকিত হয়েছেন কিংবা একটা কিছুর সৌন্দর্যে বা কারও ব্যবহারে খুব বেশি মুগ্ধ হয়েছেন তখনই সেসব বিষয়ে কবিতা লেখার আগ্রহ তাকে পেয়ে বসেছে। ‘নিঝুম দ্বীপের পথে’কবির একটি কবিতার নাম, এ কবিতাটির গল্প নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণের সময় সেখানে পরিচিত হওয়া আবদুর গফুর নামের এক মানুষকে মনে করার মধ্য দিয়ে। ভ্রমণে মধ্য দিয়ে মানুষের জ্ঞানের বিকাশ হয় এমনটি বিশ্বাস করতেন কবি রনজিত কুমার তাই সুযোগ পেলে প্রায়ই দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন ভ্রমণে। তার নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণের সময় এ লেখার লেখকের সুযোগ হয়েছিল ভ্রমণসঙ্গী হবার এবং একজন স্বাক্ষী আবদুর গফুর নামের মানুষটির আন্তরিকতার সেটা অন্য গল্প বটে। তবে এ পর্যন্ত এটা বুঝাই গেলো কবি রনজিত কুমারের কবিতার ভেতর অবশ্যই একটা গল্প থাকে। এবার আসি কবির দিনাজপুর ভ্রমণের পর লেখা কবিতা শিরোনাম হয়েছে যার ‘আমার দেখা। শিরোনাম দেখেই বুঝা যাচ্ছে কবি কবিতা নিয়ে খুব গুরুত্ব দিয়ে তেমন ভাবেননি- কবিতার শিরোনাম দেয়াও কোনো কবির কাছে হেলাফেলা বিষয় নয় অথচ রনজিত কুমার সেটাই করেছেন! যাই হোক কবিতার প্রতি কবি রনজিত কুমারের সকল উদাসীনতা দেখেও কবিতার প্রতি তার প্রেম আমরা অস্বীকার করতে পারি না, কেন না শেষতক আমরা তার কবিতার চেষ্টায় দেখি মানুষই বড় হয়ে ওঠে তার কাছে। ‘আমার দেখা’কবিতায় কবি দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির, রামসাগর, বড় পুকুরিয়ার কয়লাখনি দেখার সংকল্প করে করে শেষতক কিছুই না দেখে কিছু মানুষের সাথে কর্মব্যস্ততায় থেকে চলে এসেছেন, তাই কবিতার শেষ চরণে দেখি উদ্বৃতির এ উচ্চারণ

ওমা! কী যে হলো আমার, কীসে যে হয়ে গেলাম বেহুঁশ

এখানে এসে ওসবের কিছুই দেখা হলো না আমার

একমাস ধরে শুধু দেখলাম এখানকার কিছু মানুষ,

কিছু সহজ সরল মানুষ।

(আমার দেখা/এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে)

 

‘এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে’ কবি রনজিত কুমারের একমাত্র কবিতা গ্রন্থ। সত্যি বলতে কী ‘এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে’ কোনো কবিতার বইয়ের নাম এটা কিছুতেই মনে হয়নি। কেন মনে হয় না বলছি আসলে কবিতার শব্দেরও বিশেষ রূপ-লাবণ্য বলে কিছু থাকে যে সেটা তো আর মিথ্যে নয় বরং আমরা আলোচিত কবিতার বইটির কবির একটি প্রবন্ধের বইয়ের নাম দেখেছি ‘চৌহদ্দির রিনিঝিনি’! নামের মধ্যে কেমন যেন একটা রিনঝিন ঝংকার সুর তুলে যায় যেন। যাই হোক, কবি রনজিত কুমার কবিতার প্রেমে মগ্ন থেকেও সারাক্ষণ গদ্যময় কাজের ভেতর ব্যস্ত থেকেছেন, তদোপরি স্বপ্ন দেখেছেন প্রতিটি মানুষ কবিতা হয়ে ওঠুক। কিন্তু আমরা দেখছি প্রত্যেক মানুষ নিজে কবিতা হয়ে উঠবে এরূপ স্বপ্ন দেখার মনুষটি নিজেই একদিন কবিতা হয়ে গেছেন, এই কবিতাটি যেন আমরা বার বার পড়ে মনে রাখি আপন শ্রেণি সংগাম।

 

কমেন্ট করুনঃ

Scroll to Top
Copy link