ভাষা সংগ্রামের পূর্বপাঠ : তাত্ত্বিক সংগ্রাম।। রফিউর রাব্বি

ফন্ট সাইজ-+=

রফিউর রাব্বি

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিটি পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্ব থেকেই উচ্চারিত হচ্ছিল। ভাষা আন্দোলনের পূর্বে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে-বিপক্ষে একটি তাত্ত্বিক লড়াই শুরু হয়েছিল এবং তা চলেছিল দীর্ঘদিন। অনেকেই ভাষা সংগ্রামের আদিপর্বের এ লড়াইটিকে ভাষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক লড়াই বলে উলে­খ করে থাকেন। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত ‘ইত্তেহাদুল মুসলেমিন’এর এক উর্দু সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে ‘উর্দুই পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হইবে’ বলে দাবি করার পর পরই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়ে যায়।১ পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য ও লেখালেখি আরম্ভ হয়। ৩ জুন ‘কাফেলা’ পত্রিকার ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যায় কবি বুদ্ধদেব বসুর একটি চিঠি প্রকাশিত হয়। তিনি পত্রিকার সম্পাদক বরাবর চিঠিটি লিখেন। তিনি লিখেন, ‘কলকাতার মুসলমান সাহিত্যিকরা মিলে নতুন একটি বাংলা সাপ্তাহিক বের করেছেন, এই খবর পেয়ে উৎসাহিত হয়েছি। বলা বাহুল্য, বাঙালি সাহিত্যিকদের ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’ এই দুই অংশে বিভক্ত আমি নিজের মনে কখনোই করি না; কিন্তু ঘটনাচক্র আজ এমন ঘন জটিল হয়ে উঠেছে যে আপাতত এই বিভাগ মেনে নিতে হলো। রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর বিচ্ছেদ ঘটলো বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমানে; এ-বিচ্ছেদ যে কত সুদূর-প্রসারী সর্বনাশে আমাদের উত্তীর্ণ করতে পারে, এখন তা আমাদের কল্পনারও অনায়ত্ত। এখনকার মতো, বিধাতার কাছে শুধু এই প্রার্থনা আমরা জানাতে পারি যে, সে-সর্বনাশ যেন না ঘটে, কালক্রমে বাঙালির ঘরে যত ভাই-বোন আবার যেন এক হয়। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে অতিক্রম করে কখনও একটি মিলনের ক্ষেত্র আছে আমাদের, একটিই আছে, একটিমাত্র। সে-ক্ষেত্র আমাদের সাহিত্য, আমাদের ভাষা। একমাত্র সাহিত্যই সেই শ্রীক্ষেত্র, যেখানে জাতিভেদ নেই, দেশে-দেশে সীমান্তরেখা নেই, মানুষে-মানুষে ভেদচিহ্ন নেই। কত দূর, কত অচেনা, কত বিরোধী পরস্পরের সঙ্গে মিলন ঘটে সাহিত্যে-আর এ তো বাংলার হিন্দু মুসলমান। হিন্দু মুসলমান উভয়েই যে বাংলা ভাষা বলে, এই কি তাদের ঐক্যের অলঙ্ঘ্য পরিচয় নয়? আমাদের এই মৌল এবং বর্তমানে একমাত্র মিলনক্ষেত্রেও বিপন্ন হবে, যদি রাষ্ট্রভাষারূপে পূর্ব বাংলায় উর্দু আর পশ্চিম বাংলায় হিন্দি স্থাপিত হয়। সে-দূর্দৈব যাতে না ঘটে, সে উদ্দেশ্যে আন্দোলন আরম্ভ করার সময় এসেছে। রাষ্ট্রব্যবস্থা যে-রকমই হোক, স্বাধীন দেশে মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য-কোনো ভাষা যে রাষ্ট্রভাষার স্থান পেতে পারে, আধুনিক জগতে এ-প্রস্তাব অচিন্তনীয়। এই সংকটকালে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বাঁচাবার দায়িত্ব হিন্দু মুসলমান উভয়েরই। আশা করি আপনাদের পত্রিকায় এই বিষয়টিকে যথোচিত প্রাধান্য দেবেন।’
আবদুল হক ‘বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ শিরোনামে দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ লিখেন। দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার রবিবাসরীয় পাতায় ২২ ও ২৯ জুন দুই কিস্তিতে তা প্রকাশিত হয়। তখন কবি আহসান হাবীব ছিলেন ইত্তেহাদের রবিবাসরীয় পাতার সম্পাদক। এর একদিন পর ৩০ জুন ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে আবদুল হকের আরেকটি প্রবন্ধ দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হয়। তাতে তিনি স্পষ্ট করেই লিখেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে, তা এখন স্থির করার সময় এসেছে। যে ভাষাকেই আমরা রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করি, তার আগে আমাদের বিশেষভাবে ভেবে দেখতে হবে, কোন ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করলে সব থেকে বেশি সুবিধা হবে, কোন ভাষায় পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক লোক কথা বলে, পাকিস্তানের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাষা কোনটি, কোন ভাষায় সব থেকে শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সৃষ্ট হয়েছে এবং কোন ভাষা ভাব প্রকাশের পক্ষে সব থেকে বেশি উপযোগী। যেদিক থেকেই বিবেচনা করা যাক না কেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার দাবিই সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে দ্ব্যর্থক যদিও কিছু নেই, তবু এখানে স্পষ্ট করেই বলা প্রয়োজন বোধ করছি যে, কেবল পূর্ব-পাকিস্তানের জন্যই নয়, পশ্চিম-পাকিস্তানসহ সমগ্র পাকিস্তানেরই রাষ্ট্রভাষা হওয়ার দাবি এবং যোগ্যতা সবচেয়ে বেশি বাংলা ভাষার। পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ভাষা পাঁচটি : বেলুচি, পশতু, সিন্ধী, পাঞ্চাবি এবং বাংলা। পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দুভাষা নেই তা নয়, বাংলাও আছে। কিন্তু পূর্ব-পাকিস্তানের তো নয়ই, পশ্চিম পাকিস্তানেরও কোনো প্রদেশের মাতৃভাষা উর্দু নয়। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্বাচন করতে হলে এই পাঁচটি ভাষার মধ্য থেকেই করতে হবে। এর মধ্যে প্রথম চারটিতে যারা কথা বলে, তাদের কারোই সংখ্যা বাংলাভাষীদের সমান নয়। পশতুভাষীদের সংখ্যা ১ কোটির অনেক নিচে। বেলুচি এবং সিন্ধীভাষীদের সংখ্যা তার চেয়েও কম। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক লোকে কথা বলে পাঞ্জাবিতে। কিন্তু ভাষা হিসাবে এগুলোর কোনটিই প্রথম শ্রেণির পর্যায়ে পড়ে না। এসব ভাষায় কোনো উন্নত সাহিত্য গড়ে উঠেনি। অতএব এসব ভাষাকে রাষ্ট্রভাষিক প্রশ্ন থেকে বাদ দেয়া যায়। বাকি থাকে বাংলা। আমাদের যে বিকলাঙ্গ, পূর্ব পাকিস্তান সে পাকিস্তানেও বাংলাভাষীর সংখ্যা পাঁচ কোটির মতো। সিলেটের গণভোটে আমাদের জয় হলে এর সীমা-নির্ধারণ কমিশনের রায়ের ফলে আপাতত নির্দিষ্ট পূর্ব-পাকিস্তানের সংলগ্ন মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলো এর সঙ্গে সংযুক্ত হলে পূর্ব-পাকিস্তানের লোকসংখ্যা দাঁড়াবে পাঁচ কোটির কিছু বেশি। এই পাঁচ কোটির প্রায় সকলেই বাংলাভাষী। পশ্চিম-পাকিস্তানের জনসংখ্যা কিছু কমবেশি তিন কোটি এবং ভাষা হিসেবে এই তিন কোটি লোকও আবার প্রধান চার ভাগে বিভক্ত।
পাকিস্তানের সব থেকে বেশি লোকে কথা বলে বাংলা ভাষায়। এই হিসেবে পাকিস্তানে প্রচলিত ভাষাসমূহের মধ্যে রাষ্ট্রভাষা হওয়ার দাবি সবচেয়ে বেশি বাংলার। …অতএব, পাকিস্তানের কেবল পূর্ব-পাকিস্তানের নয়, পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় পাকিস্তানকে নিয়ে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবার যোগ্যতা সবচেয়ে বেশি বাংলা ভাষার। …যারা বলেন যে, বাংলা হিন্দুর ভাষা এবং পৌত্তলিকতার ভাষা, মুসলমানদের ভাষা নয়, তারা কেউ এই ভাষা সম্বন্ধে জ্ঞান রাখেন না। …আরবি ও ফারসি মূলত ছিল পৌত্তলিক জাতি ও সংস্কৃতির ভাষা, ইসলামের প্রভাবে এই ভাষা দুটি হলো ইসলামীয় ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভাষা।’২
এর কিছুদিন আগে ২৩ জুন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় আয়েশা বেগম নামে একজনের চিঠি প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে তিনি লিখেন. ‘সম্পাদক সাহেব, একটি কথা উঠেছে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নাকি হবে উর্দু। বাংলা ও আসামের যে যে অংশ নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হচ্ছে তার চারটি অধিবাসীদের মধ্যে বাংলা যারা বলে না কিংবা বাংলা যাদের মাতৃভাষা নয় তেমন লোকের সংখ্যা হাজারে এক জনেরও কম। যেখানে প্রায় সকল অধিবাসীরই মাতৃভাষা বাংলা, সেখানে একটা স্বতন্ত্র ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করে রাখা যেমন করেছিল আমাদের ইংরেজ প্রভুরা। যদি আমাদের কাঠমোল্লা শ্রেণির কোন কোন লীগ নেতার সমাজে এই গণতন্ত্র বিরোধী অবাস্তব পরিকল্পনা ঠাঁই পায় তবে তার বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা একান্ত প্রয়োজন।’৩
সাপ্তাহিক মিল্লাত-এর ২৭ জুন সংখ্যায়র সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, ‘মাতৃভাষার পরিবর্তে অন্য কোন ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে বরণ করার চাইতে বড় দাসত্ব আর কিছু থাকিতে পারে না। পূর্ব পাকিস্তানবাসীকে এই ঘৃণ্য দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধিতে যদি কেহ বাসনা করে তাহা হইলে তাহার সেই উদ্ভট বাসনা বাঙালির প্রবল জনমতের ঝড়ের তোড়ে তৃণখণ্ডের মতো ভাসিয়া যাইবে।’৪
জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দীন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেন। এরপর মাহবুব জামাল জাহেদী বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ‘রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ শিরোনামে ২০ জুলাই দৈনিক ইত্তেহাদে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেন। ২৭ জুলাই ‘উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে’ শিরোনামে দৈনিক ইত্তেহাদে আবদুল হকের আরেকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এরপর দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি ড. জিয়াউদ্দীন আহমেদের বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করে লিখেন, ‘ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করার পক্ষে অভিমত দিয়েছেন। কিন্তু তিনি বোধ হয়, একথা ভুলিয়া গিয়াছেন যে, পাকিস্তানে মুসলমান ব্যতীত বহু সংখ্যক হিন্দু ও শিখ নাগরিক আছে। অনেকেই এরূপ ধারণার বশবর্তী যে, একটি রাষ্ট্রে একটিমাত্র রাষ্ট্রভাষা থাকিবে। সোভিয়েত রাশিয়ার কয়েকটি ভাষাই রাষ্ট্রভাষারূপে পরিগণিত হইয়াছে। সেইরূপে কানাডায় ইংরেজি ও ফরাসি ভাষা, বেলজিয়ামে ফরাসি এবং ফ্লোমিন ভাষা এবং সুইজারল্যান্ডে ফরাসি, ইটালীয় ও জার্মান ভাষা রাষ্ট্রভাষারূপে পরিগণিত। কংগ্রেসের নির্দিষ্ট হিন্দির অনুকরণে উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে গণ্য হইলে তাহা শুধু পশ্চাৎগমনই হইবে।
আমরা ইংরেজকে পরিত্যাগ করিতে পারি, কিন্তু ইংরেজিকে ত্যাগ করিতে পারি না। ইহা একটি আন্তর্জাতিক ভাষা এবং আধুনিক চিন্তাধারা ও বিজ্ঞানের বাহন। পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান এই দুইটি ডোমিনিয়নকেই প্রগতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করিতে হইলে, ইংরেজি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা উচিত। ইহা আমাদের জাতীয় গৌরবের পরিপন্থী হইবে না। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভের জন্য ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছিল, কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর তাহারা ইংরেজি ভাষাকে পরিত্যাগ করেন নাই। ইংরেজি ভাষার বিরুদ্ধে একমাত্র যুক্তি এই যে, ইহা পাকিস্তানে ডোমিনিয়নের কোনো প্রদেশের অধিবাসীরই মাতৃভাষা নয়। উর্দুর বিপক্ষেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। পাকিস্তান ডোমিনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীর মাতৃভাষা বিভিন্ন, যেমন-পশতু, বেলুচি, পাঞ্জাবি, সিন্ধী এবং বাংলা। কিন্তু উর্দু পাকিস্তানের কোনো অঞ্চলেই মাতৃভাষারূপে চালু নয়।
উপরিউক্ত ভাষাসমূহের মধ্যে বাংলা ভাষার সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যে একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করিয়াছে। কত অধিকসংখ্যক লোকে একটি ভাষা বলে, এই অনুযায়ী বাংলা ভাষা বিশ্বভাষার মধ্যে সপ্তম স্থান অধিকার করিয়াছে। যদি বিদেশি ভাষা বলিয়া ইংরেজি ভাষা পরিত্যক্ত হয়, তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ না করিবার পক্ষে কোন যুক্তি নাই। যদি বাংলা ভাষার অতিরিক্ত কোন দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করিতে হয়, তবে উর্দু ভাষার দাবি বিবেচনা করা কর্তব্য। ভারতের সর্বত্রই অনেকে মোটামুটিভাবে উর্দু ভাষা বুঝিতে পারে। এমনকি আরব, ইরান ও আফগানিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার অধিবাসীগণও সহজেই অনুসরণ করিতে পারিবে। এই দিক দিয়া উর্দুুর হিন্দি অপেক্ষা আন্তর্জাতিক ভাষারূপে পরিগণিত হইবার সুবিধা আছে। কিন্তু উর্দু অপেক্ষা ইংরেজির দাবি অগ্রগণ্য। ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে যে সুবিধা পাওয়া যাইবে, উর্দু ভাষা সে তুলনায় নগণ্য।’৫
৩ আগস্ট ‘বেগম’ পত্রিকায় ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে ‘মিসেস এম. এ. হক’ ছদ্দনামে আবদুল হকের একটি ছোট নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। তিনি তাতে স্পষ্ট করে বললেন, ‘বাংলা এবং উর্দু এই দুই ভাষাকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা সঙ্গত। সুইজারল্যান্ড, কানাডা প্রভৃতি দেশে একাধিক ভাষা রাষ্ট্রভাষারূপে গৃহীত হয়েছে, পাকিস্তানেও গ্রহণ না করার কারণ নেই।’ বাঙালি কবি ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও তখন কেউ কেউ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে কলম ধরেন। তারা এমনও বলেন ‘রাষ্ট্রভাষা হওয়ার যোগ্যতা বাংলা ভাষার নেই।’ তাত্তি¡ক এ বিতর্ক দীর্ঘ দিন ধরে চলে।৬
বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার দাবি জানিয়ে ১৭ নভেম্বর ১৯৪৭ কয়েক’শ বিশিষ্ট বাঙালি নাগরিক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে স্মারকলিপি দেন। এর পরদিন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়, ‘বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বলিয়া ঘোষণা করার অনুরোধ জানাইয়া পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রীর নিকট একখানি স্মারকপত্র দাখিল করা হইয়াছে। পূর্ব পাকিস্তানের শত শত নাগরিক এই স্মারকপত্রে স্বাক্ষর করিয়াছেন এবং ইহাদের মধ্যে সাহিত্যিক, কবি, শিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, আইনজীবী, অধ্যাপক, ওলামা, ছাত্র, রাজনৈতিক নেতা, ডাক্তার, মহিলা সকলেই আছেন।
স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মৌলানা আবদুল্লাহিল বাকী এম.এল.এ, তমদ্দুন মজলিসের সেক্রেটারি অধ্যাপক আবুল কাশেম, মৌলবী আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, কবি জসিমুদ্দীন, মৌলবী আবুল কালাম শামসুদ্দীন (সম্পাদক আজাদ), অধ্যাপিকা মিসেস শামসুন্নাহার মাহমুদ এম.এ., এম.বি.ই, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খান, চেয়ারম্যান, মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, শিল্পী জয়নুল আবেদীন, অধ্যাপক মনসুরউদ্দীন, মিঃ আবুল হাসানাত (ডি, আই, জি, পুলিশ), অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন ডি. পি. এইচ (প্রভাষক সলিমুল্লাহ মুসলিম হল), প্রিন্সিপাল শরফুদ্দীন আহমদ, প্রিন্সিপাল জহুরুল ইসলাম, মি. জাকের হোসেন (আই. জি. পুলিশ), ডা. ওসমান গনি ডি. এস. সি, অধ্যাপক আবদুল লতিফ বার এট ল, মওলানা মোস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক অতুল সেন, আল্লামা ডাঃ মহিউদ্দীন, মৌলবী আবুল মুনসুর আহমদ, মিসেস লীলা রায় এম এ (সম্পাদিকা, জয়শ্রী), মিসেস আনোয়ারা চৌধুরী বি. এ. বি. টি, সেক্রেটারি নিখিল বঙ্গ মুসলিম মহিলা সমিতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থ বিজ্ঞানের প্রধান অধ্যাপক ডা. এস. আর. খাস্তগীর ডি. এস. সি, গায়ক আব্বাস উদ্দীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন শাস্ত্রের প্রধান অধ্যাপক মিঃ বিনয়েন্দ্র নাথ রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষার প্রধান অধ্যাপক মি. গণেশ বসু, ‘আজাদের’ বার্তা সম্পাদক মৌলবী মোঃ মোদাব্বের, নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র লীগের সেক্রেটারি শাহ আজীজুর রহমান, সৈয়দ ওলিউল্লাহ, শওকত ওসমান, আবুরুশদ, আলী আহসান, সৈয়দ মান্নান বখ্শ, আহসান হাবীব, ডা. ফহিমুদ্দিন (প্রচার বিভাগের সরকারি ডিরেক্টর), ডা. আবদুল মাজেদ (ডেপুটি সার্জন জেনারেল), ডা. ওয়াহিদ মাহমুদ (জনস্বাস্থ্য বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারি), মি. আবুল কাশেম, ‘জিন্দিগী’ সম্পাদক কাজী আফসার উদ্দিন, আবু জাফর শামসুদ্দিন, জহুর হোসেন চৌধুরী প্রভৃতির নাম বিশেষ উলে­খযোগ্য (পত্রিকায় যেভাবে প্রকাশিত হয়েছে)।’৭
মাসিক ‘আল ইসলাহ’র নভেম্বর সংখ্যায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার পক্ষে মুহম্মদ মুসলিম চৌধুরী বি.এ.বি.টি’র একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধে তিনি অত্যন্ত যুক্তি সহকারে বাংলার পক্ষে তার মতামত তুলে ধরেন। অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন লিখেন, ‘যদি গায়ের জোরে উর্দুকে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের উপর রাষ্ট্রভাষারূপে চালাবার চেষ্টা হয়, তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হবে।… শিগগিরই তাহলে পূর্ব-পশ্চিমের সম্বন্ধের অবসান হওয়ার আশঙ্কা আছে’।৮ ড. মুহম্মদ এনামুল হক লিখেন, ‘উর্দু বাহিয়া আসিবে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর মরণ, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মৃত্যু।’৯ চতুরঙ্গ ১৯৪৮ সালের জুলাই-আগস্ট সংখ্যায় ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। মুজতবা আলী তাতে লিখেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের অনিচ্ছা সত্ত্বেও যদি তার ঘাড়ে উর্দু চাপানো হয় তবে উর্দু ভাষাভাষী শুধু ভাষার জোরে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করতে চেষ্টা করবে- ফলে জনসাধারণ একদিন বিদ্রোহ করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।’ আবুল মনসুর আহমদ ‘বাংলা ভাষাই হইবে আমাদের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক নিবন্ধে বলেন, ‘উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করিলে পূর্ব-পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ রাতারাতি ‘অশিক্ষিত’ ও সরকারি চাকরির অযোগ্য বনিয়া যাইবে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ফারসীর জায়গায় ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা করিয়া বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ মুসলিম শিক্ষিত সমাজকে রাতারাতি ‘অশিক্ষিত’ ও সরকারি কাজের ‘অযোগ্য’ করিয়াছিল।১০
১৯৪৮-এর ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার কার্জন হলে পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বললেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোন আদর্শের কথা নয়, এটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙ্গালীত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো টি নেই।’১১
তখন রাষ্ট্রভাষার সাথে সাথে বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি বড় হয়ে সামনে চলে আসে। মোতাহের হোসেন চৌধুরী বললেন, ‘ধর্ম পরিবর্তনশীল কিন্তু বাঙালিত্ব পরিবর্তন সাপেক্ষ নয়।’ সে সময়ের বিতর্কে সাদাত আলী আখন্দ ‘বাঙালি’ শিরোনামে প্রবন্ধে তির্যক ভাবে লিখলেন, ‘যদ্দুর পারেন তসবি টিপুন, মালা জপুন: তার সঙ্গে বাঙালিত্বের কোন বৈরিতা নেই। রিলিজিয়ন ও ন্যাশনালিটি এক জিনিস নয়।’১২
রাষ্ট্রভাষা ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের এ তাত্ত্বিক-বিতর্ক তখন দেশের কয়েকটি জেলা শহরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৪৭-এর ডিসেম্বর মাসে নারায়ণগঞ্জের বিজলী প্রেস থেকে ‘স্ফুলিঙ্গ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটিতে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা কেন?’ শিরোনামে ড. এনামুল হকের লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। লেখাটির প্রথম কিস্তি প্রকাশিত হয়েছিল এবং পরবর্তী দুই সংখ্যায় এটি শেষ হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান সরকার পত্রিকাটির প্রকাশিত ঐ সংখ্যাটি বাজেয়াপ্ত করে দেয় এবং পরে বিজলী প্রেসটিকেও তারা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়।১৩
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ একটি শ্রেষ্ঠ ঘটনা। আর এ মুক্তিযুদ্ধের আতুর ঘর হচ্ছে বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, আর বায়ান্নের সুতিকাগার হচ্ছে পাকিস্তান-পূর্বকাল থেকে এ ভূখণ্ডে সংঘটিত বাংলা ভাষা নিয়ে ‘তাত্ত্বিক লড়াই পর্ব’। আর এ লড়াইয়ে বাংলার পক্ষে যারা লড়েছেন এই বঙ্গীয় ব-দ্বীপের স্বাধীনতায় তাদের অবদানও অনস্বীকার্য। তারা যেমনি ভাষাসৈনিক তেমনি আমাদের মুক্তি সংগ্রামেরও আদিযোদ্ধা।
তথ্যসূত্র
১. দৈনিক আজাদ ১৯ মে ১৯৪৭, ২. দৈনিক আজাদ ৩০ জুন ১৯৪৭, ৩. স্বাধীনতা (কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র) ২৩ জুন ১৯৪৭, ৪. আহমদ রফিক-এর ভূমিকা, ভাষা-আন্দোলনের আদিপর্ব / আবদুল হক, ৫. দৈনিক আজাদ ২৯ জুলাই ১৯৪৭, ৬. ভাষা-আন্দোলনের আদিপর্ব / আবদুল হক, ৭. দৈনিক আজাদ ১৮ নভেম্বর ১৯৪৭, ৮. রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা / কাজী মোতাহার হোসেন, সওগাত, অগ্রহায়ণ সংখ্যা ১৩৫৪, ৯. কৃষ্টি, কার্তিক, ১৩৫৪
১০. ভাষা-আন্দোলনের আদিপর্ব / আবদুল হক, ১১. বদরুদ্দীন উমর / পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, ১ম খণ্ড, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, সংস্করণ ১৯৯৫, পৃষ্ঠা ১৪৯, ১২. ভাষা আন্দোলন থেকেই শুরু / মাহমুদুল বাশার / যুগান্তর, ৩ ফেব্র“য়ারি ২০১৫, ১৩. মোশারফ হোসেন নান্নু / ধ্রুবতারা, ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, জুলাই-সেপ্টেম্বর ১৯৯৯

কমেন্ট করুনঃ

Scroll to Top
Copy link