মৃত্যুর সময় যার জন্ম, তার মৃত্যু নেই, এটা ভেবেই বরং এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটানো যাক। লেখালেখির শুরুতে আচমকাই কেনো জানি, ছোটকাগজের মিছিলে নেমে পড়েছিলাম। সেই শবযাত্রায় নিজের কাঁধেও তুলে নিয়েছিলাম ‘জীবনানন্দ’ নামক এক দগ্ধচিতায় অনল সাজানো লিটলম্যাগ পোড়ানোর কিছু বেদনা ও দায়। কিন্তু আমার সেইসব দিনের ছাই-জর্জরিত ‘ছোটকাগজ কনসেপ্টে’র নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও অজ্ঞানতার ধুলো ঝেড়ে ফেলা পাগলামি চিন্তার খসড়া ছাড়া আবাক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছুই লিখতে চাইছি না।
পাঠ ও পাঠক চিন্তা করে ছোটকাগজের কনসেপ্ট তৈরি হয় নি, হবেও না কখনো। ছোটকাগজের জন্ম মূলত ছোট লেখকের পেইন থেকে। নিরীক্ষা প্রবণতায় জারিত নতুন কিছু করার আকাক্সক্ষা থেকেও এর যাত্রা শুরু হয়। যদিও সৃজনশীল এই কর্মকাণ্ডের গ্ল্যামার’স উদ্দেশ্য এতোটাই ক্ষীণ এবং এর বিপরীতে দেনা-পাওনা যা কিছু অতোটা বিলবোর্ড সর্বস্বও নয়। তাই, যে কেউ চাইলেই, ছোটকাগজের উদ্দেশ্যগুলি হেডিংবোর্ডে টাঙানো রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিজ্ঞাপনের মতো দেখতে পারবেন না। কারণ, এমন কিছু পুঁজি-পুঁজ, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, ক্ষত-বিক্ষত যন্ত্রণার এনেস্থেসিয়ায় স্থির থাকে ছোটকাগজের ঘুম। কিংবা এ কাগজের ব্যাকটেরিয়ায় এতোটাই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পক্ষাঘাত থাকে, যা কেবল ব্লাঙ্কচোখে কোনোভাবেই দেখা সম্ভব নয়।
যদিও বা, সাম্প্রতিক সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণাত্মক বেশি। লেখকের নিজস্ব ও নতুন ধরনের চিন্তা প্রকাশের বিভিন্ন মাধ্যমগুলোও আজকাল যতোই প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠুক না কেনো, গ্লোবালি এটি একটি প্রক্রিয়াগত চিন্তার প্রকাশ মাত্র। এর সমস্ত পদ্ধতিই আমাদের ছোটকাগজের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে থামিয়ে দিতে পারবে না। সে কারণেই ছোটকাগজের চিন্তাকে কখনো ক্রান্তিকাল ছোঁবে না। হয়তো পদ্ধতি পাল্টে যেতে পারে। বরং এই বলা যায়, ছোটকাগজ তার ব্রেক-থ্রো প্রকাশের জন্য ব্লগ-অনলাইন অথবা ওয়েবসাইট ব্যবহার করবে এবং নানা পদ্ধতিতে এর ব্যবহার হয়তো প্রতিনিয়ত বাড়বে বাড়ছেও। আর সেসব আমরা বহু অন-লাইন পত্রিকার ভার্সনে বুঝে উঠতে পারছি।
তবুও, সর্বত্র গ্লোবালাইজেশনের মানে এই নয় যে, এখনকার সমস্ত আধুনিকতাই ছোটকাগজের চিন্তাকে ক্রান্তিকালের দিকে ঠেলে দেবে। যদি তাই হয়, তবে সমাজ-মানুষ-সভ্যতা-ক্লাসিক কোনো কিছুই থাকবে না। বিকাশ লাভ করবে না তেমন কোনো প্যারাডাইমের প্রান্তর। যদি না অভিশপ্ত হয়ে আবার বর্বরতা থেকে শুরু করে পৌঁছতে হবে এখানে। এই সভ্যতার কাছে। কেননা, ছোটকাগজ যে কোনো বিশেষ ভঙ্গি ও সাইজের পত্রিকাই নয়; ছোটকাগজ মূলত কাঠামোর বাইরে এসে, বিশেষ কোনো চিন্তা ও অভিনবত্বের দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে উঠছে এখনকার গ্রহণযোগ্যতায়। তাহলে, এই ছোটকাগজের ছোটরা হচ্ছে কারা? অবশ্যই সাহিত্যের প্রবল স্রোতে ঝাঁপ দেয়া সেইসব অবশ্যম্ভাবী তারুণ্যেরা। তাই, এরা যখন তার প্রথম লেখাটি প্রকাশের তাগিদে
আত্মনির্ভরতার প্রতিশ্রুতিতে আত্মবিশ্বাসী হয়, তখন এরাই একেকটি ছোটকাগজের সম্পাদক হয়ে ওঠেন। কেউ কেউ অবশ্য প্রথাগত সাহিত্য ও শিল্পবোধের বিপরীতে বিশুদ্ধ নন্দনতত্ত্বের ছোটকাগজ প্রকাশ করে, কেবল অন্যের শ্রেষ্ঠ লেখাটি প্রকাশের প্রয়োজনে। হয়তো এদের সম্পাদনা বরাবরই মৌলবাদ এবং প্রতিষ্ঠানের গ্রাস এড়িয়ে প্রতিশ্রুতিশীল নবীন/প্রবীণ লেখকের লেখায় সমৃদ্ধ হয়। ফলে, এইসব ছোটকাগজ…সে যে ধারায়ই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেনো, নিষ্ঠা-সৎ ও মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই কমিটেড ধারায় এগুলো প্রকাশিত হয়। তাই, আমাদের ছোটকাগজের চিন্তাগুলো ছোটরাই করে বটে। তবে, এই চিন্তার ব্যাপ্তি মোটেই ছোট কিছু নয়। অনেক বিশাল এর ঐশ্বর্যময়তা। যার গভীরতা-ঔদার্যতা উপলব্ধি সব পাঠকের সবার অন্তরের উজ্জ্বলতা নয়। একটি ‘লিটল বয়’ হিরোসিমা ধ্বংসের জন্যে জরুরি হলে, সাহিত্যের প্রথাগত/তথাকথিত এলিট ঐতিহ্য ভাঙনের জন্যেই একটি সৎ/শুদ্ধচিন্তার (লিটলম্যাগাজিন) ছোটকাগজ এক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে। অবশ্য এজন্যে এই কাগজের বারুদশালা, চিন্তা ও দর্শনগুলোও পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক রাখতে হয়। যার মধ্যে রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠান-পরনির্ভরতা ভোগ এবং ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্য কোনো ভাবেই উসকে উঠবে না। আবার, স্রেফ আঁতলামি, অহংবোধ, গোষ্ঠীতন্ত্রে আক্রান্ত অস্থিরতাও, দায়বদ্ধ কোনও ছোটকাগজের বৈশিষ্ট্য নয়। মূলত সৃজনশীল ছোটকাগজের চিন্তার পরিধি ও এর ব্যাপকতার পথ খুবই সরু, দুর্গম ও দুস্তরও বটে। তাছাড়া, দীর্ঘস্থায়ী নিষ্ঠা ও ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি প্রকৃত ছোটকাগজের বিশ্বাস নয়। তবে ছোটরাই শুরু করে; যে কাগজের নৌকা বানিয়ে তারুণ্যের প্রবণতায় দুর্গম সাগর-মহাসাগর-নদী পাড়ি দিতে পারে। বিশেষ সেই উদ্দেশ্যও দীক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যেতে থাকে সময়ের কোনো এক স্টেশনে। পুনরায় আর এক তারুণ্যকেই ছেড়ে দিতে হয় স্পেস করে। কেননা, এই সরু পথের চিন্তাকে দুর্গমতাকে আমরা হয়তো কখনো অন্ধকার ছাপাখানার পাইকায় সাজিয়েছি। এখন হয়তো সেই চিন্তার আউটপুট কম্পিউটার ট্রেসিং, ডিমাই-প্লেটের ঝকঝকে অক্ষরগুলো অফসেট মেশিনে মুদ্রিত হচ্ছে। তবুও, অতি সম্প্রতি ছোটকাগজ সম্পাদনার কনসেপ্টগুলো ব্লগ অনলাইনের নানা অভিধায়, প্রতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের প্রবণতায় নিয়তই আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে। তো, যেভাবে যে মাধ্যমেই মুদ্রিত ও প্রকাশিত হোক না কেনো; একজন ছোটকাগজ সম্পাদক তার পত্রিকার সমস্ত টানাপোড়েন সয়েও ছোটকাগজ বিভিন্ন কারণে উৎকৃষ্ট/উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
এ জন্যেই আমরা এ-ও মনে করি, ছোটকাগজের ক্যানভাস মোটেই ছোট কিছু নয়। ছোটকাগজই পাঠক তৈরি করছে। তরুণ লেখক উঠে দাঁড়াচ্ছে। সেইসব প্রকৃত পাঠক ও লেখকের প্লাটফর্ম এটি। ফলে, পাঠক ও লেখকসত্তায় প্রতিনিয়ত যাওয়া-আসার সেতু তৈরি করছে, যা মূলত একেকটি ছোটকাগজের পক্ষেই সম্ভব। যদিও বা, এ-রকম ভাবি ? যারা পাঠক তারাই লেখক। তবে কিন্তু গ্রাফটা অন্যরকম হয়ে যায়। ছোটকাগজ যদি অসংখ্য লেখক তৈরি করে থাকে, তাহলে পাঠকও তৈরি করেছে সমপরিমাণ। পিছনে ফিরে দেখলেই এর সত্যতা মিলবে। যেহেতু আমাদের দৃষ্টিতে কিছু বড়কাগজের ঔদ্ধত্য আছে এবং এদের অসংখ্য পাঠকও আছে। তাই ওদের সবটাই কিন্তু তৈরি হচ্ছে মূলত এইসব ছোটকাগজের অবদানেই। তাই, আমরা যদি, এই প্রক্রিয়াকে একটি পাইপ লাইন মনে করি, তবে দেখা যাবে ঝাঁকে ঝাঁকে নতুন লেখক/পাঠক আসছে। আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম, নতুন লেখক, নতুন সম্পাদকের চাপেই। হয়তো পাঠকের মান কিংবা লেখকের মান স্তরের পরিমাপ এটা রাষ্ট্র-সমাজ ও তার স্বাস্থ্য যেমন…রাষ্ট্রীয় অনেক উপাদানের সাথে যুক্ত। এক্ষেত্রে ছোটকাগজের করার কিছু নেই। এই চলার উপমায়, চলমান প্রত্যেকেই মহাপান্থের মানুষ। তাই, যে লিখবে, যে পড়বে, সবটাই তার কমিটমেন্টের উপর নির্ভর করবে। হারিয়ে ফেলা কোনো হতাশা বা নিয়ম নয়। বরং আর্থ-সামাজিক কাঠামো, রাষ্ট্রের আচরণ, শাসন-শোষণের মাত্রা, সামগ্রিক আকাক্সক্ষা, সাময়িক সুস্থতা ও অসুস্থতা সময়ের সাথে সাথে বাড়ে অথবা কমে। লেখক পাঠকের গ্রাফ লাইনটাও এ রকমই। তাহলে কি ছোটকাগজের প্রয়োজনীয়তা উপযোগিতা নেই? যুগের মেরুকরণে ব্যর্থতাই কি এর নিয়তি? এই প্রশ্ন হাস্যকর। যে কাগজের মাধ্যমে সে দেশের সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি, তারুণ্যের বোঝাপাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্ভীকতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তবুও, আজো আমাদের এইসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে কেনো? যদিওবা আমাদের চিন্তায়, নিয়তি এই শব্দের বিশেষণ একেবারেই বেমানান। প্রয়োজন উপযোগিতা এসব দিয়ে তো ছোটকাগজকে বিশ্লেষণ করা আরো মূর্খতা। তবে হ্যাঁ যতোটুকু বুঝি, ছোটকাগজের উপযোগিতা কিংবা প্রয়োজন কখনো ফুরায় না। কারণ, আর কিছু নয়, সে নিজেই নিজের ঈশ্বর এবং স্বয়ম্ভু। ফলে, ছোটকাগজের ব্যর্থতা বলেও কিছু নেই। যুগের মেরুকরণ যে ভাবেই হোক না কেনো, ছোটকাগজ টিকে থাকবে তার চিন্তা-পদ্ধতি-অঙ্গীকার-অহং ও এর দর্শনের কারণেই। বুঝতে হবে, কাঠামো ছোটকাগজের একটি মুখোশ মাত্র। যদিও অবস্থানে বিশাল প্রতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেও অনন্য। প্রশ্ন হলো, মানুষ কি যন্ত্র হয়ে বর্বর হবে হচ্ছে, চিন্তাশূন্য বস্তুবাদীতে যদি এই বিমানবীকরণ সত্যি হয়। ছোটকাগজ তখন আরো বেশি সফল হয়ে উঠবে। ব্যর্থতা ফুটে উঠবে। এই যুগ-যুগান্তের মেরুকরণের নির্দিষ্টতায় বিদ্ধ মানুষের আত্মায়। ব্যর্থতার নিয়তি থেকে বরং ছোটকাগজই পারে তাকে বড় করে আনতে। আবার সব রকম আপোষ আত্মসমর্পণ… এবং নির্ঘণ্টকে অপ্রয়োজনীয় করেও তুলতে পারে। যে কোনো জাতির সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন প্রভৃতিকে। ফলে, ছোটকাগজের সবুজ প্রান্তর গড়ে উঠবে চিরকাল। এর বিপরীত যে কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক আলুমার্কা চিন্তা, ছোটকাগজের সম্মানের জন্য একেবারেই অর্থহীন। তবে যদি, কখনো ছোটকাগজের সম্মানের জন্য সে রকম প্রান্তর তৈরি হয়ে ওঠে, তখন ছোটকাগজ আর ছোটকাগজ থাকবে না। তা মূলত মূর্খ হতাশাবাদীদের মুখপত্র হয়ে উঠবে। অর্থসংকট ও সংগ্রামের মধ্যেই ছোটকাগজ প্রাণ ফিরে পায়। পথ দেখায় তথাকথিত বড়কাগজ, বড়লেখক এবং সৃজনশীল পাঠককেও। তাহলে, একবার ভেবে দেখুন তো! ঐশ্বরিক কোনো এদোন উদ্যানের সবুজ প্রান্তরের, ও রকম একটি ল্যান্ডস্কেপে ছোটকাগজ দাঁড়িয়ে আছে। আর কিছু মূর্খ স্যালুট দিচ্ছে। তোপধ্বনি সামরিক কায়দায় অভিবাদন মঞ্চ তৈরি হবে, ছোটকাগজের জন্য উন্মুক্ত লালগালিচা সংবর্ধনায়… !
যদিও এই লেখাটিতে লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস ঐতিহ্য বিষয় বলার তেমন কোনও ইচ্ছেই আমার ছিলো না। কারণ, একটি লিটল ম্যাগাজিন আমাদের ইতিহাসের অংশ হলেও ইতিহাস গড়ার ক্ষমতাও এর আছে। তাই, আমিও তপোধীর ভট্টাচার্যের মতোই বলতে চাই যে,… “কখনো কখনো, নিজেরই সযত্নরচিত পদ্ধতি প্রকরণ ও অন্তর্বস্তু প্রাতিষ্ঠানিক স্বভাব অর্জন করে নেয়, তখন নির্মোহভাবে নিজেকে আঘাত করে জটাজাল থেকে প্রাণের গল্পকে মুক্ত করতে হয়।” তবুও…আমার লিটলম্যাগ ভাবনার এই লেখায় কিছুটা ইতিহাসের ছাঁচে ফেলে কিছু ছোটকাগজের তালিকাও দিতে হল।
হয়তো আমার মতো আপনারাও অনেকেই জানেন…লিটল ম্যাগাজিনরে প্রচার ও প্রসারের কাল বিংশ শতাব্দীর শুরুতে হলেও, বোস্টন থেকে ১৮৪০ সালে প্রকাশিত Ralph Waldo Emerson ও Margaret Fuller সম্পাদিত The dail পত্রিকাটিকেই এ অঙ্গনের গবেষকেরা প্রথম লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কেননা, এই ডায়ালেই এলিয়টের অনন্য অসাধারণ কাব্য ওয়েস্টল্যান্ড কবিতাটি সর্বপ্রথম ছাপা হয়েছিল। যদিও এরও আগেই ১৭৩১ সালে এডওয়ার্ড কেভ সম্পাদিত ‘Gentleman’s Magazine’ প্রকাশের পরপরই ম্যাগাজিন শব্দটি প্রচলিত হতে থাকে। তবে লিটল শব্দটি জুড়ে উনিশ শতকের প্রথম দিকে ইউরোপে লিটল ম্যাগাজিন শব্দটির ব্যবহার আরম্ভ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এবং প্রতিষ্ঠানের ডাইস সর্বস্ব পণ্য-সাহিত্যের বিপরীতে আঙ্গিক ও কাঠামোগত পরীক্ষা নিরীক্ষার প্লাটফর্ম হিসেবে ভিন্ন চিন্তার বিশেষ ধারার এইসব কাগজকে লিটল ম্যাগাজিন অভিধায় পরিচিতি পেতে আরম্ভ করে। তখন মার্গারেট এন্ডারসন সম্পাদিত The Little Review সে সময়ের চেতনাপ্রবাহী অন্যতম লিটল ম্যাগাজিন হিসাবে বহুল প্রশংসিত হয়েছিল। এমনিভাবে বাংলাসাহিত্যেও বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদর্শন-কে প্রথম ছোটকাগজ বলা হলেও, সার্বিকভাবে প্রথাবিরোধী মননশীলতার ধারায় প্রমথ চৌধুরির ‘সবুজপত্র’কেই বাংলার প্রথম লিটল ম্যাগাজিন বলা যেতে পারে। এরপর, ১৯২৩ সালের- কল্লোল, ১৯২৪ সালের- শনিবারের চিঠি, ১৯২৬ সালের- সওগাত, ১৯২৭ সালের- শিখা, ১৯২৭ সালের- কালি কলম, ১৯২৭ সালের- প্রগতি, ১৯৩১ সালের- পরিচয়, ১৯৩২ সালের- পূর্বাশা ইত্যাদি পত্রিকাগুলি ১৯৪৭- এর দেশ ভাগের আগে পর্যন্ত সমস্তই কোলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তবে, বুদ্ধদেব বসু ও অজিত কুমার দত্ত সম্পাদিত প্রগতি পত্রিকাটি ঢাকা থেকে এবং সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত পূর্বাশা কাগজটি কুমিল্লা শহর থেকে প্রকাশিত হত। এরপর সাতচল্লিশ পরবর্তীকালে পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশে লিটল ম্যাগাজিনের একটি ক্ষীণ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। তখন ফজল শাহাবুদ্দিন সম্পাদিত- কবিকন্ঠ, সিকান্দার আবু জাফরের- সমকাল, ফজলে লোহানীর- অগত্যা (১৯৪৯), মাহবুব-উল আলম চৌধুরি ও সুচরিতা চৌধুরীর- সীমান্ত (১৯৪৭), এনামুল হক সম্পাদিত- উত্তরণ (১৯৫৮) ইত্যাদি কাগজগুলো এ সময়ের সৃষ্টিশীল ধারায় সমৃদ্ধ ছিল। তবে ষাটের দশক হচ্ছে বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সবচাইতে উর্বর সময়। তাই এ সময়ের উল্লেখযোগ্য কিছু পত্রিকার নাম না করলেই নয়Ñ কণ্ঠস্বর (১৯৬৫), বক্তব্য (১৯৬২), সপ্তক (১৯৬২), স্বাক্ষর (১৯৬৩), সাম্প্রতিক (১৯৬৪), নাগরিক (১৯৬৪), স্যাড জেনারেশন (১৯৬৩), প্রতিধ্বনি (১৯৬৪), না (১৯৬৭), পূর্বমেঘ ( ), সুন্দরম (১৯৭৬), পলিমাটি, বহুব্রীহি, কালস্রোত, ইত্যাদি আরও অনেক ছোটকাগজ স্বাধীনতা উত্তরকালের বাংলাদেশের শিল্পসাহিত্যকে উর্বর করেছে নানাভাবে।
এরপর স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে শিল্পসাহিত্যের মাঠেও খরা-উর্বরার সময় পরিলক্ষিত হয়। ফলে ষাটের উজ্জীবিত সাহিত্য আন্দোলন সত্তরের শুরুতে এসে কিছুটা নিস্তেজ হয়ে ওঠে। তবুও সত্তরের দশকের কিছু ছোটকাগজ আমাদের মননশীল সাহিত্যধারাকে অব্যাহত রেখে বেশ কয়েকটি পত্রিকা তখন প্রকাশিত হয়েছে। সেই সময়, গণসাহিত্য পত্রিকাটি ছিল সকলের গ্রহণযোগ্য লিটলম্যাগ। এছাড়াও কালস্রোত, অলক্ত, কবি, অতলান্তিক, অধুনা, উচ্চারণ, কাক, কাঁদামাটি ও চিরকুট এবং নাট্যবিষয়ক থিয়েটার ইত্যাদি পত্রিকা ছাড়াও তখন আনওয়ার আহমদ ও বেবী আনওয়ারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় রূপম ও কিছুধ্বনি। বলা যায় এই পত্রিকা দুটির প্রকাশনা অব্যাহত ছিল বহুবছর।
পরবর্তী আশি…নব্বই এবং তার পরের বছরগুলোতে প্রচুর ছোটকাগজ নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। এতে আমাদের শিল্পসাহিত্যের নানাস্তরে রূপান্তর ঘটেছে বিভিন্ন লিটলম্যাগের মাধ্যমে। বহু লেখক আছেন যারা কেবল ছোটকাগজের লেখক হিসেবেই নিজেদের লেখার যাবতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। আবার এরা কেবল কিছু লিটলম্যাগে লিখেই তাদের লেখাকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন সাহিত্যতত্ত্ব দর্শন ও নানা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নিজেদের সাহিত্যের গতি-প্রকৃতিও পাল্টে নিতে পেরেছেন এমোন অনেক ছোটকাগজের অবদান কেবল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে এবং থাকবে বহুকাল…তাই রাজধানী ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের জেলা উপজেলা এমোনকি একটি ছোট্ট গ্রাম থেকেও এমোন অনেক লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে যার সঠিক মূল্যায়ন কিছু দিয়ে সম্ভব নয়। তবুও সেইসব লিটলম্যাগের মলিন মলাট এবং অলংকারবিহীন কিছু ছোটকাগজের নাম এখানে উল্লেখ না করলেই নয়…একবিংশ, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক, লোকায়ত, সংস্কৃতি, গান্ডীব, সংবেদ, প্রান্ত, লিরিক, নিসর্গ, অনিন্দ্য, নান্দীপাঠ, আর্ক, নৃ, প্রেক্ষিত, বীক্ষণ, এপিটাফ, বিতর্ক, নিরন্তর, অরুন্ধতী, চিহ্ন, ধূলিচিত্র, অমিত্রাক্ষর, মধ্যাহ্ন, মৃত্তিকা, সমুজ্জল সুবাতাস, অন্তরীপ, কালধারা, ভাস্কর, খোয়াব, দ্রষ্টব্য, অ, উটপাখি, মঙ্গলসন্ধ্যা, ছাপাখানা, কাশপাতা, লোক, শালুক, নন্দন, কবিধ্বনি, পরাবাস্তব, ব্যাস, মানুষ, ধাবমান, ছাটকাগজের মলাট, জীবনানন্দ, শুদ্ধস্বর, ১৪০০, সুদর্শনচক্র, বিবর, প্রাকৃত, দ্রাবিড়, প্রতিশিল্প, ঋতপত্র, পূর্ণদৈর্ঘ্য, লাস্টবেঞ্চ, উল্লেখ, দ্রাঘিমা, ত্রিবেণী, পোয়েট ট্রি, চারবাক, সুণৃত, হরপা, চম্পকনগর, আগুনমুখা, আরণ্যক, ধ্রুবতারা, ব্রাত্য, কালনেত্র, ঊষালোক, মরাল, অরণি, বৈঠা, পত্তর, দাঁড়কাক, পর্ব, বিবিক্ত, সময়কাল, কাঁদাখোঁচা, গল্প, মেইন রোড, ব্রতকথা, শূন্য, শালিক জংশন, ঘুড্ডি, গুহাচিত্র, উতঙ্ক, শতদ্রু, লেখাবিল, মুনাজেরা, কোরাস, বেহুলা বাংলা, চর্যাপদ, পুণ্ড্র, বুকটান, খড়িমাটি, কঙ্কাল, ধমনী, বয়ান, গল্পপত্র, গল্পকথা, …প্রভৃতি লিটল ম্যাগাজিন হচ্ছে আমাদের সাহিত্যের বিপরীত ধারার ধারাবাহিক অংশ কেবল…
ছোটকাগজ সম্পাদনা ও সম্ভাবনা
একটি ছোটকাগজ সত্যিকারের ছোটকাগজ কি না, তা নির্ভর করে ঐ কাগজটির সহ্য ক্ষমতা এবং সম্পাদকের মেধা ও মনন মিশ্রিত দূরদর্শিতার উপর। কাগজটিকে হরেক রকম বানানো তর্কের ছাঁচে ফেলে ‘প্রতিষ্ঠান/অপ্রতিষ্ঠান বিরোধী…ছোটকাগজের লেখক/ বড়কাগজের লেখক…’ এইসব প্রলাপে প্রবাহিত হয়ে ছোটকাগজ করা মূর্খতা ছাড়া আর কিছু নয়। মেধা ও বোধ কোনো সম্পাদকের নিজস্ব হতে পারে। কিন্তু এর সহ্য ক্ষমতা বলতে, আরো অনেক কিছুকে বোঝায়। আর তা বোঝাতে, ওই কাগজটি শিল্পমান সম্পন্ন হয়ে ওঠার নতুনত্বে এবং অভিনবত্বে যে কোনো রকমের প্রাণস্পর্শী লেখা প্রকাশের জন্য তার দরজা কতটা খোলা রাখে। কতোবেশি লেখককে নয়, লেখাকে আমন্ত্রণ জানায়। ফলে, এ রকম একটি প্লাটফর্ম থেকেই তৈরি হয়, এই সময়ের সাথে সম্মুখ সময়ের সংযোগ এবং এর থেকেই একটি ছোটকাগজের কালস্রোতে ভেসে বপু খুলে দাঁড়ানোর এক চিলতে মাটি পেয়ে যান প্রকৃত লেখকের পরিচয়। তাই তো একজন স্রষ্টা নিয়তই একা। আজকে কেউ কেউ…নিজেকে লেখক/ কবি/ কবিতাকর্মী মনে করে এক ধরনের গুরুমুখী মৌমাছির চাক তৈরি করে স্থূলতায় নিঃশেষ করে দেয় প্রতিভাকে। সত্যিকার কবি/ লেখককে কেউ ব্যবহার করতে পারে না। না দর্শন, না ঈশ্বর। কেননা, লেখা ছাড়া যে লেখকের আর কোনো উদ্দেশ্য থাকতে নেই। অনেক ছোটকাগজের সম্পাদককে দেখেছি, লেখক/ কবিকে মুখ্য করে, লেখাকে নয়। তাই সম্পাদনার বেলায় ছোটকাগজ/বড়কাগজ এই খেলায় মেতে না উঠলেই ভাল হয়। কেননা, যে সকল কবি/লেখক প্রবল বড়কাগজ বিরোধী, তাদেরই তো আবার বড়কাগজে হজম হতে দেখি। প্রতিষ্ঠান/অপ্রতিষ্ঠান এই তকমায় বিরোধী হতে হতে সেই কাগজই মানসিকতায় প্রতিষ্ঠান হয়ে, সীমিত কেন্দ্র, গোষ্ঠীবদ্ধতায় আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যায়। এই যে নক্ষত্র পতন চলছে, এর মূলে কোনো ছোটকাগজ কাউকে নক্ষত্র হতে উসকে দিতে আসে নি। কতগুলো ছোটকাগজ সেই নক্ষত্র নির্দিষ্ট করতে পেরেছে কি, পারে নি, আমাদের জানা নেই। তবে, কবিতা হয়ে ওঠার বাইরে কোনো রকম খণ্ড দর্শনে শক্তিক্ষয় করতে চায় নি। কিন্তু ছোটকাগজে সব কবিকেই আমন্ত্রণ জানাতে হয়। বয়স-ব্যক্তি কোন কিছুই মুখ্য বিবেচনায় নয়। তাহলেই, বহু প্রতিষ্ঠিত কবির লেখা যেমন মনে রেখেও পত্রিকাটি সমৃদ্ধ করা যায়। আবার, বহু তরুণের কবিতা ছেপেও একজন সম্পাদক নিজেকে সমৃদ্ধ মনে করেছেন। তাই, প্রকৃত ছোটকাগজের সম্পাদনার ক্ষেত্রে অনেক বড় ডাস্টবিন থাকতে হয়। অনেক লেখক, অনেক কবির ভুল লেখা হয়তো ছাপানো হয় নি। কিন্তু, তরুণদের বেলায় কিছু কিছু ভুল হয়তো থেকেই ছিল। তাই, প্রকৃত ছোটকাগজের কনসেপ্ট মানেই : সে লেখকের ভালো লেখাটি ছাপতে চায় নিজেদের সাথে প্রথম সংযোগের আনন্দ খুঁজে নিতে। যার কোন রুদ্ধতা নেই। মেনিফেস্টোও নেই…। তার মানে ছোটকাগজের ভালবাসা কেবল বহুগামী নয়; সমৃদ্ধ বহুগামী! ছোটকাগজ সম্পাদনার প্রবণতা প্রথমত ছাপার স্পেস জনিত সমস্যার ফলাফল। প্রশ্ন হল, কারা ছোটকাগজ সম্পাদনা করে? এক অংশ বড়কাগজে জায়গা পায় না বলে। অন্য অংশ তথাকথিত কাগজে জায়গা নেয় না। যারা জায়গা পায় না তারা শো-বিজ আক্রান্ত বিশেষণ লোভী। (ড্যাসের কবি…ড্যাসের সম্পাদক হতে চান) সাহিত্য নির্মাণ তাদের কাছে মুখ্য নয়। অন্য অংশ নতুন ধরনের ক্লাসিক তৈরি করার চিন্তায় ; অভিনব উচ্চারণ নিয়ে ছোটকাগজ সঙ্গী করে এগোয়। কারণ আর কিছু নয়। ঐ সব কাগজ যেমন আপোষহীন এই লেখকদের চেনে না। নিরাপোষকারিরাও চিন্তাবিশ্বের বহুমাত্রিকতার কারণে তাদেরকে বর্জন করে। মৌলিক লেখক সর্বত্রই দ্বিতীয় পক্ষের সম্পাদকদের দলে। কেননা, সম্পাদনা মোটেই গৌণ আনন্দ নয়। অবান্তর হস্তমৈথুনের আনন্দের মতোও নয়। ছোটকাগজ প্রক্রিয়ায় শিল্পের বেসাতিটা আত্মসমীক্ষণের। সেইসব সৎ গোষ্ঠীতন্ত্রহীন উৎকৃষ্ট লেখকের শ্রেষ্ঠ লেখাটি পাঠ করা এবং সেইসব উৎকৃষ্ট পাঠককে ছোটকাগজের সঙ্গে ইনভলভ করাই হচ্ছে ছোটকাগজ সম্পাদনা চিন্তার প্যারালাল। নিরীক্ষানির্ভর একগুঁয়ে কিন্তু নয় মৌলিক বরং বাণিজ্যিকও নয়-বরং পুরোপুরি কনট্রিবিউশন-ই হচ্ছে প্রতিটি সম্পাদনার দায়িত্ব। অবশ্য ছোটকাগজের ক্ষেত্রে সেই বিপ্রতীপ সৌন্দর্য ও আনন্দ খুঁজে পেতে অনেক দুস্তর পথ চলতে হয়। কিন্তু ছোটকাগজের সমস্যা মূলত সেই প্রথম পক্ষের গণ্ডমূর্খরা। শো-বিজ আক্রান্ত যারা দলবাজী প্রপাগাণ্ডা করে, পাঠককে ছোটকাগজ সম্পর্কে ভুল ধারণা সরবরাহের মাধ্যমে সমস্যা তৈরি করে। আরো সমস্যা হচ্ছে কনসেপ্ট। সম্পাদকীয় লেভেল পৃষ্ঠপোষকতায় কতটা কন্ট্রোল ক্ষমতা আছে কিংবা নেই। তাহলে, সম্ভাবনা…! এই প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু আমরা সম্ভব করতে পারছি কি না এটাই প্রশ্ন। না কি নিজেদের অক্ষমতায় কলুষিত করছি নির্মাণকে। আর এইসব মারাত্মক ব্যালান্স প্রতিক্রিয়াকে কব্জা করে কোনো কিছুকে তোয়াক্কা না করে ক্রুফো’র সেই যে একধরনের ‘প্ল্যান্ড ভায়োলেন্স’ অর্থে এগিয়ে যাওয়াই হচ্ছে ছোটকাগজের সম্ভাবনা ও সুন্দরের দিকগুলো। হয়তো সময় একদিন বিচার করবে এই সম্ভাবনাগুলো…। কথাটা সত্যি! মুশকিলটা হলো যারা তরুণ তাদের কাছ থেকে কী পরিমাণ আশা করা যায় অথবা এখনকার তরুণরা ঐ পরিমাণ দেয়ার জন্য প্রস্তুত কি না। আমাদের সময় তরুণরাই ছোটকাগজ করতেন এবং ঐ সময় বহু পত্রিকা প্রথম প্রকাশেই অনেককে চমকে দিয়েছিল। এখন তরুণদের অনুভবের স্তরেই গোলমেলে অবস্থা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন কারণে, গ্লোবালাইজেশনের খারাপ চর্চা করে। যা ব্যাখ্যা করে না বললেও চলে। আজকাল এগুলো এতো বেশি দৃশ্যমান যে, অন্ধরাও দেখতে পাচ্ছে। ছোটকাগজ করা, না করা একজন লেখকের অথবা সম্পাদকের স্বতঃস্ফূর্ত এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হতে হয়। যা কখনো কখনো উত্তেজনা এবং প্রতিবাদের দায় হওয়া উচিত। শুধু তাই নয়, আরো অনেক কিছু লেখক এবং পাঠকের ভিতর মিশ্রিত হতে হয়। তাছাড়া, পাঠকও বেড়েছে অনেক। হয়তো তারা সিরিয়াস বই এবং ছোটকাগজ পড়ে নিজের সাথে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া সাজিয়ে ভিতরে ভিতরে উৎকৃষ্ট হয়। আবার, ছোটকাগজের ভুল ব্যাখ্যায় আমাদের ফ্যাক্টরগুলো কাজ করছে না। এখনকার কোনো কোনো তরুণ ছোটকাগজকে নিজের লেখক সত্তা তৈরির কাজে পরিণত করছে বলেই মানসম্মত ছোটকাগজের এই দশা। ফলে, শিল্পমান হারাচ্ছে অধিকাংশ সাহিত্যের ছোটকাগজ…। প্রকৃত লেখকের কাছে দৈনিক অথবা ছোটকাগজের ক্ষেত্রে প্রধান বলে কিছু নেই। কখনো কবির কাছে দৈনিক/ছোটকাগজ উভয়ই গৌণ হয়ে যেতে পারে। প্রশ্ন হল, লেখক লিখতে বসে কোথায় তা ছাপবেন, সেটা মনে রেখে লিখছেন কি না। যদিও ছাপার ক্ষেত্রে লেখকের পছন্দ-অপছন্দ থাকতেই পারে। কিন্তু এটাকে ঘিরে কোন তত্ত্ব, আন্দোলন, বিরোধিতা লেখকের লেখায় কোনো গুরুত্বের মাত্রা যুক্ত হয় না। লিখতে এসে লেখার জায়গা দখল করবে না বিচ্ছিন্ন হয়ে এক ধরনের দখলদারিত্বের কাছে আটকা পড়বে (কখনো কখনো) কেনো ? এমন তো হতে পারে, অনেক দৈনিকের সাহস-ই নেই আপনার সেই লেখাটি ছাপাবে। এই সাহসের ক্ষেত্রে যদিও ছোটকাগজ সবসময়ই অগ্রগামী। দৈনিকের সাহস থাকা বা না থাকার পিছনে অবশ্য উদ্দেশ্য থাকা স্বাভাবিক। এ কারণেই তরুণদের নতুন লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে, সবসময়ই ছোটকাগজ দৈনিকের পাতা পিছনে ফেলে এগিয়ে যায়। বুঝতে হবে, দৈনিক কারা প্রকাশ করে? কারা ছোটকাগজ করে? এর মধ্যেই এই দুই মিডিয়ার ঐতিহ্য এবং উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে আছে। তরুণদের তা বুঝতে হবে এবং এটাও মনে রাখা উচিত, দৈনিকে প্রকাশ যেমন কোনো লেখক বা লেখার মাপকাঠি নয়, তেমনি ছোটকাগজও। হয়তো দৈনিকে প্রকাশ হওয়া মাত্র কোনো তরুণ কবি অহং-এ আক্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন। যা তার লেখক সত্তার বিশালতাকে থামিয়ে দিয়ে স্থূলতায় আটকে দেয়। আবার ছোটকাগজে প্রকাশ হয়ে তামসিক গোষ্ঠী অহং-এ আটকা পড়েও চোরাবালিতে ডুবে যান অনেকেই। মূলকথা : কোথায় ছাপা হবে না হবে, এটাকে ভুলে নিয়ত লেখা অন্যকে পড়া ও লেখার দিকে সতর্ক চোখ রাখাই একজন তরুণের দায় থাকা সুবিধাজনক এবং নিরাপদ। সত্যিকারের লেখা হয়ে উঠলে, ছাপা-ছাপির ক্ষেত্রে কেউ কারোর উপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে না। বরং এই ভালো লেখাটি ছেপে উভয় কাগজই প্রধান হয়ে উঠবে। তবুও, পছন্দ তো অসীম সূত্র যা নিয়ে তর্ক চলে না। তাহলে, যদি প্রশ্ন ওঠে যে, পাঠকের কাছে যেতে হলে লেখককে ছোটকাগজ, বড়কাগজ না-কি বইয়ের মাধ্যমে যেতে হয়…। এর উত্তরে আমি বলব : অবশ্যই ছোটকাগজ। পাঠকের সাথে সরাসরি মেল বন্ধনের ক্ষেত্রে এই তিনটি মাধ্যমের মধ্যে ছোটকাগজই প্রথমত পছন্দের সবচেয়ে গতিশীল মাধ্যম ভেবে নেওয়া উচিত। কেননা, এই কাগজে উপস্থাপনের দিকটিতে ধ্যান-শ্রদ্ধা এবং অভিনবত্ব আছে। আপাতভাবে বড়কাগজ এবং বই-কে পাঠক সংযোগের উত্তম মাধ্যম মনে হলেও, জরুরি কিন্তু নয়। বড়কাগজ সংবাদপত্র বলেই পাঠক ওদের সাহিত্যের পাতাও সংবাদ মনে রেখেই পড়ে। যার মধ্যে হৃদয়ের যোগসূত্র থাকে না। এক্ষেত্রে কবি বা লেখকের সুনামের পাঠ যদি মুখ্য হয়, তবে ভিন্ন কথা। প্রকাশ এবং পাঠকের সংযোগ যদি Creation হয়, শিল্প হয়, তবে তা অনেক কিছু দাবি করে। যার কোনোটিই বড়কাগজের নেই। বইয়ের মাধ্যমে কিছু সংযোগসূত্র থাকে বটে। কিন্তু বিপননের ক্ষেত্রে স্থবিরতা এবং ইদানীং এক্ষেত্রে লেখকের ধান্ধাবাজিও যুক্ত হচ্ছে। ঔষধ বিক্রির মত বই বিক্রির প্রক্রিয়া তো হাস্যকর…! তাছাড়া প্রতিশ্রুতিশীল সব লেখকেরই সত্যিকার শিল্প মানসম্পন্ন লেখাটি প্রথম ছোটকাগজেই বেরোয়। এরপরে সে পাঠকের কাছে পৌঁছোয় তখনই। বই পাঠককে সুবিধা দেয় কিন্তু সংযোগটা ঘটায় ছোটকাগজই। তাই, কবি এবং কবিতার পাঠক মনে রেখেই এ কথাগুলো বলতে হচ্ছে। তাহলে, বই এবং বড়কাগজকে যদি প্রতিষ্ঠান বলি সেই বিবেচনায় কবিতার পাঠক এখন প্রতিষ্ঠান বিরোধীরাই। কে, কিভাবে প্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞা দেয়, জানি না। সাহিত্যকর্মী এবং সম্পাদক হিসেবে বরাবরই মনে হয়েছে একটি ছোটকাগজ যদি চিন্তার পথগুলো আটকে দেয়, নার্সিসিজম এবং দলবাজিতে আক্রান্ত হয়। যারা সাহিত্য নির্মাণে মনোযোগ না দিয়ে, লেখক বিরোধ সরবরাহ করে এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট তত্ত্বে দ্রবীভূত হয়ে সাহিত্য বিচারে আমলাতন্ত্র আরোপ করে তবে ঐ ছোটকাগজ একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। যার রূপ ভয়াবহ ! ছোটকাগজের অবদানের চেয়েও ভয়াবহ। বিশ্বাসযোগ্য ছোটকাগজের দুর্দিন এখন। চারদিকে কনডম বিজ্ঞাপনের মতোই আলোআঁধারির ধূম্রজাল। সম্পাদক-কবি-লেখক সকলেই আজকাল জর্জরিত একই জালে। সচেতন লেখক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চাইবে না। তাহলে বিরোধিতার কথাও সে বলবে না। আবার ছোটকাগজের আন্দোলন-ফান্দোলনের তোয়াক্কাও করবে না। তবে, ছোটকাগজের যে একটি ট্র্যাজেডির জগৎ আছে। এর ভেতরের দু:খভোগ-ব্যথা-বেদনা আরও যেসব ক্ষত আছে যা কেবল সেইসব কয়েকজন ছোটকাগজের মরমী-সৎ লেখকেরাই এর খবর রাখে। কিন্তু আজকাল ছোটকাগজের নামে অধিকাংশই হচ্ছে করে খাওয়ার ধান্দাবাজি। কেউ এর থেকে লিফট নিচ্ছে গন্তব্যে পৌঁছে যেতে। মোটা কাগজে রদ্দি ছাপিয়ে পৃষ্ঠাভরে পায়ের তলায় রেখে উপরে ওঠার দেয়াল টপকাচ্ছে। এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট আওড়াতে আওড়াতে এরাই আবার সেই এস্টাবলিশমেন্টের সুবিধাদি ভেঙ্গে খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানের দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে বিজ্ঞাপন নিতে যেয়ে। যে অর্থে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, তাতো সেই কাগজের নির্মাণ এবং সম্পাদনার মধ্যে থাকেই। দখল এবং বর্জন কোনোটাই শুভ নয়। বরং সবপথ খোলা রাখাই ভালো। বিজ্ঞাপন এবং প্রতিষ্ঠানের (তথাকথিত) লেখক যদি আমার চিন্তা এবং কাগজকে শোষণ করে পিছন দিকে নিয়ে যায়, তবে ঐ বিজ্ঞাপন অবশ্যই বিজ্ঞাপন এবং ঐ লেখক অবশ্যই প্রতিষ্ঠান। যেখানে সে কৃত্রিম বিরোধিতায় নিজেই বিজ্ঞাপিত হয় নিজের বেশ্যালয়ে। যার ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, আজকের ভয়াবহ ভয়ঙ্কর অসুখের নাম এইডস। এই দুরারোগ্য ব্যাধিতে নিজে তো নি:শেষ হচ্ছেই ছড়াচ্ছে আরও আরও…যা, এইসব প্রবণতাই ছোটকাগজকে ক্ষতিগ্রস্ত এবং কলুষিত করছে প্রতিনিয়ত…।
ছোটকাগজ ও বাণিজ্যক পত্রিকার কৌশল
কৌশল, সব ছোটকাগজের ক্ষেত্রে এটা সম্ভব না। এক্ষেত্রে ঢালাও দুর্নাম চাপানো উচিত নয়। কোনো কোনো ছোটকাগজ এর বাইরে আছে। তবে, বিষয়টি ভিন্নভাবে ভাবলে মনে হয়, লেখকের এখন একা হবার সময়। গোষ্ঠীবদ্ধ নির্মাণ সংকীর্ণতা এবং আত্মচর্চার ঘেরাটোপে আটকে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ঐ পত্রিকাগুলোকে কি ছোটকাগজ বলা যাবে? লিটলম্যাগাজিনের বরং এই প্রবণতাগুলোই ভাঙ্গার কথা। অথচ সে নিজেই আক্রান্ত। যেসব পত্রিকা এই শৈবালে আটকে গেছে তার লেখককূল (!) খুব নিকট সময়ে নির্মাণ সংকীর্ণতায় বিদ্ধ হয়ে যাবে। আবার কখনো কখনো এ-ও মনে হয় লেখক থেকে লেখকের দূরত্ব থাকা উচিত…মাইল…মাইল। সম্পাদনা শারীরিক এই দূরত্ব কমিয়ে দেয়। যে কারণে সেই লেখক সম্পাদকের চিন্তা এবং অতিক্রমগুলি ব্যক্তি শোষণে আটকে যেতে পারে। সম্পাদনা করতে যেয়ে পাঠের অনেক ক্ষতিকর দিক আছে। লেখকের কী মাত্রায় একা হওয়া দরকার তা বোঝাতেই এই স্পর্শকাতর কথাগুলো বলা। কারণ, ছোটকাগজ সম্পাদনা এখন তো অনেকটাই ফ্যাশনে আটকে গেছে। কিংবা পাঠক যোগাযোগের বদলে, লেখক যোগাযোগের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা অনেক লেখকের ক্লাসিক নির্মাণের নীরবতাকে ভেঙ্গে দেয়। নৈ:শব্দ্যের ধাঁধায় ফেলে…মনে রাখতে হবে, ছোটকাগজ বাণিজ্যিক পত্রিকাকে মনে রেখে সম্পাদিত হয় না। লেখকের কালকে অতিক্রম করার প্রবণতা থেকেই এর উৎপত্তি। বাণিজ্যক পত্রিকার সাথে এর দ্বন্দ্ব এবং শত্রুতা যদিও এর কারণ নয় পরিণতি এবং আরো মজার বিষয় বাণিজ্যিক পত্রিকাকে আমলে এনে তাকে শত্রু ভাবা ঠিক নয়। কারণ বাণিজ্যিক কাগজকে প্রতিপক্ষ ভেবে ছোটকাগজের নিজস্বতা ও সম্ভ্রম হারিয়ে, নিজেই সে নিজেকে ছোট করে। যদি বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলো মনে করতো যে, ছোটকাগজ তার শত্রু তাতে বরং তার দেউলিয়া অবস্থা প্রমাণিত হতো। তবুও, অবাক লাগে যে, ছোটকাগজ সম্পাদকরা এইসব কথা বলে, লিটলম্যাগাজিনের সম্ভ্রমহানি করে বাণিজ্যিক পত্রিকাকে সম্মান দেখায় কেনো? ছোটকাগজের সাথে বাণিজ্যিক পত্রিকাকে এই দ্বন্দ্বে লিপ্ত করা মূর্খ সম্পাদকের জ্ঞানচর্চা বলা যায়। তবে, অতিক্রমের ক্ষেত্রে যদিও একথা বলা যায়, একটি ছোটকাগজ অন্য একটি ছোটকাগজকে বিভিন্নভাবে অতিক্রম করে যেতে পারে। আমাদের মধ্যে এই অতিক্রম করার প্রবণতা তো দূরের কথা, উল্টো একটি ছোটকাগজ অন্য একটি ছোটকাগজকে সহ্য করার ক্ষমতাই অর্জন করে নি। বরং নিজের চরিত্র হারিয়ে অন্যের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এবং একে অন্যকে তাচ্ছিল্য করছে। যে জন্য এখন হামেশাই মেঘে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে আমাদের মন্ত্রময় ছোটকাগজের সাহিত্য নির্মাণ নক্ষত্রের পথগুলো…।
সমস্যা হচ্ছে, সাময়িকী বামনরা চিন্তাকে খুলে দেয় না। আটকে দেয়। ছোটকাগজের সাহিত্য বিচার, একজন বামন করবে ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। এই সাহিত্য বিচার করবে কাল মহাকাল। যতোটা পারা যায়, ছোটকাগজে নতুনদের খুব বেশি আশ্রয় দেয়ার কথা ভাবা উচিত। সাথে পুরনোরা যদি নতুন কিছু করে, তাকে সামনে আনা। সম্মাননা করা। যদিও কিছু সাহিত্যমূর্খ বামনদের পাল্লায় পড়ে পিছু হটছে নতুন চিন্তা। নতুন সাহিত্য সৃষ্টির উন্মাদনা হারাচ্ছে অজস্র সাময়িকীর ভিড়ে। অপরদিকে ছোটকাগজ হারিয়ে ফেলছে তার চরিত্র। বামনরা ভোগ করছে নতুনদের। এরা পাতায় পাতায় বীজ-নষ্টের নাশকতা ছড়াচ্ছে। কিংবা দেউলিয়া হবার ভয়ে নিজেকে মুখ্য করে তুলছে। যে চিন্তাকে নিয়ন্ত্রিত করে বামনরা তার একমাত্রিক চিন্তায় আটকে ফেলে সেতো যতটা না মূর্খ, তারচেয়ে বড় শোষণকারী বহুরূপী প্রতিষ্ঠানের হয়েই এসব করছে। তাই, ছোটকাগজের প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ক্রোধমিশ্রিত নতুন পথের সন্ধানকারী তরুণ লেখকেরা কেনো যে এদের পোষ্য হয়। কেনোইবা এদের বৃত্তের দুয়ারে ঘুরপাক খাচ্ছে। কেনো তারুণ্যের এই আপোষকামিতা…! যদিও দুই বাংলার অনেক কাগজই ছোটকাগজের চরিত্র হারিয়ে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। এর কারণ ভিন্ন ভিন্ন। ওপার বাংলার ছোটকাগজের বিষয় বৈচিত্র্য আছে সত্য। কিন্তু, বিষয়ের সাথে যেসব লেখককূল জড়িত তাদের চিন্তাকাঠামো অনেকাংশেই গতানুগতিক, যা নতুন পথের অসম্ভবকে সমর্থন করে না। যেখান থেকে শুরু হবে নতুন পথের সন্ধান। ওদের চিন্তা এখনো অতীত-ক্লাসিক-অপভ্রংশ। ফলে, ওদের নতুন ক্লাসিক তৈরির ক্ষেত্রে নতুন পথের সন্ধান নেই। নেই ক্রোধের বিস্তার। ওদের ছোটকাগজের বিষয়গুলোর মধ্যে বি-মানবায়ন খুব বেশি নেই। এক ধরনের একমাত্রিক জীবনমুখী ধারা ওখানকার লেখকদের চালিত করে। ফলে, মিডলক্লাসের গার্হস্থ্য নিয়ন্ত্রিত বিষয়গুলোর মধ্যে ওখানকার ছোটকাগজের লেখকরা ঘুরপাক খায়। তাছাড়া, মুড নিয়ন্ত্রিত সাহিত্যের চেয়ে প্রতিবেদন এবং ন্যারেট করার প্রবণতা অনেক বেশি। তাইতো, পশ্চিম বাংলার ছোটকাগজ মারা যাচ্ছে লেখক, আধিক্যে। যারা সবাই চিন্তাবিশ্বে শারদীয় একমাত্রিক যাতে ক্রিয়েটিভ কোনো অভিনব মন্ত্রময় পথের সন্ধান অন্তত খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানকার (বাংলাদেশের) ছোটকাগজের সমস্যা অনেক। প্রতিশ্রুতিশীল বহু লেখক, যারা তাদের চরিত্র হারিয়ে নিজেদের অসম্ভব করে তুলছে। অথবা এই যে তারা আর ক্লাসিক চর্চার আকাক্সক্ষা পোষণ করছে না। এ সবই একগুঁয়ে চর্চার ফল। বিভিন্ন রকমের ম্যানুফেস্টো, শ্লোগান, গোষ্ঠীবদ্ধ আকাক্সক্ষা এখানকার লেখকদের ক্ষয় করে গেছে। এ-ও বলা যায়, লেখক হবার কমিটমেন্ট ছিল না বলেই উত্তেজনা এবং সাময়িক প্রাপ্তি তাদের প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রে আমাদের লিটলম্যাগাজিন সেই ভূমিকা রাখতে পারছে না। লেখক হবার অসীম যাত্রায় ছোটকাগজ অনেক ভালো পাঠক তৈরি করছে, কিন্তু মৌলিক লেখক তেমন সৃষ্টি করতে পারে নি। মূলত, বাংলাদেশের ছোটকাগজ মরে গেছে। মরে যাচ্ছেÑ লেখক শূন্যতায়। এর জন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া বহু ছোটকাগজ যতোটা দায়ীÑ ততোটাই দায়ী লেখক এবং সম্পাদকীয় মূর্খতাও…। তবে কেবল ছোটকাগজের আনন্দ-বেদনা প্রসূত আমার স্বল্পবিদ্যা ও ক্ষীণবুদ্ধির এই আলোচনা যদি আজকের একজন ছোটকাগজের সম্পাদকও তার প্রয়োজনীয় হবে বলে ভেবে থাকে তবে এর পুরো কৃতিত্বটাই হবে আজকের অনুষ্ঠানের আয়োজকদের জন্যেই…।
কমেন্ট করুনঃ