লম্বা বক্তৃতা চলছে সেই সন্ধ্যা থেকে। এই মুহূর্তে আবারও একগুচ্ছ কথাবার্তা শোনার মনযোগ আদৌ আপনাদের অবশিষ্ট আছে কিনা বুঝতে পারছি না। এখানে পৌঁছনোর আগে ভাবছিলাম কী বলা যায়! ‘নামহীন-গোত্রহীন’ বলে একটা শব্দ শুনেছেন। আমি এই শহরের একেবারেই ‘নামহীন-গোত্রহীন’ এক মানুষ। আমাকে কেউ যদি বলে যে, কোথায় বাড়ি আমার? আমি বলি আপনাদের সবার চেনা, দেশের সুবিখ্যাত নাট্যজন মাসুম রেজা যেই শহরে থাকে, আমি সেই শহরের। আমাদের শহরের মাঝখানে একটিই বড় রাস্তা — নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়ক। শহরে সাহিত্যের যাঁরা অভিভাবক, যাঁরা সংস্কৃতি চর্চার প্রধান স্তম্ভ — আজকে যাঁরা এখানে আছেন, আমি তাদের কাছে কৈশোর-যৌবনে পৌঁছাতে পারিনি, আমার সংকোচ-দ্বিধা ও সর্বোপরি, অযোগ্যতার জন্য। এই সভাকক্ষে আমার সেই সব — একদা অধরা জ্যোতিষ্কমণ্ডলী — আমার কথা শুনছেন, এজন্য গভীর কৃতজ্ঞতা। ঐ যে বলছিলাম, ‘নামহীন-গোত্রহীন’ — যখন সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, তখন কেউ-কেউ জিজ্ঞাস্য হয়েছিলেন, এই শহরের কোন্ প্রান্তে আমার আবাস? আমি বলি যে, আমাদের শহরে একজন গুণী সঙ্গীতশিল্পী আছেন এস আই টুটুল; যার অন্যতম প্রধান সমঝদার ছিলেন, সুখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদ — ঘরের বাইরে যে গায়ককে একমাত্র টিভির পর্দায় দেখা যায় এবং যার মঞ্চ-অনুষ্ঠানে পৌঁছতে হলে, লম্বা কিউ পাড়ি দিয়ে আপনাকে প্রায় যুদ্ধে জয়লাভ করতে হবে — সেই টুটুলের বাড়ি ছুঁয়ে একদম শেষ মাথায় পুরনো একটা দালান আছে একতালা; আমি সেই বাড়িতে বেড়ে উঠি। আমার রাস্তার নাম গিরীজানাথ মজুমদার রোড। সকাল থেকে আমি এসব এলেবেলে কথা ভাবছিলাম; যেহেতু পুরস্কার জুটেছে, পুরস্কারের সঙ্গে আপনারা জানেন যে তিরস্কারের সম্পর্ক আছে — কী কথা বললে তিরস্কার খানিকটা লঘু হয়, তা নিয়ে ধন্দে পড়ি। নোবেল পুরস্কার যখন শুরু হয়েছে তলস্তয় বেঁচে ছিলেন। আপনাদের সবার জানা — তলস্তয়কে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়নি। আজকে সারা পৃথিবীর মানুষ যদি প্রথম দুজন-পাঁচজন লেখকের নাম স্মরণ করতে চায়, তাহলে আমৃত্যু তলস্তয়ের নাম বলতে হবে তাকে। শুধু তলস্তয় বলছি কেন, এই পুরস্কারহীনতার রাজনীতিতে একদিন অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন চেখভ, কনরাড, জয়েস, ইবসেন, কাফকা, প্রুস্ত সহ বোর্হেস’এর মতো অসামান্য-মনস্বী লেখককূল। এখন রাষ্ট্রযন্ত্রের কৃপায় আপনাদের সামনে একটি পুরস্কারের পর সাত-পাঁচ বক্তৃতা করছি, নিজেকে বিশিষ্ট বুদ্ধিমান প্রমাণের জন্য — এজন্য সঙ্কোচ হচ্ছে; বিশেষ করে যখন জানতে পেরেছি, কী এক বিপুল নিস্পৃহতায় — ঔপন্যাসিক জে. এম. কোয়েৎসে দু’দুবার বুকার এবং ২০০৩ সালে নোবেল পাওয়ার পরেও কোথাও কোনো সাক্ষাৎকার দেননি। এমনকি বুকার পুরস্কার তিনি সশরীরে গ্রহণ করতে যাননি। অতএব আমার এই বক্তিমার আয়োজন যে অনেকখানি অসাড় এবং বাচালতায় পরিপূর্ণ, তা আপনারা সহজেই আঁচ করতে পারবেন।
এই সভার মাননীয় সভাপতি, সভায় উপস্থিত — আমন্ত্রিত সকল পর্যায়ের অতিথিবৃন্দ, আমার সম্মুখে উপস্থিত আছেন এই শহর, এই জেলার, এই জেলার বাইরের বিদ্বজ্জন এবং আজকের সমাবেশের সবচেয়ে বড় যে শোভা, নানান মত ও পথের মানুষ, যারা সভাকক্ষে উপস্থিত হয়েছেন, তরুণ, প্রবীণ, চেনা-অচেনা সবাইকে আমার প্রীতি-শুভেচ্ছা এবং সম্মাননা জ্ঞাপন করছি।
মনুর একটা কথা ছিল — ৫০ বছরের পরে সংসার ধর্ম থেকে দূরে চলে যাওয়া। বুঝতেই পারছেন যে, যথেষ্ট সাহসের অভাবে আমি সেই কাজটি এখনই করতে পারিনি। বঙ্কিমচন্দ্র বলতেন, ‘যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে লিখিয়া দেশের বা মনূষ্যজাতির মঙ্গল সাধন করিতে পারেন অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্যই লিখিবেন। যদি না হয়, তাহলে লেখক হয়ে যায় যাত্রাওয়ালা অথবা নীচ ব্যবসায়ীদিগের সঙ্গে গণ্য…।’ আমি নিশ্চিত যে আমি লিখে রাষ্ট্রের, এই দেশের মানুষের সামান্যতম কল্যাণ করতে পারিনি। কাজেই আমি ‘অকর্তব্য’ই সম্পাদন করেছি শেষ পর্যন্ত। রুশো’কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, আপনি কেনো রাষ্ট্রকে নিয়ে লেখেন? রুশো বলেছেন, যেহেতু আমি রাষ্ট্রের বাইরে থাকি — রাষ্ট্রের সঙ্গে যারা সম্পর্কিত, তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে এত ওতোপ্রতভাবে জড়িত থাকে, তারা তাই রাষ্ট্র সম্পর্কে সঠিক কথাটি বলতে পারেন না। সবিনয়ে বলি — বঙ্কিম কথিত, সকল অকর্তব্যের পরেও যা দু’একছত্র লিখেছি, তার সবটুকুই আমাদের এই অসম্ভব-সম্ভবের রাষ্ট্র নিয়ে, রাষ্ট্রের গলিঘোঁজ এবং রাষ্ট্রের অর্ন্তগত দ্রোহ ও বিবমিষা নিয়ে; কিম্বা রাষ্ট্র নিজেই যখন সন্ত্রাস — সেই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নিয়ে কখনও কিছু কথা জমেছিল; সেই কথাগুলোই হয়ত অক্ষম কলমে লিখতে গেছি। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কে আমাকে লেখার দায় দিলেন? বলা যায় — প্রায় কিছুই না ভেবে, বাক্য-শব্দের এই অনধিকার চর্চা শুরু হয়েছিল গোপন নিষিদ্ধ ব্যাধির মতো একদিন। ধীরে ধীরে বুঝতে শিখি — লেখক যা করতে চায়, তা কিন্তু, যা সে কাগজের পৃষ্ঠায় ঘটায় — সেই অংশটুকু নয়। আমি বা আমাদের অন্তর্গত কোন্ মানবমণ্ডলী বইয়ের এই পৃষ্ঠাগুলো রচনা করে — আমরা কখনই অবহিত নই। বই প্রস্তুত হয় লেখকের মৃত্যুর দিন, অথবা লেখক নিজেই বই হয় মৃত্যুর পর। আরো সহজ কথায় বলি — আলটপকে ঘাস খাওয়া, বা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো — এই সব আশ্চর্য-উজ্জ্বল প্রবাদ-প্রবচনের সাক্ষাৎ উদাহরণ হিসেবে আমাকে এক্ষুণি ভাবতেই পারেন। বহুদিন ধরে ভেবেছি: যেমন নাট্যজন মাসুম রেজা, ফিজিক্সের ছাত্র — আমার যতদূর মনে পড়ে। এক্ষুণি স্মরণ হচ্ছে এরনেস্তো সাবাতোকে, আর্জেন্টিনার এই লেখক একাধারে ছিলেন পদার্থবিদ ও চিত্রকর। আমি মেডিকেল পড়েছিলাম। পদার্থ বিজ্ঞান আর নাট্যশাস্ত্র — মাসুম রেজা মেলালেন কিভাবে? আবার আমি কেনই বা মেডিকেলশাস্ত্র টপকে এসব দু:ষ্কর্মে যুক্ত হলাম, কখনো কখনো উত্তর খুঁজতে গেছি। আজ অবশ্য সারা পৃথিবীতে নতুন পাঠ-পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে ‘মেডিকেল হিউম্যানিটিজ’ নামে। আমাদের প্রতিবেশী দেশেও এ সম্পর্কে ঢের বলাবলি আছে; সংস্কৃতি চর্চার নানান যে শাখা প্রশাখা আছে — সে’সবের নির্যাস, তথ্য, তত্ত্ব ভবিষ্যতের চিকিৎসকের মনোগঠন, সংবেদনশীলতা এবং দেখার চোখ আরো বিস্তৃত করবে — এমনটি মেডিকেল হিউম্যানিটিজ’এর পণ্ডিতবর্গ ভাবছেন। অবশ্য আমরা যখন লেখালেখি তথা অপাঠ্যে ভুতগ্রস্ত হই, তখন এই বিদ্যা-বুদ্ধির প্রসঙ্গ এখানে আসেনি। কবে-কখন কোন রসায়নে পাঠ্যপুস্তিকার জটা আড়াল করে আমরা খানিকটা গ্রন্থানুরাগী হয়েছি, সেইটি আর স্মরণে নেই। তবে কখনও ভেবেছি, আজ এই সভায় দাঁড়িয়ে বারবার ঐ কথাটিই মনে হচ্ছে — মানুষের সকল বক্তব্য, সকল ভাবনা, সকল প্রসঙ্গ যেহেতু গ্রন্থ নির্মাণের দিকেই ধাবিত হয় — প্রত্যেকটি বই, আমার ধারণা, ইশারা-ইঙ্গিতে শেষ পর্যন্ত ঘরে ফেরার কথাই লিপিবদ্ধ করে। এই অনুষ্ঠানে, বক্তৃতায় অনেকেই তাদের স্মৃতি বর্ণনার সূত্রে ঘরে ফেরার কথা বলেছেন। তাদের কথা অধিকতর ষ্পষ্ট করার জন্য ‘নস্টালজিয়া’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। আমি নস্টালজিয়া শব্দের বুৎপত্তি খুঁজি : গ্রিক এই শব্দটি এসেছে ‘নসট্রাম’ থেকে, মানে হলো, ঘরে ফেরা। আর ‘এ্যালগোস’ অর্থ হলো ব্যথা — আমি আমার কাছে ব্যাখ্যা করি সংক্ষেপে : ঘরে ফেরার আকাঙ্খা জনিত ব্যথা। সত্যিই কি ঘরে ফেরা যায়? এই একটি কথায়, যদি মানুষের জীবনের প্রধান অভিমুখ ব্যাখ্যা করা যায়, কিম্বা চিহ্নিত করি মানুষের প্রধান অভীষ্ট, তাহলে বলতে হয় বাধ্যতামূলক গৃহত্যাগী হয়ে, মানুষ নানা পরিব্রাজন শেষে ঘরে ফিরে আসার চেষ্টাই করে দিনের শেষে। হোমারের ইলিয়াড এবং ওডেসি তার উজ্জ্বল প্রমাণ। এই দীর্ঘ পরিভ্রমণে, আমার অনুমান — মানুষের প্রথম বেদনা শুরু হয়, যেদিন তার জন্ম হয় সেদিন থেকে; আমি বলি ট্রমা অব বার্থ। মানুষের প্রথম ‘উদ্বেগ’ জন্মলাভের ট্রমা। উদ্বেগের ইংরেজী এ্যাংগজাইটির উৎস সন্ধান করি — ল্যাটিন ‘এ্যানজের’, অর্থ শ্বাসরুদ্ধ হওয়া; মানুষের প্রথম অযাচিত এই সংগ্রাম, মায়ের জন্মপথের সরু রাস্তা বেয়ে আসার সময় তীব্র ‘শ্বাসরুদ্ধ’ হওয়ার নিরুপায়-বিপদজনক অভিজ্ঞতা।
মানুষের এই ভয়-তাড়িত পরিব্রাজনা, মুণ্ডুহীন রাষ্ট্রের উৎপাদিত ভয়ের সংস্কৃতিতে জারিত হয়ে, আমাদের পেছনে ধাবিত হয় আমৃত্যু-আজীবন; কিন্তু পাশাপাশি ঐ যে ঘরে ফেরার গল্প — সেই সূত্রে শৈশবের বৃক্ষ-ঘাস-জনপদের ভেতর যে চিত্রকলা ও কবিতার বীজ রোপণ হয় অলক্ষে — সেই ‘পোয়েটিক্স অফ স্পেস’ আমাদের ভেতর ছড়ায় ‘ঘরে ফেরার বেদনা’ অথবা ঐ চেনা জায়গার প্রতি তীব্র মায়া, তত্ত্বের ভাষায় ‘টপোফিলিয়া’। ইংরেজীতে ‘হোম’ এবং ‘হাউজ’ এর অর্থ পৃথক হলেও — ল্যাটিন, ডাচ এবং জর্মনে ‘হোম’ এর পরিপূরক শব্দ পাই না। আমাদের কাছে সমতলের ঘাসলতা পরিবেষ্টিত স্থানটিই যখন ‘হোম’ — তখন পর্বতপ্রেমী জন মুইর’এর কাছে — পর্বতে যাওয়া-ই ঘরে ফেরা — … গোয়িং টু মাউন্টেইন ইজ গোয়িং টু হোম! আমার আজকের বলাবলি — মূলত: এই ঘরে ফেরার আনন্দ-বেদনা ও স্মৃতিময়তা নিয়ে; অন্য অর্থে যে জনপদ আমাকে-আপনাকে করে তোলে ‘গল্পপোষ্য’, যে জনপদ আমাকে-আপনাকে দেয় জল বাতাসের স্বপ্ন-ঘ্রাণ, যে জনপদ আমাকে-আপনাকে দেয় বেঁচে থাকার প্রণোদনা, অথবা বাক্য-ভাষা নির্মণের কালে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত দান করে তার অনন্ত শব্দভাণ্ডার — আমি এই সভায় দাঁড়িয়েছি সেই জনপদের ভূমিপুত্র হিসেবে, কেবলমাত্র Ĺণ স্বীকারোক্তির জন্য। পেছন ফিরে দেখি — আজকে আমরা যে সমাবেশটিতে বসে আছি, এর পাশে পৌরসভার যে মূল ভবন, সেটা ছিল জমিদার সতীশ সাহার বাড়ি। একটু আগে বলছিলাম আমার বাড়ির রাস্তার নাম গীরিজানাথ মজুমদার রোড। এই ‘গীরিজানাথ মজুমদার রোড’ কথাটি — আমাদের শৈশবে পোস্টকার্ডে খামে, যখন আত্মীয়কূলের চিঠি পেতাম তখন প্রায়শ: ভুল বানানে লেখা থাকতো ‘গির্জা’। রাস্তার মুখেই ইঞ্জিনিয়ার রেনউইক প্রতিষ্ঠিত রেনউইক এণ্ড কোম্পানি — এই কারখানায় আঁখ মাড়াইয়ের কল হতো, আর হতো চিনি কলের খুচরো যন্ত্রপাতি। স্কুলে যাওয়া আসার পথে — কারখানার তীব্র ধাতব শব্দ, কখনো কারখানা ছুটির সাইরেন এবং কারখানার গা ঘেঁষে বিস্তৃত ঝাউ গাছের শন-শন সামুদ্রিক শব্দ ছিল আমাদের শৈশবের এক অনন্য শব্দ-গান। কারখানার ফোরম্যানের নিমাইদাকে চিনতে পারতাম; কারখানা শেষে, তেল-কালি মুছে — খোল-করতাল, ঢোলক এবং চন্দনের ফোঁটায়, মুহূর্তেই তিনি হয়ে উঠতেন আমাদের শ্রেষ্ঠ কীর্তনিয়া। দূর ইতিহাসের কেউ শেখান — ১৮৬৬ সাল। খ্রীষ্টিয় কবরস্থান উদ্বোধন শেষে ফেরার পথে, রেনউইকের স্টিমার ঘাট থেকে আচমকা পা পিছলে রেভারেণ্ট বিশপ কটন গড়াই নদীতে সলীল সমাধিস্ত হন। এই শহরের শেষ প্রান্তে, তখন ১৮৯৬ — রবিঠাকুর ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে আবিষ্কার করছেন টেগোর এ্যান্ড কোং। এর পাশেই আরেকটি আঁখ মাড়াইয়ের কারখানা যজ্ঞেস্বরের। রবিঠাকুর, পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখছেন — যজ্ঞেস্বরের কাছ থেকে মোটরের এইচ.পি জেনে নিতে।
এখন এই ঘরে ফেরার কালে — রবিঠাকুরের জমিদার এবং লেখক অংশের সংযুক্তি ও বিযুক্তি পাঠ করি — কুষ্টিয়া, শিলাইদহ আর গড়াই নদীর পশ্চাৎপদে। রেনউইক কোম্পানির ধাতব গর্জন, কখনও হঠাৎ সাইরেন — নদীর জলস্রোতে ডুবে যেতে যেতে, বাড়ি ফেরার পথ এইবেলা আচ্ছন্ন করে, অথবা নিক্ষেপ করে অনাদিকালের গোলকধাঁধায়।
দূর বাতাসে সঙ্গীত আসে — ‘মন রে কৃষিকাজ জানো না… ।’ …মন তবে কৃষিকাজ করে কীভাবে? আরো দূরে অস্পষ্ট সুরে আশ্রমবাসী কেউ গুন গুন করে — .. মন চলো নিজ নিকেতনে ……। আমি ভেবে-ভেবে এই অন্তর্জগত অনুবাদের প্রয়োজনীয় শব্দ হাতড়ে বেড়াই। কে জানে এই শব্দই হয়ত নির্মাণ করে ভাষার ইশারা, যখন ভাষা থাকে আমাদের কাছে অবচেতনের মতো। এই মেলবন্ধনেই আমাদের মনোরাজ্যে পত্তনি হয় একখণ্ড চাষের জমি। সেই জমি কেনাবেচার রহস্যে আমি যেনো ইতিহাসের এক দরিদ্র রায়তে পরিণত হই। লোকমুখে গল্প ভাসে — আমাদের চেনা ঘরবাড়ি থেকে সামান্য দূরেই শালঘর মধুয়া কুঠিবাড়ি। আর একটু এগুলে বল্লভপুর মন্দির, শাহ সূজার মসজিদ, প্রাচীন এম এন স্কুল, বলরামভজা সম্প্রদায় — মার্চপাস্টের মতো সার হয়ে কেবল স্মৃতির কুশীলবেরা দৌড়ে দৌড়ে আসে। দোলাচল হয়, নি:সঙ্গতা হয়; বাবার অকাল মৃত্যু আসে — মাতামহ বলেন, বাবার মুখ দেখে নাও শেষবারের মতো; আঁধার কবরে সাদা কাপড় এবং কর্পুর গড়িয়ে যাওয়ার মিহি চিত্রমালা ছাড়া বাবার মুখমণ্ডলের আমি কোন কিছু আভাস পাই না। কবরে ঝুপঝুপ মাটি পড়ে, আমার গলায় কান্নার নিষিদ্ধ দলা — মাটির ভেতর বাবা হারিয়ে যায় অনন্তকালের জন্য। ধীরে-ধীরে জগত-সংসারের ঘাত-প্রতিঘাতে অপর মানুষে রূপান্তরিত হই; আর ছোটসময়-ব্যক্তিসময়-বড়সময়ের মিথস্ক্রিয়ায় প্রস্তুত হতে থাকে আমাদের ব্যক্তিগত স্মৃতি, যৌথস্মৃতি, রাষ্ট্রযন্ত্রের স্মৃতি, যুদ্ধের স্মৃতি, যুদ্ধ পলায়নের স্মৃতি এবং জেগে ওঠার স্মৃতি। মানুষ তো স্মৃতির-ই সমষ্টি! ঘরে ফেরার পথ তাই সহজ হয় না। নিশি পাওয়া মানুষের মতো ইতিউতি হাতড়ে বেড়াই।
কুষ্টিয়া শব্দটি কি ‘কুস্তি’ করতে-করতে এলো, নাকি পাটের ‘কুষ্ঠা’ থেকে এলো — কাউকে জিজ্ঞেস করি। ভাবতে ভাবতে লম্বা পথ তৈরি হয়। দূরবীণের উল্টো দিকে চোখ রাখার মতো — এই শহরের দৃশ্যমালা তখন চলে যায় লক্ষণ সেন-বখতিয়ারের যুদ্ধ ও ঘোড়া-সমাচার হয়ে, নদীয়া-রাজবংশ ছুঁয়ে পুরনো মাথাভাঙ্গা নদীর দিকে। আমরা বহু পরে গড়াই নদীতে ড্রেজার দেখি, কিন্তু এর অনেক আগেই মাথাভাঙ্গা নদীতে নাব্যতা আনার জন্য বারবার চেষ্টা করা হয়েছে। নীলকর কোম্পানির স্বার্থ রক্ষার্থে ১৮২০ সালে রবিনসন নামক এক সাহেব কুমার নদীর মুখে বালি বোঝাই নৌকা ডুবিয়ে মাথাভাঙ্গায় বেশি পানি ঢুকানোর চেষ্টা নিয়েও ব্যর্থ হয়। এই নদীর পথঘাট চিনতে চিনতে আমরা জলাঙ্গী, চূর্ণি, গড়াই, নবগঙ্গা, কালীগঞ্জ ভৈরব হয়ে আরও দূর গঙ্গা-ভাগিরথির জলরাশি স্পর্শ করি কখনও। ধীরে-ধীরে অবহিত হই — ‘বেঙ্গল ইণ্ডিগো কমিশন’ এর সুবাদে নীল চাষের যাতনা এবং বিদ্রোহ বিষয়ে; একবিঘা চাষে খরচ যখন ১২ টাকা তখন কৃষক পায় মাত্র এক থেকে তিন টাকা। ক্রমশ: কৃষক অসন্তোষের সঙ্গে সঙ্গে নীলকরদের অত্যাচারও বৃদ্ধি পায়। ইতিহাসের ঘুলঘুলি থেকে উঁকি দিলে তীব্র সেই সংঘর্ষের ছবি ভাসে — কেনী এবং আমলা কুঠির প্যারি সুন্দরীর মধ্যে। কৃষকেরা ক্রোধে কালীগঙ্গা ও কুমার নদীতে নীলের গাছ নিক্ষেপ করছে। নীল হাঙ্গামার তদন্তের জন্য এই কুমার নদী পথে লে. গর্ভনর স্যার জে পি গ্রান্ট রওনা হলে, লক্ষ লক্ষ অত্যাচারিত নীলচাষী নদীর পাড় ঘেঁষে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।
ধীরে-ধীরে ইতিহাসের আগুন ও ছাইভষ্ম তৈরি হয়: ওয়াহাবী আন্দোলনের সঙ্গে কুমারখালির কাজী মিয়াজান যুক্ত হন। এই ধারাবাহিকতায় আসে ফারায়েযী আন্দোলন, বাউল বিরোধী ন্যাড়া ফকির খেদা আন্দোলন, নীল বিদ্রোহ, খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, দেশভাগ, … একাত্তর, … চুয়াত্তর … , পঁচাত্তর এবং ৯০ এর গণ অভ্যুত্থান। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় — এই শহরের আমলাপাড়ায় শক্ত এক ঘাঁটি তৈরি হয়েছিল বাঘা যতীনের যুগান্তর দলের। লক্ষ্য করি — রামপ্রসাদ, লালন, জলধর, কাঙ্গাল, মীর মশাররফ, জগদীশচন্দ্র, রবিঠাকুরের … বাইরে আরো সব অসাধারণ কীর্তিমান মানুষেরা — আমাদের চোখের আড়ালে, একদিন এই চেনা পথে হেঁটেছেন — জগদীশগুপ্ত, কবি গোলাম কুদ্দুস, খগেন্দ্রনাথ মিত্র, শচীন্দ্রনাথ অধিকারী, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, অন্নদা শঙ্কর, কাজী মোতাহার কিম্বা ‘পল্লী জীবন’ খ্যাত দীনেন্দ্র রায়; এঁদের গৌবরময় পদচিহ্ন মিশে গেছে আমাদের সংঘবদ্ধ অবিমৃষ্যকারীতায় উৎপাদিত ক্লিন্ন-ক্লেদাক্ত ধূলিবালি-কাদায়। এক্ষণি মনে পড়ছে মুন্সি জমীর উদ্দিন আর মুন্সি মেহেরুল্লার ধর্ম বিষয়ক তীব্র বিতর্কের কথা। মুন্সি জমীর উদ্দিন — একবার ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করছেন, তারপর খ্রিষ্টভক্ত হয়ে আবারও মুসলিম হচ্ছেন। পুরনো মানুষদের মুখে শুনেছি — দেশবন্ধুকে ট্রেনের কামরায় এক ঝলক দেখার জন্য তারা পোড়াদহ স্টেশনে গিয়েছিলেন; আর দেশবন্ধু সি আর দাসের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে লম্বা টুপিদাড়ি পাঞ্জাবীতে শহরের একজন সোমেশ^র প্রসাদ চৌধুরী সবার কাছে হয়েছিলেন ‘সোমেশ^র মৌলবী’। এই শহরে যেমন শাহ আজিজ-সাদ আহমেদ গংদের মতো স্বাধীনতা বিরোধী ছিল, তেমন ছিল আজীবন বিপ্লবী কমরেড রওশন আলি ও জসিম উদ্দিন মণ্ডল। পুরনো গেজেটিয়ারে দেখা যায় — ১৮৬৪’তে তীব্র এক ঘুর্ণিঝড়ে, মশার উৎপাত ও বংশ বিস্তার ক্ষীণ হয়ে, সে বছর এতদ অঞ্চলে ম্যালেরিয়া কমে যায়। দেখতে পাই — এই সব স্বপ্ন-স্বপ্ন গল্পের স্রোতে ভেসে-ভেসে আমাদের বয়ঃপ্রাপ্তি ঘটে। ক্রমে-ক্রমে দেশ উত্তাল হয়, দেশজুড়ে ৬৯–৭১’সালের ভয়-দ্রোহ এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ হত্যা হয় পক্ষীর মতো। জলে-ডাঙ্গায় লাশ জমে থাকে শকুন-কাক-শৃগালের অফুরান খাদ্যের উপাদান হয়ে। শহরে মৃতট্যাংক, গুলি ও বারুদের চিহ্ন। যুদ্ধ শেষে পোড়া ঘরবাড়ির ঘাসভর্তি উঠোনে মানুষের খুলি এবং নারীর ছিন্ন পাদুকা। এদিকে সদ্য স্বাধীন দেশে বন্যা-খরা-দুর্ভিক্ষে মানুষ আবারও মৃত্যুর স্রোত নির্মাণ করে। একদিন ১৯৭৪’এর এক বিকেল-সন্ধ্যায় হঠাৎ আবিস্কার করি — আমাদের গড়াই নদীর বুক-পিঠ জলশূন্য; মানুষ হেঁটে-হেঁটে নদী পার হচ্ছে। আমি চমকে উঠি — নদী আমাদের রক্ত প্রবাহের মতো, অথচ সেই নদী এখন জলশূন্য! ধীরে-ধীরে জনপদ কীভাবে মুমূর্ষু হয়ে উঠছে। এর পরেই ৭৫’এর অবিস্মরণীয় নারকীয় হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার নিশ্চিহ্নকরণ প্রকল্প এসে দাঁড়ায়। বলা যায় — এই প্রকার বিবিধ ইতিহাসযান ও সময়যানের মিথস্ক্রিয়ায় আমরা একদিন ভেতর-ভেতর উন্মূল হই, বাস্তুচ্যুত হই। দোলাচলে একবার গৃহহীন হই, একবার হই গৃহ অভিমুখী।
নানান কূটাভাস খোঁজার প্ররোচনায় এবার শুধুই হেঁটে বেড়ানো শহরের রাস্তা-ঘাটে– দেখি ব্রিটিশ সভ্যতার স্মারক হিসেবে রেল বেড়েছে — শিয়ালদা — জগতি — পোড়াদহ — রায়টা — হার্ডিঞ্জ ব্রিজ হয়ে প্রাচীন এক পরিভ্রমণ প্রকল্পে কখনও আচ্ছন্ন হই। দেখি শহরের একমাত্র বস্ত্রকল — মোহিনী মিলের চিমনিজুড়ে অস্পষ্ট-সাদা-নীল ধোঁয়া এবং পায়রার উড়াউড়ি; আর মিলের গা-ঘেঁষে ড্রেন বেয়ে চলেছে নতুন কাপড়ের আশ্চর্য রঙের স্রোত — সেইসব সুতা-কাপড়ের রং ক্ষণে-ক্ষণে বদলায়; আর আমরা রংয়ের নাম আলাদা করতে-করতে শৈশব-কৈশোরকে রঙিন করি, অথবা একদিন নিখোঁজ কারখানার মতোই আবার সহসা বিবর্ণ করে ফেলি। হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে শহরের গোশালা, গজানন ঠাকুরের মন্দির, নফর শাহের মাজার, কেরামত আলি মস্তান, উদিবাড়ি দায়রা পাক এবং ৭১’এর ধ্বংসপ্রাপ্ত পেতলের সেই প্রাচীন রথ। অথবা অনন্তকালের গল্পপোষ্য মানুষের বয়ানে নির্মাণ হয় আরো দূর পৃথিবীর আর এক চিত্রমালা — পরিমল থিয়েটারকে কেন্দ্র করে শহরে চলছে আশ্চর্য-উজ্জ¦ল সেই সব নাটকের মহড়া; সঙ্গে সঙ্গীতের মূর্ছনাও বটে — এই ‘নাটুকে শহরে’ একদা বাংলার সব মহার্ঘ্য শিল্পীরা পদচিহ্ন রেখেছিলেন, আমি ক্ষণে-ক্ষণে অবাক হই — সর্বজনমান্য প্রমথেশ বড়ুয়া, শিশির ভাদুড়ী, অহীন্দ্র চৌধুরী, আঙুরবালা, ইন্দুবালা, কৃẲচন্দ্র দে, সন্ধ্যা, শ্যামল, হেমন্ত, ধনঞ্জয় ও মানবেন্দ্র … ; সেই ঐন্দ্রজালিক সুর এবং স্বরের রেশ শহরের বায়ুমণ্ডলে কবে নিখোঁজ হয়ে গেছে, জানতে পারিনি। ইতিহাসের খেরোখাতায় দেখি — কুমারখালী থেকে সংগৃহীত হাড়গিলা পাখির বেগুনী পালক, কোলকাতায় বিক্রি হচ্ছে — ‘কুমারখালী ফেদার’ নামে; আর এই পালক ব্রিটিশ রমণীদের হাতবন্ধ-দস্তানায় সৌখিন পাখা হয়ে শোভা বর্ধন করছে। বলা যায়, ইতিহাসের এই প্রকার অলৌকিক আবিষ্কারের ভেতরেই একদিন আমাদের জন্ম-মৃত্যুর বীজ ও রহস্য জাগরুক হয় অলক্ষে। সাহিত্য যদি হয় ‘পাত্র বিশেষ’ — মোটা দাগে এই সব দিবাস্বপ্ন, স্বপ্নজগত এবং বাস্তবতার কথা-ই যৎসামান্য সংগ্রহের প্রয়াস পেয়েছি আমার বাক্য-শব্দের আড়ালে। বঙ্কিমের নির্দেশ ছিল — লেখা যশের জন্য নয়, টাকার জন্য নয় … ; হয়ত এই একটি নির্দেশ আমি প্রতিপালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছি। আমি নিশ্চিত হই, সাহিত্য আসলে একটি যোগাযোগের উপায় — একজনের চিন্তা অপরকে জানানো। মনিষীরা বলেন — লেখা একটি কাজ, লেখা একটি দায়, লেখা একটি থেরাপি — হয়ত লিখে কেউ তার দূষিত রক্ত বিশুদ্ধ করে। ওরহান পামুক বলতেন — এক চামচ ওষুধ গ্রহণের মতোই লেখালেখির কাজ তার কাছে একটি বাধ্যতামূলক ব্রত। আমি বলি, জীবনের কতিপয় রং-ধ্বনি-ঘ্রাণ — যা আমাকে একদিন বিবশ করেছিল, সেই সব মিলিয়ে নির্মাণ করতে গেছি আমাদের এক অক্ষম-যৌথ আত্মজীবন। কে জানে, জন্মগ্রহণের পর, হয়ত আমরা শুধুই দেখতে চেয়েছিলাম; ‘ডাকঘর’এর অমলের মতো — একটিই ইচ্ছে, শুধুই দেখবো বলে পণ করেছি। … দ্যা আর্ট অফ সিয়িং … … পৃথিবী দেখার শিল্প … … লেখালেখি-সাহিত্য, সে অর্থে পৃথিবীর উদ্দেশ্যে একটি সুলিখিত পত্র রচনা মাত্র। দেখার এই কাজটিও একা করা যায় না, প্রকাশ করা যায় না — ফলে তৈরি হয় বন্ধু, সহযোগী, সহযোদ্ধা, সমাজ, রাষ্ট্র — এঁরা তাদের দৃষ্টি এবং ইন্দ্রিয়গুচ্ছ Ĺণ দেন এবং জীবনের সেই সব দূর্লভ অভিজ্ঞতা পাইয়ে দেন ক্রমে-ক্রমে। লেখালেখি সে অর্থে, খানিকটা যৌথ-কর্মও বটে। আমরা লিখি না, লিখিত হই …।
যে জুলাই মাসে আপনাদের সান্নিধ্য পেলাম — এতকাল বাদেও হঠাৎ-হঠাৎ শোকার্ত হয়ে পড়ি, ভ্যানগগের মৃত্যুর একশ বছরের অধিককাল পেরিয়ে যাওয়ার পরেও, এই মাসের শেষ নাগাদ, ১৮৯০’এর ২৯ শে জুলাই ভ্যানগগ স্বেচ্ছামৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। চারপাশে খবর রচিত হয়, পৃথিবীর এই শনৈ-শনৈ উন্নয়নের ভেতর — বিশ^ব্যাংক-আইএমএফ তথা মার্কিন স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট মুক্ত বাজারের চক্রে আমরা নিষ্পেষিত। যাকে বলে লার্ন্ড হেল্পলেসনেস — শিখেছি কোনভাবেই এই বিপন্নতা থেকে মুক্তি নেই। আপনারা মানবেন — কার্বন-ফুটপ্রিন্টের নথিপত্র সাক্ষ্য দেয়, প্রকৃতি বিপর্যস্ত এবং গোলকায়ন তথা উত্তর-সত্যের রাজনৈতিক-অর্থনীতিতে আমরা আজ কেবলই লক্ষ্যহীন; যে সময় পাড়ি দিচ্ছি — রবিঠাকুরের ভাষায় ‘লোভে দুই চোখ আচ্ছন্ন’ — ভবিষ্যতের গবেষকবৃন্দ বলেন: প্রতি ৪০ সেকেণ্ডে ধরিত্রী মাতার একজন আত্মহত্যা করছেন; যে পৃথিবীতে একদা ভাষা ছিল ৭০০০, প্রতি সপ্তাহে একটি ভাষার মৃত্যু হচ্ছে, অর্থাৎ ২০৫০’এর মধ্যেই ভাষা হারিয়ে যাবে ৯০ ভাগ। ভাষা হারানোর অর্থ আশাহীন হওয়া, সংযোগহীন হওয়া — বেঁচে থাকা বটে, কিন্তু সে এক বিপন্ন বিষ্ময়ে আবিষ্ট মৃত-জড় জীবন। ‘এ আই’ অর্থাৎ আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স, … কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা — এই বিষয়ের পণ্ডিতবর্গ নিশ্চয় অন্য ব্যাখ্যা দাঁড় করাবেন। কিন্তু আমরা যারা পুরনো মানুষ, এই চেনা-পৃথিবীর নি:সম্বল-সন্তান — আমাদের কেবলই ভয় হয়, উদ্বেগ হয়, আবার তৎক্ষণাৎ দূর্বার ইচ্ছে নিয়েই বাঁচতে ইচ্ছে করে — কারণ জীবন এক অভাবিত আশির্বাদ।
বঙ্কিম বলতেন — বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা করিবেন না, … অতিশয় বিরক্তিকর। আমি নিশ্চয় — বিরক্তি উৎপাদনের চূড়ান্ত ঘটনাই সম্পাদন করে ফেলেছি ইতোমধ্যে। মার্জনা চাই।
আসলে গালভারি কথাবার্তা-বক্তিমা — সেইটিই প্রধান বিষয় নয়; আপনাদের কল্যাণে, এতগুলো মানুষের মুখ দেখা — আমার কাছে তীর্থ করার মতোই পূণ্যের এবং আনন্দের। এই আনন্দ-বেদনা নিয়েই — এই শহরের, ধরা যাক প্রায় ৪০ বছর পেছনের একটি গল্প দিয়েই আমার বক্তব্য শেষ করি: ইটালিয়ান এক দলছুট-ইঞ্জিনিয়ার রোলা-ডিল-রিচি — আপনাদের স্মরণ হবে, উন্মূল জীবনের শেষপ্রান্তে, চা-পাউরুটি ভিক্ষে করতেন শহরের রাস্তায়; ভিক্ষের সময় মুখে বলতেন … হ্যালো মাইকিং — … … হ্যালো মাইকিং — …… আমি এখনও সেই আওয়াজ শুনতে পাই যেন, ১৯৭৫’এ মৃত সেই মানুষটি এই শহরে ফেরার নেমন্তন্ন পাঠায় যেনবা — হ্যালো মাইকিং। রিলকে বলতেন, সকল স্থান-প্রতিবেশের একটি অদৃশ্য আহ্বান থাকে — কল অফ স্পেস — … আমি আমার জীবন-অপরাহ্নে, এই শহরের, এই জন্মভিটার প্রতিনিয়ত সেই আহ্বান শুনি যেন; … হ্যালো মাইকিং — এই শব্দের রেশ-বর্ণ-ঘ্রাণ নদীয়া-কুষ্টিয়া- মাথাভাঙ্গা- গড়াই নদী হয়ে, মন পবনের নাও হয়ে ভেসে যায় অদৃশ্যে — মন বিষাদ হয় — অশ্রু সজল হয়ে চেনা শৈশব-কৈশোরের বৃক্ষ-লতা দেখি — কোনদিন-ই সেই চেনা পৃথিবীতে আমরা আর ফিরতে পারি না। এক প্রকার নিষ্করুন মায়া এবং আচ্ছন্নতা…। আমার যৎকিঞ্চিৎ বাগাড়ম্বর, আমার মূর্খ-লেখাপত্র-টিকাভাষ্য, বলতে কি, এসবের-ই এক অক্ষম অনুবাদ মাত্র। কিম্বা শেষ পর্যন্ত আমরা হয়ত কিছুই আবিস্কার করি না, কেবল ভাষার এক উত্তরাধিকার বহণ করে চলি যৌথ অবচেতনায়। নানান বদল হওয়ার জ্যামিতিতে নিজের বাড়ি-নিজের ঘর-নিজের স্বপ্নের ঘর রুপান্তরিত হতে-হতে চেনা-অচেনা পরিসর-ই হয়ে দাঁড়ায় আমাদের ভুলঘর-ভুল আশ্রয়। বুঝতে শিখি: ভিটেমাটির ঘরবাড়িতে আমরা কদাচিৎ নিজেকে দেখতে পাই; বরঞ্চ ঘরবাড়িই শেষপর্যন্ত — তার ভাঙ্গা পলেস্তারার গদ্য-পদ্য-চিত্রময়তা নিয়ে প্রবিষ্ট হয় আমাদের অন্তর্জগতে, আমাদের স্মৃতিভাষ্যে। সবিনয়ে বলি — এই হল আমাদের ঘরে ফেরার সহজ-সরল ভ্রমণ আলেখ্য।
আপনাদের সদিচ্ছা, শুভবুদ্ধি, কর্মোদ্যম, কর্ম সাধনা, মঙ্গলময় হোক। অনেক অসংলগ্ন-অস্পষ্ট ভাসা-ভাসা কথা হল — এরপরেও আপনারা কথা শোনার দয়া দান করেছেন। এজন্য সবাইকে কৃতজ্ঞতা।
————————————————————————————————————————————–





কমেন্ট করুনঃ