একটু আগে আমি গত হয়েছি। ঘটনাটা ঘুমের মধ্যেই ঘটেছে। মানে আমি মারা গেছি ঘুমের মধ্যেই। তবে এখনও ঠিক বুঝতে পারছি না, আমি কি বেঁচে আছি, নাকি স্বপ্ন দেখছি! অথচ আজ আমার জন্মদিন। প্রতি বছর এই দিনকে ঘিরে বাসায় নানা রকমের আয়োজন থাকে। বাসায় হাসানের মা পোলাও রাঁধে, পাশের বাড়ির গুলনাহার ভাবী, পুরান ঢাকা থেকে পোড়া মুরগি নিয়ে আসে। আর আমার বন্ধুরা তো আছেই। রাত ঠিক ১২টা বাজলে ওরা সবাই হইহই করতে করতে ঘরে ঢুকবে আর আমাকে অবাক করে দেবে। আর আমার একমাত্র ছেলে মায়ান ঘুম ঘুম চোখে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলবে, হ্যাপি বার্থ ডে মা। ওহ, মায়ানের বাবার কথা তো বলতে ভুলেই গেলাম। ও ঠান্ডা মাথায় জন্মদিনের সব আয়োজন করবে, কিন্তু ভাবখানা এমন করবে যেন সে কিছুই জানে না। জন্মদিনটা আমার ভালোই কাটে। কিন্তু আজ কী হবে! আমি কি সত্যই মরে গেলাম?
ইস!আর একটা দিন বেশি বাঁচলে কী এমন ক্ষতি হতো! শুনেছি, জ্ঞানী লোকের জন্ম-মৃত্যু নাকি একই দিনে ঘটে। আমি কি জ্ঞানী কেউ ছিলাম? কিছুই তো মনে পড়ছে না। আচ্ছা, আমি মরে গিয়ে স্বপ্ন দেখছি, নাকি স্বপ্নে মরলাম?
সবাইকে বেশ ব্যস্ত মনে হচ্ছে। এইমাত্র বিছানার পাশে আগরবাতি জ্বালিয়ে গেল হাসানের মা। কেউ একজন মায়ানের চাচাকে টেলিফোনে আমার কথা জানাচ্ছে। তার মানে ঘটনা সত্যি! আজব তো! কেউ একটু কাঁদছেও না! নাকি কান্নাকাটির পর্ব শেষ! আমি হয়তো একটু দেরি করে ফেলেছি! নাহ্, ভুল ভেবেছিলাম। এই তো গুলনাহার ভাবী ঠিকই কাঁদছেন। উনি পুরান ঢাকার মেয়ে, তাই ঢাকাইয়া ভাষাতেই কাঁদছেন। -‘হাচা নি ভাবিসাব, না কয়া চইলা গেলেনগা! আইজ আপনারে আমগো পুরান ঢাহার কাহানি হুনামু মনে কইচিলাম। আমার কইলজার মইদ্যে কী হইতাচে বুঝাইবার পারুম না…ক্যালা, ক্যালা এমতে গেলেন গা? আপনে মইরা গেছেন হুইনা পরথমে বিশ্বাস করবার পারি নাইক্কা। হের বাদে হক্কল কিছু ফেলাইয়া লৌড় পাড়তে পাড়তে আইয়া পড়চি… ও ভাবিসাব… ভাবিসাব গো…’
আরে, তাই বলে এমন চিৎকার করে কাঁদবে? উফ! আমার খাট তো রীতিমতো কাঁপছে। কী মুশকিল, সবই তো দেখছি কিন্তু কিছুই বলতে পারছি না। তাও ভালো, ছেলেটাকে সাথে আনেনি। ছেলেটা আসলেই তো আমার মায়ানটাকে ধরে ধরে মারতো, কামড়ে দিতো। এখন তো আমি বেঁচে নেই। আমার ছেলেটাকে কে দেখে রাখবে! যাক বাবা, যা হয় ভালোর জন্যেই হয়, ওর ছেলেটা আসেনি। কিন্তু কান্নায় শব্দে তো আর থাকা যাচ্ছে না। মাথা ধরে যাচ্ছে। কী কাণ্ড! মরে গেলেও মাথা ধরে তাহলে?
এই ছেলেটা কে? সবাই ওকে মায়ান নামে ডাকছে কেন? মায়ান তো আমার ছেলে। আমার একমাত্র ছেলে। ওর বয়স এখন আট। কিন্তু এই ছেলেটার তো মনে হচ্ছে ১৬ হবে। আহারে মায়ান! মা ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না! আহ্, বাবা আমার। এখন তোকে কে খাইয়ে দেবে? কে ঘুম পাড়িয়ে দেবে? কে তোকে স্কুলে নিয়ে যাবে? আমার লক্ষ্মী বাবাটাকে দেখছি না কেন? আমি যে মরে গেছি, ও কি তা এখনও টের পায়নি? মায়ানটা বড় হলে ঠিক এই ছেলেটার মতোই হবে। আচ্ছা, এমন পটাপট ইংরেজি বলে যাচ্ছে, ওই মেয়েটা কে?
– ‘Don’t upset mayan. I am very sorry for your mother. But I’m here always for you. Let’s go some-where. You feel better.’
ও কি তবে আমার মায়ান বাবার সাথেই কথা বলছে! মায়ানটা এত বড় হলো কবে!অফিস আর নিজের কাজ নিয়ে এতো ব্যস্ত হয়েছিলাম, ছেলেটা যে এতো বড় হয়ে গেল তা খেয়ালই করলাম না।আমি একটা কেয়ার লেস মা। জীবনে কোন কাজই ঠিক মত করতে পারলাম না।আমার যে মায়ানকে নিয়ে, ওর বাবাকে নিয়ে এতো চিন্তা হয় সে কথা তো ওদের বলে যেতে পারলাম না। মৃত্যর আগে যদি একটু সময় পেতাম তবে সবাইকে মনের সবটা বলে যেতে যেতাম।
মায়ান, ও মায়ান, মেয়েটার পাশে এমন গা ঘেঁষে বসেছিস কেন? একটু সরে বস বাবা। এত লোক বাসায়, কেউ দেখলে কী বলবে, বল তো! বাবা, আমার বিছানার কাছে একটু বস না। তুই তো তোতা পাখির মতো কত কথা বলতিস! আজ এমন চুপ হয়ে গেলি কেন বাবা? কাছে আয়। তোকে একটু দেখি। আমি তো তোকে আর ধরতে পারবো না। তুই না হয় আমাকে একটু ধর। আমাকে ছাড়া তুই কীভাবে থাকবি, বল? তুই কি কাঁদছিস আমার জন্য? থাক, কাঁদিস না। মা তো আর চিরদিন থাকে না, বাবা। আমি হয়তো একটু আগেই চলে গেলাম। খারাপ লাগছে? আয়, কাছে এসে বস।
আচ্ছা, মেয়েটা কি তোর ক্লাসমেট, নাকি অন্যকিছু? থাক, বলতে হবে না। এখন ওকে সিএনজিতে তুলে দিয়ে আয়। রাত হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি চলে যাক। উফ, কেউ একটু দেখও ফাজিল মেয়েটার কাণ্ড। এক্কেবারে মায়ানের গা ঘেঁষে বসে আছে! কেউ কিছু বলছে না কেন? কী অসভ্য রে বাবা! কেউ কি এই বেয়াদপ মেয়েটাকে একটু বোঝাতেও পারে না- এটা মরা বাড়ি? এখানে এতো রং-ঢং মানায় না। ওগো, শুনছো, আমার প্রেশারটা একটু মেপে দাও, প্লিজ। ওহ্, ভুলেই গেছিলাম- আমি তো মরেই গেছি। কী কপাল! মরে গেলেও সন্তানের জন্য চিন্তা থাকে তাহলে?
আচ্ছা, মায়ানের বাবা কোথায়? মরেও শান্তি নেই দেখছি। তার তো নাওয়া-খাওয়া কিছুই ঠিকমতো করতে মনে থাকে না। এখন আমি নেই। বাপ-ছেলে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াবে। বাহ, খুঁজছি মায়ানের বাবাকে, আর এসে হাজির হাসানের মা। তা কী রান্না করেছো হাসানের মা? আমার ছেলেটাকে তো ঝাল খাইয়ে মারবে। ভেজা মুজা পরিয়ে স্কুলে পাঠাবে। অদ্ভুত তো আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে! মরা মানুষের চোখে জল আসে নাকি! মরা মানুষও কাঁদে তাহলে! আহা, আমার ছেলেটা! হাসানের মা যদি রান্নায় ঝাল বেশি দেয় তবে আমি ভূত হয়ে ওর ঘাড় মটকে দেব- এই বলে রাখলাম… আহা, হাসানের মা, তুমিও দেখি কাঁদতে শুরু করলে- ‘ও মোর খোদা, এহন আমি কী হরমু… ও খালা, আমনে কম্মে গেলেন? মোর পরানডা বাইরাইয়া যাইতেয়াছে।’
কে এলো আর কে গেল কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না। সবাই অন্য রুমে বসে আছে। আরে, আমি তো এখানে; এই বিছানায় মরে পড়ে আছি। এখানে এসে একটু দেখা করে যাও। যাক, শাওন তাহলে এসেছে। ও আমার কলেজকালের বান্ধবী। এই নিয়ে চতুর্থবার বিয়ে করেছে, কিন্তু মেয়েটার কপালই খারাপ। একটা স্বামীও বেশিদিন টেকে না। দেখো তো কাণ্ড!এমন দিনে কেউ কি এমন চড়া মেকআপ দেয়? দেখে মনে হচ্ছে বিয়ে বাড়িতে এসেছে। আরে, তুই তো বান্ধবীকে বিদায় জানাতে এসেছিস।
যাক বাবা, এতক্ষণ পর মায়ানের বাবাকে দেখতে পেলাম। কিন্তু একি! এত বড় বড় দাড়ি-গোঁফ হলো কবে! তবে কি আমার শোকে? তা কী করে সম্ভব? আমি তো আজই মরলাম। আর এর মধ্যেই এত বড় বড় দাড়ি-গোঁফ! হতেও পারে। শোকের মাত্রা বেশি হলে এমন হতেই পারে… আহা, কী হয়েছে হাল! ওগো, শুনছো, তোমার পা এমন টলমল করছে কেন? ও, বুঝেছি। তাই বলে আজকেও? তুমি আর মানুষ হলে না!আমি নেই, এখন তো আরো স্বাধীন। কেউ কিচ্ছুটি বলার নেই। তাই বলে সকল যন্ত্রনা বুকে নিয়ে রাত জেগে কবিতা লিখতে বসে যেও না। তোমার মন খারাপ হলে এখন আর কেউ পাশে বসে থাকবে না। প্রেসারের ওষুধটা মনে করে খেও। আর কষ্ট বেশিক্ষন বুকে পুষে রেখো না। তাহলে আর রাতে ঘুমই হবে না। আর শোন, হাতে সিগারেট রেখে বিছানায় ঘুমাতে চলে যেও না। বিছানা তো জ্বলবেই, নিজেও জ্বলবে। শাওনটা মায়ানের বাবার গায়ে কেমন ঢলে ঢলে পড়ছে। যখন বেঁচে ছিলাম তখন খারাপ লাগেনি কিন্তু এখন লাগছে। তা সান্ত্বনা দিতে এসেছিস, তা-ই দে। এত ঢলাঢলির দরকার কী? আমি নেই বলে তুই কি ভিন্ন কিছু ভাবছিস? না না, তা কী করে হয়? এ আমি কিছুতেই হতে দেব না। আমি থাকতে দেখি তুই কী করে এই কাণ্ড ঘটাস? আরে আমি তো নেই, কাণ্ড একটা ঘটে যেতেই পারে। আমি কী একটু ঈর্শান্বিত? মানুষ মরে গেলেও কি ঈর্শা মনের মধ্যে থেকে যায়? ইচ্ছে হচ্ছে নিজের চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলি। ইচ্ছে হচ্ছে শাওনের গলাটা চেপে ধরি। তুই এটা ভাবলি কী করে! উফ, আমাকে নিয়ে কেউ কবরে শুইয়ে দাও, প্লিজ। আমি আর নিতে পারছি না…
না, আমি এত স্বার্থপরও তো হতে পারি না। কী এমন বয়সই বা হয়েছে মায়ানের বাবার? বিয়ে না করে কীভাবে বাকি জীবনটা পার করবে? ও বিয়ে করতে না চাইলে আমি না হয় ভূত হয়ে এসে ওকে বিয়ের জন্য অনুরোধ করে যাব। আমার কথা তো আর ফেলতে পারবে না। আমার আঁচলের চাবিটা ওর বিছানায় রেখে এসে বলব, নতুন যে আসবে তাকে এটা দিও…আমার কান্না পাচ্ছে আবারও।
হায় হায়! সবাইতো চলে যাচ্ছে। আমার নিজের তো কিছুই রইলো না। দীপনদা, টুটুল দা কতবার বই-এর পান্ডুলিপি চাইলো, দিলাম না। এখন তো সবাই বলবে কবির বউ মরেছে। বইগুলো থাকলে নাহয় বলতো ক,খ,গ বইয়ের প্রতিভাবান লেখিকা মারা গেছেন। তবে এই লেখিনা শব্দ নিয়ে আমার মহা এলার্জি। আরে যে লেখে সে লেখক। তার আবার ছেলে মেয়ে কি? গত সপ্তাহে এ নিয়ে খুব অপমান বোধ করেছিলাম। একটা অনুষ্ঠানে আমাকে মহিলা কোঠায় মঞ্চে ডাকতে চেয়েছিলো। সেদিন বুঝলাম আমার যতটুকু পরিচয় তৈরি হয়েছে তাতে মঞ্চে ডাকার মত যোগ্যতা তৈরি হয় নি আমার। ফলে নারী কোঠা। খুব রাগ হয়েছিলো ।মনে মনে বলেছিলাম, দেখিস, একদিন আমিও…
তা যোগ্যতার প্রমান আর দিতে পারলাম কই! তার আগেইতো মরে গেলাম। ফলে আগামী কাল খবর হবে, ৯০ দশকের এক কবির সহধর্মিনী মরা গেছেন।
এই রে। আমার আলমারিতে তালা মারতে ভুলে গেছিলাম। এখন কি হবে! আমার সব নতুন শাড়ি। এই তো গত মাসে কিনেছিলাম। একটাও পরা হয়নি। ভেবেছিলাম কাল থেকে অফিস করবো শাড়ি পড়ে। তারপর মায়ানের বিয়ে হলে ওর বউকে দেব। তা আর হলো কই!
গত সপ্তাহে নিপাকে একটা হ্যান্ড পেইন্টের শাড়ির অর্ডার দিয়েছিলাম। নিপা, প্লিজ, তুই শাড়িটা আমাকে পাঠাস না। আমি চাই না আমার শাড়িগুলো শাওন পড়ে ঘুরে বেড়াক। দেখ, আমি তো মরে গেছি। ওটা আমার স্মৃতি মনে করে তোর কাছে রেখে দে। কাউকে দিস না। আমাকেও না। প্লিজ প্লিজ প্লিজ। ও যা আবেগি মেয়ে, আমার মৃত্যুর খবর পেলে এখনি হয়তো চলে আসবে।
নিপা চারুকলা থেকে পাস করেছে। চাকরি না করে সংসারটাই করে যাচ্ছিলো। মাঝখান দিয়ে ওর স্বামীটা মারা গেল। একদিন শ্বাসকষ্ট উঠেছিলো। হাসপাতালে নিতেই টেস্টে ধরা পড়ল করোনা। আইসিইউতে ১৫ দিনের মাথায় মারা গেল। ততদিনে জমানো টাকা সব শেষ। তা প্রায় অনেকদিন হয়ে গেছে। তখন আমিই ওকে কিছু টাকা দিয়ে বলেছিলাম, অনলাইনে কিছু একটা কর। এই ১ বছরে ওর ব্যাবসাটা ভালোই জমে উঠেছে। সপ্তাহে তিন দিন অনলাইনে লাইভ করে শাড়ির। শোক কাটিয়ে উঠছে একটু একটু করে। আহা রে মরণ!
ওই দেখ! মায়ানের বাবা কী শুরু করলো! বাসায় এত মুরুব্বি এর মধ্যেই একটার পর একটা সিগারেট টেনে যাচ্ছে। হাসানের মা’টা-ই বা কোথায়? কেউ একটু মায়ানের বাবাকে থামাও। খালি পেটে শরীরে এত সইবে না। আমার আর ভালো লাগছে না। ক্লান্ত লাগছে … আমি এখন ঘুমাবো… মরা মানুষেরও ঘুমের দরকার হয়।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম, কে জানে! চারপাশে এত বরফ কেন! আমি তো ঠান্ডায় জমে যাবো। ওহ্! আমাকে জমানোর জন্যেই তো এত আয়োজন। বুঝেছি, আজ রাতটা আমাকে এখানেই পার করতে হবে। কাল হয়তো কবর হবে। তার মানে, কবর না হওয়া পর্যন্ত আমি সবকিছু টের পাব।সবাই গেল কোথায়? ওরাও বুঝি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। বাইরে বেশ ঝড় হচ্ছে। কেউ একজন বেল বাজাচ্ছে। সবার কি কানে তালা নাকি? এত জোরে বেল বাজছে অথচ খুলে দিচ্ছে না কেন কেউ? নিশ্চয়ই আমাকে দেখতে এসেছে।আহা, বাইরে ভিজে যাবে যে… কেউ একজন আসছে। হাঁটার শব্দ পাচ্ছি, ও দরজাতো খোলাই আছে। আমি কদমের ঘ্রাণ পাচ্ছি!
-কে তুমি? ওমা, এত কদম! পেলে কোথায়? আমার জন্যে এনেছো?
-হুম, তোমার জন্যে। কিনিনি। গাছ থেকে পেড়ে এনেছি।
-তুমি কি মায়ানের বন্ধু? নাকি মায়ানের বাবার?
– তোমার বন্ধু।
– তু-মি… তুমি কি বাদল? কথা বলছো না কেন?
-হুম।আমি বাদল।
– এতো দিন পর আমার কথা মনে পড়লো?কই ছিলা, কেমন ছিলা, আমাকে খুঁজোনাই কেন? আমি তো ভেবেছিলাম, তুমি সেদিন মরেই গেছ!অথচ তুমি এমন দিনে এলে, যখন আমি আর বেঁচে নেই।
– শুধু কি আমিই মরে গেছি?তুমিও তো আর বেঁচে নেই।
-এটা কী করে সম্ভব? আমি কি তাহলে মরে গিয়ে ঘুমিয়ে গেছি! আর সেই ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে তোমাকে দেখছি?
-মনে করো তাই।
– কি বলো! আমার তো অনেক বয়স হয়েছে, চুল পেকেছে আর তুমি কী করে সেই ১৮তেই আটকে আছো ধুর ছাই, মরেও দেখছি শান্তি নেই।
-এমন বোকার মতো কথা বলছো কেন লোপা? তুমি তো আমাকে শেষবার এইটুকুনই দেখেছিলে। তারপর আর দেখা হয়নি। আমি সেই ১৮তেই আটকে আছি তোমার জন্য।
-বাদল!তুমি সত্য -ই এসেছো?
-এসেছি
– আমার খুব মনে আছে।এরকম একটা ঝড়ের দিনে তুমি কত কষ্ট করে ভিজতে ভিজতে আমার জন্য অনেক কদম ফুল নিয়ে এসেছিলে। পেছনের বারান্দায় লুকিয়ে ফুল হাতে আমরা দেখা করেছিলাম। ওই প্রথম কেউ একজন ফুল নিয়ে এসেছিলো আমার জন্য! প্রথম কদম ফুল। সেদিন আমি মনে হয় আনন্দে মারা যেতে বসেছিলাম! কিন্তু মুহূর্তেই সব ধুলায় মিশে গেল। কখন যে আব্বা এসে আমাদের পেছনে দাঁড়ালেন, টেরই পাইনি।
-লোপা?
-বলো,শুনছি।
-এখনো কদম পেলে তেমন খুশি হও? খুশিতে হাসতে হাসতে সেদিনের মতো গলার ওড়না মাটিতে লুটিয়ে পড়ে?
-আশ্চর্য, মরে গিয়েও মানুষ এমন রোমান্টিক থাকে!
-কেন থাকবে না? আমি যে সত্যি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। –
-থাক, বাদ দাও।শোনো, আজকাল আর ওড়না পরি না। বয়স হয়েছে। কেউ আর আমার দিকে অমন করে তাকায় না এখন, বুঝলে?
কী যে বলো! তুমি এখনও আগের মতই সুন্দর…
-তোমার কথা শুনে আমারতো মরার পরেও আনন্দে আবার মরতে ইচ্ছে করছে! জানো আমাকে আর কেউ এভাবে বলে না।
-এখনো আগের মতো ঢেলা ঢেলা কাজল দাও চোখে? শাড়ি পড়ো আলুথালু ভাবে?
-মাঝে মধ্যে। মায়ান পছন্দ করে। মায়ান আমার ছেলে। তোমার মতোই বড় হয়ে গেছে। মায়ানও তোমার মত ফুল খুব পছন্দ করে। তবে আমার বাসায় ফুল প্রেবেশ নিষেধ। বিশেষ করে কদম। কদম ফুলের গন্ধ আমি আর নিতে পারি না।
-লোপা
-বলো
-তোমার সাথে আমার বিয়ে হলে মায়ানতো আমাকেই বাবা বলে ডাকতো, তাই না?
-চুপ করো। এখন আর এসব কথার কোনো মানে হয় না।
-তোমার সাথে যেদিন আমার শেষ দেখা, সেই দিনটার কথা মনে আছে? আমরা স্কুল ফাঁকি দিয়ে বরফকল পার হয়ে ফুলের সেই গ্রামটার কাছে চলে গিয়েছিলাম। ওইখানে নদীর একটা ঘাট ছিলো। সেই ঘাটপাড়ে দাঁড়িয়ে দূরে আসমান ছুঁই ছুঁই একটা কদমগাছের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আমরা। তুমি অবাক হয়ে বলছিলে, ইস্, ওই গাছের ফুলগুলো যদি নিতে পারতাম! আমি বললাম, এনে দেবো? তুমি না করলে। আমি শুনলাম না। ঝাঁপ দিলাম ভরা নদীতে। ভেবেছিলাম, নদীটা পাড়ি দিতে পারব।পারলাম না…
-চুপ করো, চুপ করো। এতদিন তো সেদিনের কথা ভুলেই ছিলাম, ভালোই ছিলাম। কেন মনে করিয়ে দিলে? দেখ, আজ মরে গিয়েও তোমার জন্যে কষ্ট পাচ্ছি। আমি কেন সেদিন তোমাকে আটকাতে পারলাম না? কেন?
-আজ ভুলে যাও ওসব কথা। মনে করো, আমরা ফিরে গেছি সেই দিনটিতে, যখন তুমি ১৬ বছরের বালিকাটি আর আমি ১৮। সেদিন মন ভরে তোমাকে আমার ভালোবাসার কথা বলতে পারিনি। ভেবেছিলাম নদী সাঁতরে ফিরে তোমার হাতে কদম দিয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরবো। তোমাকে ভালোবাসবো। আমিতো কোনদিন কাউকে চুমু দেইনি। সেদিন বেঁচে থাকলে ঠিক দিতাম।
-চুপ করো। আমার কান্না পাচ্ছে। মায়ানের বাবা জানতে পারলে খুব কষ্ট পাবে।
– তুমি-আমি; আমরা কেউই তো আর বেঁচে নেই। মানুষ একবার মরে গেলে,তার স্বপ্নটাও কি মরে যায়? যখন বেঁচে ছিলে তখন, আমাকে দেখতে ইচ্ছে হয়নি কোনদিন?
-জানি না। তুমি আর এসব বলো না প্লিজ। মায়ান, মায়ানের বাবা জানলে খুব কষ্ট পাবে।
-আমাদের শরীর আর বেঁচে নেই। তার মানে আমরা মৃত। মরা মানুষের মনের কি দাম বলো? আজ তোমাকে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরলে কারো কিচ্ছু আসে যায় না। নদী সাঁতরে আজ সেই গাছ থেকে কদম নিয়ে এসেছি। আমাকে ফিরিয়ে দিওনা…
– বাদল, শুনতে পাচ্ছ কে যেন আমাকে ডাকছে!
-লোপা, এই লোপা? আরে ওঠো, রাত ১২টা বাজে। দেখ সবাই এসেছে । জন্মদিনে তোমাকে শুভেচ্ছা জানাতে। আরে ওঠো।
– আমি ধড়াস করে উঠে বসলাম। আমি বেঁচে আছি!বাদল তাহলে স্বপ্নেই এসেছিলো!
– তোমার বিছানায় কদম ফুলের ঘ্রাণ পাচ্ছি। এই শীতে তোমার জন্য কদম কে ফোটালো?
– কি বলছো মায়ানের বাবা!
– কেন তুমি পাচ্ছ না?
– আমি! হু…ম আমিও পাচ্ছি! কদমের তীব্র ঘ্রাণ…
………………………………………………………।।





কমেন্ট করুনঃ