কাজল কানন
আমাদের ঘরে বাঁশের বেড়া ও খুঁটি ছিলো। বাবা-মা দুজনই তাম্বুল চিবাইতেন। প্রায়ই তাদের আঙুলে চুন লেগে থাকতো। এই চুন মোছার জন্য আলাদা কোনো রুমাল বা কাপড়ের ত্যানা ব্যবহার করতেন না। যত্রতত্র কিংবা বাঁশের বেড়া-খুঁটিতে চুন মুছতেন। এটি শুধু আমাদের ঘরেই না, প্রতিবেশিদের ঘরেও দেখেছি। আমার নানীও ব্যাপক তাম্বুল চিবাইতেন। একবার নানীদের একটি ঘর ভেঙে নতুন করে তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলো। আমার বলার বিষয় হচ্ছে, ওই ঘরের দরজার পাশের খুঁটিটি। সেখানে আমি একটা ঘোড়ার মুখ দেখতে পেতাম। আঙুলে লেগে থাকা চুন মুছতে মুছতে নানামুখি দাগে এই ঘোড়ার মুখাবয়ব তৈরি হয়েছিলো। তখন সেই খুঁটি উপড়ে ফেললে আমার মনোবেদনা সৃষ্টি হয়। যতটা মনে পড়ে আমি কান্নাকাটি করেছিলাম। বাড়ির বড়রা পাত্তা দেননি। এটি তাদের কাছে পাত্তা পাওয়ার মতো বিষয় ছিলো না। বরং আমার মামা কোথা থেকে যেনো আমাকে একটি মাটির তৈরি ঘোড়া এনে দিয়েছিলেন। সেটি পেয়ে কান্না থামলো আমার।
এই যে আঙুলের চুন মোছার দাগে দাগে ঘোড়া হয়ে গেলো, এটি কিন্তু নানীর একার কাজ ছিলো না। বাড়িতে আরও যারা তাম্বুল চিবাইতেন সবাই এর নির্মাতা। তারা না চাইলেও প্রতিটি দাগ সংঘবদ্ধ হয়ে একটা ঘোড়ার মুখ বানিয়ে ফেলল! সেসময় এসব ভাবতে না পারলেও এখন মাথায় আসেÑ কোনো দাগ বা রেখাই অনর্থক নয়। দাগে দাগে কথা হয়, সম্বন্ধ হয়, হয় সংঘও। এখনও যখন কোনো পানদোকানের বেড়ায় চুনের দাগ দেখা যায়, সেগুলোও বিচিত্র ধরনের। মনে হয় প্রতিটি দাগ বা রেখা যেনো আঁকিয়ের মানোভুবন বর্ণনা করছে। লোকটি চুন মোছার সময় কী ধরনের মানসিক ঘুরপ্যাঁচের মধ্যে ছিলেন, তার স্থিরতা-অস্থিরতা কেমন ছিলো এর একটা নমুনা আন্দাজ করা যেতে পারে আঙুলের চুন মোছার দাগ থেকেও।
বড়দের আনমনা দাগাদাগি কিংবা শিশুদের দাগাদাগিতেও মনের ভাব হাজির হতে পারে। শুধু যুতমতো রঙতুলি নিয়ে বসলেই কিছু একটা হবে, এমন নয়। মানবকল্পনা এক বিচিত্র ছায়া-আবছায়া মেশানো। অনেক সময় অনেকে লেখায় বসে কিংবা অন্যকোনো কাজে থেকেও হাতিয়ার দিয়ে দাগাদাগি করেন। আমাদের বড় কোনো লেখকের দাগাদাগি কাটাকাটি থেকে কিন্তু ছবিও পাওয়া গেছে। সেই ছবি নিয়ে অনেক কথা আছে মানুষের মধ্যে। তাই দাগাদাগি কোনো কথা প্রকাশ করে না- এমনটি সব সময় নাও হতে পারে।
বাংলাদেশের চিত্র শিল্পীরা মূর্ত, বিমূর্ত যত দাগাদাগি করেছেন, তার একটা আত্মভাষ্য নিশ্চয়ই রয়েছে। কিছু একটা প্রকাশ পাচ্ছে। এতে কেউ কিছু একটায় যুক্ত হচ্ছেন, কেউ পারছেন না। এখন কথা হচ্ছে কে কোন পরিণতিতে বিরাজমান থেকে কাজটি করেছেন, তার মনে কোন ভর কাজ করেছে- সেই চিন্তাভাষ্যই সেখানে মূর্ত হতে পারে। এই কথাগুলো বলেই আমি চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের (১০. ০৮-১৯২৩-১০.১০.১৯৯৪) পিছু নিতে চাই।
এসএম সুলতান রাজমিস্ত্রীর পুত্র ছিলেন, ধনী লোকের কল্যাণে ছবি আঁকার বিদ্যালয়ে পড়েছেন বা পড়া শেষ করেননি, উপমহাদেশ, ইউরোপ-আমেরিকায় ঘুরেছেন; বড় বড় শিল্পী পিকাসো-দালির সঙ্গে তার কর্ম দর্শিত হয়েছে, সুলতান নাটকীয় জীবনের ভারবাহী ছিলেন- ইত্যাদি বিষয় নানাভাবে আমরা জেনেছি। সেগুলোকে ফের বয়ানে আনা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। এমনকি সুলতানের চিত্রকর্ম নিয়ে একটা তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়ার যোগ্যতাও এই লেখকের নাই। এই কাজটি অনেক গুণীজন করেছেন এবং করবেন। এই রচনায় সুলতানের বিশদ চিন্তাদর্শন ঠাওর করতে পারার কৃতিত্বও দাবি করা হচ্ছে না। কেবল এক সাধারণলোকমনের ব্যক্তিগত একটি আন্দাজ, প্রতিক্রিয়া হিসেবে হাজির করাই লক্ষ্য।
সুলতান চাষাদের ছবি এঁকেছেন। বাংলাদেশের শিশুরা সুলতানের ছবি না দেখে, বা কোনো চাষা না-দেখেও শত শত চাষার ছবি আঁকে, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ছবি এঁকে অনেক পুরস্কার, প্রশংসা অর্জন করেন ছোটরা-বড়রা। চাষার দেশের মানুষ চাষাদের ছবি আঁকবে এটিইতো স্বাভাবিক। চাষা আর গ্রামের ছবি এঁকে খাতা ভরে ফেলা এমন অনেক শিশু আছে, যে কখনো গ্রাম কিংবা চাষা কোনোটাই সামনাসামনি দেখে নাই। তারপরও মনোরম মনোহর ছবি হয়ে যাচ্ছে!
সুলতান যেটা করেছেন, সেটা হচ্ছে আরেকটা কারবার। আরেক কিসিম। আরেক কাণ্ড। সারা দুনিয়া দেখে এসে ‘তুলনামূলক কম অগ্রসর’ বাংলাদেশের মর্মমূল দাগাতে চেয়েছেন। এই চেষ্টা করতে করতেই তুলি রেখে দুনিয়া ছেড়েছেন। যে সময়টা সুলতান সক্রিয় ছিলেন, সে সময়টা পশ্চিমে শুধু হেলেই ছিলো না, একেবারে শুয়ে পড়েছিলো। পশ্চিমা শিল্প-সাহিত্যই শুধু নয় সমগ্র ভাবসম্পদই সর্বেশ্বর হয়ে উঠেছিলো। যার কাছে বাকি দুনিয়া ছিলো কেবল গ্রাহকযন্ত্র। বিশেষ করে ভারতবর্ষে পশ্চিমা জ্ঞান-বিজ্ঞানের তোহম তখন তুঙ্গে। যেটাকে এক কথায় বলা যায় উপনিবেশিক ভাববয়ানে একসার সবকিছু। এমন একটি বাস্তবতায় এসএম সুলতান পাল্টা নাচন শুরু করলেন। তিনি আকাশছোঁয়া দৃষ্টি নিয়ে মাটি দেখতে শুরু করলেন। অর্থাৎ বিশ্ব দেখলেন বটে, সেটা তাকে প্রবলভাবে স্থানিক হতেই উৎসাহ দিলো। তিনি বিষয় আঙ্গিক আর খোয়াব একসঙ্গে এই জনপদে রোয়া শুরু করলেন। একইসঙ্গে ‘প্রকৃতিকে জয়’ করার ঘোষণা দিয়ে যে ‘আধুনিক’ কলহের সৃষ্টি, তিনি বীরদর্পে তার থেকে সরে দাঁড়ালেন। তার কাছে বাংলাদেশ ধরা দিলো এক অভিনব বিশ্ব হিসেবে যেখানে উপনিবেশিক জারিজুরির পাত্তা নাই। বরং স্থানিক বৈচিত্র্যকেই বিশ্বভাব হিসেবে ধরতে চাইলেন। তাই বলা যায়, তিনি কেবল বাংলাদেশের চিত্রই আঁকেননি, সারা বিশ্বের জন্য একটি নতুন বার্তা দিতে থাকলেন। সেটি হচ্ছে প্রতিটি কোণা বা অঞ্চল মিলেমিশে একটি বিশ্ব হতে পারে। কোনো একটি কেন্দ্র বা অঞ্চলের নমুনাকে বিশ্বভাষ্য হিসেবে জারি করার দিন শেষ। যেখানে শুধু মানুষ নয়, মহাপ্রাণ, সর্বপ্রাণ বা প্রাণপ্রকৃতি একটি অনিবার্য ভাষ্য হিসেবে হাজির। তিনি ব্যক্তিজীবনেও প্রকৃতির কাছেই সমর্পিত মানুষ। তার জীবনসংসার ঘুটা দিলে এমন আওয়াজই পাওয়া যায়। বিশেষ করে মানুষকে কেন্দ্রে রেখে বাকি প্রাণপ্রকৃতিকে তার অঙ্গসজ্জা হিসেবে দেখার কুপ্রস্তাব থেকে ক্রমেই সরে আসতে থাকলেন এসএম সুলতান।
আধুনিকতার সিলসিলায় মানুষের যে একক মহানুভবতা তাফালিং করে আসছিলো সুলতান তার গতিপথে পাল্টা প্রাণপ্রকৃতির তরঙ্গ তুলে দিলেন। এটি আমাদের জাতিগতভাবে শুধু নয়, গোটা বিশ্বের জন্য জরুরি চিন্তাপরিসর। সুলতান প্রকৃতি ও প্রকৃতিঘনিষ্ট মানুষের ছবি এঁকেই খামতি দেননি। এই দর্শন তার জীবনধারাকে ব্যক্ত করেছে। তিনি এর বাইরে দুইইঞ্চিও সরে যাননি। ভোগবাদের চরম বিকলাঙ্গপ্রসব তার দেখার বাইরে ছিলো না। ভোগবাদী চাকচিক্য থেকে যে অন্তর সরে গেছে, এটি এই শিল্পী টের পেয়েছেন উপযুক্ত সময়ে। ফলে ভোগবাদী দুনিয়ার সব জারিজুরি থেকে নিজেকে মুক্ত করে প্রাণপ্রকৃতির গুচ্ছে পুঁতে ফেলেছেন দূরদর্শন বয়ানের এই বয়াতি।
ভারতশিল্পের উপনিবেশায়ন ও সুলতানের বিউনিবেশায়ন ভাবনা গ্রন্থে লেখক সৈয়দ নিজার লিখেছেন- তিনি শুধু চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, তার স্বতন্ত্র দর্শন, রাজনীতি, সমাজ ও নন্দনভাবনা ছিল, যা একই সাথে দেশজ ও সময়ের চেয়ে অগ্রগামী এবং জীবন-যাপনের ‘সহজিয়া’দের ‘সহজ’ হয়ে ওঠার অক্লান্ত প্রচেষ্টার স্মারক। তার চিন্তার ছাপ পড়তে পারতো আমাদের ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ ও দর্শনচিন্তাসহ জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে। কিন্তু তার চিন্তা জ্ঞানের অন্যান্য শাখা তো দূরের কথা, পরবর্তীকালে বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় কোনো ধারাক্রমই সৃষ্টি করতে পারেনি। কখনো কখনো সুলতানের কাজ অনেক শিল্প-সমালোচকদের কাছে অবোধগম্য ছিল বলে তা অবমূল্যায়িত হয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে প্রদর্শিত সুলতানের শিল্পকর্মের অন্যতম বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘আত্মসত্তা’। …….. তিনি তার চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন দেশজ নন্দনতত্ত্ব ও শিল্পকলার রূপ। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্পকলা উপনিবেশের উত্তারাধিকার। আমাদের সমকালীন নন্দনভাবনা ও শিল্পচর্চা গভীরভাবে পাশ্চাত্যের আধুনিক শিল্পকলা দ্বারা প্রভাবিত। এদেশের শিল্পচর্চার ইতিহাস ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই সুলতানের কর্মে দেশজ শিল্পের যে রূপ ধরা পড়েছে তা এ দেশের শিল্পরসিক ও শিল্পীদের অনেকেই উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সে কারণে সুলতানের কোনো উত্তরসূরি নেই। নেই কোনো ধারা। কিন্তু তার শিল্পকর্মে বিউপনিবেশনের পদ্ধতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা শুধু শিল্পের বিউপনিবেশায়ন প্রস্তাবই নয় বরং জ্ঞানের যে কোনো ধারার বিউপনিবেশায়নের পদ্ধতি হিসেবেও বিবেচ্য হতে পারে।
এমন নয়, আধুনিকতা নামে যা বোঝানো হয় সুলতান তার বিপরীত কাজটি করেছেন। অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে পেছনে ফিরে যেতে চেয়েছেন। ঠিক যেখানে উপনিবেশিক ছেদন-কর্তন হয়েছে, তিনি সেখানে মনোযোগ স্থাপন করেছেন। উপনিবেশিক ছেদন-কর্তনের ফলে যে ‘রীতিবিদ্যা’ আজ পর্যন্ত জারি রয়েছে, সেখানে সুলতান নারাজি দিয়েছেন। তিনি কইতে চান- পেছনে যাওয়া নয়, ওই ছেদনমুখ থেকেই গিট্টুটা দিতে হইবে। কারণ আমাদের কলাকে আমাদের মতোই পাকাইতে হইবে। বাইরের তাপে-চাপে নয়, ভেতরগত চিত্তাচার দিয়ে। উপনিবেশিক ভাবকর্ম এদেশের শিল্প-চিন্তা-কর্মকে নতস্বীকারের প্রকল্পে পরিণত করেছে। উন্নতের কাছে নত। উন্নত কে? পশ্চিম। নত কে? প্রাচ্য। এ প্রবণতায় নববৈশিষ্ট্যের নামে চিন্তার প্রকার ও প্রকরণে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বাজে জিনিস। এতে দেশীয় বৈশিষ্ট্যকে অবেহেলা করাটা অনেক শিল্পী ও ভাবুকের কাছে সাধানার বিষয় হয়ে উঠেছে। যে কারণে সুলতানের চর্চিত দর্শনের ধারাবাহিকতা টেনে রাখার চেষ্টা দেশের শিল্পে মূলধারায় নেই।
শিল্পী এসএম সুলতান দাগাদাগির সর্ব অঙ্গে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য খাড়া করিয়েছেন। এটি করতে গিয়ে তিনি প্রচলিত সব মত-পথকে চ্যালেঞ্জ করে, পাল্টা মত-পথ জারি করেছেন। তার ছবিতে যে গ্রাম আমরা দেখি, সেটি প্রাণপ্রকৃতির ভেতর থেকে দেখা, বাইরে থেকে নয়। সবুজ রঙ ছড়িয়ে এই দেশের প্রকৃতিকে কেবল কোমলবাসনার পরিসর হিসেবে তিনি দেখেননি। তার গ্রামপ্রকৃতি ভেতর থেকে পুঁজের মতো টিপে টিপে বের করে দৃশ্যমান করা। বাইরে সবুজের বয়নঢঙয়ের খোসা ছাড়িয়ে ভেতরে গেলে শ্রমজীবি মানুষের আর শস্যভাণ্ডারের যে সংজ্ঞা ভেসে ওঠে, সুলতান সেটি খোলসা করতে চেয়েছেন। ফলে সুলতানের প্রকৃতিতে রঙের বয়ান অন্যের সঙ্গে মেলে না। এই রঙ শ্রম এবং প্রকৃতির ঘর্ষণ ও সঙ্গমের মুখমণ্ডল। এটি চেহারায় যেমন ভিন্ন, ভাবেও উত্তীর্ণ। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনব্যবস্থায় যে ভাবের স্ফূরণ করেছে, এটিই এখানকার নন্দন বা শিল্পবৈশিষ্ট্য। ফলে এই জীবন ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে কিছু বুঝতে চাইলে এখানে জটলা তৈরি হয়।
বিশ্বসভ্যতা বা মানবসভ্যতা যাই বলা হোক, সুলতান সেখানে পরিতৃপ্ত নন। তিনি উন্নয়নের দাবিদার বহু জনপদ ঘুরে এসে এই ভাবপরিসর আমল করেছেন নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে বসে। তার শিল্পকর্ম নিয়ে অনেকের ভিন্ন মত রয়েছে, থাকতেই পারে। কারণ দুনিয়াটাই মতের জারিজুরি। মত-মগজের শাসন, মিলিটারি খবরদারির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অস্ত্র দিয়ে যে কাজ হয়, মন্ত্র দিয়ে তার চেয়ে অনেক গভীর, ক্ষত সৃষ্টিকারী ও টেকসই প্রভাব খাটানো যায়। সুতরাং অস্ত্রের আধিপত্যের চেয়ে, মন্ত্র বা ভাবের আধ্যিপত্য অনেক কার্যকর। শিল্পী সুলতান এর মর্মমূল ভালোভাবেই মনস্থ করেছেন বলে ধারণা হয়। এই কারণেই তিনি আমাদের চিত্রকলায় বা চিন্তায় একটি প্রবল হাওয়া মারতে পেরেছেন, এমনটাই কইতে চাই।
অনেকে সুলতানের শিল্প কর্মকে আধুনিক নয়, এমন মন্তব্যও করেন। আমি মনে করি তারা ঠিক জায়গায় চাকু ফেলেছেন। সুলতান ‘আধুনিক’ ছবি না আঁকার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করেছেন বলেই ধারণা করি। যেসব কলকব্জা নিয়ে পশ্চিমা ‘আধুনিক’ প্রকল্প সূচিবদ্ধ হয়েছে, এই শিল্পী তার আছড় ছাড়ানোর জন্য জীবনভর মতে-পথে লেগে ছিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠিত মত পথের কোনোটাই গোনেননি। সুলতান ছবি আঁকাই একমাত্র কাজ হিসেবে নির্বাচন করে চিন্তার খামতি দেননি। নিজের জীবনের একটি প্রাণপ্রকৃতিঘনিষ্ঠ পরিসরও গড়ে গেছেন। সুতরাং কাঁটাবন থেকে পাখি, কবুতর, কুত্তা কিনে খাঁচায় পোষা মানুষ, সুলতানের মাছিমদিয়ার প্রাণপ্রকৃতিসঙ্গ বুঝে ওঠার সক্ষমতা রাখেবন কিনা এটি এক কথায় বলে দেয়া যাবে না। এখানেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যেতে পারে, সুলতান আধুনিক হতে চেয়েছেন কিনা। আবার এটাও নয়, সুলতান আগের কারো মতো করে তার শিল্পভাষ্য খাড়া করেছেন। এখানে তিনি তার মতোই। প্রচলিত প্রতিষ্ঠানেও তার বক্রনয়ন জারি ছিলো। তিনি নিজের মতো করে প্রতিষ্ঠান গড়ারও চেষ্টা করেছেন। এতে শিশু থেকে পরিণত কেউ বাদ যায়নি। সবকিছুতেই একটি বিকল্প-সাধারণ হয়ে ওঠার গল্প তার জীবন।
সুলতান ফোলা পেশির মানুষ এঁকেছেন। জিম করে পেশি ফোলানো মানুষ কিন্তু আঁকেননি। এখানে একটা দেহমনের রসায়নে ভেদাভেদ রয়েছে। প্রাণপ্রকৃতির ভেতরগত সবল প্রকাশ খুব দরকারি একটা জিনিস। সুলতানের আঁকা প্রাণপ্রকৃতি দেখলে কিন্তু এমনটাই মালুম হয়। সংকোচহীন ভাব যেনো নিয়ত স্ফারিত হচ্ছে। আশপাশের অনুষঙ্গ নিয়ে একটা ক্যানভাস আস্ত ভাবের জলসা হয়ে ওঠে। সুলতান এই জনপদের মূলমর্ম ধরে কাফেলা সচল রেখেছেন। আসলে এই দেশের মানুষ কী দিয়ে গড়া, তার একটা চাওয়া রয়েছে, সে চাওয়াটা কী? এমন প্রশ্ন এই শিল্পীর ভাবভুবনকে নাচিয়েছে। সুলতান গ্রাম নিয়ে, কৃষি নিয়ে কাজ করেছেন বলেই হাততালি দেবো, এমনটি মনে করি না। এখানে তার কর্মদর্শন, বা ভাবনাপ্রণালিই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কীভাবে এদেশের মূলর্মম নিয়ে তার খেয়াবনামা হাজির করেছেন, সেটি, আমাদের পরখ করার বিষয়। এই জনপদের কৃষিসংস্কৃতির স্বত:স্ফূর্ত উত্থানই সুলতানের মৌলিক মহড়া।
উপনিবেশিক ভাবধারা ও তার আধিপত্য, আমাদের নানা ক্ষেত্রে চোখ ঝাপসা করেছে। এই ঝাপসা চোখ দিয়ে দুনিয়া দেখার ফলে আত্মবিনাশী গৌরব চিন্তা-চেতনায় খাবলা বসিয়েছে। নিজেদের যা কিছু, তার প্রতি মননে বিবমিষা তৈরি হয়েছে। একটা ঘোরতর অভিযান ব্যতিত এর থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। এখানেই শিল্পী সুলতান আমাদের ভরসার জায়গা। তিনি ছবি আঁকার উপকরণ রঙ থেকে শুরু করে সবকিছুর মধ্যে একটা পাল্টাভঙ্গি জারি করেছেন। এর ফলে আঁকিয়ে সুলতান আর ভাবুক সুলতান আমাদের কাছে একই মোকদ্দমা।
পুঁজিবাদ সব কিছুকে পণ্য বিবেচনা করে। শিল্পও তার বাইরে নেই। গায়ক যখন গান করেন, তার সৃজনশীল ভাবব্যবচ্ছেদ কিংবা সুরতরঙ্গ পুঁজিবাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। গান ও শিল্পীর পণ্যমূল্য দেখাটাই এখানে মুখ্য। আরও একটি মামলা হচ্ছে, প্রচলিত ব্যবস্থায় এটি কোনো ঝুঁকি তৈরি করছে কিনা সেটিও তার কাছে প্রাধান গণ্য। অন্যকোনো শিল্পমূল্যের বিষয়টিও এখানে একই রকম। সুলতানের ছবিও অনেক টাকা দামে বিকানো যায়, তবে সেটি কী কারণে বিকায়? এর মধ্যে প্রধানভাবে কাজ করে একই জিনিস, সেটি হচ্ছে সুলতান কতটা দামি শিল্পী, ইউরোপ আমেরিকায় তার নাম-ধাম আছে কিনা। প্রচলিত বুদ্ধিবৃত্তিতে এর মূল্যমান কীভাবে ধার্য রয়েছে, তার আলোকে। এক্ষেত্রেও শিল্পী সুলতান বেপরোয়া। তিনি খেয়ালখুশি মতো দাগাদাগি করেছেন, যত্রতত্র বিলিয়েছেন। ছবি সংরক্ষণ করতে হবে, বেশি মূল্যে বিক্রি করতে হবে, বড় করে প্রদর্শনী করতে হবে, এসবে তার শূন্য-আগ্রহ।
শিল্পীকে একবার সরাসরি দেখার ভাগ্য আমার হয়েছে। ১৯৯৪ সালে নারায়ণগঞ্জের সংগঠন শ্রুতি তাকে এখানে এনে সংবর্ধনা দিয়েছিলো। তখনই তাকে চাক্ষুস করি। কোনো কথা বলার সুযোগ হয়নি। তবে এ অনুষ্ঠানের রেষ ধরে আমি শ্রুতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। সেখানে আমার অনেক বন্ধু, সহযাত্রী ছিলেন- যারা সুলতানের সঙ্গে কথা বলেছেন, এমনকি তার জন্মদিনে দলবল নিয়ে নড়াইলে মাছিমদিয়া গিয়েছেন। তাদের কাছ থেকে সুলতান সম্পর্কে নানান বিষয় শুনেছি। যেসব কথা সাধারণত সুলতানকে নিয়ে লেখা বইপুস্Íকে পাওয়া যায় না। এছাড়া শ্রুতিতে এসে তিনি বক্তৃতা করেছেন, সেখানেও নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। শ্রুতিতে একটা সময় সুলতানচর্চা একটি নিয়মিত বিষয় ছিলো। সেই সূত্রে কিছু কিছু বিষয় ঠাওর হয়েছে। এমনও জানা গেছে, দরিদ্র কোনো লোক এসে সুলতানকে বলেছেন, টাকার অভাবে তার মেয়ে বিয়ে দিতে পারছেন না। শিল্পী তাকে একটি ছবি এঁকে দিয়ে বলেছেন, এটি বিক্রি করে দেখুন কিছু টাকা পাওয়া যায় কিনা। এমন নানা ধরনের কথাবার্তা আছে এই শিল্পীর জীবন ঘিরে।
এসএম সুলতান প্রাণপ্রকৃতির শিল্পী। এটিই মুখ্য বিষয় হিসেবে ঠাওর হয়। আর আজকের দুনিয়ায় এটিই নবতর প্রবাহ হতে পারে। এই কথা বলার জন্যই উপরের আলোচনায় মশগুল হওয়া। সুলতানের সমসামিয়ক বা তাঁর কিছুটা আগে-পরের চিত্রকলার যে বহর আমরা দেখে আসছি, এরপর সুলতানের দাগাদাগি দেখলে আমাদের চোখ কিছুটা খচখচ করবে। সুলতানের শিল্পভাষ্যে এসবের তেয়াক্কা করার টাইম নাই।
উপনিবেশিক মানদণ্ডে ইউরোপীয় চিত্রকে আর্ট এবং ভারতীয় ক্রাফট চিহ্নিত করে প্রথমটিকে আধুনিক, অপরটিকে অনাধুনিক বলা হলো। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের তৈরি করা শিল্প ক্রাফট বা কারু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। গণমানুষের কাছ থেকে, তাদের চিন্তা, কল্পানার পালক থেকে চিত্রকলাকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। তাদের সৌন্দর্যচেতানা অস্বীকার করা এবং কেড়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে যে নিষ্প্রাণ শিল্পের আধিপত্য জারি করা হয়েছে, সুলতানের শিল্পভাষ্য সেখানে প্রতিরোধী প্রতিষেধক। পশ্চিমা বিশ্লেষকরা মনে করেন ভারতীয় স্থাপত্য এবং ভাস্কর্য শিল্প নয় বরং প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শশন মাত্র। তাই এ ধরনের উপনিবেশিক ঝাপসা চোখে ‘কাঁটা বাছতে’ গেলে পরিণতি কী হতে পারে, সেটি অজানা থাকার কথা নয়।
আগস্ট ২০২৪
নারায়ণগঞ্জ





কমেন্ট করুনঃ