সামছুল আলম আজাদ
শিল্প মূলত আর্কাইভ, মানুষের ইতিহাস। সমাজ দর্শন, লালনের ভাষায় এক ‘আয়না মহল’। মানুষের যা কিছু সঞ্চয়, দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ- বেদনা, ক্ষোভ যার কোন রঙ নেই, রূপ নেই এবং শিল্প ছাড়া তার আর কোন স্থায়ী আশ্রয় নেই। এই প্রদর্শনীর চিত্র, ভাষ্কর্য ও স্থাপনা শিল্পে এইসব অনুভূতিই আশ্রয় পেয়েছে।
দাগ আর্ট স্টেশন তাদের চতুর্থ বর্ষপুর্তি উপলক্ষে ১৯ -২৬ আগস্ট ২০২২ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার গ্যালারিতে ‘লক্ষ্যাপাড়ের চিত্রকথা-১’ শিরোনামে নারায়ণগঞ্জে বসবাসরত শিল্পীদের অংশগ্রহণে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। প্রদর্শনীর শিল্পীরা সকলেই এই সংগঠনের সদস্য।
এ নগর শিল্প কারখানার, আবার শিল্প সাহিত্যের। নগরের সবকিছু হাত ধরে চলে। তেমনি পাশাপাশি চলে বিত্ত-বৈভব ও দারিদ্র- বৈষম্য, এ দৃশ্য সারা বিশ্বের প্রতিকী বর্ণনা।
প্রদর্শনী কক্ষে প্রবেশের পথে ‘জগদ্দল’ নামে একটি বিরাট আকৃতির (পাথর রূপি) ভাস্কর্য, মাথার উপর ঝুলছে। শহীদ আহমেদ মিঠুর এই কাজটি শুরুতেই দর্শকদের সচেতন করে তোলে ভিতরের কাজ সম্পর্কে। নানান আঁকিবুকি ও লেখায় সমৃদ্ধ এই কালো পাথরের অবয়ব যেন বহুকাল ধরে আমাদের উপর চেপে বসে আছে, যা আমরা কখনোই সরাতে পারিনা। যদিও দড়ি কিছুটা ছিঁড়ে যাওয়ার ভিতর দিয়ে শিল্পী আশার পথ দেখাচ্ছে।
বাংলার শিল্পে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা পটচিত্র। অমল আকাশ পটচিত্রের এই ধারাকে তার নির্ভরতার চাবি করেছেন। প্রদর্শনীতে তার দুটি চিত্র। হাসেম ফুডসে আগুনে পুড়ে যাওয়া শ্রমিকরা যেন এই চিত্রেই আশ্রয় পেয়েছে। শিল্পী পটের সামনে দাঁড়িয়ে গানে গানে সেই করুণ কাহিনী বর্ণনা করে চলেছেন, যা এই চিত্রকে একটি ত্রিমাত্রিক ধারনায় উন্নীত করেছে।
খন্দকার নাসির আহম্মেদ মূলত ভাস্কর, প্রত্যক্ষ মানব অবয়বের ভিতর দিয়ে সরল রূপে মানবিক আকাঙ্ক্ষার বিপরীত অবস্থানের প্রত্যক্ষ রূপ উপস্থাপন করে চলেছেন। নিঃস্ব মানুষেরা কখনও ফুল, কখনও পাখিদের সহযোগী করে বেঁচে আছে তার ভাস্কর্যে।
শীতলক্ষ্যা এক সময়ের বিশুদ্ধ খরস্রোতা নদী, এখন বিষাক্ত পানির ভান্ডার। কেবল একা নয়, তার সাথে সংযুক্ত সকল নদী। নদী বিধৌত বাংলাদেশের মানুষ এখন নদী দেখলে ভয় পায়। নদীর অহংকার ছিলো সভ্যতা, সেই মুখ আর নেই নদীর। লিটন সরকার তাই তার কাজে জলদেবীকে উপস্থাপন করে চলেছেন বিশুদ্ধতার বাসনায়।
বিত্ত গড়ে দিয়েছে মানুষের মধ্যে বিস্তর ফারাক, যেন সাদাকালো বৈপরীত্য। কারখানা নিংড়ে নিয়েছে নদীর সরল শুদ্ধতাকে। তাই বদরুল আলম ইমনের কাজ বিবর্ণ, সাদাকালো ধূসর । দূষণের উৎস থেকে শুরু করে মৃত প্রাণীর অবয়বের সরল উপস্থাপনা এক বেদনা ভরা কাব্য হয়ে উঠেছে। ভেসে উঠেছে প্রকৃতি, রঙ হারিয়ে এক ভয়াল বিভৎস রূপ, এসবই এখন যেন তার চিত্রপট।
‘ লক্ষ্যাপাড়ের মানুষ ‘ এ যেন দুর্যোগ কবলিত এক প্রকৃতির নামের শ্লোগান। প্রথমত মানুষের দুষণ, তারপরে নদী। নদী ও নারী এই বাংলার অপার সৌন্দর্যের কাব্যগাথা। রঞ্জিত কর্মকারের ভাস্কর্যে নারীরা আতঙ্কিত, নিষ্প্রভ। কখনো আবার মানুষের মনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা অজানা আনন্দকে উস্কে দেয়। শিল্পী সাহসী হয়ে ওঠেন সুরের মূর্ছনায়।
তবুও শিল্পী মুনতাসির মঈন অবিচল থাকে এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের অবয়ব চিত্র নিয়ে। এই দেয়ালটি অবিচল হয়ে প্রদর্শনীতে দাঁড়িয়ে আছে নির্ভীক নির্ভরতার প্রতীক হয়ে, যেন বলছে ওই দেখো মানুষ ছিল এখনও আছে ভবিষ্যত মানুষের জন্য।
ভাঙ্গা রূপ, বিবর্ণ রঙ, নিরাশার স্রোতের বিপরীতে এই প্রদর্শনীর একমাত্র নারী শিল্পী সুমনা আক্তার পুরানের নারী চরিত্রের মত টুকরো টুকরো কাপড়কে সেলাই করে করে ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্নকে জোড়াতে চাইছে।
গ্যালারির উত্তর পাশের যে কর্নার, সেখানে ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে আছে এ জেলার ঐতিহাসিক, ঐতিহ্যবাহী ভবনসমূহ। খন্দকার নাসিরের তত্ত্বাবধানে চারুকলার নবীন শিক্ষার্থীরা প্রথমে অভিজ্ঞতা নিয়েছে শহরের। আয়োজনটির ধারনাকে বেগবান করতে হাত বাড়িয়ে ছিল আলোকচিত্রী জয় কে রায় চৌধুরী, স্থপতি নুরুজ্জামান ডালিম, শিল্পী মনির মৃত্তিক। এই শহর ও প্রান্তরে টিকে থাকা স্থাপত্য (করোগেডেট বোর্ড কাগজের) হয়তো কোন একদিন ভেঙ্গে পড়বে অথবা টিকে থাকবে আরও বহুকাল এই আশায় সুমিত দাস, তামান্না লিজা, সজিব ঘোস, সজিব মন্ডল, শিব শংকর মন্ডন, সানন্দা সাহা, দিপা পোদ্দার, নুর মোহাম্মদ সান্ত, মেইবু অং মারমা যুক্ত হয়ে নির্মাণ করেছে শহর অন্তর শহর, শিল্পের আগামীর সম্ভাবনা।





কমেন্ট করুনঃ