সাইফুল ইসলাম
“আরে ও রে পাগেলার নদী / বসত বাড়ি করলা রে ছাড়াছাড়ি”- গিয়াসউদ্দিন বয়াতির গানের শুরুতেই এই চরণ যেন চিৎকার করে জানিয়ে দেয় এক নৈরাশ্যময় বাস্তবতার কথা, যা যমুনাপারের হাজারো মানুষের জীবনকে প্রতিদিন গিলে খায়। এই গান শুধু কোনো সুরেলা বিনোদন নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে নদীভাঙনের শিকার মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা, আক্ষেপ এবং অঘোষিত প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। আর যে ভাঙন প্রতিনিয়ত নদীতীরবর্তী মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলছে, তার নেপথ্যে রয়েছে তথাকথিত উন্নয়ন নামের তামাসার কালো ছায়া।
নদীভাঙন: প্রকৃতি না রাজনীতি?
গানে উল্লেখ আছেÑ“কুলকান্দিতে পাইলিং রে দিয়া / কুড়াল নদীর চর পরি গেলি”- এ দুটি লাইন শুধু প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবর্তনের নয়, বরং ইঙ্গিত দেয় পরিকল্পনাহীন নদীশাসন প্রকল্পের দিকে। এখানে ‘পাইলিং’ বা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে একপক্ষের ভূমি রক্ষা করতে গিয়ে অন্যপক্ষের জমি বা বসতি নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। যমুনা নদী শুধুই প্রাকৃতিক শক্তি নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় অবহেলা, উন্নয়নের অসম নীতি এবং শ্রেণি বৈষম্যের প্রতীক।
স্মৃতি ও বাস্তুচ্যুতি: ভাঙনের শিকার জীবনের আর্তি
“কারো ভাঙলি ভিটে রে বাড়ি / কারো ভাঙলি জমিদারি / কারো ভাঙলি নতুন ওই পিরিতি”- এই তিনটি স্তরে ভাঙনের অভিঘাত প্রকাশ পেয়েছে: বাস্তব সম্পদ (ভিটেমাটি), সমাজিক পরিচয় (জমিদারি বা অবস্থান), ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও সম্পর্ক (পিরিতি)। অর্থাৎ ভাঙন শুধু ঘরবাড়ি কেড়ে নেয় না, তা মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎÑতিনটিকেই একসাথে গ্রাস করে।
নির্বাসন ও অভিবাসনের মর্মন্তুদ কাহিনি
“কত মানুষ ঢাকায় গেল / কত মানুষ বগুড়্যাত মইল / কত মানুষ গার্মেন্টসেত পুড়ি মইল”-এই পঙ্ক্তিমালায় উঠে এসেছে নদীভাঙনের প্রান্তিক মানুষদের বাস্তুচ্যুত জীবনের করুণ চিত্র। তারা কোথাও গৃহহীন শ্রমিক, কোথাও ভিক্ষুক, কোথাও অসুস্থ-নির্জন এক মৃত্যুপ্রার্থী। এ এক অন্তহীন নির্বাসনÑনিজভূমে পরবাসী হওয়ার গল্প।
পাগেলার নদী : একটি প্রতীকময় উপস্থাপনা
‘পাগেলার নদী’ শব্দবন্ধটি এই গানের কেন্দ্রীয় প্রতীক। এটি একাধারে যমুনা নদীর অনিয়ন্ত্রিত গতি, হঠাৎ রোষ, এবং সীমাহীন ধ্বংসযজ্ঞকে তুলে ধরে। ‘পাগল’ এই ক্ষেত্রে শুধু উন্মাদ নয়, বরং একটি দিশাহীন, বেপরোয়া শক্তির চিত্র, যার উপর মানুষের নেই কোনো নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু আছে অনিবার্য নির্ভরতা। আর নদীকে এই নির্মমতার পথে ঠেলে দিয়েছে উন্নয়নের ছদ্মাবরণে ‘নদী শাসন’ নামের রাষ্ট্রীয় হঠকারিতা। নদীর বুকে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের খেসারত গুনতে হয় বংশপরম্পরায় বছরের পর বছর নদীবর্তী মানুষদের।
গানের শিল্পমান ও ভাষাশৈলী
এ গানটির ভাষা গ্রামীণ, অথচ পরতে পরতে জারিত এক গভীর শিল্পবোধ। “শিং ভাঙা নিয়া বাবা টানাটানি বাজলি”-এখানে ‘শিং ভাঙা’ বা কোনো ছোট ঘটনা নিয়েও সংকট সৃষ্টি হওয়াটাই বোঝানো হয়েছে। প্রতিটি পঙ্ক্তি যেন ছবি আঁকে-নদীর ধ্বংস, মানুষের ছুটোছুটি, কান্না, বিসর্জন।
এই গান কেবল এক অঞ্চলের নয়, বরং বাংলাদেশের হাজারো নদীপারের মানুষের জীবনগাঁথা। এটি কোনো সাহিত্যিক অলঙ্কার দিয়ে মোড়া কবিতা নয়, বরং জীবন্ত বাস্তবতার অকপট দলিল। রাষ্ট্র যখন উন্নয়নের নামে মানুষকে ঘরছাড়া করে, প্রকৃতি যখন তার স্বাভাবিক গতিপথ হারায়, তখন এই গানই হয়ে ওঠে ইতিহাসের কণ্ঠস্বর।
‘পাগেলার নদী’ আসলে শুধু যমুনা নয়, এটি একটি প্রতীক-ভাঙনের, বিচ্ছেদের এবং তারপরও টিকে থাকার এক অনন্ত সংগ্রামের।
গিয়াসউদ্দিন বয়াতি জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার যমুনা নদীর তীরবর্তী চরগোয়ালিনী ইউনিয়নের হারগিলার চর এলাকার বাসিন্দা। নদীভাঙন নিয়ে তার লেখা ও সুরারোপিত গানটি এখানে তুলে ধরা হলো।
কুলকান্দিতে পাইলিং রে দিয়া
কুড়াল নদীর চর পড়ি গেলি
শিং ভাঙা নিয়া বাবা টানাটানি বাজলি
আরে ও রে পাগেলার নদী
বসত বাড়ি করলা রে ছাড়াছাড়ি ॥
কারো ভাঙলি ভিটে রে বাড়ি
কারো ভাঙলি জমিদারি
কারো ভাঙলি নতুন ওই পিরিতি
আরে ও রে পাগেলার নদী
বসত বাড়ি করলা রে ছাড়াছাড়ি ॥
গুইঠাইলেতে পাইলিং রে দিয়া
হারগিলার চর নদী হলি
কামারপাড়া মানিক যারে নিয়া টানাটানি বাজলি
আরে ও রে পাগেলার নদী
দ্যাশের মানুষ করলা রে ছাড়াছাড়ি ॥
কত মানুষ ঢাকায় গেল
কত মানুষ বগুড়্যাত মইল
কত মানুষ গার্মেন্টসেত পুড়ি মইল
আরে ও রে পাগেলার নদী
দ্যাশের মানুষ করলা রে ভাঙ্গাভাঙ্গি ॥
প্রসঙ্গত, এই গানটি আরও অনেক দীর্ঘ, তবে এখানে শুধু নদীকেন্দ্রিক অংশটুকু চয়ন করা হয়েছে।





কমেন্ট করুনঃ