আহমেদ বাবলু
নাগরিক মানুষেরা, যারা পাহাড় নদী সাগরের বুক ঘেঁষে বসবাস করে না, ইট কাঠ কংক্রিটে প্রকৃতিবিহীন জীবন যাপনে তারা যখন হাঁসফাঁস করে এবং সেসব থেকে মুক্তি পেতে তাদের অনেকেই যখন প্রকৃতির কাছে বেড়াতে যায়, বিশেষত পাহাড়ের কাছে, তখন অনেকেই পাহাড়ের বুকে দূরতম কথার যে প্রতিধ্বনি হয়, সেই প্রতিধ্বনিকে নিয়ে একধরণের রোম্যান্টিক খেলায় মেতে ওঠে তারা। প্রিয়নাম ধরে চিৎকার ক’রে ওঠে। সেই প্রিয়নাম প্রতিধ্বনিত হয়ে যখন নিজেদের কূর্ণকুহরে প্রবেশ করে, ভীষণ রোমাঞ্চিত হয়। কিন্তু নাগরিক মানুষের কাছে পাহাড় যতোই রোমাঞ্চকর হোক না কেন, পাহাড়ি জীবন আসলে রোমাঞ্চকর নয়। সে জীবন কঠোর ও কঠিন। করুণ ও সংগ্রামী সে জীবন। বাংলাসংগীতের মনোযোগী শ্রোতা হলে সে কঠোর, করুণ ও সংগ্রামী জীবনের প্রতিধ্বনি, বেদনাকাব্য, বিষাদের সুর, নিশ্চিতভাবেই আপনাদের চেনার কথা। জানার কথা। তবে এও মিথ্যে নয়, নগর জীবনের যাঁতাকলে সেসব নিয়ে হয়ত অনেকেরই ভাবার অবকাশ থাকে না। পাহাড়ের গান শুনলেও তা বিনোদনের ভঙ্গীতেই শুনে থাকি সকলে। গান যেন – শোনার জন্যই শুধু শুনে যাওয়া। আজ তবে ব্যতিক্রম হোক। আমরা বাংলাসংগীতের ধারায় পাহাড়ের গান নিয়ে একটু গভীর আলাপে যাই। খুঁজে দেখি বাংলা গানে পাহাড়, কোন রঙে, রেখায়, সুরতরঙ্গে, আমাদের জানান দিতে চেয়েছে তার সংস্কৃতি।
পাহাড়ের সঙ্গে নাগরিকজনের প্রতিধ্বনির খেলার কথা বলছিলাম। বাংলাগানে পাহাড় ও প্রতিধ্বনি দুটি শব্দের দ্যোতনার কথা এলে নিশ্চিতভাবেই মনে পড়বে ভূপেন হাজারিকার কথা। যে শিল্পী সত্যি সত্যি পাহাড়ের প্রতিধ্বনির মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন। জন্মেছেন আসামের পাহাড় বেষ্টিত সংস্কৃতিতে। নিজের লেখা ও সুর করা গানের ভেতর দিয়ে তিনি তাঁর গাঁয়ের কথা বলেছেন –
মোর গাঁয়েরও সীমানার পাহাড়ের ওপারে
নিশীথ রাত্রির প্রতিধ্বনি শুনি।
ভূপেন হাজারিকার সেই প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া আর আমাদের মতো পর্যটনে যাওয়া মানুষের প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়ার অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। ভূপেন শুধু প্রতিধ্বনি শোনেনই না, সে প্রতিধ্বনিকে বোঝার চেষ্টা করেন।
কান পেতে শুনি আমি – বুঝিতে না পারি
চোখ মেলে দেখি আমি – দেখিতে না পারি
চোখ বুজে ভাবি আমি – ধরিতে না পারি
হাজার পাহাড় আমি – ডিঙোতে না পারি
নিশীথ রাত্রির প্রতিধ্বনি শুনি
প্রতিধ্বনি শুনি আমি প্রতিধ্বনি শুনি…
হাজার পাহাড় ডিঙোতে না-পেরে, অনেক ভেবেও সে প্রতিধ্বনির অর্থ ধরতে না-পেরে, তিনি ভাবতে থাকেন –
হতে পারে কোনো যুবতীর শোকভরা কথা
হতে পারে কোনো ঠাকুমার রাতের উপকথা
হতে পারে কোনো কৃষকের বুকভরা ব্যথা
চেনা চেনা সুরটিকে কিছুতে না চিনি
নিশীথ রাত্রির প্রতিধ্বনি শুনি…
আমরাও জানি। হতে পারে অনেক কিছুই। হয়ও। পাহাড়ি মানুষের শোকভরা কথা আর বুক ভরা ব্যথার যে গল্প সে গল্প আসাম অথবা বাংলাদেশ, কোথাও কোনো ভিন্নতা নেই। নিপীড়িত এইসব মানুষেরা তাই বারবার তাদের প্রতিধ্বনির মানে বদলে দিতে চায়। বদলে দিতে চায় নতুন কোনো দিনের স্বপ্ন দেখে দেখে। ভূপেনের এই গানের শেষে এসে আমরা সে খবর জানতে পারি –
মোর কালো চুলে সকালের সোনালি রোদ পড়ে
চোখের পাতায় লেগে থাকা কুয়াশা যায় সরে
জেগে ওঠা মানুষের হাজার চিৎকারে-
আকাশছোঁয়া অনেক বাধার পাহাড় ভেঙে পড়ে
মানবসাগরের কোলাহল শুনি
নতুন দিনের যেন পদধ্বনি শুনি
পদধ্বনি শুনি, পদধ্বনি শুনি।
অসমীয়া ভাষা থেকে এই গানটির বাংলা রূপান্তর করেছিলেন শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
ঐ যে ভূপেন নতুন দিনের পদধ্বনির ইংগিত দিচ্ছেন? সেই নতুন দিন আনার লড়াইয়ে ২০০৪ সালে বাংলাদেশের মধুপুরে পীরেন স্নাল নামের এক গারো যুবকের বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায় সরকারী বাহিনীর গুলিতে। পীরেন স্নালকে নিয়ে আদিবাসী গানের দল “মাদল” অসাধারণ এক গান তৈরি করে-
পাখির স্বভাব পাখির মতো উড়বে বলে
বন পাহাড়ে উড়ে ঘুরে গাইবে বলে
লাল সে মাটির গন্ধ বুকে পুষবে বলে
সবুজ মায়ার বাঁধন অটুট রাখবে বলে
শালবৃক্ষের মতন শিনা টান করে সে
মানুষ হয়ে বাঁচতে পীরেন জান দিয়েছে।
আমরা জানি পাহাড় আর বন নিয়েই আদিবাসী মানুষের জীবন। মাদলের শিল্পী শ্যাম সাগর তার কণ্ঠ উচ্চকিত ক’রে সেই বনের অধিকারের কথা জানান দেয় এই গানে –
এই বন যে আমার মাগো আমি তারই ছেলে
অবাধ চলন বলন আমার তারই কোলে
এই বন যতদূর ঠিক তত দূর আমার বাড়ি
এই মাটিতে পোতা আছে আমার নাড়ি
সেই নাড়ি ধরে কারা যেন টান দিয়েছে
তাই রুখতে, পীরেন স্নাল জান দিয়েছে।
কেন জান দিতে হয় পীরেনদের? এই গানের শেষ স্তবকে পরিষ্কার করে বলা আছে –
তারা উন্নয়নের নামে দেখো দেয়াল তোলে
তারকাটাতে ভিন্ন করে মা আর ছেলে
এত দিনের জীবনবোধে হানলো কারা
মায়ের ছেলে হোস যদি রে রুখে দাঁড়া
সেই প্রাণের ডাকে প্রাণ মেলাতে ছুটে গেছে
দামাল ছেলের রক্তে মায়ের বুক ভেসেছে।
পাহাড়ের এই মতো গানের গল্পে শ্রোতা হিসেবে যত গভীরভাবে সম্পৃক্ত হবেন, ততোই আপনি আর সাধারণ শ্রোতা থাকবেন না, নিজেকে আবিষ্কার করবেন ভিন্ন এক মানুষ হিসেবে। দায়বদ্ধ মানুষ। সে দায় যেমন মানুষের প্রতি। একইভাবে পাহাড় বা অরণ্যের প্রতি। সকল প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি। এমনতরো দায়বদ্ধতা নিয়ে বাংলাদেশের একটি গানের দল গান ক’রে আসছে অনেক দিন ধরে, দলটির নাম “সমগীত”। যাদের গান বাণিজ্যিক সংগীত কারখানা থেকে নির্মিত নয় বলে হয়ত ব্যাপক সাধারণের শ্রুতি অভিজ্ঞতায় ঠাঁই হয় না সেইসব গান। অথচ (সম্ভবত) এই দলটিই বাংলাদেশে সর্বপ্রথম পাহাড়ি মানুষের অধিকার নিয়ে গান তৈরি করে। এক পাহাড়ি মেয়ের গল্পের ভেতর দিয়ে তুলে আনে পাহাড়ি মানুষের হাজার বছরের বঞ্চিত জীবনেরই বয়ান –
ঝর্ণার ছন্দে ঢাল বেয়ে নেমে আসে দুরন্ত পাহাড়ি মেয়ে
পাহাড় পেরোবার প্রচন্ড স্পর্ধা, দৃঢ়তারই গান গেয়ে…
…………………………………………………………………
হাজার বছরের বঞ্চিত জীবনের লাঞ্ছিত স্বপন আর তৃষার্ত আবেগের
ক্ষুব্ধ স্লোগান নিয়ে তাজিনডং পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসে দুরন্ত পাহাড়ি মেয়ে…
তার বুকের গভীরে গর্জে ওঠে, বুকের গভীরে গর্জে ওঠে
……………………………………………………………………
আমি গুরিবং জয় একদিন, আমি গুরিবং জয় একদিন
আমরা করব জয় একদিন…
এই যে সমগীত পাহাড়ি মেয়ের গল্প নিয়ে গান করতে গিয়ে তার বুকের ক্ষুব্ধ স্লোগান আর গর্জে ওঠার স্বরটিকে তুলে আনলো, এই অনন্য দৃষ্টিভঙ্গিটিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের বাণিজ্যিক মূলস্রোতের সংগীত কারখানায় তৈরি হওয়া গানে পাহাড়ি মেয়েদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটি কেমন? সেটা নিয়ে সংক্ষিপ্ত দুয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যায়।
বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে লিজেন্ড হিসেবে যাদের ভাবা হয় তাদের মধ্যে অন্যতম নাম-জেমস। সেই জেমসের বিখ্যাত এলবাম ‘অনন্যা’য় “দুরন্ত মেয়ে” শিরোনামে একটি গান জনপ্রিয় হয়েছিল, সে গানের কথায় একবার চোখ রাখি –
ঐ দূর পাহাড়ে লোকালয় ছেড়ে দূরে,
মন কেড়েছিলো এক দুরন্ত মেয়ে
সেই কবে হিমছড়ির বাঁকে
ও দুষ্টু মেয়ে দেখেছিলাম তোমাকে।
মেঠো পথে ধুলো মাখা গায়ে পায়ে পায়ে বুনো ছায়া,
কাঁপন জাগায় ফুলে ফুলে দোলা জাগে,
সুখেতে থেকে থেকে ওঠে, গেয়ে গেয়ে পাখিরা
যদি ভুল না হয় এই গানের গীতিকার অনেক জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা আসিফ ইকবাল।
জি সিরিজের প্রযোজনায় ‘পাহাড়ি ঢাল’ শিরোনামে একটি গান বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গানটির শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার রাজীব শাহ। সে গানটির কথাগুলোর একটু দেখি –
আমার মনটা কাইরা নিল যে
ঐ পাহাড়ি ঢালে বসত করে সে
ঐ পাহাড়ি মেয়ে মনটা চুরি করেছে।।
শহুরে মানুষের চোখে পাহাড়ি মেয়েকে দেখার এটাই সাধারণ ও প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি। এমন উদাহরণ আরও অনেক দেয়া যায়। নাট্যব্যক্তিত্ব শংকর সাঁওজালের লেখা ও তানভীর আলম সজীবের সুরে আর গায়কীতে জনপ্রিয় হওয়া একটি গানের কথা –
কবে যাব পাহাড়ে, আহারে
কবে পাব তাহার দেখা, আহারে আহারে
কবে শাল মহুয়ার, কনক চাঁপার
মালা দেব তাহারে, আহারে আহারে।
যেন পাহাড়ি নারী মানেই আকর্ষণের বস্তু। তাকে নিয়ে কেবল প্রেমের গানই লেখা যায়, অন্য কিছু নয়। রোম্যান্টিকতায় আমার আপত্তি নেই। রোমান্স জীবনেরই অংশ। কিন্তু পাহাড়ি নারীর কঠিন বেঁচে থাকার যে লড়াই, সংগ্রাম, নিপীড়িত জীবন, মূলস্রোতের সংগীতধারায় তার চিহ্নটি দেখা যায় না কেন? কল্পনা চাকমাও তো একজন পাহাড়ি মেয়েই ছিল। যাকে সরকারী বাহিনীর লোকেরা অপহরণ করেছিল। সে অপহরণ আলোড়ন তুলেছিল সারা বিশ্বে। সেই পাহাড়ি নারীকে নিয়ে ওইসব কারখানার উৎপাদক শিল্পীদের দ্বারা রচিত কোনো গান নেই কেন?
এখানেই আমরা ভরসা করতে পারি বাণিজ্যিক শিল্পীর বাইরে সেই যে দায়বদ্ধ শিল্পীর কথা বলেছিলাম? তাদের উপর। যেমন ফারজানা ওয়াহিদ শায়ান। যিনি সকল সামাজিক রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোরালো চিৎকারে তার সংগীত নিয়ে মিছিলে হাঁটেন এবং স্বরচিত সংগীত স্লোগানের মতো পরিবেশন করেন। তিনি এখানেও ব্যতিক্রম নন। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আঞ্চলিক সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমা ১৯৯৬ সালের ১১ জুন দিবাগত রাতে, অর্থাৎ ১২ জুন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার লাইল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে অপহৃত হয়েছিলেন। তারপর প্রায় তিনদশক পেরিয়ে গেলেও এখনো তার কোনো হদিস নেই। কোনো বিচার নেই। শিল্পী শায়ান এই লড়াকু নারীকে নিয়ে ঠিকঠিকই গান রচনা ক’রে শিরোনাম হিসেবে ঘোষণা করেন “এটা কল্পনার চাকমার গান” নিজে বাঙালি হয়ে বাঙালিকে বিদ্রূপও করেন এই গানে, পুরো গানটিই তুলে দেওয়ার মতো, তবু আমি তার অংশ বিশেষই তুলে আনি।
এটা কল্পনা চাকমার গান,
আমরা বাঙালিরা তো শুনিইনি নামটাও তার
এই নামে ছিল বুঝি কেউ?
জিজ্ঞেস করো যদি কথা বলে উঠবে পাহাড়।
আমাদের শহরের মন,
আজও কি জানতে চায় পাহাড়ের কেমন জীবন?
পাহাড়ের কণ্ঠস্বর!
কল্পনা চাকমার আর কোনো পেলে কি খবর?
বুঝত সে পাহাড়ের ব্যথা,
বলত সে পাহাড়ের অধিকার সমতার কথা।
ক্ষমতাকে পেত না সে ভয়,
সত্যের ক্ষমতাকে করে নিয়েছিল পরিচয়।
গর্জে উঠত বারেবারে,
ক্ষমতারা একদিন স্রেফ তুলে নিয়ে গেল তারে।
তারচেয়ে বড় যেই শোক,
তার শোকে কাঁদল না ভালো করে বাঙালির চোখ।
কী ক’রে কাঁদবে? যখন এই বাংলার মুক্তিযুদ্ধে পাহাড়ি আদিবাসী মানুষের সাহসী অংশগ্রহণ থাকার পরেও সগৌরবে তাদের অবদান অস্বীকার ক’রে আমরা গেয়ে উঠি-
“বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ,
বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার মুসলমান,
আমরা সবাই বাঙালী”
তখন এসবে দুঃখিত হওয়া ছাড়া অবাক হবার কিছু থাকে না।
আমাদের সৌভাগ্য যে বাংলা সংগীতে একজন ভূপেন হাজারিকা জন্মেছিলেন! যিনি পাহাড়ি এইসব মানুষের গান গেয়ে গেয়েই আমাদের কাছে কিংবদন্তীসম হয়ে উঠেছেন। তাঁর আরেকটি গানে পাহাড়ের করুণ জীবনের উল্লেখ পাই। গানটি বেহারাদের নিয়ে। বেহারা তাদের বলা হতো, যারা পালকীর বাহক ছিল। পালকির চল হয়ত উঠে গেছে বা যাচ্ছে। তবু বাংলাসংগীতের বুকে পালকী বিষয়ক গান তো থেকে গেছেই। ‘হে দোলা’ শিরোনামে বিখ্যাত গানটিতে অসমীয়া ভাষায় পালকিকে দোলা হিসেবে প্রকাশ হতে দেখি। যে গানে বর্ননা পাই পাহাড়ের উঁচুনিচু কঠিন পথ দিয়ে বেহারারা জীবিকার তাগিদে রাজা মহারাজাদের দোলাতে বহন ক’রে চলে। উঁচু পাহাড়ে উঠতে গিয়ে দেহ ভেঙে ভেঙে পড়ে তাদের। ঘামে ভিজে ওঠে। তবু ভীষণ সাবধানে, ধীরে, পায়ে পা মিলিয়ে, পাহাড়ি পথ ভাঙে তারা। বুকে সব সময় গভীর শঙ্কা! একবার যদি কাঁধ থেকে পিছলিয়ে পড়ে যায় দোলাটি তাহলে হয়ত আর তা তোলা যাবে না। আসলে দোলা নয়, কাঁধ থেকে যেন ওইসব শ্রমজীবী মানুষের জীবনটাই ছিটকে পড়ে যাবার ভয়। গানটি শুনলেই পুরো গল্পটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে –
যুগে যুগে ছুটি মোরা কাঁধে নিয়ে দোলাটি
দেহ ভেঙে ভেঙে পড়ে
ঘুমে চোখ ঢুলু-ঢুলু রাজা-মহারাজাদের
আমাদের ঘাম ঝরে পড়ে।
উঁচু ওই পাহাড়ে ধীরে-ধীরে উঠে যাই
ভালো ক’রে পায়ে পা মেলা
হঠাৎ কাঁধের থেকে পিছলিয়ে যদি পড়ে
আর দোলা যাবে না তো তোলা-
রাজা-মহারাজার দোলা-
বড় বড় মানুষের দোলা।
অসমীয়া ভাষায় ভুপেন হাজারিকার কথা, সুর ও কণ্ঠের এই গানটিও বাংলা রূপান্তর করেছিলেন সেই শিবদাস বন্দ্যোপাধায়।
০২
আপনি যদি সচেতনশ্রবণে পাহাড়ি মানুষের ঘনিষ্ঠ জীবন নিয়ে রচিত গান শোনেন, তাহলে আরেকটি ভাবের আধিক্য খুব সহজেই আপনার কাছে ধরা পড়বার কথা, আর তা হচ্ছে হাহাকার! জীবীকার প্রয়োজনে কিংবা জীবন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে প্রায়শই পাহাড়ি জীবনকে, নিজের শিকড় ছেড়ে শহুরে অর্থনীতির মূলস্রোতে এসে আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু মূলস্রোতের ঢেউয়ের আঘাত ক্রমাগত তাকে জানান দেয়, এখানে সে মানানসই নয়। ভীষণ ক’রে বেমানান। কবি অরুণ কুমার চক্রবর্তীর লেখা তুমুল সমাদৃত কবিতার উদ্বৃতি দিয়ে বলা যায় –
‘হাই দ্যাখ গো/ তুই ইখানে কেনে?
ও তুই – লাল পাহাড়ির দেশে যা, রাঙামাটির দেশে যা
হেথাকে তুকে মানাইছে নাই রে/ ইক্কেবারেই মানাইছে নাই রে…
কবিতাটি ১৯৭২ সালে রচিত হলেও ১৯৭৯ সালে এই কবিতায় সুরারোপ ক’রে ঝুমুর গানের শিল্পী সুভাষ চক্রবর্তী রেকর্ড করেন প্রথিতযশা সংগীত পরিচালক ভি বালসারার তত্ত্বাবধানে। পরে পশ্চিম বাংলার জনপ্রিয় ব্যান্ড ভূমির কল্যাণে গানটি ব্যাপক পরিচিতি পায়। দারুণ বিষাদময় এই গান। অরুণ কুমার চক্রবর্তী গানটির যে জন্মইতিহাস বলেছিলেন তা এক কথায় অসাধারণ।
‘‘সময়টা এপ্রিল মাস। শ্রীরামপুর স্টেশনের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, নাকে এল পরিচিত গন্ধ। এই সেই গন্ধ যার আবেশ আমাকে মাতাল করে দেয়। এখানে মহুয়া? পাতাহীন গাছের অজস্র ঝুমকো মহুয়া ফুল যেন আমাকে ডাকছে। রুমালে কিছু ফুল নিয়ে রাখলাম। মনের ভিতর একটা কষ্ট হচ্ছিল। ওকে এখানে দেখে মনে হয়েছিল, বড্ড বেমানান। এই ধান, আলুর দেশে ও কেন? মহুয়া তো জঙ্গলমহলের রানি! ওকে তো সেখানেই মানায়। ওর গায়ে জড়িয়ে আছে আদিবাসী গন্ধ। ও তো লাল মাটির গাছ। তার পর আমার মনের রঙে কখন যে লিখে ফেললাম গানটা!’’
বলা যায় শহরে আসা প্রায় প্রতিটি পাহাড়ি মানুষের জীবন অরুণ চক্রবর্তীর দেখা সেই মহুয়া গাছের মতোই, যাকে দেখে বলা যায় – হেথাকে তুকে মানাইছে নাই রে/ ইক্কেবারেই মানাইছে নাই রে…
এই না মানাতে পারার টানাপড়েন পাহাড় বিষয়ক আরও অসংখ্য গানে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের আরেক জনপ্রিয় শিল্পী অঞ্জনদত্তর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। অঞ্জন পাহাড়ের মানুষ নন কিন্তু তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছেন দার্জিলিঙ ও কালিম্পঙে। নিজের রচিত সংগীতে তাই বারবার এসেছে পাহাড়ের কথা। পাহাড় থেকে দূরে থাকার হাহাকার নিয়ে রচনা করেছেন একাধিক গান। দার্জিলিং শিরোনামের দুটি গান আছে অঞ্জনের। দ্বিতীয় গানটিতে পাহাড় ঘেরা জীবনের বর্ননা পাই এভাবে –
কুয়াশায় ঘেরা ভাসা ভাসা সেই পাইন গাছের ফাঁকে ফাঁকে রোদ্দুর
খাদের ধারে শুয়ে শুয়ে হাতে পায়ে হলদে সবুজ রঙ
ছিল না বালাই সময়ের শুধু আকাশে একটা নেপালি গানের সুর
আমার পাহাড়ি ছেলেবেলার একটা গান…
তো এই শিল্পী “কাঞ্চনজঙ্ঘা” নামের শ্রোতাপ্রিয় গানের ভেতর দিয়ে পাহাড়ের এক যুবকের গল্প জানান আমাদের। যে যুবক একটু ভালোভাবে বাঁচার আশায়, একটু বেশি রোজগারের আশায়, ভালোবাসার নীলচে পাহাড় ছেড়ে একদিন কোলকাতা আসে কিন্তু তারপর, কিছুতেই ভুলতে পারে না পাহাড়ের বস্তির সেই জীবন। ভুলতে পারে না প্রিয়তমা নারীর কথা, যে কানের মাকড়ী বিক্রি ক’রে কোলকাতা আসার জন্য ট্রেনের ভাড়ার টাকা তুলে দিয়েছিল তার হাতে। গানটির অন্তরাতেই ভাগ্য অন্বেষণে শহরে আসা যুবকের বয়ানে স্মৃতির সেই হাহাকার বাণীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন অজনদত্ত।
সোনার খোঁজে কেউ কতদুর দেশে যায় আমি কলকাতায়
সোনার স্বপ্ন খুঁজে ফিরি একা একা তোমাদের ধর্মতলায়
রাত্রির নেমে এলে তিনশো বছরের সিমেন্টের জঙ্গলে
ফিরে চলে যাই সেই পাহাড়ি বস্তির কাঞ্চনের কোলে।
অঞ্জনের এই হাহাকার কবীর সুমনেরও জানা আছে। তাই অঞ্জনদত্তকে নিয়ে গান বাঁধতে গিয়ে সুমনও গানে গানে বলেছিলেন –
নেপালি ছেলের হাতেও গিটার থাকে
তার সুর ঘোরে পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে
শুনে নেব গান ছুটিতেই তুমি আমি
গাই গান আমি ঝরনার কাছে থামি
বাড়ছে বয়স বাড়ছে স্মৃতির পুঁজি
ছেলেবেলা আমি এখনও তোমায় খুঁজি
খুঁজে যাই তবু বুঝি না খোঁজার মানে
খুঁজেছ তুমিও দার্জিলিং এর গানে
সুমন অঞ্জনরা যে বোধের গান করে থাকেন প্রায় একই বোধের গানে কণ্ঠ মেলান মৌসুমী ভৌমিকও। মৌসুমীও পাহাড়ে ঘেঁষে বড় হয়েছেন। ছেলেবেলা কেটেছে শিলঙে। তারপর তিনিও যখন সে পাহাড় ছেড়ে কোলকাতায় এসেছেন তখন অঞ্জনের মতো করেই সঙ্গে করে এনেছেন গাদা গাদা হাহাকার। সেই হাহাকার প্রকাশিতও হয়েছে তার গানে –
ছেলেবেলার পাহাড় আমায় ডাকে,
হাওয়ায় হাওয়ায় মায়ের গন্ধ থাকে।
বিকেল বেলায় লুকোচুরি বাঁশের ঝাড়ের ফাঁকে
মায়ের গন্ধ ঠাণ্ডা হাওয়ায় মায়ের গন্ধ থাকে ।।
…………………
সন্ধ্যে হবার খানিক আগে আমার দু’চোখ বুজে
ছেলেবেলার পাহাড়টাকে নিচ্ছি আমি খুঁজে
হঠাৎ দেখি ধুলোর চাদর আমার পাহাড় ঢাকে
ছেলেবেলা পথ হারাল কোলকাতারই বাঁকে।।
এইমতো পাহাড় বিষয়ক হাহাকারের গানের উদাহরণ আরও বিস্তর দেয়া যাবে, আমরা আর সে তালিকা দীর্ঘ না করে বরং পাহাড় নিয়ে আরেকটি ভিন্ন অনুভূতির গানের কথা বলি। যে গানে শহুরে জীবনে ক্লান্ত এক রোম্যান্টিক যুবক জীবনকে নিয়ে দারুণ এক জুয়া খেলতে চায়। ইটের শহরে জোড়াতালির জীবন ছেড়ে, জটিল ধাঁধার জীবন ছেড়ে, পাহাড়ে গিয়ে বসত গড়ার স্বপ্ন দেখে। গানটি লেখা, সুর ও গায়কীতে শিল্পী সোহান আলী সমাদৃত হয়েছেন খুব –
চলো দোতং পাহাড় জুম ঘরে পূর্ণিমা রাত বর্ষাজুড়ে
জীবন জুয়ার আসর বসাবো।
আমি – মারফা রেঁধে দেবো পাতে, বিন্নি চালের ভাত সাথে
দু বেলা দু মুঠো খেয়ে তৃপ্তির আলিঙ্গন
পুবের – হু হু বাতাস বইলে পরে, পাঁজর ভাঙ্গা গান ধ’রে
আয়েশ করেই কাটুক এ যৌবন
এই ইটের শহর পোড়ায় খালি জোড়াতালি জীবন আমার ভাল্লাগেনা রে
কে কার রাখে খবর, দম ফুরালেও একলা একা, নিথর দেহ কাইন্দা মরে রে
……………………
এক শেকড় কাটা বৃক্ষ আমি, ডালপালা নাই নতুন পাতাও আর আসেনা রে
যে যার নিজের মত ফুল থেকে ফুল সৃষ্টি খেলায় মত্ত আমার ফুল জোটেনারে
এই ছোট্ট জীবন স্বপ্ন যেমন কিসের তরে হায়
তাই জটিল ধাঁধার শহর ছেড়ে মন পাহাড়েই যায়।।
উল্লেখিত সবগুলো গানই কিন্তু পাহাড়ের ছুতোয় মূলত পাহাড়ি মানুষের সংকট ও সংগ্রাম, পাহাড় ছেড়ে আসা মানুষের হাহাকার কিংবা পাহাড়ি নারীর প্রেমে পড়া অথবা পাহাড়ে গিয়ে বসত করতে চাওয়ার গান। এর বাইরেও নানান উপমায়, উৎপ্রেক্ষায়, নানান রূপকে, বিচিত্রভাবের প্রকাশে বাংলা সংগীতে পাহাড়ের কথা এসেছে বিস্তর। বাংলা আধুনিক গানে প্রায় ক্ল্যাসিক হয়ে ওঠা, সুবীর নন্দীর এই গানটির কথাও স্মরণ করা যায় –
পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝর্ণা বলো
ওই পাহাড়টা বোবা বলেই কিছু বলে না
তোমরা কেন বোঝো না যে
কারো বুকের দুঃখ নিয়ে কাব্য চলে না।
লিখেছিলেন মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, সুরকার খন্দকার নূরুল আলম। উদ্বৃতি দেওয়া যায় নজরুলের গান থেকে –
আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই
ওই পাহাড়ের ঝর্না আমি, ঘরে নাহি রই গো
উধাও হয়ে রই।।
কিন্তু এখানে আমি মূলত তুলে আনতে চেয়েছি সেইসব-গান যে গান সমতলে বসবাসকারী মানুষের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভিন্ন। সেইসব গান-যে গান নির্মিত হয়েছে পাহাড়ঘনিষ্ঠ শিল্পীদের দ্বারা। সেইসব গান-যে গান বাণিজ্যিক কারখানায় উৎপাদিত না হয়ে জন্ম হয়েছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকারে উচ্চকিত সংবেদনশীল লড়াকু কিছু শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীর ভেতর থেকে। যেসব গানে উঠে এসেছে পাহাড়ি মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, জীবনের রূঢ় বাস্তবতা, তাদের উপরে রাষ্ট্রীয় নীপিড়ন। যে গানে উঠে এসেছে পাহাড়কে ভালোবাসার গভীর হাহাকার। যে হাহাকার নাগরিক মানুষের দরবারে ঠিকঠাক পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে সব সময়। লালন ফকির যেমন বলেছিলেন –
সাঁই নিকট থেকে দূরে দেখায়
যেমন কেশের আড়ে পাহাড় লুকায় দেখনা
ঠিক যেন তেমনি করেই, আমাদের স্যাম্পু করা কেশের আড়ালে আমরা পাহাড়কে লুকিয়ে রাখি। লুকিয়ে রাখি পাহাড়ের গান। লুকিয়ে রাখি পাহাড়ি মানুষের যন্ত্রণাকাব্য। তবু বাংলা সংগীতের ইতিহাসে যেসব মহান সংগীত স্রষ্টা, নাগরিক মানুষের রোম্যান্টিসিজিমের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পাহাড়ি মানুষের প্রকৃত আখ্যান তাঁদের গানের মধ্যে নিয়ে এসেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সংগীতকেই, তাঁদেরকে স্যালুট জানাই।
১৬/১১/২০২৪
আহমেদ বাবলু
E-mail – as.anandalok@gmail.com
phone – 01911764049





কমেন্ট করুনঃ