ফ্রাঙ্ক বয়েজের জন্ম ডোমিনিকান রিপাবলিকের সান্তো ডোমিনিকো শহরে ১৯৭৮ সনে। তিনি একটি অনলাইন কবিতা পত্রিকা পিঙপঙ-এর সম্পাদক। ল্যাটিন আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক কবির কবিতা অনুবাদক হিসেবেও স্বনামধন্য। তিনি স্প্যানিশ ভাষার কবি।
তার কবিতায় থাকে একটি সকৌতুক করুণ রস। আপাতদৃষ্টিতে তার কবিতার জগৎ এক দ্বীপবাসী তরুণের আত্মজীবনীমূলক হলেও তা ছড়িয়ে যেতে চায় বিশ^জুড়ে। তা তাকে শিল্পীর মর্যাদায় আসীন করে। তার কবিতায় স্থিতধী, প্রায় গদ্যতাড়িত ছন্দের সাথে প্রথমেই নজর কাড়ে তার ভিতরে ছড়িয়ে থাকা ক্যারিবীয় বিষাদ। আর তা বয়েজের অন্যান্য কাজে আরো ফুটে ওঠে। বয়েজের আছে একটি নামকরা ব্যান্ড দল ‘এল হোমব্রেসিটো’। অন্যদের সাথে গান করেন। কবিতা আবৃত্তি করেন ব্যান্ডের যন্ত্রাদি ও কম্পিউটারসৃষ্ট সুর সহযোগে। তার তিনটি জনপ্রিয় এলবাম চলে বাজারে। এলবামের অনেক গানই বয়েজের কবিতাকে সুর করে।
২০০৪ সালে প্রকাশিত হয় তার কবিতা সংকলন ‘জ্যারন অ্যা অত্রোস পয়েমাস’। দেশবিদেশ থেকে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ চারটি, সাথে আছে তার গল্পসংকলনগুলো, আছে ভ্রমণকাহিনি। তাছাড়া সংবাদসাময়িকীতে প্রকাশিত নিবন্ধাদি। অনুবাদ করেছেন আটটি ভাষায়। ২০০৯ এ তার সর্বশেষ কবিতার সংকলন ‘পোস্ট্যাল’ জাতীয় কবিতা পুরস্কার সলেমি ওরেনা বিজয়ী হয়।
দেশে দেশে কবিতা উৎসবগুলোতে তিনি খুবই নন্দিত অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে থাকেন। এসব অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি গিয়েছেন শিকাগো, মিশরসহ ভূ-মধ্যসাগরীয় দেশসমূহে। তা এই তরুণ কবিকে দিয়েছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের এক বিশাল প্রাণবন্ত জীবন তবে তার প্রিয় ক্যারিবীয় দ্বীপকে ভুলে গিয়ে নয়। বার বার বয়েজ ফিরেছেন ক্যারিবীয় বন্দরে, ভর করেছেন আপন বন্দরের জেটি ও তার পিলারগুলির ওপর।
তিনি তার দেশ ডোমিনিকান রিপাবলিকের তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গল্পকার। তার গল্পসংকলন ‘প্যাগলেস ট্যু অ্যা লস সাইকোএনালিস্টাস’ ডোমিনিকান বইমেলা-২০০৬ এ প্রথম পুরস্কার লাভ করে। ২০০৭ সালে সান্তো ডোমিনিগো থেকে তা প্রকাশিত হয়। তিনি বহু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেন। এমনকী তার নিজ দেশ থেকে প্রকাশের আগেই তার কবিতার বই অন্যান্য দেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
কবিতাগুলো‘ফোর্ট নাইটলি রিভিউ’, ২৬ মে, ২০১৪ সংখ্যা থেকে নেয়া। মূল স্প্যানিশ ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন হোয়েট রোজার। সাউথ ক্যারোলিনায় রোজারের জন্ম হলেও দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন ফ্রাঙ্ক বয়েজের জন্মভূমি ডোমিনিকান রিপাবলিকে। স্প্যানিশ, জার্মান, ফরাসি কবিতাসহ বিভিন্ন সাহিত্য অনুবাদক হিসেবে সুবিদিত। ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তরে মূলত ‘ফোর্ট নাইটলি রিভিউ’-এর হোয়েট রোজারের অনুবাদের সাহায্য নিয়ে অনুবাদ করেছেন রঘু অভিজিৎ রায়।
অভিগমন
তারা অপেক্ষা করে বাড়িগুলো খালি করা পর্যন্ত
বেঁধে ছেঁদে মালামালগুলো লাগেজে পুরতে।
চাঁদ, তারা আর আকাশের মেঘেদের তারা নামিয়ে রাখে,
বিদ্যুতের তার, তাদের কবুতর,
জলের কলস, টিভির এন্টেনা আর পোষা পাখিদের সাথে।
জড় করে নেয় ক্রান্তীয় ভূ-দৃশ্যাবলী
যেভাবে একটা ক্যানভাস বস্তাবন্দি করে নেয়,
একটা সার্কাসদল একটি শহর যেভাবে ছেড়ে যায় অন্য শহরে,
পুনরায় আশায় বুক বেঁধে
শূণ্যভাগ্য ছুড়ে দিয়ে ভাগাড়ে
নিউইয়র্ক কিংবা বার্সিলোনায়।
সান্তো ডোমিংগো
থেসাস কুড়িয়ে নিলো এরোডিনের সুতো
গোলাকধাঁধাঁ থেকে বের হতে তাই খুঁজছিল
সূর্যও তেমনি কুড়িয়ে নিচ্ছে
সেই সুতো নগরের প্রধান সড়ক থেকে
পথঘাট আর মোটেল ছেড়ে,
দূরে পর্বতরাজি
এবং বাতি জে¦লে রাখা নৌকোগুলো,
একটি কাঠ
ভাসছে ওজামার উষ্ণ জলে অপার স্নেহে
যেন একটি প্রসারিত হাত বলছে- হ্যালো,
অথবা হবে হয় তো বলছে- বিদায়।
অ্যানা স্যাক্সটন
গাড়ির দরজাটা লাগিয়ে তা লক করে নিলেন। গলায় ঢালতে থাকলেন ভদকা আর আবৃত্তি করে চললেন শেষ কবিতাটি
চোখে কালো অশ্রুর বন্যা,
চিৎকার করে পড়ছেন কবিতা, গাড়ির ভেতরটা ভরে গেছে কার্বনডাইঅক্সাইড,
গ্যারেজের বাইরে গাড়িটির শুধুই গর্জন। তবু তিনি এক্সেলেটর পা চাপছিলেন, সাথে ভদকা আর চিৎকার করে কবিতা, তার নিজের কবিতা। শেষে এক্সেলেটার থেকে সরিয়ে নিয়েছেন পা। চলছিল শুধু কবিতা শব্দহীন, চোখ থেকে কালো জলধারা বয়ে চলছে আর বিষাক্ত ফুসফুস ফুলছে, গায়ে তার মায়ের কোটটি আর পুতুলের মতন তার চোখের তারা দুটি পিটপিট করছিল।
দুমাস কবিতা না লেখার পর
কোনো একদিন আপনি লাশ হয়ে যাবেন
আপনি আর কবিতা লিখবেন না
তবু এখন বসুন, অপেক্ষা করুন,
লিখুন আর অপেক্ষা করুন আর লিখুন ভাবনাকে
আর এই হোক শেষ কবিতা।
রবার্ট ফ্রস্ট বলে গেছেন কবিতার যে পথে তিনি হেঁটেছেন
জেনেছেন সকল অলিগলি মিলেছে একই অরণ্যে
আর মৃত্যুই তো অরণ্যের এই উৎপ্রেক্ষা
যেন আমরা রূপকথার হান্সেল আর গ্রেটেল
ফেলে যাই পিঠার টুকরোগুলো
তেমনি কবিরা রেখে যায় কবিতা
যদিও পাখিরা পায় পিঠার টুকরোটাকরা
কিন্তু কবিদের কবিতা থেকে যায় প্রকাশকের কাছে অপ্রকাশিতই।
রাতের দৃশ্য-শিল্প
জেটির এদিক থেকে তুমি দেখতে পাবে
প্রতিটি অট্টালিকা আর সড়কের নিয়ন
যেনো একেকটি নৌকা।
মাঝে মাঝে একেকটি যাত্রী বা মালবাহী জাহাজ
সবগুলো আলো জ্বেলে ছেড়ে যাচ্ছে
সমুদ্রের দিকে মাথা দিয়ে।
মনে হবে ঐসব মিটিমিটি জ্বলতে থাকা
সাগরবেলার আলোকমালা হয়ে যাচ্ছে সামুদিক জাহাজ
বাড়িঘর আর অট্টালিকাসকল নোঙর তুলছে
আর সমস্ত সান্তিয়াগো যেন তুললো পাল ।
মিউ
মহত্তম মনগুলো খুঁজে পেলাম না
আমার প্রজন্মের,
আমি তা নিয়ে ভাবি না।
শিরোনামহীন
লোমশ সকালের প্রত্যাশায়
শহরের যেকোনো ছাদে
বসে লাল চোখে অদ্ভুত বিছানায়
জড়িয়ে আন্ডারপ্যান্ট
প্রেমের কবিতার নানা রঙ
১
চেয়েছি একটি প্রেমের কবিতা লিখতে
কবিতাগুলো কখনো তা বলে না যা বলতে চেয়েছি
হয়তোবা কবিতা তাই বলে যা প্রকৃতই বলতে চাই
অর্থাৎ আমরা একদম জানি না কী বলতে চাই
২
আমি তোমাতে লগ্ন হই
তখন যখন আমি বলি
যখন আমি তোমাকে লিখি
তখন আর লগ্ন থাকি না
তা না হয়ে যখন প্লেটোসুলভ-তোমাতে
আমার অনেককিছু থাকে
তোমার চেয়ে
৩
কেভেদো যখন প্রেমের কবিতা লিখতে পারে না
সে তখন ঠিক নিজেকে ধরে রাখতে পারে না
চার্চের ঘন্টিঘরে চড়ে বসে
ঢিল ছুঁড়ে জনতার দিকে চলতে থাকা জনস্রোতে
৪
সারাজীবন প্রেমের কবিতা লিখে
আমি ব্যর্থ হয়েছি
শতশত প্রেমের কবিতা লিখেছি তার বেশিটাই তখন
যখন আমার কেউ ছিল না যাদের লিখতে পারি
৫
রিসিপশনিস্ট আর মেসেজপার্লারের মেয়েগুলি
আমার কবিতাগুলো অবলীলায় বলে যায়
আর আমি হাউজি খেলি যেসব বৃদ্ধাদের সাথে নিয়ে
তারা কাঁদে মদের গ্লাস হাতে করে
মনে করে করে আমার কবিতা
৬
তরুণীদের কবিরা প্রলোভন দেখায় বিপথে
আর কবিরা অমর করে কবিতায় তাদের
অথচ আমরা ভুলে গেছি কত ক্লাডিয়া
কত জুলিয়েট কত মার্গারেট
কত ক্রিশিলানডিয়াদের
৭
তরুণীরা আর কবিতায় আস্থা রাখে না
কবিদের বিছানায় শুধু তারাই যায়
যাদের বয়স পড়ে গেছে
আর যারা মন বুঝে তারাতো অনেক দামি
আজ রাতে তারা সব কবিদের বিছানায় আর
আমাকে রেখেছে ওরা শেকল টেনে
ওরা জড়িয়ে বিবস্ত্র তরুণীদের
আমি একা ঘরে লিখছি কবিতা
৮
সমস্ত প্রেমের কবিতাই অবাস্তব
কবিরা লিখতে চায় প্রেমের কবিতা যেন অবাস্তব
তা-ই সবচেয়ে বাস্তব
৯
লুসিয়ান ব্লাগা লিখেছিল সেসব শব্দমালা
যারা কাঁদতে চেয়েছিল তাদের কান্না
কিন্তু পারেনি
আর আমি সেসব বলতে এসেছি।
ভূমধ্যসাগরের সাথে ক্ষণিকের কথোপকথন
আমি অন্যএক দিনের কথা দিয়ে শুরু করছি যেদিন
দেখা ভূমধ্যসাগরের সাথে ক্ষণিকের জন্য
যেন তা একজন ভোলে যাওযা অভিনেতার সাক্ষাত।
জেটির পথে হেঁটে হেঁটে শুনছি
সাগরের ঢেউয়ের শব্দ যেন
জো পেসসির এজমার কাশি
ভোলে যাওয়া অভিনেতার চেয়েও
সমুদ্র মনে করে দেয় মিশরের মমি
যা থাকে কায়রো মিউজিয়ামে।
তোমাকে নিয়ে কিছুই করার নেই, ক্যারিবিয় সমুদ্র,
আজ অপরাহ্নবেলায় তুমি এত প্রাণপ্রাচুর্যময়
মনে হয় যেন এই মাত্র জিম থেকে এলে।
আমি জানি না আমার ভাল লাগে কীনা
যখন তুমি তৃণভূমিতে
সিংহ যেমন শান্ত শুয়ে থাকে।
অথবা যখন তুমি রাগে গর্জে
উদ্যত হও সমুদ্রতটের পায়ু-সঙ্গমে
মারলিন মনরোকে যেমন করেছিল
‘দি লাস্ট ট্যাঙ্গো ইন প্যারিস’-এ।
শঙ্খচিল আর সামুদ্রিক চাতক
আঙ্গুল ফসকে পালায় যখন ধরতে যাও
মনে হয় যেনো তোমার বুক থেকে
ওদের তাড়াতে চাও, কিন্তু শক্ত শিকল
তোমাকে বেঁধে রাখে তুমি শুধু
অনর্থক চেচাতে থাকো চিৎকার।
সত্যি বলো, তোমার কি তোয়াক্কা নেই
সমুদ্রতরী ভরে দিচ্ছি যত পুরানো আর জঞ্জাল
ফেলছি এই সমুদ্রে?
ফেলে আসা দিনগুলোতে সৈকতে মিলতো
তোমার উপকূলে থাকা কত না সমুদ্র-গুল্ম
একজন টুরিস্ট দিয়ে গেলো সিফিলিস
আমি নিজে নিজে বললাম, কী কুৎসিৎ!
অবাক হলাম এটাই শেষ নয়।
বিপরীতে সুনামি পাঠালে
প্রতিশোধ আমাদের শহরগুলোকে
মুছে দিতে ম্যাপ হতে মিয়ামি
আবার ফিরে গেলে যেন রাখাল আগের মতোই
মেতে ওঠলে ঘাস খাওয়াতে তোমার বাতাসের পালকে
শান্তি আর সাচ্ছন্দ্যে
সমস্ত উপকূলে।
তোমাকে কী আর বলা যায়, তুমি তো আমার
আশৈশব সমুদ্র, তোমার ভাষা রপ্ত করতে
কেটে গেল আমার সমস্ত জীবন।
আমাদের দুজনেরই বয়স বাড়লো
তবু কালের এ যাত্রায়
চলে আসি তোমার এ বালুবেলায়
একই ভাবে নিস্কলুষ শৈশবের মতন
তোমার তটে হেঁটে হেঁটে
কুড়ালাম ঝিনুক, আমি আমার কানের
আর তোমার মাঝে তা রাখলাম
আর তুমি এই প্রথম আমার সাথে কথা বললে।





কমেন্ট করুনঃ