কুয়েত এয়ার ওয়েজ এর বিরিক্তকর ভ্রমণ শেষে যখন প্যারিসে নামি তখন ঝকঝকে সকাল। রোদের এই মোনালিসার মতো হাসি যেন ছিল একটি বাড়তি পাওনা। কারণ এর আগে যতবার এসেছি আকাশ ছিল মেঘলা, বিষণ্ন। এবারের ভ্রমণসঙ্গী আমার ছোট্ট বেলার বন্ধু আল আমিন। প্যারিস মেট্রোতে চড়ে হোটেলে পৌঁছেতে খুব বেশি সময় লাগলো না। এবারের হোটেল প্যারিসের বনেদি পাড়ায়, লুভর থেকে যার দূরত্ব মাত্র ২ মিনিট হাঁটা, নাম টিম হোটেল লা লুভর। আর্থিক দৈন্যতা থাকা সত্ত্বেও বনেদি পাড়ায় হোটেল নেয়ার কারণ হলো মিউজিয়ামগুলো থেকে হোটেলের দূরত্ব যৎসামান্য।হেটে যাওয়া যায়, ভাড়া বাঁচে। কিন্তু ট্যুরিস্ট এরিয়াতে হোটেল নেয়ার কিছু অসুবিধা ও আছে।
এবার আসা যাক হোটেলের বর্ণনায়। আমার ধারণা দুনিয়ার সবচেয়ে ছোট লিফটগুলো প্যারিস শহরে আছে। টিম হোটেলের লিফট ও তার ব্যতিক্রম না। লিফট এতোই ছোট যে দুটো ব্যাগ নিয়ে ঢোকার ব্যবস্তা নেই। লিফটে একবার একটি ব্যাগ নিয়ে রুমে রেখে নিচে নেমে আবার লিফটে আরেকটি ব্যাগ নিয়ে রুমে উঠতে হয়। তারপর হলো দুনিয়ার ছোট রুমের পাল্লায় প্যারিস দ্বিতীয় হবে! প্রথম হলো টোকিও। টোকিওর ডাবল রুমে বাজি ধরে বলতে পারি লাগেজসহ দুইজন মানুষ আটবে না। লাস্ট টোকিও ভিজিটে খাটের উপর একটি লাগেজ কোল বালিশ বানিয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম! প্যারিসের রুম টোকিওর চেয়ে কয়েক ইঞ্চি বড়। ১০ স্কোয়ার মিটার একটি অ্যাটাচ বাথসহ রুম।এতো ছোট রুমে আমার একটি অস্বস্তিকর সমস্যা হয়, সেটা হলো লাগোয়া বাথরুমে প্রাতকার্র্য সারার সময় যাবতীয় অবাঞ্ছিত শব্দ এবং গন্ধের অংশীদার হয় রুমের মধ্যে কেউ থাকলে। আমার সাথে থাকা বন্ধু প্রাতকার্য সারার সময় অবাঞ্চিত শব্দ রোধের একটি সমাধান বের করলো, তা হলো বাথরুমে মোবাইলে উচ্চ স্বরে টকশো চালানো! কিন্তু গন্ধ কি আর ঢাকা যায় !
ভ্রমণের ক্লান্তি দূরের ওষুধ হলো দারুণ একটি প্রাতরাশ। প্রাতরাশের জন্য খাঁটি ফরাসি এক রেস্টুরেন্ট বেছে নিলাম। নাম ক্যারেট। আর্ট ডেকো স্টাইলে করা এই পাতিশরী স্থাপিত হয়েছিল ১৯২৭ সালে বিখ্যাত তাদের হট চকলেট, ম্যাকারণ আর ক্রসেন এর জন্য। হট চকোলেটে হুইপ ক্রিম দিয়ে চেটেপুটে খাওয়াই আদর্শ। মজা করে খেয়ে বিল দেখে একটি কৌতূক মনে পড়লো।
ফ্রান্সের এক প্রত্যন্ত গ্রামে এক মার্কিন পর্যটক এক সরাইখানায় উঠেছেন। পরদিন সকালে ব্রেকফাস্টে তাকে দেয়া হলো এক কাপ কফির সঙ্গে এক টুকরো পাউরুটি, মাখন আর জ্যাম। মার্কিনিরা ব্রেকফাস্টে অনেক কিছু খায়। তিনি একটা ওমলেট চাইলেন।দাম দেবার সময় চক্ষু স্থির! ওমলেটের বেশ চড়া দাম ধরা হয়েছে।তিনি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন এখানে কি ডিম পাওয়া যায় না? সারাইখানার মালিক জানালেন যে, ডিম পাওয়া যায় কিন্তু মার্কিন পর্যটক পাওয়া যায় না! ক্যারেটে খেতে গিয়ে আমার অবস্থা সেই পর্যটকের মতই হলো!
প্যারিসে এসে সবাই যে জিনিষটা দেখার জন্য ছুটে তা হলো আইফেল টাওয়ার। ২০০৬ সালে আইফেল টাওয়ার দেখে বিরক্ত হয়েছি। বিরক্তির কাতারে খোদ কবিগুরুও আছেন। তিনি লিখিছিলেন ,”এক মস্ত দৈত্য তার সহস্র লৌহ কঙ্কাল নিয়ে আকাশে মাথা তুলে চার পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে” সত্যিই তাই।

তাই সেদিকে আর পা না বাড়িয়ে আমি ছুটলাম লুভরের দিকে। লুভরের ভার কোনো মানুষের মগজ নিতে পারবে না। বলা হয়ে থাকে লুভরের সবগুলো আইটেম এক মিনিট করে দেখলে ৬৪ দিন লাগবে শেষ করতে। লুভর মিউজিয়ামে ঢুকার পথে এই কাঁচের পিরামিডটা একটা দারুণ। পিরামিডটা বানানো হয় ১৯৮৯ এ। ১৯৮০ পরে ফ্রেঞ্চ গভর্মেন্ট মনে করলো প্রাসাদের এন্ট্রি টা একটু জাকজমক করলে কেমন হয়? তারা এক অদ্ভুত কাজ করলো। একজন চীনা আমেরিকানকে এর কাজ দিলো। তার নামটাও অদ্ভুত। তার নাম আইএম পাই। ফ্রেঞ্চ জনগণ ক্ষেপলো। একজন চীনা বংশোভূত আমেরিকান তাদের প্রাসাদে হাত দিবে! সে কি বুঝবে ফ্রেঞ্চ কালচার সম্পর্কে? এটা কি হতে পারে? পাইও ব্যাপারটাকে চালাঞ্জ হিসেবে নিলো। পাই চিন্তা করে সাজালো পৃথিবীর সব চেয়ে ভারী আয়োজন এক হালকা মেটেরিয়াল দিয়ে। কি সেটা? সে পিরামিড বানালো কাচ দিয়ে। কাচকে বাঁধলেন পলিশ করা সুন্দর ইস্পাত ফ্রেমে। কাচ আর ইস্পাতের প্রেম হলো। পাশে ঝর্ণা বানালেন এমন করে যেন মনে হয় পিরামিড পানিতে ভেসে আছে! দর্শক ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেলো এতো আলো! সাথে ইস্পাত আর কাচ ভেদ করে নীল আকাশ উঁকি দিচ্ছে পানির কলকল শব্দ ও কানে বাজছে! কি দারুন! এখন আইফেল টাওয়ারের পর এটা সর্বধিক দর্শনীয় স্থান।
নিন্দুকরা ‘পাই’ এর কাজে অবাক হলেও থেমে থাকলো না তার নিন্দা। রটালো পিরামিড হলো মৃত্যুর প্রতীক শয়তানের পূজা করতেই এই পিরামিড বানানো হয়েছে।এই পিরামিডে নাকি কাচের সংখ্যা ৬৬৬। মানে শয়তানের সংখ্যা !
কিন্তু সত্যি কি তাই?
আসলে কাচের সংখ্যা ৬৭৩!
লুভরের কিছু প্রিয় এবং অপ্রিয় (মোনালিসা) ছবির বর্ণনা দিলাম। কেন তা প্রিয় বা অপ্রিয় তাই বলার চেষ্টা করেছি।

Liberty lending people-Eugène Delacroix ছবিটা ফ্রেঞ্চ রেভুলেশনের উত্তাল সময় দেলাক্রোয়া এঁকেছিলেন। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র এক নারী। হাতে রাইফেল এবং ফরাসি রিপাবলিকের পতাকা হাতে এগিয়ে চলছে। জনতা তাকে অনুসরণ করছে। নারীর মাথায় ফিগরিয়ান ক্যাপ। রোমে দাস থেকে মুক্ত বন্দিদের এই ক্যাপ দেয়া হতো। এখানে নারী চরিত্রটিই মুক্তি। মুক্তি একটি আইডিয়া। আইডিয়া পোশাকের মুখোশ পরে থাকে না। তাই নারী চরিত্রটির উর্ধাঙ্গ অনাবৃত। পশ্চাৎপটে পুড়ছে প্যারিস। এক আহত তরুণ মুক্তির দিকে তাকিয়ে আছে, সেই তরুণ হলো ফ্রান্স! তার পোশাকটা দেখেন ফ্রান্সের পতাকার তিন রং আছে সেখানে। ছবিটা দেখে অপরাজেয় বাংলার কথা মনে পড়লো।

The wedding at Cana-Paolo Veroneseএই পেইন্টিংটা ল্যুভর সব চেয়ে বড় পেইন্টিং। ২২ ফুট লম্বা ৩২ ফুট চওড়া। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় একে সরিয়ে নেয়ার দরকার পড়েছিল তখন দু টুকরো করে কেটে সরাতে হয়েছিল! পরে আবার দু টুকরো এক সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কাটার সে দাগ এখনো আছে।ওল্ড টেস্টামেন্টের একটি ঘটনার উপর পেইন্টিং তা আঁকা। যিশু একটি ভোজে বসেছেন কিন্তু ওয়াইন শেষ হয়ে গেছে। তখন অলৌকিক ভাবে যিশু পানি কে ওয়াইন বানাচ্ছেন। তার অলৌকিক ক্ষমতা দেখে সবার চোখে মুখে বিস্ময় দেখা যাচ্ছে।

The virgin of the rocks-Leonardo da Vinci মোনালিসার চেয়ে ও এটা আমার বেশি প্রিয়। মেরি বসে আছেন একটা গুহায়। মেরির ডানদিকের শিশুটা জন ব্যাপটাস আর বাম দিকে শিশু যিশু। আরো বামে এক এঞ্জেল। মেরি মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন, কেমন যেন বিষন্ন। মোনালিসার হাসির চেয়ে এই বিষণ্নতা আমার কাছে আরো সুন্দর আরো রহস্যময়।

Coronation of napoleon-Jacques-Louis David দারুণ আর একটা বিশাল বড় পেইন্টিং। ফ্রেঞ্চ পেইন্টার দাভিদের আঁকা।নেপোলিয়নের রাজ্যাভিষেক চলছে। পোপকে পাত্তা না দিয়ে রাজা নিজেই মুকুট রানীকে পরাচ্ছেন! পোপ পেছনে গোমড়া মুখে বসে আছেন।সবার দৃষ্টি মুকুটের দিকে, শুধু পোপ নিচে তাকিয়ে আছেন। কি দারুণ নাটকীয়তা ফুটে উঠেছে।

The raft of Medusa-Théodore Géricault জেরিকোর এক দুর্দান্ত সৃস্টি। ১৮১৬ সালে ফ্রেঞ্চ কলোনি সেনেগালের কাছে নাবিকের অদক্ষতার কারণে সমুদ্রে মেডুসা নামের ফ্রেঞ্চ একটি জাহাজ বিকল হয়ে যায়।হাই অফিসিয়াল সবাই লাইফ বোটে করে জীবন বাঁচলেও ১৪৭ জন লোয়ার ক্লাস ক্রুকে তারা গভীর সুমুদ্রে রেখে চলে আসে। এই ১৪৭ জন একটি ভেলা বানান এবং সমুদ্রে নেমে পড়েন। শুরু হয় তাদের দুর্বিষহ যন্ত্রণা। খাদ্যের অভাবে বেশিরভাগ মারা যান। ক্ষুদার সেই যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে জীবিতরা মৃতদের মাংস খেতে শুরু করেন। অবশেষে ১৫ দিন পর তাদের উদ্ধার করে আর একটা শিপ। শেষ মুহূর্তের সেই ছবি এঁকেছেন জেরিকো। দুর্দান্ত কম্পোজিশন এবং কালার দেখার মতো। জীবিত ১৫ জনের সাথে মৃত পচা মানুষের গায়ের রঙের পার্থক্য দেখলে অবাক লাগে। একটি কুড়ালের উপস্থিতি ছবিকে আরো ভয়ঙ্কর করেছে। একদম নিচে একজন পিতা তার সন্তানের লাশ নিয়ে বসে আছেন। আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা সে হারিয়েছে। কি মাথা নষ্ট ছবি!

The card sharp with the ace of diamonds-Georges de La Tour জুয়া খেলা চলছে।খেলোয়াড়দের চোখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন কী হচ্ছে! কী মজার একটা ছবি। দারুণ নাটকীয়তা।

l’Astronome-Johannes VERMEER পৃথিবীতে ভেমিয়ারের পেইন্টিং খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন।এখন মাত্র ৩৬টা আছে। লুভে আছে দুটি। এর আগে ৫টা দেখেছিলাম মেট, নিউইয়রকে। এক্সট্রিম ডিটেলস এর জন্য ভেমিয়ার জগৎবিখ্যাত। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় এক লোক ভেমিয়ারের নাম নকল করে প্রচুর ছবি নাজিদের কাছে সেল করেছিল।পরে সত্য্ প্রকাশ পাওয়াতে ভেমিয়ার আলোচনায় চলে আসে। সবাই পাগলের মতো আসল ভেমিয়ার খুঁজতে থাকে। এই ছবিতে যে নীল রঙের কাপড় আছে তা আলট্রা মেরিন রঙে আঁকা। তখনকার দিনে এই উলট্রামেরিন রং ছিল ভীষণ দামি রঙ। স্বর্ণের চেয়ে নাকি এর দাম বেশি ছিল। তখনকার দিনে প্রচুর মেরি আঁকা হতো এই উলট্রামেরিন দিয়ে! শোনা যায় এই উলট্রামেরিন রঙ কিনতে কিনতে ভেমিয়ার দেউলিয়া হয়েছিলেন!

The Death of Sardanapalus-Eugène Delacroix এ খানে রাজা সারদানাপোলিস যুদ্ধে হেরে গেছেন। আত্মসমর্পণ শ্রেয় না মনে করে আত্মহত্যার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আত্মহত্যার জন্য সাথে নিচ্ছেন প্রিয় সব কিছু। আসবাব, প্রাণী আর দাসী! ঘোড়া আর দাসীরা ভীত তাদের চোখে, মুখে, শরীরে মৃত্যু আতঙ্ক। এ জিনিসও ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা যায়!

The intervention of sabina women-Jacques-Louis David এই অদ্ভুত ছবি দাভিদের আঁকা। দুই পাশে দুই দল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সে রণভঙ্গের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত কিছু নারী তাদের সন্তানসহ। মানুষের শরীরের এক্সট্রিম পসচার এখানে দেখানো হয়েছে দারুণভাবে। সাথে ইমোশনও! ইমোশন কেন বললাম। মধ্যের নারীগুলোর যুদ্ধ বন্ধের আকুতি ইমোশনাল। নারীদের সাথে এক দলের সম্পর্ক বাপ ভাই অন্য দলের সম্পর্ক স্বামী। রোমের প্রতিষ্টাতা রোমুলাস একবার আক্রমণ করে সাবিন নামের এক গোত্রকে। তারপর তারা অপহরণ করে সাবিনদের সব নারী দের এবং তাদের বিয়ে করে। পরে সাবিনার যখন আক্রমণ করে রোমানদের তখন সেই নারীরা বাধা দেন কারণ একদিকে তাদের বাপ অন্য দিকে স্বামী। বাংলাদেশ কেউ আঁকলে নাম হবে বাপ বড় না স্বামী বড়।

Monalisa-Leonardo da Vinci ১৯১১ সালে মোনালিস চুরি না হলে আজ কেউ এর খবরও রাখতো না। চুরি হবার পর সবার আগ্রহ জন্মায় কে চুরি করলো এই পেইন্টিং। পুলিশের সন্দেহের তালিকায় ছিল খোদ পিকাসো। এমন কি তারা পিকাসোকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে! পাবলিক দারুণ মজা পায়। ইন্টারন্যাশনালি নিউজ হয়। তার দুই বছর পর চোর মোনালিসাকে ফ্লোরেন্সের এক আর্ট ডিলারের কাছে বেচতে গিয়ে ধরা পড়েন এবং মোনালিসাকে তার আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়। পাবলিক আবার মজা পায় এবং মোনালিসাকে দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এই হুমড়ি খাওয়া এখনো চলছে। ভিঞ্চির শ্রেষ্ট কাজগুলো মোনালিসার পাশেই ঝুলছে কিন্তু কোনো ভিড় নেই।
এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

লুভরের ছবিজুড়ে নগ্নতার ছড়াছড়ি। আমার মতো বঙ্গ দেশীয় পুরুষের কাছে আর্টে নগ্নতা অস্বস্তির কারণ। কবিগুরু যেন বুঝতে পেরেছিলেন সেই অস্বস্তি। তার ভাষায় সে কি দারুণ করে বুঝিয়াছেন আর্টের এই নগ্নতা খুবই সাধারন একটি ব্যাপার।
‘সেদিন French Exhibition-এ একজন বিখ্যাত আর্টিস্ট রচিত একটি উলঙ্গ সুন্দরীর ছবি দেখলুম।কী আশ্চর্য সুন্দর। দেখে কিছুতেই তৃপ্তি হয় না ।সুন্দর শরীরের চেয়ে সৌন্দর্য পৃথিবীতে কিছু নেই— কিন্তু আমরা ফুল দেখি, লতা দেখি, পাখি দেখি, আর পৃথিবীর সর্ব প্রধান সৌন্দর্য থেকে একেবারে বঞ্চিত ।মর্ত্যের চরম সৌন্দর্যের উপর মানুষ সহস্তে একটা চির অন্তরাল টেনে দিয়েছে । কিন্তু সেই উলঙ্গ ছবি দেখে যার তিলমাত্র লজ্জাবোধ হয় আমি তাঁকে সহস্র ধিক্কার দিই।আমি তো সুতীব্র সৌন্দর্য-আনন্দে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলুম, আর ইচ্ছে করছিলো, আমার সকলকে নিয়ে দাঁড়িয়ে এই ছবি উপভোগ করি। বেলি যদি বড়ো হত (বেলির বয়স তখন ছয় বছর) তাকে পাশে নিয়ে দাঁড়িয়ে আমি এই ছবি দেখতে পারতুম।এরকম উলঙ্গতা কী সুন্দর! এই ছবি দেখলে সহসা চৈতন্য হয়— ঈশ্বরের নিজ হস্তরচিত এক অপূর্ব সৌন্দর্য পশু-মানুষ একেবারে আচ্ছন্ন করে রেখেছে এবং এই চিত্রকর মনুষ্যকৃত সেই অপবিত্র আবরণ উদ্ঘাটন করে সেই দিব্য সৌন্দর্যের একটা আভাস দিয়ে দিলে ।(পরিশিষ্ট: য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়রী)
লন্ডনে যাবার পথে প্যারিসে যাত্রা বিরতি করে ল্যুভর দর্শন করেন 1878 সালে।
ল্যুভর থেকে যখন বের হলাম তখন বিকেল। গোধূলির আলোতে প্যারিসকে দারুণ সুন্দর লাগছে। কিন্তু এই সুন্দর্য ভাটা পড়লো পেটের ক্ষিদার কাছে। পাশের এক রেস্তোরায় ঢুকে অর্ডার করলাম পুরো পুরি ফরাসি এক খাবার যার নাম “ফ্রয়ে গা”।খাবারটার বিবরণের আগে একে নিয়ে একটু ইতিহাস কপচাই। প্রাচীনকালে এজিপ্টিয়ানরা দেখলো শীতকালে হাঁস একটু বেশি খাওয়াদাওয়া করে সে সময় তাদের কলিজা একটু বড় হয় অন্য সময়ের চেয়ে। শুরু হলো হাঁসের উপর অত্যাচার জোর করে খাইয়ে তাদের কলিজা বড় করে খেতে লাগলো। তাদের থেকে এটা শিখলো রোমানরা। তারা আবার এক ডিগ্রি উপরে হাঁসকে জোর করে খাওয়াতে লাগলো মিষ্টি ডুমুর তাতে কলিজার মজা আরো বাড়লো। শেষ পেরেকটা মারলো রাজা লুই XVI সে ফয়ে গা কে তকমা দিলেন “The Dish of Kings”আরো বেড়ে গেলো এর চাহিদা। জোর করে হাঁসকে ভুট্টা খাইয়ে তাদের লিভার দিয়ে তৈরি হয় এই ফয়ে গা। রুটি দিয়ে মাখনের মতো মেখে খেতে দারুণ।
ডিনার শেষে শেন নদীর তীরে হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যার প্যারিস দেখছিলাম। গোধূলির শেষ আলোকবিন্দু মিলিয়ে যেতে টিম টিম করে জ্বলে উঠছে বৈদ্যুতিক বাতি। খুব সুন্দর লাগছিলো শহরটাকে। খুব সুন্দরের পাশে মন খারাপ লাগে। সুনীলের একটি কবিতা মনে পড়লো ,
প্যারিস নতুন হোক! অবিকল আমার বিষাদ!
অচল হৃদয়ে সব স্মৃতি যেন পাষাণ ফলক;
পুরাতন উপকণ্ঠ, পথ, ভাঙা, নতুন প্রাসাদ
হ’য়ে ওঠে সেখানে প্রণয়চিহ্ন, কঠিন রূপক ।
চলবে..
শেয়ার করতে:





কমেন্ট করুনঃ