অনেকদিন আগের কথা। কলকাতার একজন বাগ্মী নেতা আমাদের জেলায় এক কৃষক সমাবেশে সুদীর্ঘ ভাষণ দেবার পর সভায় উপস্থিত একজন বৃদ্ধ কৃষককে জিজ্ঞেস করেছিলামÑকেমন লাগল? উত্তরে তিনি বলেছিলেনÑ“ নেতায় তো কইছুইন ভালা, খালি অত কইলকাত্তি না কইয়া যদি এট্টু বঙ্গভাষাত কইতাÑ।” অর্থাৎ নেতা তো বললেন খুব ভালো কিন্তু এত কলকাতার ভাষা না বলে একটু বাংলাভাষায় বলতেন!
[গানের বাহিরানা : লোকসংগীত, উপভাষা, উপমা ও উচ্চারণ, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, পৃষ্ঠা ৯৫, প্যাপিরাস, কলকাতা, আশ্বিন, ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ]
উপরোক্ত উদ্ধৃতিগুলোর আলোকে নির্দ্বিধায় বলা যায়, ভাষা কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। এই সত্যের ব্যাপারে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই। অকথিত আফছার বিন আব্বাসের গান সেই সাক্ষ্য বহন করে। তিনি ভাষাকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন, যা সরাসরি মানুষের হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে, তাদের যন্ত্রণা, ক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং আশার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। লোকজ ভাষার সহজ অথচ গভীর আবেদনে তিনি মানুষের সঙ্গে এক আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন, যা কোনো প্রচারমাধ্যম ছাড়াই পৌঁছেছিল জনপ্রিয়তার শিখরে।
আফছার বিন আব্বাস ছিলেন শোষিত-নিপীড়িত মানুষের প্রকৃত বন্ধু ও আত্মার আত্মীয়। তিনি চাষা-ভুষা, মুটে-মজুরদের মানসপট গভীর মনোযোগ দিয়ে পাঠ করতেন এবং তাঁদের জীবন ও সংগ্রামের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর গান এবং সাহিত্য তাই শুধু শিল্প নয়, হয়ে উঠেছিল নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। বলা যায়, তাদের মনস্তত্ত্বের সঙ্গে বিলীন হয়ে গিয়ে নিজেই হয়ে উঠেছিলেন তাদের প্রতিচ্ছবি।
তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গান আশির দশকে গাইবান্ধা-রংপুর অঞ্চলে আঞ্চলিক ভাষায় গাওয়া হতো এবং এখনও স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তিনি মানুষের অন্তরের শিল্পী হয়ে ছিলেন এবং এখনো তাঁর গান রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক।
আফছার বিন আব্বাসের গানের উল্লেখযোগ্য বিষয়বস্তু ও তাৎপর্য হলোÑ মানবিকতা ও সমাজচেতনা এবং আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার ও সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা। আফছার বিন আব্বাসের গানে যে গভীর মানবিকতা ও সমাজচেতনা রয়েছে, তা আজও বিরল। তিনি নিছক বিনোদনের জন্য গান লেখেননি; বরং সমাজের প্রান্তিক মানুষের যন্ত্রণা, প্রতিবাদ ও স্বপ্ন তাঁর গানের উপজীব্য।
গাইবান্ধা-রংপুর অঞ্চলের ভাষায় গান রচনা করে তিনি স্থানীয় সংস্কৃতি ও অনুভূতির প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। প্রচারবিমুখ এই মানুষটি নিজের খ্যাতির পেছনে না ছুটে তিনি যে নীরবে কাজ করে গেছেন, তা তাঁকে একজন আদর্শবাদী সাংস্কৃতিক কর্মীতে রূপান্তর করেছে। তাঁর গানগুলো আজও সমাজের নানা বঞ্চনা ও বৈষম্যের প্রেক্ষিতে আলোচ্য এবং প্রেরণার উৎস।
আফছার বিন আব্বাসের জন্ম ১৯৫২ সালের ১ ডিসেম্বর গাইবান্ধা জেলার সাদুল্যাপুর উপজেলার কামারপাড়া ইউনিয়নের কিশামত বাগচী গ্রামে। তাঁর পিতা আব্বাস আলী সরকার ও মাতা আছিয়া খাতুনের ১০ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় এবং ভাইদের মধ্যে সবার বড়। লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক জগতে তিনি ‘আফছার বিন আব্বাস’ নামেই বেশি পরিচিত।
ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন আফছার। স্থানীয় লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ১৯৭০ সালে লক্ষ্মীপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পাস করেন। কিন্তু কলেজে ভর্তি হওয়ার আগেই পিতার মৃত্যু তাঁর জীবনে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সংসারে নেমে আসে দারিদ্র্য। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি বাধ্য হন পড়াশোনা ছেড়ে ছোট ভাই-বোনদের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে।
স্বপ্ন ও সংগ্রামের পথ বেয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধের অল্প কিছুদিন আগে একেবারে শূন্যহাতে চলে যান নারায়ণগঞ্জে। সেখানে এক আত্মীয়ের আশ্রয়ে থেকে গৃহশিক্ষকতা শুরু করেন। একই সময়ের মধ্যেই শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় মাথায় করে চালের বস্তা বয়ে এনে অসহায় পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেনÑএতেও প্রতিফলিত হয় তাঁর গভীর মানবিকতা ও দেশপ্রেম।
স্বাধীনতার পরে জীবিকার প্রয়োজনে তিনি নিজ উদ্যোগে শুরু করেন ডাইং ব্যবসা। কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠায় তিনি সফলতা লাভ করেন এ ক্ষেত্রে। তবে ব্যবসার বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়Ñ তিনি সমাজচেতনায় দীপ্ত, শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলা একজন সংগীতস্রষ্টা।
আফছার বিন আব্বাসের সাংস্কৃতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল ছোটবেলাতেই। স্কুলজীবনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত গান পরিবেশন করতেন। সংগীতের প্রতি এই আকর্ষণ কখনো স্তিমিত হয়নি। পরবর্তী সময়ে কর্মজীবনের নানা ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি গান লেখা ও গাওয়াÑদুই-ই চালিয়ে যান এবং এর মধ্যে দিয়েই উঠে আসে তাঁর ভেতরের শিল্পীসত্তা।
নারায়ণগঞ্জে অবস্থানকালে তাঁর সাহিত্য প্রতিভা নতুন করে বিকশিত হতে থাকে। সেখানে তিনি সখ্য গড়ে তোলেন সেসময়ের উদীয়মান ও খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের সঙ্গে। তাঁর সাহচর্যে ছিলেন গল্পকার সুমন মাহবুব, ছড়াকার ইউসুফ আলী এটম, কবি ও সাংবাদিক হালিম আজাদ, নাহিদ আজাদ, ওয়াহিদ রেজা, বজলুর রায়হান প্রমুখ। এই গঠনমূলক সাংগঠনিক পরিবেশ তাঁর সাহিত্যসাধনাকে একটি সুসংহত রূপ দেয়।
তিনি নারায়ণগঞ্জের জনপ্রিয় সাহিত্যপত্রিকা ‘ড্যাফোডিল’ ও ‘দারুচিনি’-তে নিয়মিত কবিতা লিখতেন। তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল ছড়াকার হিসেবে। শুধু স্থানীয়ভাবে নয়, ছড়াকার হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি রয়েছে জাতীয় পর্যায়েও। এমনকি তাঁর লেখা ছড়া লন্ডন থেকে প্রকাশিত ছোট কাগজে ছাপা (হতো), যা তাঁর সাহিত্য প্রতিভার প্রভাব ও বিস্তারের স্পষ্ট প্রমাণ।
তাঁর গানের বাণী, ছড়া ও কবিতায় উঠে আসে শ্রমজীবী ও অধিকার-বঞ্চিত মানুষের গল্প ও জীবনসংগ্রাম। নিছক অলংকার নয়, বরং তাঁর শিল্প ছিল প্রতিবাদ, সচেতনতা এবং মানবিকতার উজ্জ্বল রূপ।
আফছার বিন আব্বাস ছিলেন এমন একজন ছড়াকার, যিনি শব্দের কারিগর হিসেবে নয়, বরং মানুষের ভাষ্যকার হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর ছড়া, কবিতা ও গানে ছিল মাটির গন্ধ, মানুষের কান্না, প্রতিবাদের ভাষা। তিনি শহুরে মোহ কিংবা সাহিত্যিক আড়ম্বর নয়Ñ প্রান্তিক মানুষের মুখের ভাষায় তাদেরই কথা বলতেন। এটা তাঁর সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর লেখালেখি ছিল শোষণবিরোধী সংগ্রামের অনুবাদ।
আফছার বিন আব্বাসের সাহিত্যসাধনার গভীরতা ও বিস্তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রথিতযশা ছড়াসাহিত্যিক মুক্তিহরণ সরকার বলেন:
আফছার বিন আব্বাস নারয়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন অতিবাহিত করলেও তাঁর সাহিত্যকর্ম স্থানীয় অনেকের চেয়ে বেশি (দশক হিসেবে হেরফের হতে পারে)।
[আমার দেখা গাইবান্ধার সাহিত্যচর্চার মিনি ফিরিস্তি, প্রাচীন গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি ও মুকুন্দদাসের যাত্রাপালা, মুক্তিহরণ সরকার রচনাসমগ্র, সম্পাদনা: সাইফুল ইসলাম, পৃষ্ঠা: ২০৩, ঢাকা, ২০০৪]
এই মূল্যায়ন প্রমাণ করে, আফছার বিন আব্বাস কেবল একজন সাংস্কৃতিক কর্মী নন, তিনি ছিলেন মানুষের প্রাণের সঙ্গে সংযুক্ত দুর্লভ কণ্ঠস্বর, যাঁর লেখা নিঃশব্দে প্রতিবাদ হয়ে আজও ধ্বনিত হয়।
১৯৮০ সাল পর্যন্ত আফছার বিন আব্বাসের ব্যবসা বেশ ভালোই চলছিল। তবে পারিবারিক অসহযোগিতা ও নানা প্রতিকূল কারণে এক সময় ব্যবসায় ধস নামে। বাধ্য হয়ে ১৯৮১ সালে তিনি ফিরে আসেন গাইবান্ধার নিজগ্রামেÑএকেবারে শূন্য হাতে। শুরু হয় জীবনের এক নতুন অধ্যায়, যা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও সংগ্রামী।
চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও থেমে থাকেননি তিনি। শিল্প-সাহিত্যচর্চায় অব্যাহত রাখেন নিজেকে। এই সময় স্থানীয়ভাবে যুক্ত হন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রাজ্ঞ সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মুক্তিহরণ সরকার। উদীচীর সাংগঠনিক আদর্শ এবং গণমানুষের প্রতি দায়বদ্ধ সাংস্কৃতিক কার্যক্রম তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে গণসংগীত রচনায়। শোষণ, বঞ্চনা ও সামাজিক হাহাকারের বিষয়বস্তু নিয়ে তিনি গান লিখতে শুরু করেন এবং সেগুলোর অধিকাংশে নিজেই সুরারোপ ও পরিবেশনা করতেন।
একই সময়ে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত হন এবং জীবিকার জন্য স্থানীয় কামারপাড়া বাজারে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। তবে ব্যবসা ছিল শুধু জীবনধারণের উপায়, প্রকৃত আত্মনিয়োগ ছিল ভাওয়াইয়া চর্চা ও উদীচীর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। তাঁর এ একনিষ্ঠতা শিল্পসাধনার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার সাক্ষ্য দেয়।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকে আফছার বিন আব্বাস সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মী হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও গণমানুষের মুক্তির সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এই সময় গান, কবিতা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি গণচেতনা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যান। তাঁর এই স্পষ্ট অবস্থান ও সংগ্রামী ভূমিকার কারণে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের রোষানলে পড়তে হয় তাঁকে। হুমকি, অপমান, এমনকি নিপীড়নের মধ্যেও তিনি আপসহীন থেকে এগিয়ে যান নিজের আদর্শিক পথেÑগণমানুষের পাশে, শিল্প ও প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে।
এই সংগ্রামী সময়পর্বে আফছার বিন আব্বাসের প্রধান হাতিয়ার ছিল তাঁর নিজস্ব ধাঁচে রচিত ‘গণভাওয়াইয়া’Ñযা ছিল ভাওয়াইয়ার ঐতিহ্যিক সুর ও ছন্দে বাঁধা এক নতুন ধারা, যেখানে প্রতিফলিত হতো খেটে খাওয়া মজুর-শ্রমিক মানুষের জীবনসংগ্রাম, বঞ্চনা ও যন্ত্রণা। এই গানগুলো তিনি রচনা করতেন সরাসরি গণমানুষের মুখনিসৃত ভাষায়, তাদের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার গভীরতা থেকে। তাঁর লেখা এসব ভাওয়াইয়া গান স্থানীয় এলাকায় দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। গণআন্দোলনে, সাংস্কৃতিক সভায় কিংবা কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশে এসব গান হয়ে ওঠে প্রতিবাদের অনন্য ভাষা। শুধু আফছার বিন আব্বাসই নন, উদীচীর আরেক একনিষ্ঠ সংগঠক ও তাঁর সংগ্রামী সহযোদ্ধা শিল্পী রণজিৎ সরকার-ও এসব গান গেয়ে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন জাগরণ। এই গানগুলো সাধারণ মানুষের মনে যে আলো ছড়িয়ে দিত, একইভাবে তা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিক ও দুর্বৃত্তদের কাছে ছিল যেন এক একটি ‘বিষমাখানো তীর’Ñযা চিরে দিত তাদের মুখোশ। সেখানেই শিল্পী আফছার বিন আব্বাসের শক্তি ও সাহসের প্রকৃত প্রকাশ ঘটে।
এই প্রসঙ্গে উদীচীর একনিষ্ঠ কর্মী, আফছার বিন আব্বাসের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা শিল্পী রণজিৎ সরকার বলেন:
আফছার বিন আব্বাসের গানের বাণী আর নিজের করা সুরে খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে গণমানুষের জীবনের বাস্তব ছবি। কিছু কিছু গানে রয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ, আবার কিছু গানে শুধু মানুষজনের যাপিত জীবনের কষ্ট, হাহাকার, দুর্দশার চিত্র। সব গানেই হয়তো সংগ্রামের স্পষ্ট আহ্বান নেই, কিন্তু গণমানুষের বঞ্চনার কথা, তাদের হৃদয়ের যন্ত্রণা, তাদের মুখের ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। এটাই তো গণসংগীতের মূল চেতনাÑমানুষকে সচেতন করা, বাস্তবতা তাদের নজরে আনা। সেই জায়গা থেকেই আমরা এসব গানকে বলি ‘গণভাওয়াইয়া’।
রণজিৎ সরকার আরও বলেন:
যেমন উনি লিখেছেন ‘তোরা ভয় করিস ভাই কোন ব্যাটার আর কোন শালার’, ‘প্যাটে ক্ষুদা দাউ দাউ জ্বলে, ধুঁকি মরি না খায়া’, কিংবা ‘নেকাপড়ার চিন্তা করা হামার ঘরে’, অথবা ‘তোরা ভয় করিস ভাই কোন ব্যাটা আর কোন শালার’Ñএই গানগুলোতে উঠে এসেছে গণমানুষের ক্ষুধা, লাঞ্ছনা, অপমান আর প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর। এখানে কোনো রঙ্গরস নেই, নেই নিছক বিনোদনের ছায়া। আছে এক গভীর জীবনবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আত্মিক সংযোগ।
এই মূল্যায়নেই স্পষ্ট হয়, আফছার বিন আব্বাসের গান কেবল সুরের খেলা নয়, বরং একটি কালজয়ী সামাজিক দলিল, যা দরিদ্র মানুষের জীবনের ভাষ্য হয়ে উঠেছে।
নিজের লেখা গান স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও আফছার বিন আব্বাস কখনোই নিজেকে প্রচারের আলোয় আনার চেষ্টা করেননি। তিনি কখনোই সরকারি প্রচারমাধ্যম- বেতার বা টেলিভিশনের দ্বারস্থ হননি। গীতিকার বা শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য কোনো আবেদনও করেননি কখনো। তাঁর কাছে গান ছিল আদর্শের প্রকাশ, প্রতিবাদের ভাষা এবং মানুষের কথা বলার হাতিয়ারÑযা কোনো স্বীকৃতির মুখাপেক্ষী ছিল না।
অথচ আশ্চর্যের বিষয়, আফছার বিন আব্বাসের সমসাময়িক অনেক স্থানীয় গীতিকার তখন সরকারি বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত হয়ে “গীতিকবি” হিসেবে পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। তাঁরা হয়তো নিয়মিত প্রচারমাধ্যমে গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন বা প্রচার পেয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও, গণমানুষের হৃদয়ে যে অনুরণন সৃষ্টি করেছিলেন আফছার বিন আব্বাস, তাঁর গানের যে জনপ্রিয়তা এবং আবেগঘন সংলগ্নতা ছিল খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের সঙ্গে, তা তারা কেউই ছুঁতে পারেননি।
আফছার বিন আব্বাসের গান ছিল জনমানুষের মুখ থেকে উঠে আসা ভাষায়, তাদেরই যন্ত্রণা ও প্রতিবাদকে প্রতিধ্বনিত করে রচিত। এজন্যই তাঁর গানগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছিল প্রচারমাধ্যম ছাড়াই, শুধুই মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।
এই নীরব অবস্থানেই ফুটে ওঠে তাঁর শিল্পীসত্তার স্বকীয়তা ও আত্মমর্যাদা। তিনি গান লিখেছেন, সুর করেছেন, গেয়েছেন- কেবল মানুষের জন্য, মানুষের কথা বলে যেতে। সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির বাইরেও তাঁর গান হয়ে উঠেছে গণমানুষের কণ্ঠস্বর।
সময়ের পরিক্রমায় তীব্র হয়ে ওঠে আফছার বিন আব্বাসের অর্থনৈতিক দৈন্য। পরিবার-পরিজন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্বপ্নÑসবকিছু টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এই কঠিন বাস্তবতায় তাঁর জীবন যেন বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই সময়ে পাশে দাঁড়ান শুভাকাক্সক্ষীরা। বিশেষত কামারপাড়া উদীচীর অন্যতম সংগঠক ও সাংবাদিক মুক্তিহরণ সরকার এবং অন্য সহযোদ্ধারা তাঁকে উৎসাহ ও পরামর্শ দেন আবার ঢাকায় ফিরে নতুনভাবে জীবন গড়ার জন্য। অবশেষে ১৯৯২ সালে, দীর্ঘদিন পর তিনি আবার ফিরে আসেন রাজধানী ঢাকায়Ñহাত খালি, কিন্তু মনে ছিল আবারও কিছু করে ওঠার প্রত্যয়।
ঢাকায় ফিরে গণমাধ্যমকেই তিনি জীবিকার পাথেয় হিসেবে বেছে নেন। একে একে যুক্ত হন দৈনিক সবুজ বাংলা, ভোরের কাগজ, ডেইলি ডেস্টিনি, অর্থনীতি প্রতিদিন, ভোরের পাতা, বণিক বার্তা-সহ একাধিক পত্রিকায়, যেখানে তিনি সম্পাদকীয় সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন প্রকাশনা সংস্থা ‘আগামী’-তেও, যেখানে তাঁর সাহিত্যসংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ পান। এই সময়টিও ছিল তাঁর জীবনের আরেকটি সংগ্রামী পর্ব- যেখানে জীবনযাত্রা চালিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনে তিনি লেখার পেশাকে পেশাগত স্তরে নিয়ে যান, কিন্তু নিজের ভেতরের শিল্পীসত্তা ও আদর্শচর্চা থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।
এখানে আফছার বিন আব্বাসের একটি অসামান্য শক্তিশালী গণভাওয়াইয়া তুলে ধরছি, যেখানে তীব্র শ্রেণিচেতনা ও বঞ্চিত মানুষের অভিজ্ঞতা ভাওয়াইয়ার সুরে এবং লোকজ ভাষায় অত্যন্ত জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে। গানটির প্রতিটি পঙ্ক্তি যেন এক একটি সামাজিক দলিল, যা নিপীড়িত শ্রেণির দুঃখ-দুর্দশার জীবন্ত চিত্র অঙ্কন করে। গানটির পঙ্ক্তিগুলোর পাশে অর্থ বা ব্যাখ্যাসহ সংক্ষিপ্ত টীকা দেওয়া হলো, যাতে পাঠকের কাছে ভাষা ও ভাব স্পষ্ট হয়:
হামরাগুল্যা১ কীÑ
চের জেবন বোজা টানা ওমার চাকর-ঝি?
ওমরাগুল্যা২ হামারঘরোক৩ মানুষ থুচে৪ কি ॥
ক্ষিদ্যার ঠেলায় হামার৫ যকোন৬ জেবন বাড়ায়
ওমরা তকোন মুরগি খায়া ভুঁড়ি চাড়ায়৭।
স্যুট পিন্দিয়্যা গাড়ি হাঁকায়
কাপড়া ব্যাগরে৮ হামরা যকোন উদ্যামে৯ থাকি ॥
হামার যকোন পোড়া অইদোত১০ মাতা ঘুর্যায়
ওমরা তকোন ফ্যানের তলোত১১ শরীল জুড়্যায়
জাড়োত১২ ঘুম্যায় ন্যাপের তলোত
খ্যাতা ব্যাগরে হামরা যকোন ঠকঠকে কাঁপি ॥
১ = আমরা, ২ = তারা, ৩ = আমাদের, ৪ = রেখেছে, ৫ = আমাদের, ৬ = যখন, ৭ = স্ফীত করা, ৮ = বিহনে, ৯ = উদোম, ১০ = রোদে, ১১ = নিচে, ১২ = শীতে।
নিঃসন্দেহে এই গান কেবল অভাব বা কষ্টের প্রকাশ নয়Ñএটি শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে এক নির্মম বাস্তব চিত্র। আফছার বিন আব্বাস এখানে ‘ওমরা’ বনাম ‘হামরা’Ñএই দুই শ্রেণির মাধ্যমে শোষক বনাম শোষিত শ্রেণির দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছেন। ভাওয়াইয়ার সহজ, লোকজ ছন্দ ব্যবহার করে তিনি শক্তিশালী রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, যা সত্যিকার অর্থেই “গণভাওয়াইয়া”-র সংজ্ঞায় পড়ে।
আফছার বিন আব্বাসের অসাধারণ ও হৃদয়স্পর্শী আরেকটি গণভাওয়াইয়াÑ যেটিতে গ্রামীণ খেটে খাওয়া মানুষদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম, অনাহার, আর অসহায়ত্বের চিত্র যেন রক্তে লেখা এক কবিতা হয়ে উঠেছে। লোকজ শব্দভাণ্ডার ও ভাওয়াইয়ার ছন্দে এটি একটি শক্তিশালী শ্রেণিচেতনামূলক সংগীত, যেখানে আক্ষেপ, ব্যথা ও প্রতিবাদের ধ্বনি একসঙ্গে মিশেছে।
কামলা থাকি উটি গেইছে নক্কীপুরের হাটোত
ঘাটোর দিকি চাতে চাতে বেলা গেল পাটোত
উপ্যাস থাকা ছইলগুল্যা আর নিন্দ তো আইসে না
অ্যালাও কেনা মরার ব্যাটা খাবার আনে না ॥
কাইলক্যা থাকি খায়া আছি দুকন্যা করি উটি
মাইনষের চুয়ার পানি খায়া ভিজাইছি যে টুটি
ন্যাছরাদেওয়া ঠ্যাং দুখ্যান আর শরীল টানে না ॥
অ্যালাও কেনা মরার ব্যাটা…
অ্যাকদিন যুদিল কাম করে তার দুইদিন থাকে বসি
সেদিন বুঝি কামলার ঘরোত তালাক-নিক্যা বেশি
হামার দুঃখের খবর কি রে খোদায় জানে না ॥
অ্যালাও কেনা মরার ব্যাটা…
আটা আনে না চাউল আনে কেমন করি কম
জাইবর্যা দুকন্যা আনতো মাইয়্যাঁ চুলাটা ধরাম
ক্ষিদ্যার জ¦ালায় ছোট চ্যাংড়াটা নিনতো আইসে না ॥
অ্যালাও কেনা মরার ব্যাটা…
এই গানে মূর্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের প্রান্তিক কৃষিশ্রমিক ও দিনমজুর শ্রেণির এক নির্মম বাস্তবতা। ‘অ্যালাও কেনা মরার ব্যাটা খাবার আনে না’Ñএই পঙ্ক্তিটি শুধু রাগ নয়, এটা এক ধরনের অসহায়ত্বের প্রকাশ, যেখানে রাষ্ট্র, সমাজ বা প্রভুÑকেউই খাদ্য বা সহানুভূতি দেয় না। ভাষাটি একেবারে লোকজ, আঞ্চলিক এবং বাস্তবতার মাটিতে গড়া। এই সরল অথচ গভীর ভাষায় আফছার বিন আব্বাস তুলে ধরেছেন অভিজ্ঞতা, নয় কল্পনা। তিনি একদিকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ, অন্যদিকে শিকড়ের সংস্কৃতিকে আঁকড়ে রেখেই তার কথা বলেছেনÑএখানেই তাঁর গণভাওয়াইয়া ধারা বিশেষ হয়ে ওঠে।
আফছার বিন আব্বাসের আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গণভাওয়াইয়ার শুরুর কথাগুলো তুলে ধরছি এখানে। যেগুলো আরও অনন্য ও বাস্তবভিত্তিক নিদর্শন, যা তাঁর সৃষ্টির বৈশিষ্ট্যকে গভীরভাবে তুলে ধরে। এই গানের লাইনগুলোতে খাদ্যাভাব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দরিদ্র মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম, গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের নিত্যদিনের অসহায় বাস্তবতা এবং নারীর জীবনসংগ্রামের গভীর বর্ণনাÑ সবকিছুই ধরা আছে একেবারে মাটি-ছোঁয়া লোকজ ভাষায়, কিন্তু তার পেছনে রয়েছে এক তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক এবং সামাজিক বোধ। যেমন :
১. হায় হায় চাউল কোন্টে পাম
কোন্টে ফলের খোঁজোত যাম
ত্যাল কারব্যা কাচোত চাম
পিঁয়্যাজ মইরচেরো তো কাম
ভরদুপুরোত আইসচে জামাই
ঝরেয়া মাতার ঘাম ॥
২. কচুর মাইঞ্জ আর কচুর ফুলের ভত্তা কইরচোম
ভাতের চাউল কম আচিল তাই পানি দিচোমৎ
তোমার ভালো নাগে দেকি
চাইট্টা ঢেঁকিয়্যা শাগও তুলচোম গো ॥
৩. সারাদিনে থাকে পড়ি
নুনের মালাই চাউলের হাঁড়ি
ত্যালের শিশুত থাকে না ত্যাল
এমনি করি জেন্দেকিট্যা গ্যাল্ ॥
লোকজ ভাষার ছন্দে এসব গান শুনতে সহজ ও সাবলীল হলেও, এগুলোর ভিতরে রয়েছে শ্রেণি-সংঘাত, সামাজিক ব্যঙ্গ এবং অভিযোগ। এগুলো শুধু গান নয়, বরং একটা সামাজিক নথি বা দলিল, যেখানে একটি সময়ের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অবস্থার আভাস পাওয়া যায়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ দশকে আব্বাসউদ্দীন যখন “নদীর নাম সই কচুয়া, মাছ মারে মাছুয়া” গানটি রেকর্ড করতে চাইলেন, রেকর্ড কোম্পানির কর্তারা এতে আপত্তি তোলেন- গানের ভাষা নাকি “অশিক্ষিত” এবং “গ্রাম্য”। তাদের যুক্তি ছিল, শহুরে শ্রোতাদের রুচি মেটাতে হলে গানটি ‘ভদ্র’ ভাষায় রূপান্তরিত করতে হবে। ফলে সুর ঠিক রেখে কাজী নজরুল ইসলামকে দিয়ে ভাষা পাল্টিয়ে করা হয়: “নদীর নাম সই অঞ্জনা, নাচে তীরে খঞ্জনা”।
এই রূপান্তর শিল্পীর মনে ক্ষত সৃষ্টি করলেও তিনি থেমে যাননি। বরং ভাষার এই শুদ্ধতার নামে লোকজ আবেগকে সংকুচিত করার বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিলেন। হেমঙ্গ বিশ্বাস যথার্থই বলেছিলেন, “এই ভদ্র ভাষার ব্যবহার ছিল পাখির ডানা কেটে নেওয়ার মতো।” মূল গানের প্রাণ ছিল যে ভাষায়- সেই মাটি-ঘেঁষা শব্দমালা হারিয়ে যাওয়ায় গানটি তার স্বাভাবিক গতি ও আবেদন হারিয়ে ফেলে। এর বিপরীতে আব্বাসউদ্দীনের ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’, ‘ওকি গাড়ীয়াল ভাই’, ‘ওকি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে’ গানগুলো বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে- কারণ, এগুলো লোকের ভাষায়, লোকের জীবনের কথা বলেছে। ‘অঞ্জনা-খঞ্জনা’র পরিপাটি ভাষা শ্রোতার হৃদয়ে পৌঁছাতে পারেনি, কিন্তু ‘কচুয়া-মাছুয়া’র আভাসে ভরপুর গানগুলো হয়ে উঠেছে মানুষের আপন।
এটা প্রমাণ করে, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়Ñএটি সংস্কৃতি, শ্রেণি ও চেতনার বহনকারীও। গ্রামীণ মানুষের গানকে যদি শহুরে রুচির ‘ছাঁচে’ ঢালতে হয়, তবে তা গানের প্রাণনাশের শামিল। আব্বাসউদ্দীনের অভিজ্ঞতা যেমন প্রমাণ করে ভাষার প্রতি শ্রদ্ধার প্রয়োজন, তেমনি আফছার বিন আব্বাসের গানও একইভাবে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়Ñলোকভাষাই মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর প্রকৃত সেতু।
১৯৯৪ সালের ২৪ আগস্ট গাইবান্ধার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের প্রতাপ গ্রামের জালাল উদ্দীন সরকার ও রাবেয়া খাতুন দম্পতির বড় মেয়ে জাহানারা বেগমকে বিয়ে করেন আফছার বিন আব্বাস। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় এক ছেলে ও এক মেয়েÑ জাহিদ হাসান আনন ও আনেতার সরকার ময়ূরী, দুজনেই পিতার আদর্শ ও চর্চার ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয়েছেন সংগীত সাধনায়।
তবে ব্যক্তিজীবনের এই শান্তি ও স্থিতির আড়ালে ছিল সীমাহীন দারিদ্র্য, অনবরত সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ। সারাজীবন ধরে তিনি লড়েছেন কেবল অর্থনৈতিক অনটনের বিরুদ্ধে নয়, বরং অন্যায়, অবিচার ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধেও। শিল্প, সংগীত ও লেখাকে তিনি ব্যবহার করেছেন অস্ত্র হিসেবেÑকখনো নিজের প্রচারের জন্য নয়, বরং সমাজ বদলের লক্ষ্যেই।
এই সংগ্রামী জীবনে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও ছিল না তাঁর। সঞ্চয় বা স্বস্তি ছিল না কোনো রূপেই। অথচ কোনো অভিযোগ নেই, নেই কাতরতা। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থেকেছেন আত্মপ্রচারবিমুখ, শান্ত, অথচ দৃঢ়। মানুষের সাথে দুর্ব্যবহারের নজির নেই তার জীবনে। বিত্ত-বৈভব ছিল না, কিন্তু তার মধ্যে ছিল অনুসরণীয় শিষ্টাচার।
এই অনালোচিত গীতিকবি ও শিল্পী ২০১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। রেখে যান গান, স্মৃতি, এবং এক অনবদ্য সংগ্রামী জীবনের দৃষ্টান্তÑযা আজও অনুপ্রেরণা হয়ে আছে ভাওয়াইয়া ও গণসংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে।
সাইফুল ইসলাম : গণমাধ্যকর্মী ও লোকসংগীত সংগ্রাহক





কমেন্ট করুনঃ