জয়নুলের জগৎ আমাদের কালান্তরের ঠিকানা

ফন্ট সাইজ-+=

রফিউর রাব্বি

জয়নুল আবেদিনের জীবন চিন্তা মন-মনন ও সমস্ত শিল্পজুড়ে আছে ব্রহ্মপুত্রের বালুচর ও পঞ্চাশের মন্বন্তর। দুর্ভিক্ষ জয়নুল আবেদিনের চিন্তার জগৎকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে অসহায় মানুষের বিপর্যয়ের ক্ষত তিনি কখনো ভুলতে পারেননি। দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়ার পরপরই জয়নুল কলকাতা থেকে ময়মনসিংহে নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। সেখানেও দুর্ভিক্ষের যে মর্মান্তিক বাস্তবতা ও মুনাফালোভী মানুষের প্রতারণাÑতা তাঁকে উদ্ভ্রন্ত করে তুলল। তিনি আবার কলকাতায় ফিরে গেলেন। কিন্তু দুর্ভিক্ষপীড়িত দুস্থ মানবতা তাঁকে করে তুলল বিপর্যস্ত-বিক্ষুব্ধ।

ত্রিশের দশকটিতে অর্থনৈতিক মন্দা সারা বিশ্বে পরিব্যাপ্ত। সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ফ্যাসিস্ট বাহিনীর উপমহাদেশে উপস্থিতি, শ্বাসরুদ্ধকর কলকাতা। একশ্রেণির কালোবাজারির সহায়তায় বাজার থেকে ধান-চাল উধাও হয়ে যাচ্ছে অধিক মুনাফা লাভের লালসায়। জয়নুল অবাক হয়ে দেখলেন মানুষ তৈরি করছে দুর্ভিক্ষ মানুষের বিরুদ্ধে। দুর্ভিক্ষ গ্রামবাংলার নিসর্গ উপজীব্য রোমান্টিক শিল্পীকে রূপান্তর করল এক বিদ্রোহী ব্যক্তিত্বে। তিনি কলকাতার রাজপথে, ফুটপাথে, অলিতে-গলিতে পড়ে থাকা মৃত-অর্ধমৃত কঙ্কালসার মানুষের নারকীয় দৃশ্যাবলীর স্কেচ আঁকতে শুরু করলেন। জয়নুল আবেদিন তখন আর্ট স্কুলের শিক্ষক। দুর্ভিক্ষের বাজারে ছবি আঁকার উন্নতমানের শিল্পসামগ্রী তখন যেমনি ছিল দুর্লভ, তেমনি দুর্মূল্য। এমনি বাস্তবতায় তিনি বেছে নিলেন চীনা কালো কালি, তুলি আর অতিসাধারণ সস্তা সহজলভ্য কাগজ। কখনো কার্টিজ পেপার কখনোবা প্যাকেজিং কাগজ। তিনি স্বল্পমূল্যের শিল্প-মাধ্যমে তৈরি করলেন অমূল্য সম্পদ, যা আমাদের শিল্পে অমূল্য সংযোজন হয়ে রইল। তাঁর পঞ্চাশের এই চিত্রমালা তাঁর সকল চিত্রমালাকে, এমনকি পরবর্তী চিত্রকলাকেও ছাপিয়ে রইল।

পঞ্চাশের মন্বন্তর আমাদের শিল্প-সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা সবকিছুকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এই দুর্ভিক্ষে উডহেড কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী ১৫ লাখ বাঙালির মৃত্যু হয়েছিল। বিপ্লবী ও কৃষক নেতা জিতেন ঘোষ (১৯০১-১৯৭৬) বলছেন পঞ্চাশ লাখ। তিনি লিখেছেন, ‘হঠাৎ একদিন বাজার থেকে ধান-চাল উধাও হয়ে গেল। টাকা আছে ধান-চাল নেই। মানুষ হন্যে হয়ে ধান-চালের জন্য দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিল। সরকারের ‘বঞ্চনা নীতি’র (উবহরধষ চড়ষরপু) ফলেই বাজার থেকে এভাবে ধান-চাল হাওয়া হয়ে গেল। সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষের আগুন জ¦লে উঠল। … ইংরেজ সরকারের বঞ্চনানীতি পুরোপুরি সফলতা অর্জন করল। পঞ্চাশ লাখ বাঙালিকে ভাত না দিয়ে সে হত্যা করে দিল। রণকৌশল হিসেবে সরকার আসাম ও বাংলা প্রদেশকে প্রতিরক্ষার দিক থেকে দুর্বল রেখে বিহার প্রদেশ থেকে জাপানকে প্রতিরোধ করার মতলব এঁটে বাংলার ধান-চাল সৈন্যদের জন্য সমস্ত গুদামজাত করে নিল। এই সুযোগ নিয়ে ধান-চালের বড় বড় কারবারিরা তাদের গোলাজাত ধান-চাল লুকিয়ে ফেললেন। মানুষের সৃষ্টি এই দুর্ভিক্ষ সারা বাংলায় মড়ক ডেকে আনল।’

পথে-ঘাটে-ডাস্টবিনে এখানে-সেখানে কেবল লাশ আর লাশ। জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র (১৯১১-১৯৭৭) সে সময় তৈরি করলেন তাঁর বিখ্যাত ‘নবজীবনের গান,’ বিজন ভট্টাচার্য (১৯০৬-১৯৭৮) লিখলেন নাটক ‘নবান্ন’। সে সময় নিয়ে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র বলেছেন, ‘মহামন্বন্তরের করাল ছায়া চারদিক অন্ধকার করে দিল। আর ঘরে থাকা যাচ্ছিল না। জমাট সাহিত্য আড্ডা আর রিহার্সাল ছেড়ে রাস্তায় নেমে পড়লাম। চরম বিপর্যয় আর বীভৎস মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালাম। অস্থির পায়ে দৌড়াতে দৌড়াতে হেঁটে চলছি আর মনে মনে বলছি we won’t allow people to die- মানুষের তৈরি এ দুর্ভিক্ষ মানব না। রাস্তায় ঘুরতাম। চৌরঙ্গী, কালীঘাট, লেকমার্কেটের মোড়, বালিগঞ্জ … ওদিকে শেয়ালদা, শ্যামবাজারের মোড়, সর্বত্র এক দৃশ্য। শত-সহস্র কঙ্কাল ফেন দাও ফেন দাও বলে চিৎকার করছে। … ডাস্টবিনের পচা এঁটো কাঁটা নিয়ে কুকুর-মানুষে মারামারি। একদিন দেখলাম মা মরে পড়ে আছে। তার স্তন ধরে অবোধ শিশু টানাটানি করছে আর হেঁচকি তুলে কাঁদছে। এর প্রচণ্ড অভিঘাত আমার গোটা অস্তিত্বকে কাঁপিয়ে দিল। আমি চিৎকার করে বলে উঠলামÑনা-না-না। … সুর আর কথা মনের বেদনা ও যন্ত্রণার রুদ্ধ উৎসমুখ থেকে ঝরনার মতো বেরিয়ে এলো। শুরু হলো নবজীবনের গান :

                             ‘না না না

                             মানবো না মানবো না

কোটি মৃত্যুকে কিনে নিবো প্রাণপণে

ভয়ের রাজ্যে থাকবো না।’

সে সময় ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক সংঘের তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬), গোপাল হালদার (১৯০২-১৯৯৩), চিন্মোহন সেহানবীশ (১৯১৩-১৯৮৭), সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩) প্রমুখ উপন্যাস, গল্প, কবিতা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ালেন, বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র (১৯১৫-১৯৯৭), নাটক তৈরি করলেন, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, বিনয় রায় (১৯১৮-১৯৭৫), হেমাঙ্গ বিশ্বাস (১৯১২-১৯৮৭) প্রমুখ গণসংগীত নিয়ে দাঁড়ালেন, রং-কালি-তুলি নিয়ে দাঁড়ালেন জয়নুল আবেদিনের পাশাপাশি চিত্ত প্রসাদ ভট্টাচার্য (১৯১৫-১৯৭৮), সোমনাথ হোর (১৯২১-২০০৬), গোপাল ঘোষ (১৯১৩-১৯৮০), অবনী সেন (১৯০৪-১৯৭২), দেবব্রত মুখোপাধ্যায় (১৯১৮-১৯৯১) প্রমুখ শিল্পী।

দুর্ভিক্ষের অভিঘাত জয়নুল আবেদিনের জীবনব্যাপী বিস্তৃত হয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সমাজিক সংকটে এর প্রতিটি স্তরে তিনি সেই দুর্ভিক্ষের প্রতিফলন উপলব্ধি করেছেন, সমাজের বিভিন্ন সংকটকে মানবসৃষ্ট মন্বন্তরের আয়নায় মিলিয়ে দেখতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আজ এ দেশে সমাজ-জীবনে চারিদিকেই দৈন্য। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক জীবনের সর্বক্ষেত্রেই সংকটের বোঝা যেন চেপে বসে আছে। এই সর্বাঙ্গীণ দৈন্যের কারণ বহুবিধ হতে পারে, তবে আমার চোখে এর যে একটি কারণ খুব বড় হয়ে ঠেকেছে, তা হচ্ছে রুচির দুর্ভিক্ষ। একটা স্বাধীন দেশে সুচিন্তা আর সুরুচির দুর্ভিক্ষ! এই দুর্ভিক্ষের কোনো ছবি হয় না।’একবার এক সাংবাদিক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি দুর্ভিক্ষের ওপর ছবি আঁকলেন অথচ বন্যার ছবি আঁকলেন না কেন?’ জয়নুল আবেদিন উত্তরে বলেছিলেন, ‘বন্যা প্রকৃতির। তাই এর বিরুদ্ধে করবার কিছুই নেই। দুর্ভিক্ষ মানুষের সৃষ্টি। মানবতার অপমান আমাকে ব্যথিত করেছিল। তাই দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকেছি।’স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে জয়নুল আবেদিন একবার শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে (১৯৩৫) বলেছিলেন, ‘মনোয়ার, দুর্ভিক্ষ হলে সে ছবি আঁকা যায়, নিরন্ন মানুষের হাহাকার ছবিতে দেখানো যায়। কিন্তু পাকিস্তানি শোষণের সময় মনের যে দুর্ভিক্ষ চলছে এটা তো কোনো ছবিতে আঁকা যায় না।’জয়নুল আবেদিন মানুষের অন্তরকে স্পর্শ করেই খ্যাতির তুঙ্গে ওঠেছিলেন। সে সময় কলকাতার কলেজ স্ট্রিট মার্কেটে জয়নুলের দুর্ভিক্ষের সে ছবির প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। সে ছবি ছাপা হয়েছিল কলকাতার ‘পিপলস ওয়ার,’ ‘জনযুদ্ধ’, ‘দ্য স্ট্যাটসম্যান’সহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে। ছবি ছড়িয়ে পড়ল দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। জয়নুল হয়ে উঠলেন নিপীড়িত অধঃপতিত মানুষের মুখপাত্র। তিনি তাঁর দুর্ভিক্ষের এই চিত্র সম্পর্কে অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে পরবর্তী সময়ে বলেছেন, ‘আমি দুর্ভিক্ষের দৃশ্যগুলো এঁকেছি প্রায় উন্মাদের মতো। কেন আমি এমন করেছিলাম? কেনইবা আমি ওসব স্কেচ এঁকেছিলাম? ওটা ছিল আমার একটি ক্রুদ্ধ অভিব্যক্তি; একটি প্রতিবাদ। ওই সময়কার পরিস্থিতির বিরুদ্ধে, মানুষের ভয়াবহ ভোগান্তির বিরুদ্ধে আমার এটি বক্তব্য। আজও আমি ভাবি সেই দুর্ভিক্ষের কথা, যা ছিল মানুষেরই তৈরি। মানুষই মানুষের জন্য দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। আমি শুধু চেষ্টা করেছি আমার মতামত ও অনুভূতি তুলে ধরতে।’

কাইয়ুম চৌধুরী (১৯৩১-২০১৪) বলেছেন, ‘দুর্ভিক্ষের এ চিত্রগুচ্ছ জয়নুল আবেদিনের খুবই প্রিয় ছিল। একটি ছবিকেও তিনি হাতছাড়া করেননি। এ ছবিগুলো আঁকার সময় কামরুল হাসান (১৯২১-১৯৮৮) ছিলেন তাঁর নিত্যসঙ্গী। কাগজ-কালি ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে যেতেন জয়নুল আবেদিনের পিছু পিছু। তখনকার কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু ছবি। কুড়িখানা ছবি থেকে বারোখানা ব্যবহৃত হয়েছে ইলা সেন-রচিত সুশীল গুপ্ত-প্রকাশিত ‘ডার্কেনিং ডেজ’নামক বইয়ে। বইটির দ্বিতীয় শিরোনাম ছিল বিং অ্যা ন্যারেটিভ অব ফেমিন-স্ট্রিকেন বেঙ্গল। উইথ ড্রইংস ফ্রম লাইফ বাই জয়নুল আবেদিন। ইলাস্ট্রেশন শব্দটি এখানে ব্যবহার করা হয়নি।’

সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর পাশে মৃতপ্রায় পড়ে থাকা মায়ের ছবি আঁকলেন জয়নুল। নাম দিলেন ‘ম্যাডোনা’। বিশ্ব শিহরিত হলো তাঁর ম্যাডোনা দেখে। ঊর্ধ্বাকাশে শূন্যে দৃষ্টি মেলে অর্ধশায়িতা মাতা, যার একহাতে শূন্য থালা, কোলে হাড্ডিসার শিশু, শুকনো স্তনের প্রতি তাঁর আকুতিÑরাফায়েল, মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর ম্যাডোনাকে যেন তীব্র ব্যঙ্গ করে চলেছে। এ ছবিটি সম্পর্কে জয়নুল বলেছেন, ‘একদিন গভীর রাতে হঠাৎ দেখতে পেলাম, একটা বাড়ির দিকে বহু লোক দৌড়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের সময়। বড় বাড়িগুলোর নিরাপত্তার জন্য মাঝেমধ্যেই তোলা হয়েছে ব্যাফল-ওয়াল। দেখলাম সবাই তেমনই একটা ব্যাফল-ওয়ালের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। কৌতূহলী হয়ে আমিও সেদিকে পা চালালাম। আশ্চর্য ব্যাপার তো! অন্ধকার সিঁড়ির গোড়ায় নারীকণ্ঠের অস্ফুট গোঙানির শব্দ কানে আসতেই থমকে দাঁড়ালাম। উৎকর্ণ হয়ে অন্যরাও দাঁড়িয়ে পড়েছে ব্যাফল-ওয়ালের গা ঘেঁষে। কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। গোঙানিটা একবার বাড়ছে, আবার হ্রাস পাচ্ছে। এমন সময় ওপর থেকে বোধহয় গৃহকর্তার গলাই শোনা গেল, কী হয়েছে ওখানে? নিচ থেকে কে যেন জবাব দিল, পাগলটাগলের কাণ্ড বোধহয়। বাড়ির মালিক সিঁড়ি ভেঙে নেমে এলেন। সবাই সিঁড়ির গোড়ার দিকে এগিয়ে গেল এবার। আবছা অন্ধকারে চাতালের ওপর পড়ে থাকা ছায়ামূর্তিটিকে একটি যুবতী বলেই মনে হলো। কিন্তু কে? সবার মনেই এক প্রশ্ন : অমন করছে কেন? ওপর থেকে বাড়ির গৃহিণীও বুঝি নেমে এলেন একসময়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সেখানে এসে জড়ো হলেন আশপাশের ফ্ল্যাটের নারীরাও। আলো জ্বলে উঠলে দেখা গেল কঙ্কালসার এক যুবতী সেখানে পড়ে আছে। পরনের শতচ্ছিন্ন কাপড়র আড়ালে ফুটে উঠেছে তার লাঞ্ছিত যৌবন। মেয়েটি প্রসবব্যথায় কাতর হয়ে পড়েছিল।

সমবেত নারীদের কথাবার্তা থেকেই বোঝা গেল, ক্ষুধার্ত মেয়েটি এই প্রথমবারের মতো প্রসবের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে। হাজার হলেও নারীমন! দেখতে দেখতে সেই দুর্ভিক্ষপীড়িতা রাস্তার মেয়েটির সেবাশুশ্রƒষায় লেগে গেলেন সমবেত নারীরা।

ভোররাতের দিকে শুনতে পেলাম, মেয়েটির বাচ্চা হয়েছে। খবরটা শুনে কতজনে কত কথা বলল। কেউ বলল, অদৃষ্টের পরিহাস। কেউ বলল, মিলিটারিদের স্বেচ্ছাচারের ফল। কেউবা আবার বলাবলি করল যে স্বামীটা বোধহয় আগেই মরেছে ইত্যাদি। আমি যেন কেমন আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। দুর্ভিক্ষের কত করুণ, কত বীভৎস রূপ আমি প্রত্যক্ষ করেছি; কিন্তু মাতৃত্বের এমন মর্মস্পর্শী রূপ আমি আর কখনো দেখিনি। ব্যাফল-ওয়ালের আড়ালে শায়িতা সেই বিশীর্ণ-যৌবনা, তার একটি পা আর এক পায়ের ওপর আড়াআড়িভাবে রাখা ডান হাতের শীর্ণ আঙুলগুলো তোবড়ানো টিনের থালার ওপর ছড়িয়ে আছে … সদ্যোজাত শিশুটি হাত বাড়িয়ে খুঁজছে যেন মায়ের বুকের নির্ভরতা … এই ছবিটা আমার মনে আলোড়নের সৃষ্টি করল। বারবার আমার মনে হতে লাগল, মৃত্যুপথযাত্রী ওই যুবতী যেন বলছে, ‘আমি মানুষের কাছে রেখে গেলাম এই শিশু-মানুষকে।’কলকাতায় এ ছবির প্রদর্শনীতে এসেছিলেন শিল্পপতি বিড়লা। ছবিগুলো দেখে তিনি দুহাতে চোখ ঢেকে চিৎকার করে উঠেছিলেন। ‘সরিয়ে নাও ছবিগুলো, সরিয়ে নাও।’কিন্তু এ দুর্ভিক্ষ তো তাদেরই সৃষ্টি। জয়নুলের এ ছবি সম্পর্কে সে সময় প্রখ্যাত ব্রিটিশ চিত্র-সমালোচক এরিখ নিউটন বলেছিলেন, ‘এ ছবিগুলো প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমন্বয় যা অনেকের কাছে অসাধ্য মনে হতে পারে।’

জয়নুলের দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের চিত্রকলার ঐতিহ্যে এক বৈপ্লবিক ঘটনা। এখানে ন্যাচারালিজম ও রোমান্টিক ধারার শিল্প-আঙ্গিকের বাইরে সমাজবাস্তবতা বা সোশ্যাল রিয়েলিজম জাতীয় শিল্প-বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন জয়নুল। বিষয় নির্বাচন উপস্থাপনার আঙ্গিক ও শৈলী, এমনকি অঙ্কনের মাধ্যমÑসবকিছুই ভিন্ন। বিষয় ও আঙ্গিকের এত শক্তিশালী সমন্বয় বস্তুত বিশ্ব-চিত্রকলার ইতিহাসেও কম খুঁজে পাওয়া যাবে। অতিসাধারণ কাগজে শুধু কালো চায়নিজ ইংকে রেখার টানে সমৃদ্ধ ছবি যে এত বাক্সময় হতে পারে, তা জয়নুলের দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালাই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অসাধারণ ড্রইংয়ে এই ধারায় প্রায় তিরিশটি ছবি আঁকেন তিনি। বাস্তববাদী আঙ্গিক হলেও প্রতীচ্যের আঙ্গিকও নয়, পূর্ব এশীয় ধারাও নয়, বরং সবকিছুর নির্যাস যেন ব্যবহৃত হয়েছে এই চিত্রমালায়। দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার মাধ্যমে জয়নুল বক্তব্যপ্রধান ও নিজস্ব আঙ্গিকের শিল্প সৃষ্টি করে শিল্প-ঐতিহ্যে পথিকৃতের স্থায়ী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন।

দুই

জয়নুল আবেদিন ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে কিশোরগঞ্জ জেলা) কেন্দুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা তমিজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, মা জয়নাবুন্নেছা গৃহিণী। নয় ভাইবোনের মধ্যে জয়নুল আবেদিন ছিলেন সবার বড়। খুব ছোটবেলা থেকেই ছিল ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক। পাখির বাসা, পাখি, মাছ, গরু-ছাগল, ফুল-ফল এঁকে মাকে দেখাতেন। শৈশব থেকেই শিল্পকলার প্রতি গড়ে উঠেছিল গভীর আগ্রহ। শৈশবে অন্যসব ছেলের মতো ডানপিটে ছিলেন না, ছিলেন শান্ত, কম কথা বলা ছেলে। পাড়ার লোকেরা তাঁকে ‘ঠান্ডার বাপ’বলে ডাকতেন। ডাকনাম ছিল টুনু। জয়নুল বেশ মেধাবী ছিলেন, পড়তে বসলে দ্রুত সব পড়া হয়ে যেত, ছিলেন মনোযোগী ছাত্র। কিন্তু মাত্র ষোলো বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতায় গিয়েছিলেন শুধু ‘গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস’দেখার জন্য। কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস ঘুরে আসার পর সাধারণ পড়াশোনায় আর জয়নুলে মন বসে না।

জয়নুলের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সূচনা হয় ১৯২২ সালে শেরপুরের রামবঙ্গিনী এম-ই স্কুলে। সেখানে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তারপর ময়মনসিংহ স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করা হলো তাঁকে। সেখানে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। ১৯২৮ সালে জয়নুল যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন সেময় বোম্বে ক্রনিক্যাল পত্রিকায় গলফ খেলা বিষয়ে ছবি আঁকার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। তাও আবার নির্দিষ্ট একজন খেলোয়াড় গলফবলে আঘাত করার জন্য ক্লাব উঁচু করেছে, এমন একটি ছবি। জয়নুল খবরটা দেখেই কিছুক্ষণের মধ্যেই ছবি এঁকে ফেললেন। রেখে দিলেন বিছানার তলায়। ওই ছবি পাঠাতে হলে ডাকের খরচ লাগবে ছ-আনা। শেষমেশ ছ-আনা জোগাড় করে পাঠানো হলো সেই ছবি। কদিন পর বোম্বে থেকে খবর এলো জয়নুলের ছবিই প্রথম নির্বাচিত হয়েছে। খবর পৌঁছে গিয়েছিল তাঁদের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে। আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল গোটা এলাকায়।

কিন্তু আর্ট কলেজের স্বপ্নে বিভোর জয়নুল। ওখানেই পড়তে হবে। প্রথমে বাবার প্রবল আপত্তি। বাবা বললেন, আমার নয় সন্তানের মধ্যে বড় সন্তান তুমি। তুমি যদি উচ্ছন্নে যাও আর বাকিগুলোও তাই হবে। অন্যদিকে সবচেয়ে বড় বিষয় টানাটানির সংসারে আর্ট কলেজে পড়াটাই তো বিলাসিতা। কারণ আর্ট কলেজে তখন পড়ত উচ্চবিত্ত নয়তো উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা। আর্ট কলেজে পড়াও বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। আবার এত দূরে কলকাতায় যাওয়া। কই ময়মনসিংহ আর কোথায় কলকাতা। এদিকে ১৯৩১ সালে পিতা তমিজউদ্দিন চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। কিন্তু জয়নুলের জেদ তিনি আর্ট স্কুলেই পড়বেন। কোনো কিছুই দমাতে পারল না তাঁকে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক জয়নুলকে আর্ট স্কুলে ভর্তির জন্য তাঁর পিতাকে সুপারিশ করলেন। অবশেষে ছেলের জেদ দেখে নিজের গলার হার বিক্রি করলেন মা জয়নাবুন্নেছা। সেই হার বিক্রির টাকা ছেলের হাতে তুলে দিলেন, সঙ্গে বাঁশের খোড়লে জমানো কিছু খুচরা পয়সা। গন্তব্য এবার কলকাতা। প্রথমে ময়মনসিংহ থেকে ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ। সেখান থেকে স্টিমারে গোয়ালন্দ ঘাট, গোয়ালন্দ থেকে ট্রেনে চেপে শিয়ালদহ স্টেশন।

অচেনা শহর কলকাতায় জয়নুল এলেন বটে কিন্তু থাকা খাওয়ার কী হবে, আবার স্কুলে ভর্তি হতে হলে একজন স্থানীয় অভিভাবক চাই। জয়নুল হাল ছাড়ার পাত্র নন। তিনি সোজা গেলেন দৈনিক আজাদ অফিসে সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের (১৮৯৭-১৯৭৬) কাছে। আবুল কালাম শামসুদ্দীন তাঁর ‘অতীত দিনের স্মৃতি’গ্রন্থে লিখেছেন, ‘জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে আমার দেখা হয় সম্ভবত তিন দশকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতার “আজাদ”অফিসে। তাঁর বয়স তখন সম্ভবত ছিল কুড়ির নিচে। তিনি এসে যে পরিচয়পত্র দিলেন, তাতে বুঝতে পারলাম, তিনি আমাদের নিতান্তই আপন লোক। বললেন, আমি আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে চাই, আপনাকে আমার গার্ডিয়ান হয়ে আমাকে ভর্তি করিয়ে দিতে হবে। শুনে অবাক হলামÑআর্ট স্কুলে ভর্তি হতে চায়, ছেলের আশা তো কম নয়। জিজ্ঞেস করলাম: নিজের আঁকা চিত্রটিত্র কিছু সঙ্গে আছে? বললেন : হ্যাঁ আছে বৈকি। চিত্রের বস্তা খুলে তিনি কয়েকটি তাঁর হাতে আঁকা চিত্র আমাকে দেখালেন। চিত্র সম্বন্ধে নিতান্ত লে-ম্যান হলেও এটুকু বুঝতে পারলাম, প্রাথমিক চেষ্টায় অপরিপূর্ণতা থাকলেও প্রতিশ্রুতির আভাস যেন তাতে ফুটে উঠেছে। যাকগে এরপর একদিন তাকে নিয়ে কলকাতা আর্ট স্কুলে গিয়ে প্রিন্সিপ্যাল মুকুল দের সঙ্গে দেখা করলাম। জয়নুল আবেদিন ভর্তি হয়ে গেলেন এবং আমি তাঁর কলকাতার গার্ডিয়ান হলাম।’

কিন্তু সে সময়টা ছিল জয়নুলের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। সমস্যা হলো রাতে থাকা নিয়ে। ভর্তি পরীক্ষার আগের রাতটা কাটিয়ে দিলেন ওয়েলেসলি স্কয়ারে পার্কের বেঞ্চিতে। সেখানেই শতরঞ্জি বিছিয়ে রাত্রিযাপন। ভর্তি পরীক্ষায় অসাধারণ সাফল্য দেখালেন। ভর্তির পরেও রাতে থাকার সংকট কাটে না। রাতে পার্কে থাকেন। কিন্তু সমস্যা হলো ভোর হওয়ার পর শতরঞ্জি বাঁধা তোশকটা বগলে নিয়ে কোথায় রাখবের তা নিয়ে। প্রতিদিন নিত্যনতুন জায়গা খোঁজেন। কিন্তু এরই মধ্যে জয়নুল নতুন এক বুদ্ধি খুঁজে পান। মসজিদের বারান্দায় কয়েকটি রাত অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যায়। এভাবেই চলতে লাগল। কিন্তু আর্থিক সংকট তীব্রতর হতে থাকে। তখন আর্ট স্কুল থেকে বৃত্তি দেওয়া হতো। আর্ট স্কুল থেকে প্রথম বর্ষের ফলাফলের ওপর বৃত্তি। কিন্তু জয়নুল যে এক বছর অপেক্ষা করবেন সেই অবস্থা তখন ছিল না। অন্যদিকে তিনি ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে দারুণ করেছেন। আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ মুকুল দে (১৮৯৫-১৯৮৯) তখন বিশেষ বিবেচনায় নিয়ম ভেঙে জয়নুলকে বৃত্তির অনুমোদন দিলেন। অন্যদিকে ময়মনসিংহ জেলা বোর্ড থেকে মিলল ১৫ টাকার মাসিক বৃত্তি। জয়নুলের অসচ্ছলতা কাটতে থাকল। তিনি উঠলেন ৩১ ওয়েলেসলি স্ট্রিটের একটি মেসে। সে সময় কিছু কমার্শিয়াল কাজ করেন তিনি। তাই দিয়ে প্রতি মাসে কিছু টাকা সংসারের খরচের জন্য পাঠাতে লাগলেন।

১৯৩৭ সালে একাডেমি অব ফাইন আর্টের প্রথম প্রদর্শনীতেই জয়নুলের একটি চিত্র ‘হাইলি রিকমেন্ডেড’ বলে সম্মানিত হলো। কলকাতা আর্ট স্কুলে নিজের আঁকাআঁকি দিয়ে তিনি শুরু থেকেই মুগ্ধ করেছেন তাঁর শিক্ষক ও সহপাঠীদের। তাঁর ছবির বিষয় বাংলাদেশের প্রকৃতি, নদী, গ্রাম, গ্রামের মানুষ, তাদের জীবন-সংগ্রাম। স্কুলে ছাত্রদের আঁকা ছবি নিয়ে বছর বছর প্রদর্শনী হয়। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় বার্ষিক প্রদর্শনীতে দেওয়া তাঁর ছবির নাম ছিল ‘বাঁশের সাঁকো।’ গ্রামে খালের ওপর যে বাঁশের সেতু থাকে, তেমনি একটি সেতুর ওপর দিয়ে মাথায় পুঁটলি নিয়ে পার হচ্ছে দুজন মানুষ। এটাই ছিল সেই ছবির বিষয়। ছবিটি আলাদা করে সবার নজর কাড়ে। ছবিটির জন্য শিক্ষকদের কাছ থেকেও তিনি পান বিশেষ সম্মান।

একসময় স্নাতক শেষ হয় আর্ট কলেজে। জয়নুল আবেদিন ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলে পড়েন। ছাত্র থাকাকালীন সময়েই তিনি তাঁর কাজ দিয়ে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলে ধরতে পেরেছেন। স্কুল কর্তৃপক্ষও এমন প্রতিভাকে হারাতে চায়নি। শেষ বর্ষের ছাত্র থাকা অবস্থাতেই জয়নুল সেই স্কুলে নিয়োগ পান অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে। ১৯৩৯ সালে তিনি পুরোদস্তুর স্থায়ী শিক্ষক। ১৯৩৩ সালে জয়নুল যখন আর্ট স্কুলে ভর্তি হন, সে বছরই একাডেমি অব ফাইন আর্টস প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৩৮ সালে আর্ট কলেজে চিত্রকলা ও চিত্রকর্ম বিভাগে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। সে বছর একাডেমি অব ফাইন আর্টসের উদ্যোগে সর্বভারতীয় বার্ষিক প্রদর্শনীতে ‘অন অ্যান্ড ওভার দ্য ব্রহ্মপুত্র’শীর্ষক ছয়টি জলরং চিত্রের সিরিজ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন তিনি। এসব ছবির বিষয় ছিল জেলেদের মাছ ধরা, জাল শুকানো, শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ, হাসপাতাল ও খেয়া পারাপার, শম্ভুগঞ্জে পাট ব্যবসায়ী গ্যাসপার সাহেবের কুঠি, নদীর অপর পারের কাশবন, পানিতে প্রতিফলিত নদীতীরবর্তী গাছের ছবি প্রভৃতি। ছুটিতে ময়মনসিংহে গিয়ে ১৯৩৮ সালে তিনি নদীতীরে বসে এ ছবিগুলো এঁকেছিলেন। এ প্রদর্শনীতে স্বর্ণপদক লাভ করেন জয়নুল। এ পুরস্কারটি ‘গভর্নরস গোল্ড মেডেল’হিসেবে পরিচিত। বলা চলে এ প্রদর্শনী তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে শিল্পবোদ্ধা, শিল্প-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী মহলে পরিচিত করে তোলে। এই প্রদর্শনী-পরবর্তী সময়ে তাঁর শিল্পীজীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ১৯৩৯ সালে তিনি আর্ট স্কুলে স্থায়ী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। সে বছর ব্রিটিশ সরকারের তিন বছর মেয়াদের স্কলারশিপ পান তিনি, কিন্তু যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ব্রিটেন যাত্রা স্থগিত হয়ে যায়। এদিকে জাপানি বিমান থেকে কলকাতায় বোমা পড়তে থাকে। জয়নুল কিছুদিনের জন্য কলকাতা ছেড়ে ময়মনসিংহে চলে আসেন। ১৯৪৩ সালে যখন কলকাতায় ফেরেন তখন সেখানে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।

তিন

পূর্ববঙ্গের প্রথম প্রজন্মের শিল্পীদের পুরোধা ব্যক্তিত্ব জয়নুল আবেদিন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে একটি চিত্রকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন বোধ করেন তিনি। ১৯৪৮ সালে ঢাকার জনসন রোডের ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুলের একটি জীর্ণ কক্ষে ১৮ জন ছাত্র নিয়ে গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট স্থাপন করেন। তাঁর সহযোগী হলেন আনোয়ারুল হক (১৯১৮-১৯৮১), কামরুল হাসান এবং শফিউদ্দিন আহমেদ (১৯২২-২০১২)। ১৯৫১ সালে আর্ট ইনস্টিটিউট সেগুনবাগিচার একটি বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। পরে এটি শাহবাগে স্থানান্তরিত হয় ১৯৫৬ সালে। প্রতিষ্ঠানটি যখন শাহবাগে স্থানান্তরিত হয় তখন সেখানে মাত্র দুই কামরার একটি ভবন। কলেজ ক্যাম্পাসের নকশা নির্মাণের জন্য জয়নুল আবেদিন বাংলাদেশের বিশিষ্ট স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে (১৯২৩-২০১২) দায়িত্ব দেন। মাজহারুল ইসলামের নকশায় চারুকলা ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাসের যে নান্দনিকতা তৈরি হয় তা এখনও পর্যন্ত এ দেশের ক্যাম্পাস স্থাপত্যের একটি আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জয়নুল আবেদিন এটিকে একটি আধুনিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করেন। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রথম শ্রেণির সরকারি কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং এর নাম হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এর নামকরণ হয় ‘বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়।’জয়নুল আবেদিন ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে এই প্রতিষ্ঠানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে এনে ‘চারুকলা ইনস্টিটিউট’নামকরণ করা হয়। পরবর্তীতে এটি অনুষদের মর্যাদা লাভ করে ‘চারুকলা অনুষদ’নাম ধারণ করে। এই প্রতিষ্ঠান গড়তে গিয়ে জয়নুল তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টি এখানে ব্যয় করেন। ব্যাহত হয় নিজের শিল্প সৃষ্টি।

এরই মধ্যে ১৯৫১ থেকে ৫২ সাল সময়ে জয়নুল আবেদিন সরকারি বৃত্তি নিয়ে এক বছরের জন্য ইংল্যান্ডে যান। সেখানে অবস্থানকালে তিনি পাশ্চাত্যের বিভিন্ন শিল্পধারার সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি সেখানে তাঁর একক শিল্পকর্মের প্রদর্শনীর আয়োজন করলে তা পশ্চিমা বিদগ্ধজনের অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করে। তাঁর এই ইংল্যান্ড ভ্রমণটি তাঁর শিল্পের ধারণা ও দৃষ্টিকে আরও গভীরভাবে প্রসারিত করে। বাংলাদেশের চারুকলা চর্চায়ও পরবর্তী সময়কে এটি প্রভাবিত করে। এ ভ্রমণ জয়নুলকে বাংলার সমৃদ্ধ লোকশিল্পের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে বিশেষভাবে সচেতন করে তোলে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিল্পের ঐতিহ্য আধুনিকতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তাঁর মধ্যে সম্যক ধারণা ও উপলব্ধি তৈরি হয়। এ থেকেই তিনি পরবর্তী সময়ে তাঁর চিত্রে আধুনিকতার চরিত্র তৈরি করতে পেরেছিলেন। এখান থেকে তিনি এ দেশের লোকজ শিল্প-ঐতিহ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের আধুনিক শিল্প-আন্দোলন ও কৌশলাদির সমন্বয়ে নিজস্ব একটি ধারা তৈরিতে ব্রত হন।

জয়নুল আবেদিনের বিশ্বাস ছিল, আমাদের শিল্পের ঐতিহ্য হচ্ছে আমাদের লোকশিল্প। এই শিল্পের বিভিন্ন ফর্মকে ভেঙে নতুন রূপের সৃষ্টিÑচিত্রশিল্পে একটি নতুন শৈলীর জন্ম দেবে। সে চেষ্টাই তিনি করেছিলেন বিলেত থেকে ফিরে এসে। ময়মনসিংহের হাতে-টেপা পুতুলের লম্বা গলা তাঁর ছবিতে নতুন মাত্রা এনেছিল। সেই পুতুলের গায়ের নকশা একটি নতুন দ্যোতনা এনে দিয়েছিল তাঁর ক্যানভাসে।

তাঁর সংগ্রহে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্নরকম মাটির পুতুল, কাঠের পুতুল, শখের হাঁড়ি, নকশিকাঁথা, লক্ষ্মীর সরা, নকশিপিঠা, নকশিপাখার সমারোহ ছিল। তিনি মনে করতেন মাধ্যমের সীমাবদ্ধতার কারণে তার সংক্ষিপ্তকরণ যে নতুন কাঠামোর জন্ম দিয়েছে এটাই হচ্ছে সৃষ্টি। একটি ঐশ্বর্যের ওপর সে সৃষ্টি আরেকটি নতুন ঐশ্বর্য ধারণ করে আছে। অথচ এই সৃষ্টির মুহূর্ত কত সরলভাবে তৈরি। কুমোরের হাতে যখন কাজ থাকে না, অবসর সময়ে শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য, বিশেষ করে দরিদ্র শিশুদের অল্পদামে বিক্রি এবং শিল্পীর বাড়তি রোজগারের একটি পথ তৈরির মধ্যেই এই ঐশ্বর্যের জন্ম। সৌন্দর্যপিপাসু একজন শিল্পীর চোখ আর শিশুর মনভোলানো রূপের এই মিশ্রণ অবাক করার মতো। একবার জয়নুলের বাড়িতে কাজের বুয়া ঘর মুছছে, কাপড় কাচছেÑসঙ্গে তার শিশুসন্তানটি। সেই লোকশিল্প-সংগ্রহের আলমারির সামনে শিশু সন্তানের আকুতি, পুতুলটি তার চাই। স্ত্রী জাহানারা আবেদিন জিভ কাটেন। সর্বনাশ, বলে কী? এসব বড় সাহেবের। এগুলো চাওয়া বারণ। কাজের বুয়া পাইন্যার মা অবাক বনে যায়। তার ছেলে যে পুতুল চায়, বাড়ির সাহেবও সে পুতুল চায়!

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করা লোকঐতিহ্যই জয়নুল আবেদিনকে একটি লোকশিল্প সংগ্রহশালা গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করে। ১৯৭৫ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের পানাম নগরীতে ‘বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন’প্রতিষ্ঠা করেন। যা ১৯৮১ সালে ১৫০ বিঘা আয়তনের শতবর্ষী সর্দার বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়ে ‘লোক ও কারু শিল্প জাদুঘর’হিসেবে গড়ে ওঠে। এ জাদুঘরে রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাম-বাংলার অবহেলিত শিল্পীদের হস্তশিল্প, জনজীবনের নিত্যব্যবহার্য পণ্যসামগ্রী। ১০টি গ্যালারি রয়েছে জাদুঘরটিতে। গ্যালারিগুলোতে কাঠখোদাই, কারুশিল্প, পটচিত্র ও মুখোশ, আদিবাসী জীবনভিত্তিক নিদর্শন, গ্রামীণ লোকজীবনের পরিবেশ, লোকজ বাদ্যযন্ত্র ও পোড়ামাটির নিদর্শন, তামা-কাঁসা-পিতলের নিদর্শন, লোহার তৈরি নিদর্শন, লোকজ অলংকারসহ বিভিন্ন সামগ্রী। ভবনটির কাছেই রয়েছে লোকজ স্থাপত্যকলায় সমৃদ্ধ আধুনিক ইমারতে প্রতিষ্ঠিত ‘জয়নুল আবেদিন স্মৃতি জাদুঘর’।

জয়নুল আবেদিন বিশ্বাস করতেন, জীবনের বাইরে কোনো শিল্প হয় না। জীবনবোধ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই প্রকৃত শিল্প সৃষ্টি হয়। তাঁর বিশ্বাস, যে রীতিতেই শিল্প সৃষ্টি হোক না কেন, তার সৃজনশীলতা থাকতে হবে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাসহ সমাজ সংসার, পরিবেশ কিংবা পরিমণ্ডলের সঙ্গে। জয়নুল মানবতার শিল্পী। মানুষই তাঁর ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চাষি, মজুর, জেলে, মাঝি, গাড়োয়ান, সাঁওতাল-কন্যা, বেদেনি, মা ইত্যাদি শিরোনামে সমাজের অন্তজ-শ্রেণির অবহেলিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাঁর শিল্পকর্মে মুখ্য হয়ে উঠেছে। সমাজের চারপাশে তিনি যা কিছু দেখেছেন তাই প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর কাগজে, ক্যানভাসে, চিত্রকলায়। জনজীবনের সঙ্গে যাদের একাত্মতাÑআঁকার বিষয় তাঁদের খুঁজতে হয় না। জয়নুলকেও তা খুঁজতে হয়নি। তিনি পেয়ে গেছেন। নবান্ন, জলোচ্ছ্বাস, মুক্তিযুদ্ধ, ঘাটের পথে গাঁয়ের বধূরা, ম্যাডোনা-১৩৫০, মইটানা, গুনটানা, ঝড়, বিদ্রোহী, মনপুরা-৭০, মাছ ধরে ঘরে ফেরার মতো ছবিগুলো এরই উদাহরণ। প্রকৃতি, সামাজ, সাংস্কৃতিক, পরিবেশÑসর্বোপরি মানুষ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তাঁর চিত্রে। ছাত্রাবস্থায় গ্রীষ্মের ছুটিতে তিনি চলে যেতেন সাঁওতাল পরগনায়। বিহারের পার্বত্য অঞ্চলে ছিল সাঁওতালদের বসবাস। সাঁওতালদের সারল্যেভরা জীবনাচরণ তাঁকে নানাভাবে আলোড়িত করেছে। ১৯৪৪ সালে তেলরঙে করা ‘দুমকা’ ও ‘সাঁওতাল রমণী’ জয়নুলের অনন্য সৃষ্টি।

বাংলাদেশের নৈসর্গিক দৃশ্যের মাধুর্য জয়নুলকে বিমোহিত করেছে। ছাত্রজীবনে যেমনি তাঁর মনে ঝড় তুলেছিল সাঁওতাল পরগনার দুমকা, ময়ূরাক্ষী নদী আর সাঁওতালদের ছন্দময় জীবনযাত্রা, তেমনি তুলেছিল ব্রহ্মপুত্রের দুকূল-ছাপানো স্রোতধারা। শুধু সুন্দরই নয়, অসুন্দরকেও ধরেছেন তিনি তাঁর বলিষ্ঠ তুলির আঁচড়ে। কিন্তু তাঁর সুন্দরের সাধনার মাঝে যতি টেনে দিয়েছিল পঞ্চাশের মন্বন্তর।

দুর্ভিক্ষের ছবিতে তিনি আঁকলেন কাক ও কুকুরের সঙ্গে বুুভুক্ষু মানুষ ডাস্টবিন থেকে খাবার খাচ্ছে, মানুষের লাশের ওপর বসে মাংস খাচ্ছে কাক ও শকুন, ফুটপাথে, রাস্তায় পড়ে থাকা নিরন্ন কঙ্কালসার মানুষের ছবি। আবার ১৯৭০ সালে গ্রামবাংলার উৎসব নিয়ে জয়নুল আঁকেন ৬৫ ফুট দীর্ঘ তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘নবান্ন’। আবার সে বছরই দক্ষিণবঙ্গে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হলে আঁকলেন ৩০ ফুট দীর্ঘ ‘মনপুরা-৭০’। নবান্ন ছবিতে যেমনি ফুটে উঠেছে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য আবার দুর্ভিক্ষ ও জলোচ্ছ্বাসের ছবিতে ফুটে উঠেছে বিপর্যস্ত মানবতা। সবকিছুকে গভীরভাবে দেখার প্রবল আকাক্সক্ষা ছিল তাঁর, তিনি অনুভব করতেন বিষয়বস্তুকে, মেলাতেন প্রকাশ ক্ষমতার সঙ্গে। তাঁর দৃষ্টির প্রতিফলন কাগজের ওপর বলিষ্ঠভাবে ফুটে উঠত কালো কালির আঁচড়ে।

বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর অন্যতম ছিল ১৯৭০ সালের নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় ‘গোর্কি’। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে সে ঝড়ে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তীব্র জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে ভেসে যায় হাজার হাজার মানুষ। সাহায্যের অভাবে খাদ্য ও পানীয়র অভাবে আরেক দফা মৃত্যু ঘটছে। ভয়াবহ সে ঘটনায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের উদাসীনতা এ অঞ্চলের মানুষকে ক্ষব্ধ করেছিল। সে সময় পশ্চিমাদের উদ্দেশ্যে মওলানা ভাসানীর একটি উক্তি বেশ আলোড়ন তৈরি করেছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা আসেনি।’সে ঘটনা প্রমাণ করেছিল যে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-মৃত্যু তাদের কাছে কোনো মূল্য বহন করে না। মানুষের সে ক্ষোভ সত্তরের নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়েছিল।

গোর্কি ট্র্যাজেডি বিষয় হয়েছে জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্মে। তিনি ছুটে যান দুর্যোগকবলিত দক্ষিণাঞ্চলে। বেশ কিছু স্কেচ করেন, যা একেকটি মাস্টারপিস হয়ে ওঠে। ১৯৭৩ সালে এই ‘মনপুরা ৭০’পূর্ণতা পায়। ৩০ ফুটের বিশালাকার এ স্কোলচিত্রে সমুদ্রের পটভূমিতে এসেছে স্থলভাগ। যেখানে সারি সারি মৃতদেহ। প্রকৃতিসংলগ্ন মানুষ জীবৎকালে অন্য প্রাণকে যেমনি পৃথক করে না, মৃত্যুতেও তাই। জয়নুলের সে ছবিতে মৃত মানুষের সঙ্গে মৃত গরু-মহিষও একাকার হয়ে যায়। মরদেহের সারির শেষ প্রান্তে দেখা যায় একমাত্র জীবিত মানুষটি হাঁটু মুড়ে বসে আছে। এত ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও মানুষ পরাজিত হয় না। এ যেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’র সেই অপরাজিত বৃদ্ধ জেলে। এ ছবি প্রতিটি ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ যে নতুন করে শুরু করেÑসেই সত্যের অনুরণন হয়ে রইল।

মনপুরা ভ্রমণ প্রসঙ্গে জয়নুল বলেছেন, ‘মনপুরায় আমরা যখন থার্ড ডে-তে নামলাম। সি প্লেনে আমি আর আমার বন্ধু একা ঘুরতাছি সারাদিন। কয়টা লোক বাঁইচা আছে। দেখলাম। দৌড়ায় আসল। দেখলাম জখমওয়ালা। তারা কানতে আরম্ভ করল। আমরাও কানতে আরম্ভ করলাম। আপনারা বিশ্বাস করেন, আমার পেছনে … সমুদ্র … ঠিক সমুদ্র না, সমুদ্রের খাড়ি, যেখানে যান, খালি গরু-মানুষ শুইয়া রইছে।’ রফিকুন নবী (১৯৪৩) বলেছেন, ‘সত্তরের সাইক্লোন আর জলোচ্ছ্বাসের পর মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, ক্ষয়ক্ষতি, অসংখ্য মানুষের লাশের পাশাপাশি মৃত পশু-পাখি আর ধ্বংসলীলা দেখে মর্মাহত হয়ে ঠিক করেন ছবি আঁকবেন। বিস্তৃত এলাকা জোড়া উপকূলের মানুষের দুর্গতিকে ছোট পরিসরে আঁকলে সম্পূর্ণতা পাবে না ভেবে তিনি আবার স্কোল আঁকার চিন্তা করেন এবং তা একসময়ে অতি দ্রুততায় এঁকেও ফেলেন। এই ছবি আঁকতে দেখে আমার মনে হয়েছিল, তাঁর মনটা আবার তেতাল্লিশের মন্বন্তরের সময়টিতে চলে গেছে যেন। সে সময়ের মানবিক চিন্তা আর অনুভূতিগুলো যেন ফিরে এসেছে। তাঁর আঁকার সাবলীলতা দেখে মনে হয়েছে, তখনকার উদ্দীপনাই যেন পুনরায় ধারণ করছেন। অভিভূত হয়ে দেখেছিলাম তাঁর আঁকা।’ মনপুরা ৭০ ছবিতে পরিস্থিতির আলোকে ভিন্ন ভিন্ন ব্রাশ ব্যবহার করেছেন জয়নুল আবেদিন। শুকিয়ে যাওয়া মরদেহের ক্ষেত্রে ‘অনেক ড্রাই, শুকনো ব্রাশ’ব্যবহার করেছেন। আবার ফুলেফেঁপে-পচে-গলে যাওয়া মরদেহের ক্ষেত্রে চওড়া ব্রাশ বেছে নিয়েছেন। যেখানে কালি ও পানির পরিমাণ বেশি, অর্থাৎ শুধু আবেগের বশবর্তী হয়ে এ ছবি তিনি আঁকেননি। গভীর পরিকল্পনা ও সুচিন্তিত কাজ ‘মনপুরা ৭০’।

জয়নুল আবেদিনের শেষ সময়টা কেটেছে অস্থিরতায়। হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে আক্ষেপ করেছেন, ‘আসল ছবি এখনও আঁকা হয়নি।’সাধারণত সব শিল্পীর ক্ষেত্রেই এই আক্ষেপ থাকে। অপূর্ণতা-অতৃপ্তি শিল্পীর নতুন সৃষ্টির প্রেরণা। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে হাসপাতালের শয্যায় বসে জয়নুল আবেদিন আঁকেন তাঁর শেষ ছবি ‘দুই মুখ।’ মুস্তাফা মনোয়ার হাসপাতালে তাঁকে রংতুলি এগিয়ে দিলে তিনি কাগজের গায়ে কালো রঙে, কাঁপা হাতে একটি ছেলে আর একটি মেয়ের মুখ আঁকলেন। ছবিটির শিরোনাম দিলেন ‘টু ফেসেস’। মুখ দুটি এঁকে তিনি যেন সেদিন তাঁর স্বপ্নের কথাটি জানিয়ে দিলেন। হাজির করলেন আগামী দিনের নতুন কারিগরদের। জানালেন এসব নতুন মুখই গড়ে তুলবে নতুন বাংলাদেশ।

জয়নুল আবেদিন চা ভালোবাসতেন। নিরবচ্ছিন্ন ধূমপান করতেন। একসময় ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হলেন। ৬২ বছর বয়সে ১৯৭৬ সালের ২৮ মে চারুকলা ইনস্টিটিউটের কাছে শাহবাগের পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছা অনুসারে নিজের গড়া প্রতিষ্ঠান চারুকলা ইনস্টিটিউটের পাশে সমাহিত করা হয় তাঁকে।

চার

জয়নুল আবেদিনকে নিয়ে কাইয়ুম চৌধুরী বলেছেন, ‘তখনো আমি স্কুলের ছাত্র। ওপরের ক্লাসের। প্রথম জয়নুল আবেদিনের ছবি দেখি ওই সময়ে। ছাপা ছবি। কোন পত্রিকায় আজ আর তা মনে নেই। সাদাকালোতে ছাপা ছিল ছবিটি। নাম ছিল ‘অপেক্ষা।’ ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে নৌকোর জন্য ফেরিঘাটে অপেক্ষমাণ যাত্রী। নদীর ওপারে কুয়াশাবিলীন অস্পষ্ট তটরেখা। একঝাঁক পাখি আকাশে উড্ডীয়মান। নদীর মাঝখানটায় একফালি চর। চরে একসার নৌকো বাঁধা। এপারে যাত্রীদ্বয় উবু হয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে বসা, পিতাপুত্র। শীতের সকাল। পিতার ডানপাশে তৈজসপত্রে ঠাসা বেতের ঝাঁকা। পুত্রের বাঁ-পাশে দুটি তেলের বোতল ও দুধের ঘটি। কালো রেখায় অঙ্কিত ফিগরে শুধু ক্লান্তির ছাপ। নৌকো বাঁধার জন্য বাঁশের খুঁটি। আঘাতে আঘাতে মাথা চ্যাপ্টা-চতুর্দিকে আঁশ বেরোনো। ওপারে রৌদ্রালোকিত নদী, ঝকঝকে। মাঝখানে চর-বরাবর মেঘের ছায়া। এপারে নদীকূল রৌদ্রমাখানোÑফিগরদুটি রৌদ্রে উজ্জ্বল। ছবিটি আমাকে কোনো এক গাঢ় অনুভূতিতে পৌঁছে দিতÑঅব্যক্ত বেদনায় যেন হাহাকার। কীসের প্রতীক্ষায় পিতাপুত্র? শুধু কি নদী পারাপার? ফেরির জন্য? না। ওপারে আশার প্রতীক। নির্ভাবনার আশ্রয়স্থল। রৌদ্রালোকিত। সে ছবি আমাকেও আলোকিত করেছিল, আমার শিল্পসত্তাকেও জাগিয়ে তুলেছিল তাঁর এই অসামান্য ড্রইং। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তুলির বলিষ্ঠ আঁচড়ে আঁকা শ্রমজীবী মানুষ সাদা-কালোতে, গ্রাম্যবধূ, নদী, নৌকো, ধানক্ষেত, পালকিতে নাইওর কী অপরূপ রূপে উদ্ভাসিত হতো তাঁর ছবিতে, রঙের মেলা ছড়িয়েও সেই রূপ ফোটানো অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। রেখার পরিমিতি, তুলির সাবলীল গতির মধ্যে দূরনিকটের অভিঘাত অদ্ভুত বঞ্চনার জন্ম দেয়। বাংলাদেশের গ্রামজীবনের নানা টুকরো ছবি তাঁর এসব ড্রইংয়ে ধরা দিয়েছে জাপানি হাইকুর মতো। পাকিস্তানি আমলে ফিল্ম অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের মাসিক পত্রিকা মাহেনও ও পাকিস্তান কোয়ার্টারলির পাতায় তাঁর ছবি দেখতাম নিয়মিত। মোটা তুলির আঁচড়ে, সরু তুলির রেখায় স্পন্দিত হতো ছবির বিষয়বস্তু। সংগীতের মতো আবহ তৈরি হতো রেখার ছন্দে, স্পন্দিত হতো বিষয়বস্তু যার রেশ সহজে মিলিয়ে যেত না। চোখের সামনে ভেসে উঠত দূরগ্রামের সীমান্তরেখায় দুটি তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে। সামনে বিস্তৃত ধানক্ষেত জ্যৈষ্ঠের বাতাসে আন্দোলিত, ক্ষেতের আল বেয়ে শাড়ির আঁচল উড়িয়ে ছুটে-যাওয়া গ্রাম্য-বালিকা শুধু দুটি তুলির টানে ম্যাজিক বলে প্রতীয়মান হতো। ভারতীয় রীতির রৈখিক অভিব্যক্তির সঙ্গে ইউরোপীয় একাডেমিক ড্রইংয়ের সাযুজ্য ঘটিয়েছিলেন তাঁর ড্রইংয়ে। … রঙের রানি বলা হয় কালো রংকে। জয়নুল আবেদিন নিঃসন্দেহে সেই কালো রঙের কবি। কালো রঙের সুষমায় ড্রইংয়ের লালিত্যকে এমন দৃষ্টিনন্দনভাবে উপস্থাপন আমি আর কারো ছবিতে দেখিনি। এমনকি ব্যবহারিক শিল্পেও তাঁর ড্রইংয়ের সুষমা তিনি বজায় রেখেছিলেন।’

ছবির গড়নের ক্ষেত্রে আয়তন, আকারের গুরুত্ব ছবির কাঠামোর ওপরই নির্ভরশীল। ক্যানভাসের আকার এবং তাতে কম্পোজিশনের পরিপ্রেক্ষিতÑএ বিষয়টি ছাত্রদের বোঝাতে গিয়ে জয়নুল বলতেন, ‘কুমোররা যে হাঁড়ি তৈরি করে তার নানারকম আকার ও গড়ন হয়। উঁচু ডৌলে তৈরি ভাতের হাঁড়ি, চাল সেদ্ধ হওয়ার সময়ের প্রয়োজনে ফুটন্ত পানির পরিমাণের ওপর তার গভীরতা। তেমনি বড় মাছ রান্না করার হাঁড়িটিও মাঝারি ডৌলের। আবার ছোট মাছ সাঁতলানোর জন্য চাই চ্যাতালো হাঁড়ি।’জয়নুলের ছবির বিষয়বস্তু নিয়ে কবি-লেখক সাইয়িদ আতীকুল্লাহ (১৯৩৩-১৯৯৮) বলছিলেন, ‘তাঁর দৃষ্টিপথে যারা ঘুরে বেড়াতেন তারা হচ্ছেন সাধারণ মানুষÑমাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত বাঙালি। আবেদিন স্বভাবতই বিশেষভাবে ব্যস্ত ছিলেন বাংলাদেশের মানুষ নিয়ে; সেসব মানুষ, যাদের ঘরবাড়ি উড়ে যায় ঝড়ে, খরা-অনাহার-দুর্ভিক্ষে যারা বিনষ্ট হয় লাখে লাখে, যারা মাটি কুপিয়ে রাস্তা বানায়, যারা মাঠে মাঠে ফসল ফলায়, যারা কাঁথায়-পাটিতে নকশা তোলে, হাঁড়ি বানায়, পুতুল বানায়, জাল দিয়ে মাছ ধরে নদীতে নদীতে, রোদে-ঝড়ে-বৃষ্টিতে। এককথায় যারা সমাজের একেবারে নিচুতলার বাসিন্দা এবং কোনো অবস্থাতেই জীবন যাদের প্রসন্নভাবে নেয় না সেসব মানুষকে নিয়েই ছিল আবেদিনের ভাবনা-চিন্তা শিল্পকর্ম।’

পাকিস্তান সৃষ্টির দু-তিন বছরের মধ্যেই যখন পশ্চিম পাকিস্তানের নতুন উপনিবেশবাদ স্পষ্ট হতে থাকে, ভাষার দাবি জোরালো হতে থাকেÑবাঙালির মোহ-ভঙ্গের সেই সময়ে ১৯৫১ সালে জয়নুল আবেদিন আঁকেন তাঁর ‘বিদ্রোহী’চিত্রকর্ম। ছবিটিতে একটি গাভি প্রচণ্ড শক্তিতে খুঁটিতে তাকে বেঁধে রাখা দড়ি ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে চাইছে। গাভির ঘাড় বেঁকে আছে। দড়িটি টান-টান যেকোনো সময় তা ছিঁড়ে যেতে পারে। জয়নুল এ ছবিটি আঁকতে যেভাবে মোটা ও সাবলীল রেখার আশ্রয় নিয়েছেন তা যেমনি তাঁর নিজস্বতা, অন্যদিকে এ সাবলীল ড্রইংটিতে গাভিটির দড়ি ছিঁড়ে মুক্ত হওয়ার প্রচণ্ড উন্মত্ততা প্রকাশ পেয়েছে। দ্রুত ভঙ্গিমায় কয়েকটি টানে তৈরি করা এ ছবিতে সূক্ষ্ম পরিপূর্ণতা লক্ষণীয়।

জয়নুল আবেদিন ছিলেন পুরোপুরিভাবে বিংশ শতাব্দীর মানুষ। যে শতাব্দীতে দুই দুটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। আমরা দুই দুবার স্বাধীন হয়েছি। নতুন চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে নতুন শিল্পের, সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটেছে। এ দেশের শিল্পান্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব জয়নুল। তিনি ক্রমাগত সৃষ্টির মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছেন ‘শিল্পাচার্য’, শিল্পের মহীরুহ। নতুন দেশে সমাজে নতুন শিল্প সৃষ্টির জন্য নতুন মানুষ চাই, চাই আলোকপ্রাপ্ত নতুন চিন্তাÑযা শেকড়ের সন্ধানে ক্রমাগত ধাবিত হবে। জয়নুল সে বিশাল কর্মযজ্ঞে হাত দিলেন। কাজটি কঠিন হলেও তিনি তাকে ভালোবাসলেন। কাইয়ুম চৌধুরী লিখেছেন, ‘আর্ট স্কুলে জয়নুল আবেদিনের সান্নিধ্য, তাঁর পদপ্রান্তে শিল্পশিক্ষা, পুরো দৃষ্টিভঙ্গিটাই আমার পাল্টে গেল। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, এ কী নতুন জন্ম, নতুন জন্ম, নতুন জন্ম আমার। জন্মভূমিকে অবলোকন করলাম গভীর মমতায়। মানুষের সঙ্গ নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দিল। সমগ্র হৃদয় এক নতুন রসে সিঞ্চিত হলো। তখন কত বয়স জয়নুল আবেদিনের? মাত্র বত্রিশ। সেই বয়সে তাঁর গভীর জীবনবোধ, আমাদের জীবনটাকেই পালটে দিল। কী ঐশ্বর্যে আমরা ভূষিত হলাম তা পরবর্তীকালে আমার উপলব্ধিতে এসেছে। শুধু তো শিল্পী তৈরি করা নয়, একজন আলোকিত মানুষ তৈরি করাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। ছবি আঁকার সঙ্গে সঙ্গে শেকড়ের সন্ধান দিলেনÑকোথায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি। সেই শেকড়কে অটুট রেখে আমাদের কোথায় যেতে হবে। নিসর্গ-অবলোকনে যে শিক্ষা, যে সৌন্দর্যের উপলব্ধি, সে উপলব্ধি জাগিয়ে তুললেন আমাদের ভেতরে। সাধারণ মানুষ তো সুন্দর দেখতে পায় না। শিল্পীর কাজ হচ্ছে সে সুন্দরকে তাদের চোখে পরিস্ফুটিত করা।’

মতলুব আলী সম্পাদিত ‘জয়নুল স্মৃতি’নামে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে। সে গ্রন্থে জয়নুলের সাক্ষাৎকার এবং আলাপচারিতা প্রকাশ পায়। তিনি বলেছেন, ‘যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি ছবি আঁকতে শিখলাম কী করে? বা কার কাছ থেকে? বলব আমার দেশের প্রকৃতি আর পরিবেশ আমাকে ছবি আঁকার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এ দেশের আকাশ, বাতাস, নদী, মাঠ, বন, এখানকার মানুষের চলাফেরা, ওঠা-বসা, হাসি-কান্না আমাকে ছবি আঁকতে বলেছে।’তিনি বলেছেন, ব্রহ্মপুত্রের ধারে ধারে ছেলেবেলায় খেলে বেড়াতাম। শীতের নদী কুল কুল করে বয়ে যেত। জেলেরা মাছ ধরত, মেয়েরা কাপড় কাচত, কলসি ভরে পানি নিয়ে যেত বাড়ি, যাত্রী এপার-ওপার করত খেয়া নৌকার মাঝি। আমি তন্ময় হয়ে দেখতাম মানুষের এই আসা-যাওয়া। নদীর ওপারে ছিল ঘন বন, তাকালে দেখা যেত দূরে নীল আকাশের কোল ঘেঁষে ধূসর গারো পাহাড়। সব কিছু মিলে মায়ার মতো লাগত আমার কাছে। একদিন সকালে উঠে বুঝতাম কেমন যেন মিষ্টি বাতাস বয়, দূরে বকুল ডালে কোকিল ডাকে। বুঝতাম বসন্ত এসেছে। হঠাৎ একদিন আকাশ অন্ধকার করে ঈশান কোণ থেকে ছুটে আসত কালো মেঘ, সঙ্গে সঙ্গে আসত ঝড়-কালবৈশাখী। শ্রাবণের বিকালে চুপচাপ একা বসে থাকতাম বারান্দায়। একটানা ঝর ঝর করে ঝরে পড়ত বৃষ্টি। একদিন দেখতাম আকাশে সাদা সাদা ভেসে চলা মেঘ। বাড়ির সামনে শিউলি গাছটা ফুলে ফুলে ভরে গেছে। নদীর ওপারে সাদা-কালো বন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকত। বুঝতাম শরৎকাল এসেছে। মাঠে মাঠে সোনার ফসল বুকে করে মানুষের মুখে মুখে হাসি ফুটিয়ে আসত হেমন্তকাল। চাষিরা মাঠে ধান কাটত। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে তাদের ধান কাটা দেখতাম। ওরা ধান কেটে, কেউবা মাথায় করে আবার কেউবা গরুর গাড়ি করে বাড়ি নিয়ে যেত। পাশের গাঁয়ে মেলা বসত, আমি দেখতে যেতাম সে মেলা। কত মানুষ আর কত জিনিস। আমি যেন দিশাহারা হয়ে যেতাম। আবার শীত আসত। এমনিভাবে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত আর বসন্তÑকত রূপ কত রং কত রেখা আর কত বৈচিত্র্য নিয়ে এলো-গেল।

ছেলেবেলায় আমার দেখা এই যে আমার দেশের রূপ, এ ছবি আমার মনের পর্দায় আঁকা ছিল। তারপর যখন ছবি এঁকেছি, তখন মনের পর্দায় সেই ছবি, রং আর তুলির আঁচড়ে বেঁধে রাখতে চেয়েছি। কতখানি পেরেছি জানি না। আমি চেয়েছি, আমার ছবিতে আমার দেশের মানুষের জীবন, তাদের হাসিকান্না, আমার দেশের প্রকৃতিকে বেঁধে রাখতে। এরপরও যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি ছবি আঁকতে শিখলাম কী করে, কার কাছ থেকেÑতবে বলব আমার দেশের মানুষ, মাটি আর আকাশের কাছ থেকে।’তিনি বলতেন, ‘নদীর ছবি আঁকার আগে পানির দোলনই আগে বুঝতে হবে।’

জয়নুল যখন শিল্পী হিসেবে কলকাতার শিল্পীসমাজে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন, তখন সেখানে শিল্পের দুটি ধারা বিরাজ করছিল। একটি একাডেমিক ধারা, অন্যটি বঙ্গীয় চিত্রধারা। কিন্তু জয়নুল এই দুটি ধারার বাইরে এসে নিজেই স্বতন্ত্র একটি ধারা তৈরি করেন। যা একান্তই নিজস্ব কিন্তু ঐতিহ্য ও শেকড় আশ্রিত, আধুনিক ও নতুন। জয়নুল প্রথাগত দক্ষতা নিয়ে পোরট্রেট পেইন্টার হতে চাননি। বরাবর তাঁর চোখ ছিল বাংলার প্রকৃতি ও সমাজজীবনের ওপর। আমাদের জাতীয় জীবনের মূল স্পন্দনকে শিল্পীর গভীর সংবেদনশীলতা দিয়ে অনুধাবন করেছেন তিনি। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের সৃষ্টিতে তিনি লোকশিল্পের আত্তীকরণ ও আধুনিক বোধের যে প্রকাশ ঘটিয়েছেন তা যেমনি মনোজ সুষমামণ্ডিত পাশাপাশি এ দেশের চিত্রকলায় নতুনতর এক ধারা। আজ বাংলাদেশের চিত্রকলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বমহিমায় যে ভাস্বর, তার পেছনে রয়েছে জয়নুলের উজ্জ্বল উপস্থিতি।

পাঁচ

ছবির সংগ্রহ:

জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্মের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংগৃহীত তাঁর শিল্পকর্মের সংখ্যা ৮০৭। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সংগ্রহে রয়েছে প্রায় পাঁচশ চিত্রকর্ম। তাঁর পরিবারের কাছে রয়েছে চার শতাধিক। ময়মনসিংহের সংগ্রহশালায় রয়েছে ৬২টি। এ ছাড়া পাকিস্তানের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় তাঁর বিপুল পরিমাণ চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে।

দাউদ ফারহান ও তাঁর পরিবারের সংগ্রহে জয়নুলের অনেক ছবি রয়েছে। দাউদ ফারহান শিল্পী আনোয়ারুল হকের ভ্রাতুষ্পুত্র। জয়নুল ছ-বছরের স্কুলজীবনের প্রথম তিন বছর ৩১ ওয়েলেসলি স্ট্রিটস্থ যোগীন্দ্র ভবনের মেসে কাটান। পরে বন্ডেল রোডের ৮১ নম্বরে আনায়ারুল হকের বাড়ির পাশে তাঁদেরই একটি কক্ষে স্টুডিও তৈরি করেন। তখন তাঁর খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা ছিল আনোয়ারুল হকের বাড়িতে। ময়মনসিংহ থেকে উঠে আসা তরুণ খুব সহজে সে পরিবারের একজন হয়ে ওঠেন। অন্দরমহলে যাতায়াতের ফলে বাড়ির মহিলাদের সূচিশিল্পের অনেক নকশাও সে সময় জয়নুলকে করে দিতে হয়েছে। এরূপ ঘনিষ্ঠতাসূত্রেই কলকাতা পর্বে জয়নুলের আঁকা অনেক চিত্রকর্মই আনোয়ারুল হক ও তাঁর ভাইবোনদের পরিবারের হস্তগত হয়। কলকাতা অবস্থানকালে একটি ট্রাংকে জয়নুল তাঁর ছবি জমিয়ে রাখতেনÑসেটিও ওই পরিবারে রক্ষিত ছিল। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৩৭ সালে একাডেমি অব ফাইন আর্টের প্রথম প্রদর্শনীতে জয়নুলের একটি চিত্র ‘হাইলি রিকমেন্ডেড’বলে সম্মানিত হলে তিনি পদকপ্রাপ্ত হন। এই পদকটিও ওই পরিবারের কাছেই সংরক্ষিত ছিল। জয়নুল আবেদিন তাঁর ট্রাংক, পদক ও সে সময় আঁকা বহু চিত্রকর্ম সেখান থেকে নিয়ে আসেননি। দাউদ ফারহান পরবর্তীকালে মিসেস আনোয়ারুল হক, তাঁদের অন্যান্য নিকটাত্মীয় ও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জয়নুলের এসব চিত্রকর্ম ও মূল্যবান সামগ্রীসমূহ নিজের সংরক্ষণে নিয়ে আসেন। যতদূর জানা যায়, এই পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের কাছে এখনও জয়নুলের আঁকা কিছু কিছু চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। দিল্লির মডার্ন আর্ট মিউজিয়ামে তাঁর গোর্কি সিরিজের কিছু স্কেচ রয়েছে।

ব্রাসেলসের ন্যাশনাল মিউজিয়াম, মার্কিন যুক্তরাষ্টের সিনসিনেট মিউজিয়াম ও সানফ্রান্সিসকো মিউজিয়াম অব আর্টে সংরক্ষিত আছে জয়নুলের চিত্রকর্ম। পাকিস্তানের লাহোর মিউজিয়ামে তাঁর ছবির সংগ্রহ রয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বের বহু স্থানে শিল্পানুরাগীদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে তাঁর ছবি সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ডিউক অব এডিনবরার ব্যক্তিগত সংগ্রহ।

আবেদিন জ্বালমুখ:

২০০৯ সালের ৯ জুলাই ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন বুধ গ্রহের একটি জ্বালামুখ (গর্ত) ‘আবেদিন জ¦ালামুখ’নামকরণ করে। মানবসভ্যতায় মানবিক মূল্যবোধ ও উপলব্ধিকে গভীরতর করার প্রেক্ষিতে এ নামকরণ করা হয়। বিভিন্ন সময় বুধ গ্রহের বিভিন্ন গহ্বরগুলোকে মানবতার অবদানের জন্য সম্মান জানাতে বিশ্বের মহান শিল্পী, সংগীতজ্ঞ এবং লেখকদের নামে নামকরণ করা হয়েছে। ইতিপূর্বে যাঁদের নামে করা হয়েছে তাঁরা হলেনÑইয়েটস, বাচ, বালজাক, বেথোভেন এবং পাবলো নেরুদা। এই তালিকায় যুক্ত হন বাংলাদেশের সেরা শিল্পী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন।

আবেদিন নামক জ্বলামুখটি বুধ গ্রহে নাসার ‘মেসেঞ্জার’যানটি আবিষ্কার করে। নাসার ফটো জার্নাল জানিয়েছে, ২০০৮ সালের অক্টোবরে দ্বৈত ইমেজিং সিস্টেমের (এমডিআইএস) ন্যারো অ্যাঙ্গেল ক্যামেরা (এনএসি) দিয়ে গর্তটির ছবি সংগ্রহ করা হয়। পরিমাপ অনুসারে আবেদিন গহ্বরের দৈর্ঘ্য ১১০ কিলোমিটার এবং উচ্চতা ২২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার।

নিলামে সর্বোচ্চ বিক্রয়:

২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জয়নুলের ‘মনপুরা ৭০’সিরিজের একটি ছবি নিউইয়র্কের নিলাম সংস্থা সদেবি’স নিলামে তোলে। ছবির্টি ৬ লাখ ৯২ হাজার ৪৮ ডলার বিক্রি হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থ প্রায় ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা। কোনো বাংলাদেশি শিল্পীর চিত্রকর্মের দামের দিক থেকে এটি রেকর্ড-মূল্য। এর আগে সে বছরই নিউইয়র্কে ১৮ মার্চ ২০২৪ তারিখে এক নিলামে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের দুটি চিত্রকর্ম রেকর্ড দামে বিক্রি হয়। ‘সাঁওতাল দম্পতি’নামের একটি চিত্রকর্ম ৩ লাখ ৮১ হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪ কোটি ১৭ লাখ সাড়ে ৬ হাজার টাকা। দ্বিতীয় চিত্রকর্মটি বিক্রি হয় ২ লাখ ৭৯ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার বা ৩ কোটি ৬ লাখ টাকার কিছু বেশি। ২০১৮ সালে নিউইয়র্কে জয়নুল আবেদিনের সাঁওতাল সিরিজের আরেকটি চিত্রকর্ম নিলামে বাংলাদেশি মুদ্রায় দেড় কোটি টাকায় বিক্রি হয়।

সম্মাননা:

১৯৭৪-এ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় জয়নুল আবেদিনকে সাম্মানিক ডি.লিট উপাধি প্রদান করে। এই উপলক্ষে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জয়নুল আবেদিন বলেন, ‘শৈশবে আমার ভেতরকার তীব্র এক তাড়া আমাকে ছবি আঁকার জগতে টেনে এনেছে।’তিনি বললেন, ‘আমি শুধু জানি কেন আমি আঁকি এবং কী আঁকি। আমার কাজগুলো দর্শকদের কাছে যেন দুর্বোধ্য মনে না হয়। সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া ও তাদের জীবনকে ছবিতে তুলে ধরাই আমার সব সময়ের কামনা।’১৯৫৮ সালে পাকিস্তান সরকারের সর্বোচ্চ খেতাব হেলাল-ই-ইমতিয়াজে ভূষিত হন জয়নুল আবেদিন। ১৯৫৯ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট প্রদত্ত সর্বোচ্চ সম্মানজনক পুরস্কার ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’প্রদান করা হয় তাঁকে। কিন্তু ১৯৭১ সালে ফেব্রুয়ারিতে মওলানা ভাসানীর আহ্বানে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত এক জসসভায় তিনি বক্তৃতা করে ‘হিলাল-ই-ইমতিয়া’খেতাব প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি ‘শিল্পাচার্য’ উপাধিতে ভূষিত হন। সে বছরই তিনি টেলিভিশন, ফিল্ম ও পাবলিকেশন্সের জন্য পাকিস্তান সরকারের অনারারি আর্ট অ্যাডভাইজার নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। এ দায়িত্ব পালনকালে অধিকাংশ সময় তিনি করাচিতে অবস্থান করেন।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত জয়নুল আবেদিন বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি তিন বছরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিজিটিং প্রফেসর নিযুক্ত হন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে ঘোষণা করেন। সে সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াস্থ ‘কংগ্রেস ফর ওয়ার্ল্ড ইউনিটি’র সদস্য নির্বাচিত হন। প্রাতিষ্ঠানিক এসব দায়িত্ব ও কাজ করতে যেয়ে শিল্পীর নিজের শিল্প-সৃষ্টি দারুণভাবে ব্যাহত হয়। আমরা উল্লেখযোগ্য কালশ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম থেকে বঞ্চিত হই। তার পরেও যেসব সৃষ্টিকর্ম তিনি রেখে গেছেন তা আমাদের শিল্প ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে। তিনি হয়ে আছেন শিল্পের একটি শতাব্দীর মহানায়ক। জয়নুলের জগৎ হয়ে রইল আমাদের কালান্তরের ঠিকানা। মৃত্যুর এক বছর পরে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে।

প্রচ্ছদ-ইলাস্ট্রেশন:

জয়নুল বেশ কিছু বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। জসীম উদ্দীনের নকশীকাঁথার মাঠ, রঙিলা নায়ের মাঝি, বেদের মেয়ে, পল্লীবধূ, গাঙের পাড়, পদ্মাপার, মাটির কান্না, বালুচর, আবুল কালাম শামসুদ্দীন অনূদিত তুর্গেনিভের ভার্জিন সয়েলের অনাবাদি জমি, শামসুদ্দীন আবুল কালামের কাশবনের কন্যা, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের হারামণি (২য় খণ্ড), আহসান হাবীবের রাত্রিশেষ, আবুল মনসুর আহমদের আয়না, শওকত ওসমানের বনি আদম, সরদার জয়েনউদ্দীনের নয়ান ঢুলী, শামসুল হুদা চৌধুরীর ময়ূখ, কল্যাণী দত্তের ছোটদের সচিত্র কৃত্তিবাস, আবুল আহসান চৌধুরী-সম্পাদিত লোকসাহিত্য পত্রিকা ইত্যাদি। ছোটদের সচিত্র কৃত্তিবাসই তাঁর অলংকৃত প্রথম শিশুতোষ বই। ১৯৪৭-এর আগে জয়নুলের কোনো শিশুতোষ বইয়ের প্রচ্ছদ বা অলংকরণের কাজের তথ্য পাওয়া যায় না। জয়নুল এসব প্রচ্ছদ-অলংকরণের কাজে ফোক-মোটিফ এবং গ্রামীণ জীবন ও নিসর্গের চালচিত্র ব্যবহার করেছেন।

অন্যান্য দায়িত্ব

ঢাকায় আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠা ছাড়াও দেশে-বিদেশে বিভিন্ন কাজের সঙ্গে জয়নুল যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৮ সালে তিনি টেলিভিশন, ফিল্ম ও পাবলিকেশন্সের জন্য পাকিস্তান সরকারের অনারারি আর্ট অ্যাডভাইজার নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। এ দায়িত্ব পালনকালে অধিকাংশ সময় তিনি করাচিতে অবস্থান করেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত জয়নুল আবেদিন বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি তিন বছরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিজিটিং প্রফেসর নিযুক্ত হন। সে সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াস্থ ‘কংগ্রেস ফর ওয়ার্ল্ড ইউনিটি’র সদস্য নির্বাচিত হন। প্রাতিষ্ঠানিক এসব দায়িত্ব ও কাজ করতে গিয়ে শিল্পীর নিজের শিল্প-সৃষ্টি দারুণভাবে ব্যাহত হয়। আমরা উল্লেখযোগ্য কালশ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম থেকে বঞ্চিত হই। তার পরেও যেসব সৃষ্টিকর্ম তিনি রেখে গেছেন তা আমাদের শিল্প ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে। তিনি হয়ে আছেন শিল্পের একটি শতাব্দীর মহানায়ক। জয়নুলের জগৎ হয়ে রইল আমাদের কালান্তরের ঠিকানা।

প্রদর্শনী:

জয়নুল আবেদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একক ও যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ১৯৪৫ সালের মার্চে কলকাতার মোহাম্মদ আলী পার্কে অনুষ্ঠিত ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের তৃতীয় সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত ‘আমাদের দেশ’ শীর্ষক শিল্প-প্রদর্শনী। এখানে তাঁর দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা প্রদর্শিত হয়। ১৯৪৬ সালে অল ইন্ডিয়া ফাইন আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস সোসাইটির উদ্যোগে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক শিল্প-প্রদর্শনী ও প্রথম সর্বভারতীয় শিল্প-সম্মেলনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন তিনে। সে বছর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অনুষ্ঠিত মুসলিম আর্ট এক্সিবিশনে অংশগ্রহণ করেন। এর কিছুদিন পর নভেম্বর-ডিসেম্বরে ইউনেসকোর উদ্যোগে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক আধুনিক চিত্র-প্রদর্শনীতে অংশ নেন। তিনি লন্ডনের বার্লিংটন হাউসে অনুষ্ঠিত সমকালীন আধুনিক ভারতীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন ১৯৪৭ সালে। ১৯৪৭-৪৮ সালে লন্ডনের রয়্যাল একাডেমি অব আর্টস আয়োজিত খ্রিস্টপূর্ব ২৪০০ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তানের শিল্প-প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৮-এর জানুয়ারিতে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত বেঙ্গল ড্রইং ও পেইন্টিং প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরিচয় উপলক্ষে আয়োজিত ফজলুল হক হলের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং সেখানে এক বিকেলের একটি শিল্প-প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। ১৪ আগস্ট ঢাকার গভর্নর হাউসে ভারতবর্ষে মুসলিম কৃতিত্বের বিষয় অবলম্বনে আঁকা তাঁর একশটি পোস্টার-চিত্রের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে লন্ডনের বার্কলে গ্যালারিতে তাঁর একটি একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সে বছর ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ও তুরস্ক সফর করেন। তখন ভেনিসে ইউনেসকোর উদ্যোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক শিল্প-সম্মেলনে যোগ দেন। ১৯৫৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মেয়ো স্কুল অব আর্টের উদ্যোগে লাহোরের আলহামরায় জয়নুলের একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫৫ পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল করাচিতে তাঁর একক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। ১৯৫৬ সালের ২৫ আগস্ট এক বছরের জন্য রকফেলার ফাউন্ডেশনের অধীনে জয়নুল জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, কানাডা, ব্রিটেন, জার্মানি, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইতালি, সুইজারল্যান্ড ও স্পেন সফর করেন। ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত টোকিওর দাইমার ডিপার্টমেন্ট স্টোরে তাঁর একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সানফ্রান্সিসকো মিউজিয়াম অব আর্টে তাঁর আরেকটি একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৫৭ সালের ৮ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত ওয়াশিংটনের স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনে একক চিত্র-পদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। কিছুদিন পর মে মাসে নিউইয়র্কে এবং জুন মাসে জার্মানিতে ছোট আকারের জয়নুলের দুটি চিত্র-প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত। ১৯৬১ সালে সরকারের আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। সে সময় মস্কোতে তাঁর একটি একক চিত্র-প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় এবং তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইন আর্ট বিভাগ চালু করার দায়িত্ব নিয়ে আগস্টে তিনি পেশোয়ার যান এবং সেখানে সাত মাস অবস্থান করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি আরসিডিভুক্ত দেশগুলোর (পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক) পঞ্চম দ্বিবার্ষিক চিত্রকলা-প্রদর্শনীর বিচারক হিসেবে তেহরান যান। ১৯৭০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকায় ‘নবান্ন’শীর্ষক প্রদর্শনী-আয়োজন করেন। এ উপলক্ষে ৬৫ ফুট দীর্ঘ ‘নবান্ন’ শীর্ষক স্ক্রোলচিত্রটি আঁকেন। সে বছর আরব লিগের আমন্ত্রণে ৯ মে থেকে আড়াই মাসব্যাপী মিসর, জর্ডান, সিরিয়া ও লেবানন সফর করেন। সফরকালে প্যালেস্টাইন উদ্বাস্তু শিবিরগুলো ও গেরিলা-যুদ্ধের এলাকা পরিদর্শন করেন। তাদের নিয়ে ছবি আঁকেন এবং কায়রোতে তা প্রদর্শনীর আয়োজন করেন।

১৯৭১ সালের ১২ মার্চ বাংলা চারু ও কারুশিল্পী সংগ্রাম পরিষদ-আয়োজিত ‘স্বাধীনতা’শীর্ষক মিছিলে তিনি নেতৃত্ব দেন। দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে লন্ডনের কমনওয়েলথ ইনস্টিটিউটে বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের আঁকা মুক্তিযুদ্ধের ছবির প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। দেশে ফিরে তিনি হাতে লিখে জাতীয় সংবিধান তৈরির সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন। সে বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠিত সমকালীন শিল্পকলা-প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন এবং সে প্রদর্শনী-উপলক্ষে ভারত সফররত বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশের শিল্প-আন্দোলনে জয়নুল আবেদিন অনন্য পথিকৃত। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায়ই দেশে আধুনিক চিত্র-শিল্পের গোড়াপত্তন ঘটেছে। আজ আমাদের চিত্রকলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে উজ্জ্বল অবস্থান তৈরি করেছে এর অগ্রভাগে রয়েছেন জয়নুল আবেদিন। তিনি কেবল চিত্রশিল্প নয় আমাদের সংস্কৃতি ও রুচিবোধ বিনির্মাণে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আর তাই তিনি যেমনি আমাদের শিল্পাচার্য তেমনি তাঁর জগৎ আমাদের কালান্তরের ঠিকানা।

সহায়ক গ্রন্থ:

ক্স            জয়নুল আবেদিন, নজরুল ইসলাম, শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৭

ক্স            জয়নুল আবেদিন, সৃষ্টিশীল জীবনসমগ্র, সৈয়দ আজিজুল হক, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৫

ক্স            একটি ছবির পটভূমি, জয়নুল আবেদিন, ইত্তেফাক, ঈদসংখ্যা, ১০ ডিসেম্বও, ১৯৬৯

ক্স            জয়নুল আবেদিন: তাঁর কাজ ও কথা, নজরুল ইসলাম, ঢাকা, ২০০২

ক্স            শিল্পকলা প্রসঙ্গে, মতলুব আলী, মুক্তধারা, ঢাকা, ১৯৭৮

ক্স            শিল্পের ঘরবসতি, রফিউর রাব্বি, অপরাজিতা, নারায়ণগঞ্জ, ২০১১

ক্স            জয়নুলের হাতে অন্য তুলি, কাইয়ুম চৌধুরী, কালী ও কলম, ঢাকা, সংখ্যা: জানুয়ারি, ২০১৪

ক্স            দুর্ভিক্ষ ও জয়নুল, আবুল হাসনাত, কালী ও কলম, ঢাকা, সংখ্যা: জানুয়ারি ২০১৫

ক্স            শিল্পাচার্যের গ্রন্থ-অলংকরণের সন্ধানে, আবুল আহসান চৌধুরী, কালী ও কলম, ঢাকা, সংখ্যা: জানুয়ারি, ২০১৫

ক্স            বাঙালি সংস্কৃতিতে প্রত্যহ প্রাসঙ্গিক যিনি, সৈয়দ আবদুল ওয়াজেদ, ইত্তেফাক, ২৯ জানুয়ারি, ২০২২

ক্স            জয়নুল আবেদিন : পঞ্চাশে মনপুরা, ওয়াহিদ সুজন, বণিক বার্তা, ১৭ মে, ২০২৩

ক্স            চিরকালের শিল্পের পথিক জয়নুল আবেদিন, আহমাদ ইশতিয়াক, দ্য ডেইলি স্টার, ২৯ মে, ২০২১

ক্স            একটি ছবির পটভূমি, জয়নুল আবেদিন, ইত্তেফাক, ঈদসংখ্যা, ১০ ডিসেম্বর, ১৯৬৯

কমেন্ট করুনঃ

Scroll to Top
Copy link