সাইফুল ইসলাম
(ও আহারে) জানিয়াও জানেন না
শুনিয়াও শোনেন না
আই মোর জ্বলেয়া গেইলেন মনের আগুন
নিভিয়া গেইলেন না।
ও তোর নয়নে কাজল
তিলেক দণ্ড না দেখিলে
মন হয় রে পাগল ॥
ও তোর কাইচি ছাঁটা চুল
হয় না কেনে চেংড়া বন্ধু
খেইলে কদমের ফুল।
ও তুই নাওয়ের কাণ্ডারী
নাও চাপা ও রে নদীর ঘাটে
নাওয়ের ভাণ্ডারী ॥
আজি ভাবিয়া করিস কি
চিন্তিয়া করিস কি
ঐ না আশপড়শী পাড়ার লোকে
ভাঙ্গিল পিরিতি ॥
কালোত্তীর্ণ এ ভাওয়াইয়া গানটির স্রষ্টা কেদার চক্রবর্তী*। তাঁর সুরে, তাঁর কণ্ঠেই ১৯৪৭ সালে গ্রামোফোন রেকর্ডে এটি ধারণ করে কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি। হয়তো উল্লিখিত সময়েরও অনেক আগে এ গানের কথা সাজিয়ে থাকতে পারেন গীতিকার। রেকর্ডের সময়ের হিসাবে ৭৮ বছর পেরিয়ে গেছে গানটির বয়স। কিন্তু লোক-শ্রোতাসমাজে এর কথা-সুরের আবেদন এত কতটুকু কমেনি আজো। তার প্রমাণ আছে ভুরিভুরি। তবে সেটা এখানে আলোচনার বিষয় নয়। গানটিতে ধর্মীয় ও নৈতিক সমাজবাস্তবতায় বাঙালি নারী জীবনের নিরাভরণ চিত্র বিধৃত হয়েছে, যেখানে রয়েছে প্রেমের গোপনতা, একইসঙ্গে সমাজের রাখঢাকহীন দৃষ্টি। আশা-নিরাশা আর অব্যক্ত অন্তর্বেদনার অনুপেক্ষণীয় দলিল।
(ও আহারে) জানিয়াও জানেন না / শুনিয়াও শোনেন না…
এই গানে নির্মিত কেন্দ্রীয় চরিত্রটি নারী এবং একইসঙ্গে প্রেমিকা। তাকে দেখা যায় গভীর অনুভবের আগুনে পুড়তে থাকা এক অনুরাগিণী হিসেবে। তার সে অন্তর্দহনের টগবগানি আমরা প্রত্যক্ষ করি গানের প্রথম দুটি লাইনেইÑ (ও আহারে) জানিয়াও জানেন না / শুনিয়াও শোনেন না। একইসঙ্গে গানের এ দুটি চরণে মূর্ত হয়েছে প্রেমিকের উদাসীনতা ও নারীর একাকীত্ব। তার প্রেম এখানে একতরফা অভিজ্ঞতার বেদনাভাষ্য। সে তার হৃদয় আধিকারককে নিজের অসহায় পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাচ্ছে, ডাকছে; অথচ পুরুষটি অতিশয় উদাসীন। সবকিছু জেনেশুনেও সে নির্বিকার। কিন্তু এই নির্লিপ্ততার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হতে পারে না নারী। কারণ, সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামো তার প্রেম প্রকাশের পরিসরকে সীমিত করে দেয়। তার অনুভূতি গভীর হওয়া সত্ত্বেও সমাজ ও ধর্মের বক্রচাহনি তার প্রেম প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিবন্ধক। একই কারণে নারীর প্রেমের প্রাবল্য থাকা সত্ত্বেও ঘোষিত নয়- গোপন। কারণ, ধর্মীয় নিয়মনীতি ও সামাজিক শৃঙ্খলা তাকে প্রেমের প্রকাশ্য উচ্চারণ থেকে বিরত রাখে প্রতিনিয়ত। তাই তার অনুভব পরিণত হয় অব্যক্ত দাহ-যন্ত্রণায়, আহা রে!
আই মোর জ্বালেয়া গেইলেন মনের আগুন
নিভিয়া গেইলেন না।
এখানে প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা শুধু প্রেম নয়- যৌবনাকাক্সক্ষা এবং তার অপূর্ণতায় অবিরাম দহনের প্রতিফলন। এখানে প্রেম শুধু আবেগ নয়- যৌবনের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিরও প্রকাশ। অথচ ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও লোকবিশ্বাসে এই যৌবনবোধকে অনেক সময় ‘সংযম’ ও ‘নৈতিকতার’ কঠোর গণ্ডিতে বাঁধা হয়। ‘মনের আগুন’কে ধর্মীয় ভাষ্য ও লোকবিশ্বাসে ‘পাপ’ বা ‘কামনা’ হিসেবে চিহ্নিত। তাই প্রেমিকার আকাক্সক্ষা যত গভীরই হোক, তা সমাজের নীরব নজরদারির মধ্যে আবদ্ধ থাকে। ফলে বাঙালির ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সমাজে নারীপ্রেম ঐতিহ্যগতভাবে লজ্জা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নীরবতার মধ্যে কল্পিত। বিশেষত ধর্মীয়-নৈতিক কাঠামোয় নারীর প্রেম প্রকাশ্য নয়, খুব সতর্ক হয়েই নিধুবনের পথে পা বাড়াতে হয় তাকে। ‘জ্বলেয়া গেইলেন মনের আগুন নিভিয়া গেইলেন না’- গানের এ ভাষা তথাকথিত অশ্লীল, কিন্তু গভীর অনুভবের প্রতিচ্ছায়া। এ কারণে প্রেমিকা তার মনের আগুন প্রকাশ করলেও সেটি অনেক সময় সামাজিক স্বীকৃতি পায় না- বরং নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তদুপরি এই গানে নারী সেই প্রশ্নের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে অন্তত নিজের মনের আগুন প্রকাশ করেছে, যা ধর্মীয় গোপনীয়তার সংস্কারের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।
অন্যদিকে মনোদৈহিক সংকটকালে পুরুষের দিক থেকে নারীকে উপেক্ষার চিরকালীন মনোবৃত্তির চিত্রও এ গানে সুস্পষ্ট। সেটা হতে পারে সেই পুরুষের উদাসীনতা অথবা পিতৃতান্ত্রিক বা পুরুষনির্মিত নজরদারির দেয়াল ডিঙানোর অক্ষমতা। তার এ পলায়নপরতা সহজাতরূপে ফুটে উঠেছে কেদার চক্রবর্তীর কথা ও সুরে। গানে প্রেমিকের উপস্থিতি ও স্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায় প্রেমিকার ভাষ্যে। কিন্তু তার প্রস্থান কাপুরুষবৎ। কারণ, প্রেমিকের প্রেমচিতায় জ্বালানো অনিঃশেষ আগুনে অবিরাম দগ্ধ হচ্ছে প্রেমিকা, যার নিক্ষেপিত অগ্নিবানে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে অহর্নিশ, বিপদকালে সে-ই তার দায়িত্ব ও কৃৎকর্মের দায় এড়িয়ে গেছে। নারীর দেহতরী ও হৃদয়পানসি অকূলে ভাসিয়ে ক্রমশ দূরবর্তী হয়েছে। তদুপরি প্রেমিক প্রবরের পলায়নপরতা নিয়ে নারীর যে অনুযোগ সেটাও অভিমানসিক্ত এবং তা স্পষ্ট হয়েছে ‘জ্বলেয়া গেইলেন মনের আগুন / নিভিয়া গেইলেন না’ পংক্তি দুটিতে।
ও তোর নয়নে কাজল /তিলেক দণ্ড না দেখিলে /মন হয় রে পাগল/
ও তোর কাইচি ছাঁটা চুল / হয় না কেনে চেংড়া বন্ধু / খেইলে কদমের ফুল ॥
গানের এ অংশে প্রেমিকার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি শরীরঘেঁষা ও ইন্দ্রিয়নির্ভর। এখানে নারীর শুধু প্রেমের মানসিক আকাক্সক্ষাই নয়, পুরুষের রূপ, গন্ধ ও স্পর্শের প্রতি আকর্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। এটি তার যৌবনবোধের এক সরল ও অকৃত্রিম প্রকাশ। তার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু পুরুষের চোখের কাজল অর্থাৎ দৃষ্টির টান, যা প্রেমের সূচনা করে। শরীরী বৈশিষ্ট্য হিসেবে চুল, যা কামনার এক নীরব অথচ দৃঢ় প্রকাশ। কদম ফুল- একটি ইঙ্গিতপূর্ণ রূপক; পৌরাণিকে কদম ফুল বর্ষা, যৌবন ও প্রেমের প্রতীক। তবে তার এই তারুণ্যের সতেজতা ও প্রাণশক্তিকে ধর্মীয় সমাজে অনেক সময় ‘নিষিদ্ধ’ তকমা জুড়ে দিয়ে দমন করা হয়। ধর্মীয়-নৈতিক সমাজের সমষ্টিগত শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে ব্যক্তিগত প্রেমকেও। ফলে সে নিজের কামনা প্রকাশ করলেও সমাজ তাকে সেই প্রেমের স্বীকৃতি দেয় না, বরং তাকে দোষারোপের বেড়ি পরানোর আশঙ্কা তৈরি করে। এটিই আত্মযৌবনিক সংকটের কেন্দ্র- একদিকে প্রেম ও শরীরের টানাপোড়েন, অন্যদিকে সমাজ ও ধর্মীয় শাসনের ভয়। যদিও এ গানে নারী লজ্জিত নয়, বরং তার আকাক্সক্ষা স্বীকার করছে অকপটে।
ও তুই নাওয়ের কাণ্ডারী / নাও চাপা ও রে নদীর ঘাটে / নাওয়ের ভাণ্ডারী ॥
‘নাও’ শব্দটি এখানে নারীর সমগ্র জীবনের প্রতীক। এর চালক বা পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় থাকে পুরুষ। নারীর মাধ্যমেই তার এ পরিচয় সূচিত- ভাণ্ডারী। প্রতীকীভাবে এ ভাণ্ডারী এমন একজন ব্যক্তি যিনি নারীর জীবনযাত্রায় নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। বিশ্বাসের নির্ভরতায় নারী অবলীলায় নিজেকে সমর্পণ করে সেই কাণ্ডারী-ভাণ্ডারীরূপ পুরুষের কাছে। সম্মান-সম্ভ্রমসহ তার দেহভাণ্ডারের রক্ষক এ পুরুষ পিতৃতান্ত্রিকতারই প্রতিভূ। বহুকাল ধরে নারীর মনোজগত সেভাবেই নির্মিত যে, এই পুরুষ ছাড়া সে নিরালম্ব। তাই অসহায়ত্বের চূড়ান্ত উপলব্ধি অথবা অনিবার্য বিশ্বাসে জীবনের গন্তব্যে পৌঁছার নিমিত্তে তাকেই সে আহ্বান জানায়- নাও চাপা ও রে নদীর ঘাটে/নাওয়ের ভাণ্ডারী।
“অজি ভাবিয়া করিস কি / চিন্তিয়া করিস কি / ঐ না আশপড়শী পাড়ার লোকে / ভাঙ্গিল পিরিতি ॥”
এখানে পাড়া-প্রতিবেশী অর্থাৎ সমাজ ধর্মীয়-নৈতিক ভ্রুকুঞ্চনের মিশেলে এক নজরদার রাষ্ট্রের প্রতীক। পাড়া-প্রতিবেশীর এ কঠোর চাহনি মূলত পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণের প্রতিফলন। এমন সামাজিক চাপে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক ভেঙে যায় প্রায়শই। বিষয়টি এভাবেও দেখা যেতে পারে, প্রেম ভাঙছে প্রেমিক-প্রেমিকার ইচ্ছায় নয়, বরং সমাজের “লোকদেখানো নীতিনিয়মে”। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রেম সর্বদা জনমত ও লোকাচার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তার নিজের ইচ্ছা একেবারে গৌণ। এই প্রথা প্রেমকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক না রেখে সামাজিক শৃঙ্খলার অংশ করে ফেলে। নারী তাই এখানে প্রেমে অংশ নিলেও পরিণতির ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রেমিক পুরুষ হয়তো সহজে সরে যেতে পারে, কিন্তু নারীর ওপর পড়ে সামাজিক বিচার ও কলঙ্কের ভার। কখনো কখনো পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায় যে, দণ্ডও তারই ভাগ্যে নির্ধারিত হয়।
গানটির ব্যাখ্যায় ভাওয়াইয়ার আরেক দিকপাল স্রষ্টা ও সংগ্রাহক হরিশ্চন্দ্র পাল মহাশয় [৮ই আশ্বিন, ১৩২২ বঙ্গাব্দে (১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দ) লিখেছেন- “এখানকার গানগুলোতে একটা জিনিস লক্ষ্ করা যায়, তা হচ্ছে এই যে নায়িকার বিরহতাই প্রায় গানেই ছড়িয়ে রয়েছে। এর কারণটা বোধ হয় সেই আগের দিনের মেয়েদের অবগুণ্ঠন-প্রিয়তা কিংবা অবগুণ্ঠনের বাধ্যতা। অনেক সময় দেখা যায়, গড়ে ওঠা সম্পর্কিত প্রেম নায়কের দূরদেশে যাত্রা অথবা নায়িকার মনের চারধারে সামাজিকতার তৈরী বেড়াজালে ধ্বসে যায়। যার ফলে নায়িকা সেই পূর্ব সম্পর্কিত প্রেমের স্মৃতিকে ভুলতে না পেরে নায়ককে দোষারোপ অথবা তাঁর উপর নির্ভরশীলতা ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। এ ক্ষেত্রেও নায়িকা নায়কের কাজে আন্তরিক আবেদনে পূর্ব সম্পর্কিত প্রেমের মর্যাদা দিতে গিয়ে আকুলতা প্রকাশ করেছে।” [ভাওয়াইয়া সংগীত : শিল্পীর জীবন ও শিল্পের তত্ত্ব অণে¦ষা, ড. নারায়ণচন্দ্র বসুনীয়া, পৃষ্ঠা ১২২-১২৩]
সর্বোপরি আমরা দেখতে পাই, বাঙালির ধর্মীয় ও সমাজবাস্তবতায় নারীর প্রেম, আত্মজৈবিক সংকট ও পিতৃতান্ত্রিক প্রথা- এই তিনটি দৃষ্টিকোণ একসঙ্গে ধরলে গানটির পাঠ আরও তীক্ষè ও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এ গানে নারীর প্রেম প্রকাশে সমাজের বাধা ও নজরদারি স্পষ্ট। তার নীরবতা বাধ্যগত আর স্বাধীনতা সীমিত। আত্মজৈবিক অবস্থান বিশ্লেষণে যৌবনসন্ধিক্ষণে সে নীরবে দগ্ধ, তার আকাক্সক্ষা নিয়ন্ত্রিত। এ কারণে সে তার অনুভবকে আগলে রাখে ত্রস্ত সচেতনায়। সে জানে তার চারপাশের সমাজ পিতৃতান্ত্রিক, তার কাক্সিক্ষত সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের অধিকার সমাজ ও পুরুষের হাতে, তাই সে নিশ্চল, তার সত্তাও সার্বভৌম নয়। তাই বলা যায়, গানটি শুধু একটি গ্রামীণ প্রেমগীতি নয়- এটি নারীর প্রেম ও যৌবনের ওপর পিতৃতান্ত্রিক শাসনের প্রতিচ্ছবি, যেখানে নারী নিজের মনের আগুন প্রেমিক প্রবরের কাছে জানায় ঠিকই, কিন্তু শোষণ ও সামাজিক নজরদারির মাঝে বন্দি থেকে যায়।
কেদার চক্রবর্তী, তাঁকে জানি একটুখানি…
ভাওয়াইয়া গানের প্রখ্যাত গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী কেদার চক্রবর্তীর জন্ম ১৯১৪ সালে কোচবিহারের খাগড়াবাড়ি গ্রামে। ভাওয়াইয়া গানকে দেশ-বিদেশের বিপুল শ্রোতার কাছে পরিচিত ও জনপ্রিয় করতে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। এই গুণী সংগীতজ্ঞ ও ভাওয়াইয়াপ্রেমী আব্বাস উদ্দিন, নায়েব আলী টেপু, সুরেন রায় বসুনিয়া প্রমুখের সমসাময়িক ছিলেন। কেদার চক্রবর্তীর পিতার নাম ছিল রুদ্রনাথ চক্রবর্তী এবং মাতার নাম রুক্মিণী দেবী। তিনি আব্বাস উদ্দিনের মতো বিখ্যাত শিল্পীদের সময়েও নিজস্ব সুর ও গায়কীর মাধ্যমে নিজেকে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। তার গান এবং শিল্পকলা ভাওয়াইয়া সংগীতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার লেখা ভাওয়াইয়া ‘লাল বাজারের চেংড়া বন্ধু’ শ্রোতাদের কাছে আজও যারপরনাই সমাদৃত।
কেদার চক্রবর্তী সম্পর্কে শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী লিখেছেন:
খাগড়াবাড়ী। শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ প্রকৃতির প্রাণ ময়তায় ভরা। কেদার চক্রবর্তীর জন্ম। শৈশবে সংগীতের হাতেখড়ি মার কাছে। মা ছিলেন ভাওয়াইয়া গানের গায়িকা। জেনকিন্স বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ১৯৪৭ সাল। কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রথম চার খানি গান রেকর্ড করেন।… [ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি, মুস্তাফা জামান আব্বাসী, অনন্যা, ঢাকা, পৃষ্ঠা-৩০৮]
কেদার চক্রবর্তী সম্পর্কে কিছুটা বিস্তারিত তুলে ধরেছেন দুই বাংলার ভাওয়াইয়াভূমি চষে বেড়ানো নিষ্ঠাবান তরুণ ভাওয়াইয়া গবেষক আশরাফুজ্জামান বাবু। তিনি তার নিজ নামের ইউটিউব চ্যানেল নিম্নরূপে উপস্থাপন করেছেন ভাওয়াইয়ার এই কালজয়ী স্রষ্টাকে:
কিংবদন্তী আব্বাসউদ্দীনসহ যাদের নিরলস পরিশ্রমে ভাওয়াইয়া গান আজ সার্বজনীনতা অর্জন করেছে তাদের একজন কেদার চক্রবর্তী। কেদার চক্রবর্তী ছিলেন নায়েব আলী টেপু, সুরেন্দ্রনাথ রায় বসুনীয়ার সমসাময়িক। … বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কেদার চক্রবর্তী স্বভাবশিল্পী এবং তিনি কবিও ছিলেন। এ কারণে ব্যাকরণগত শিক্ষায় সংগীত শেখেননি। তবু সংগীতের সকল শাখায় তিনি পারদর্শী ছিলেন। কেদার চক্রবর্তী ভাওয়াইয়ার পাশাপাশি শ্যামাসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি ও আধুনিক গানও সাবলীলভাবে গাইতে পারতেন। এমনকি তিনি বাঁশিও বাজাতেন দারুণ রকম। কেদার চক্রবর্তীর অগণিত শিষ্য ছড়িয়ে রয়েছেন বিভিন্ন প্রান্তে। তারা স্বনামে খ্যাতিমান এখনো। কেদার চক্রবর্তীর জন্ম ১৩২১ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ১৯১৪ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার খাগড়াবাড়িতে।
বাবা রুদ্রনাথ চক্রবর্তী। শৈশবেই কেদার চক্রবর্তী সংগীতের প্রতি আসক্ত হন। কারণ, তার মা রুক্মিণী দেবী ভাওয়াইয়া শিল্পী ছিলেন। মায়ের প্রভাব পড়েছিল ছেলে কেদার চক্রবর্তীর ওপর। তিনি স্থানীয় জেমকিন্স বিদ্যালয়ে পাঠ শেষ করেই শুরু করেন কর্মজীবন। বাংলাদেশের রংপুরে জমি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে সার্ভেয়ার হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। রংপুর অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি ও মানুষের সারল্য কেদার চক্রবর্তীকে ভাওয়াইয়ার গভীর সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়। এমন এক সময় কেদার চক্রবর্তীর জীবনে আলোর পরশ নিয়ে আসেন লোকসংগীত বিশেষজ্ঞ হরিশ্চন্দ্র পাল।
হরিশ্চন্দ্র পালের সান্নিধ্য কেদার চক্রবর্তীর জীবনে খুলে দেয় নতুন দুয়ার। হরিশ্চন্দ্র পালের সহায়তায় কেদার চক্রবর্তীও গান প্রথম রেকর্ডবন্দি হয় ১৯৪৭ সালে কলাম্বিয়া কোম্পানি থেকে। ১৯৪৮ সালে বাজারে আসা প্রথম প্রকাশিত রেকর্ডে চারটি গান ছিল। গানগুলো হলো- ‘একটা শোনেক মোরে রে’, ‘ও কি জানিয়াও জানেন না’, ‘অন্দ মন্দ না কইস কন্যা’ এবং ‘হায় কেন গেল কন্যা’। গানগুলো শ্রোতাদের মন জয় করে নেয়।
কেদার চক্রবর্তীর গানের দ্বিতীয় রেকর্ড প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে। এই রেকর্ডেও বন্দি হয় চারটি গান। কেদার চক্রবর্তীর বিখ্যাত ‘কালা আর না বাজান বাঁশরী’ প্রকাশিত হয় এই দ্বিতীয় রেকর্ডে। ১৯৫১ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত এই কেরর্ডটি বিপুলভাবে সমাদৃত হয়। প্রায় এক শতাব্দী আগে লেখা গান ‘কালা আর না বাজান বাঁশরী’ আজও সমান জনপ্রিয়। গান লেখা, গানে সুর করা ও গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি অভিনেতা হিসেবেও সুনাম অর্জন করেছিলেন। তুলসী লাহিড়ীর ‘ছোঁড়া তার’ নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি নেপথ্য সংগীতেও কণ্ঠ দিয়েছিলেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় যে, সে সময় অীভনেত্রীর সংকটের জন্য কেদার চক্রবর্তী নারী সেজে নারী চরিত্রেও দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। এর বাইরেও কেদার চক্রবর্তীর আরেকটি বিশেষ গুণ ছিল- তিনি ছবি আঁকতে পারতেন। তিনি ১৯৪০-৪২ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত অসংখ্য ছবি এঁকেছেন। তিনি ১৯৮৮ সালে আকাশবাণী শিলিগুড়ির অডিশন বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। কেদার চক্রবর্তীর দুজন স্ত্রী- রানী চক্রবর্তী ও বীনা চক্রবর্তী। দুই স্ত্রীর ঘরে কেদার চক্রবর্তীর ছয় ছেলেমেয়ে। তারা হলেন- দিলীপ চক্রবর্তী দুলু, দীপক চক্রবর্তী ফুলু, বিমান চক্রবর্তী বুলু, শ্যামল চক্রবর্তী, চঞ্চল চক্রবর্তী এবং একমাত্র মেয়ে রত্না মুস্তাফি।’
১৯৯২ সালের ১৭ আগস্ট চিরবিদায় নেন ভাওয়াইয়ার অমর সাধক কেদার চক্রবর্তী। কিন্তু রেখে গেছেন অসংখ্য অমূল্য সৃষ্টি, রেখে গেছেন বাংলার মাটির গন্ধে মিশে থাকা গান, যা আজও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে অনুরণিত হয়। সময়ের স্রোত পেরিয়েও তার সুরের জাদু মøান হয়নি; বরং তার কালজয়ী গানের ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নতুন করে প্রেম ও মমতা জাগিয়ে তোলে ভাওয়াইয়ার প্রতি। স্বভাবশিল্পী কেদার চক্রবর্তীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অন্তহীন ভালোবাসা।
একটি প্রাসঙ্গিক কথন
ভাওয়াইয়া গানের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো- একই গানে একই ব্যক্তিকে কখনও তুচ্ছার্থে, আবার কখনও সম্মানার্থে সম্বোধন করা হয়। তাকে ঘিরে ক্রিয়াপদের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। উদহারণ হিসেবে অতি জনপ্রিয় তিনটি গানের চরণ এখানে তুলে ধরা হলো:
ও কি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে
কোন দিন আসিবেন বন্ধু কয়া যাও কয়া যাও রে ॥
…
আরে গেইলে কি আসিবেন ও মোর মাহুত বন্ধু রে
তোমরা গেইলে কি আসিবেন মোর মাহুত বন্ধু রে ॥
…
ওকি একবার আসিয়া
সোনার চান্দ মোর যাও দেখিয়া রে।
ও দিয়া ও দিয়া যান রে বন্ধু
ডারা না হোন পার
ওরে থাক বোল তোর দিবার থুবার
দেখায় পাওয়া ভার রে ॥
উপর্যুক্ত প্রথম গানটিতে ‘আসিবেন’ ও ‘যাও’; দ্বিতীয় গানে ‘তোমরা’ ও ‘আসিবেন’ এবং তৃতীয় গানে ‘যান’ ও ‘তোর’ পদের ব্যবহার একই ব্যক্তিকে ঘিরে।
কেদার চক্রবর্তীর গানেও এ বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট। যেমন- তিনি বলছেন: (ও আহারে) জানিয়াও জানেন না / শুনিয়াও শোনেন না/ আই মোর জ¦লেয়া গেইলেন মনের আগুন / নিভিয়া গেইলেন না। তারপরই বলছেন: ও তোর নয়নে কাজল / তিলেক দণ্ড না দেখিলে / মন হয় রে পাগল। এখানে ‘জানেন না’ ক্রিয়া পদটি সম্মানার্থক সর্বনাম ‘আপনি’র সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যদিও ‘আপনি’ শব্দটি এখানে উহ্য। অন্যদিকে, ‘তোর নয়নে কাজল’ লাইনে যাকে ‘তোর’ বলে সম্বোধন করা হচ্ছে তিনি আর উহ্য থাকা ‘আপনি’ একই ব্যক্তি। ‘তোর’ তুচ্ছার্থের সঙ্গে ‘জানেন না’ সম্মানার্থক শব্দের এই সম্মিলন কিন্তু গানের অন্তর্মাধুর্যের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়নি।
দুঃখজনক বিষয় হলো, ভাওয়াইয়া গান বিকৃত করে গাইতে গিয়ে এ বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করা হচ্ছে। কেদার চক্রবর্তীর এ কালোত্তীর্ণ গানটির কিছ কথাও বিকৃত করে গেয়েছেন অনেকে। যেমন: ‘জ্বলেয়া’ কথাটিকে ‘জ্বালাইয়া’, ‘গেইলেন’কে ‘গেলা’ কিংবা ‘নিভিয়া’ কথাটিকে ‘নিভাইয়া’ গেয়েছেন। ভাওয়াইয়া নিয়ে এ অপচর্চা কাম্য নয়।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী এবং লোকসংগীত গবেষক ও সংগ্রাহক





কমেন্ট করুনঃ