মানুষের রক্তের ছায়ায় কি ঘুমিয়ে থাকে পাখির উড়াল স্বভাব! অথবা মানুষের কণ্ঠ ও কথার ভেতর (এবং) পাখিরা গৃহ রচে হয়ত, এখনও বা সেই কণ্ঠ বাতাসে ও বৃক্ষের পাতায় পাতায় ওড়ে। এমন কী যে পাখির কণ্ঠ তো কোনো দীর্ঘ বাক্য ও ব্যাকরণের সংকলন নয়, বা তা একটি ভাষার মতো প্রশংসা পায়। যেহেতু হৃদয় নয়, বরং মৃদু এবং হ্রস্ব, অথবা হ্রস্ব এবং মৃদু একটি বাক্যের একক স্থির করা ছিল, তখন গ্রামের লোকেরা বলে, অথবা এটা অবশ্যই বটবৃক্ষ, বটে!
গ্রামের লোকেরা অনুকরণ নয় এরূপ বলে বিরিক্ষি। নাম বটই ছিল, ছিল কি! এবং প্রত্যুষে, তা যেন কোনো প্রভাত সংকলনের দৃশ্যই, লোকেরা বটবৃক্ষ পরিচয় ভুলে সচকিত স্বাভাবিক এই যেন। তাহলে, বৃক্ষপ্রেমিক তারা প্রভাত সংকলনের শব্দবন্ধ ও বর্ণনার ভাষাছবির সনির্বন্ধ অনুষঙ্গ লক্ষ করলে দেখা যাবে; হয়ত বা তা চন্দ্রালোকে পুষ্পগন্ধের মতো রূপময় স্তূতিযোগ্য, তথাপি তা যে নয়, তা মোটামুটি নিশ্চিত। সম্ভবত।
কিন্তু হয়ত বা কী যে, যে সংকলন প্রকাশ্য ও গল্প ছড়িয়ে আছে এবং তা অপ্রতুল হলে যা বটবৃক্ষ তা প্রচার মাত্র; কেউ বলে বট নয়, শিরিষ! কেউ বলে শিরিষ নয়, কেউ বলে গাব বটে! অথবা বিলাতি নিম, শেওড়া, পিপুল…! এবং আর আর সকলে এই নতুন সংকলনের শব্দবন্ধ অনুকরণ সঙ্গত করে। অতঃপর, একই বৃক্ষের নাম বিবিধ শব্দবন্ধে উচ্চারিত হলে কল্পনার নতুন স্বরূপ বিস্তর শিল্পকলা হয়, এবং এই শিল্প-আন্দোলন গ্রামের লোকদের মগজে সহজ আনন্দ ছড়িয়ে দেয়। লোকেরা বৃক্ষের নাম ভুলে আকাশ হারিয়ে ফেলে, পুষ্পসুধা হারিয়ে ফেলে, কবিতা হারিয়ে ফেলে। এবং যা কল্পনা প্রতীয়মান হয় না, বসন্তের সেই প্রাচীন সকাল পুনর্বার বৃক্ষের গোপন অভিজ্ঞানে সুপ্ত তা কোথায়? আর বসন্তের গান। আর গৃহের ছায়াউদ্ভাসিত বসন্তের প্রার্থনা। এমন আলোক সংকলিত পুরোনো স্মৃতির ভেতর রাতের আঁধারের বিভ্রমে বৃক্ষ তলিয়ে গেলে মনে পড়ে পাখিরা তবে কোথায়?
লোকেরা বৃক্ষের পরিচয় হারিয়ে হয়ত বা নয় তা বিবিধ স্মৃতির ভেতর যা কিছু চিহ্নিত ছিল একদা এরূপ যে অবর্ণনীয় বৃক্ষের ভেতর তারা নিজেরাই হারিয়ে যায়, কথা হারিয়ে যায় (কথা যদি কেবল উচ্চারণের প্রতিধ্বনি হয় তবে তার গৌরব কী?), অথবা তারা নিজেরাই হারিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল; কেননা যে সকাল রাত্রির আবেগ দ্বারা সীমিত সময়ের নিঃশব্দ কলরবের ভেতর থেকে প্রস্ফুটিত হয়ে অর্থময় ও আলোর সূচনা করে, লোকেরা এমন উপলব্ধির যোগ্য সময়ের ভেতর থামে, কিংবা তারা আবিষ্কার করে কী যে সকালে পাখিদের কণ্ঠস্বর ক্রমশ অনেকদিন ধরে নেই। পাখির যে ভাষা কথা আছে তাদের গৌরবে, এবং সেই সর্বাপেক্ষা শিল্পিত স্বরূপ সকল লোকের অনুভূতির ভেতর ধ্বনিময় ছিল, সকল লোকের ঘুমে চাঁদের অনুকরণ শরীর হয়ে ছিল, সকল লোকের শরীরে এত জাগরণ ঝড় হয়ে থাকে; তবে তারা দেখে তাদের ঘুমের ভেতর কবে পাখিরা নেইÑশরীরের ভেতর পাখিরা উড়ে গেছে।
তখন হারানো সাম্রাজ্যের প্রাচীন বিকেলের দিকে বিলীয়মান ছায়ার ভেতর পাখিশিকারি লোকটিকে তারা খোঁজে, কিন্তু কোথাও তার ছায়া দেখে না; সে যেন অনন্ত দুঃখের কোনো কোনো গোপন পত্রপুষ্পের গন্ধের ভেতর ক্ষীয়মান স্মৃতি হয়ে, কেউ বলে এই মাত্র। বলে সে আমাদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের মধ্যে সুপ্ত কী যে! নয়!
তবে এই হয় যে, সমাচার প্রীতিপূর্বক গোপন এক কৌতূহল খেলা করে, পাখিপ্রেম এবং শিকারের মধ্যে সম্পর্ক ভেবে হাসিঠাট্টার ব্যাপক রগঢ় পৌঁছিল! তবু পাখির যেহেতু বাক্যপুঞ্জ নেই, কেবল সুর হৃদয় হয়ে ছিল। পাখির যেহেতু কৌতূহল নেই (অথবা থাকলেও তার উচ্চারিত শব্দবন্ধ নেই, কেননা পাখির সকল উচ্চারণে সুরেরই বিস্ময়!) কেবল ডানার ভেতর নক্ষত্রের ডাক আছে। লোকেরা আকাশের ভেতর খোঁজে ডানার সাহসÑকতগুলো পিপিলিকা উড়ছে। তবে রাশি রাশি মৃত্যুর সময় উপস্থিত ভেবে ভয় হয়। নিজেদের হাতপা চোখমাথা হাতড়ায়Ñহাত কোথায়? পা কোথায়? চোখ কোথায়? বরফ হয়ে যাওয়া রক্তের শীত অথবা শিশুর কান্না ছুটে আসছে হাতের ভেতর; হাতের ভেতর সমুদ্রের লবণজলে দ্রবীভূত মৃত শিশুর ছবি দেখতে দেখতে হাত হারিয়ে যায়, যেন সমস্ত হস্তশিল্প মৃত্যুর শিল্পকলার ভেতর উচ্চকিতÑমৃত্যু, বৃক্ষ, পাখি, বিদ্যালয়, রক্ত, শব্দ, ভাষা এবং ভাষণ নীরব, দৃশ্যহীন, দুর্নিবার নিরাসক্তির ভেতর ভেসে ভেসে বেড়াতে থাকে। শিকারির ভয়ে দূরে যেতে এমন কী যেÑহাত মানুষের ডানা, তবে তারা উড়ুক দূরে। অথবা এমন কী যে, মানুষের পায়ে যদি চোখের ভাষা থাকে, তবে তারা যাক সমুদ্র পেরিয়ে পাতাল ভ্রমণে, অরণ্যের দূরে। তারা দেখে তাদের পায়ে লেগে থাকা মাটির গন্ধের ভেতর থেকে ডানা মেলে উড়ছে পিপিলিকা। মরিবার তরে এইসব পিপিলিকার উড়ালে ভয়। ভয়ের বিষাদময়তা ছুঁয়ে গেলে পাখিশিকারি লোকটির হাতে জেগে ওঠে এখন একটি ছোট্ট পাখির রক্তাক্ত পালক। তবে কি এই হয়ত বা যে কোথাও যুদ্ধের শীত অথবা শীতযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে? তবে এখন পাঠ্যপুস্তক গুটিয়ে রাখার কাল; এবং ওষুধ, চাল, ডাল, লবণ, চিড়া, কেরসিন, স্যালাইন, কাপড়, শিশুর দুধ, পানি, দিয়াশলাই ইত্যাদির নিতান্ত প্রয়োজনীয় একটি হ্রস্ব তালিকা প্রস্তুত সম্পন্ন হলে পাখিশিকারি লোকটি নিঃশব্দে কথা বলে শরীরের ভেতর, পাখির ভেতর। এবং তার শরীরের ভেতর পাখিদের ভাষা ধ্বনিপ্রতিধ্বনিত হলে সে এইসব প্রতিধ্বনি ফিরিয়ে দেয় পাখির কণ্ঠেÑ
সে বলেÑশাড়িকাপড়
পাখিরা বলেÑশাড়িকাপড়
সে বলেÑদেখো কে এসেছে
পাখিরা বলেÑদেখো কে এসেছে
সে বলেÑবাড়িতে কেউ নেই
পাখিরা বলেÑবাড়িতে কেউ নেই
সে বলেÑঝড় আসছে
পাখিরা বলেÑঝড় আসছে
সে বলেÑমা মরেছে
পাখিরা বলেÑমা মরেছে
সে বলেÑতার কাপড় ছিল না
পাখিরা বলেÑতার কাপড় ছিল না
সে বলেÑতার ভাত ছিল না
পাখিরা বলেÑতার ভাত ছিল না
সে বলেÑমেয়েটা কার সাথে শোয়
পাখিরা বলেÑমেয়েটা কার সাথে শোয়
সে বলেÑঘরে ভাত নেই
পাখিরা বলেÑঘরে ভাত নেই
এবং এইসব শব্দবন্ধ শেখার ধ্বনিপ্রতিধ্বনি চলতে থাকলে পাখিশিকারির মনে হয়, অনেক কথাই সে বলেনি, কিছু কথা তার অনুভূতির ভেতর অনুচ্চারিত ছিল, কিছু কথা ছিল তার হাতের ভেতর লুকিয়ে, কিছু কথা জমে ছিল তার পায়ের তলায় চাপা, তার ঘুমের ভেতর অন্ধ, তার বন্দুকের নলের ভেতর দগ্ধ; তবু পাখিরা তার এইসব অনুচ্চারিত, লুকানো, চাপা দেয়া, অন্ধ, দগ্ধ কথা কীভাবে জানে?
এই কথা ভেবে বিস্ময় হলে বৃক্ষ এবং পাখির গন্ধ নিয়ে পাখিশিকারি হারিয়ে যাওয়া আকাশ, পুষ্পসুধা এবং পাখিদের কবিতার সান্ধ্যসংগীতের ভেতর থামে। যেন তার অনুচ্চারিত অনুভূতি পাখিদের কণ্ঠস্বরে বেজে উঠে কবিতা; কবিতার ভেতর শৈশব, কবিতার ভেতর শরীর, কবিতার ভেতর আকাশের অসীম দিকচক্রবাল; কতদূর ছড়িয়ে নক্ষত্রের কল্পনা, কতদূর তাদের কণ্ঠসুরের ছবি চাঁদের ছায়ায়। পাখিদের কবিতার ভেতর পাখিশিকারি শরীরে শুকনো পাতা, সোনালি খড় সঞ্চয় করে, ছায়া সঞ্চয় করেÑশরীরে শুকনো পাতা, সোনালি খড় এবং ছায়া সংকলিত হলে সেখানে তখন পাখির গন্ধ বিভূষিত আছে;Ñকেননা ছায়ার স্বেচ্ছাচারিতা নেই, ছায়ার ক্লেশ নেই, ছায়ার বেদনাবিষাদিত শূন্যতাবোধ নেই, ছায়ার অশ্রু নেই যে সে পাখিদের মিনতির ভাষা রপ্ত করে। কেননা শরীরে ছায়া ধ্বনিময় হলে ছায়ার ভেতর পাখির কণ্ঠের শব্দবন্ধ ছিলÑহয়ত বা কেন, এ যেন আশ্চর্য এখনও ব্যতিক্রম তা সৌন্দর্য, প্রীতিদায়ক, আকাশমণ্ডলের নীলাভ্র, নক্ষত্রনিচয়ের সূক্ষ্মতম আলোলিখিত পথকে অঙ্কিত করে; এবং এই আলোবিম্বিত পথের ছায়ার ভেতর প্রাচীন বটবৃক্ষ, যা বট তাই অশত্থ অথবা কেউ বলে পাকুড়, সেখানে এই এখন যে বট অথবা অশত্থ অথবা পাকুড়ের রৌদ্রঝিলমিল পাতায় পাখির শরীর মিশে থাকে, অথবা পাতা হয়ত পাখি নয় কি (!) বলে বিভ্রম হয়, অথবা যত পাখি তত পাতার প্রভাতসংগীতের যোগ্য স্বরূপ হয়ে ওঠে; আর পাতার সমস্ত রং, বৃক্ষের সকল শাখাপ্রশাখার ধূসরিত রেখা, আলোছায়ার পারিপাট্য যেন একটি অখণ্ড পাখিরাষ্ট্রসংঘের চিহ্ন; এ যেন এবং এই অনিবার্য যে তা আমাদের গৃহ, তা আমাদের গ্রাম, আমাদের নক্ষত্রনিচয়, আমাদের নদীমাতৃক, তা শস্যের সকল অনুভূতির এক সুদীর্ঘ সংকলন।
পাখিশিকারি লোকটি তখন যত পাতা তত পাখি হলে আনন্দ, সুতরাং গাছে গাছে ঝোপজঙ্গলে তার অবাধ বিচরণ; তার শরীরে গান, তার হাতের ভেতর গান, তার পায়ের তলায় গান, তার চোখের ভেতর গান, তার শরীরের ঘামের ভেতর গান; ঘাম আর ছায়ার ভেতর শরীরের সকল ছায়া, ছায়ার ভেতর তার কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়লে পাখিশিকারি লোকটি একটি রক্তাক্ত পালক উড়িয়ে দেয় আকাশে। অথবা সে পালকটি উড়িয়ে দেয় গ্রামে। রক্তাক্ত পালক উড়িয়ে তার আনন্দ, এই স্বেচ্ছাচারিতায় তার দুঃখ নেই। সে ভাবে পাখি যেহেতু স্বাধীন, তাদের কোনো রাষ্ট্রের সীমানা নেইÑআকাশ এবং গাছের, নদী এবং পাহাড়ের, চর এবং অরণ্যের সকল পাখিতে তার অধিকার। সে কারো পাকা ধান কাটেনি; সে গেছে পাখির উড়ালে, সে যায় পাখির আকাশে, সে আসে পাখির বৃক্ষে। কত কত দিন সে পাখির উড়ালে মগ্ন, দূর দূর মাঠে সে যায় পাখির উড়ালে, দূর দূর আকাশে সে যায় পাখির ডানায়। তার হাতে পাতার বাঁশি, বাঁশিতে পাখি সুর ছড়ালে তবে তার আনন্দ কী যে; যেন সে ওড়ে আকাশে, যেন সে ওড়ে শরীরেÑশরীর থেকে শরীরে। তার বাঁশিতে যেন পাখিরা কথা বলে বৃষ্টির ছন্দে, যেন পাখিরা বেজে ওঠে তার বাঁশির রঙে। তার বাঁশির সুরে, অথবা সুর নয়, তার অনুচ্চারিত লুকানো, চাপা দেয়া, অন্ধ, দগ্ধ অনুভূতি ছিল যে অবুঝ অথবা বোকা পাখিরা পাখিশিকারির আনন্দে উড়ে আসে।
পাখিরা উড়ে উড়ে দূরে দূরে যায়, আবার পাখিশিকারির পাতার বাঁশির ডাকে তারা ফিরে আসে পালকখচিত মাথার উপর, মাথার পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণে উড়ে উড়ে ঘোরে। পাখিরা আবার উড়ে উড়ে দূরে যায়, এবং পাতার বাঁশির সুরে ছুটে আসে মাথার উপর আকাশের পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণে।
পাখিশিকারি হয়ত তার মুঠোর শস্য ছড়িয়ে দেয় একবার, দুইবার, তিনবার, চারবার; অথবা সে শস্যের গন্ধ ছড়িয়ে দেয় ছায়ার ভেতর, এবং পাখিরা উড়ে আসে শস্যের গন্ধে। পাখিরা উড়ালে দেখে শস্যের গন্ধে লেগে আছে মানুষের আদিম ও পবিত্র পুস্তকের বাণী, তারা বাণী শুনে মুগ্ধ ও নির্বাক; পাখিরা দেখে পবিত্র বাণীর পোশাক আছে দীর্ঘ, পোশাকের অলৌকিক রহস্য আছে; যেন সেই পোশাক আলোর তৈরি, সুগন্ধী হাওয়ার তৈরি; যেন ওই পোশাক মেঘের মতো স্পর্শময় এবং ওজনশূন্য। পোশাকের কী গৌরব যে তার কোনো প্রতিধ্বনি নেই, কল্পনার স্বেচ্ছাচার নেই। তখন, পাখিরা দেখে মেঘ ফুঁড়ে উঠছে শস্যের পোশাক, শস্যের পাহাড়। শস্যের পোশাকের ভেতর পাখিরা দেখে মানুষের ঢল নেমেছে, অথবা ছন্দময় মিছিলের ব্যথিত কোরাস। শস্যের গন্ধে ঘুমিয়ে আছে আকাশের বিপুল সীমানা, তাদের আনন্দমিছিলে নিষেধ নেই। শস্যের গন্ধে ভেসে আসে সুর, শস্যের গন্ধে বকধার্মিক গেয়ে চলেছে স্বপ্নপূরণের নতুন গান। তখন, স্বপ্নপূরণের গানে আনন্দে পাখিরা উড়ে আসে; যত পাতা তত পাখি উড়ে এলে পাখিশিকারি শস্যের গন্ধ ছড়িয়ে একে একে অগণিত পাখি শিকার করেÑহত্যা করা পাখি সে ঝুলিয়ে নেয় কাঁধে, এবং কিছু পাখি তার নিপুণ ফাঁদে আটক হলে বন্দি করে খাঁচায়। পাখি শিকারে সে খুলে নেয় সকল পালক, পালক তার মাথায় টুপি সংকলিত হলে সে প্রাচীন রাজা (অথবা রাজার মাথায় প্রাচীন মুকুটের ইতিহাস)। পাখিরা তবে এই যে একদিন তারা রাজার নতুন পোশাকের ভয়ে উড়ালে যায় দূর দূর নিরুদ্দেশে; অথবা পাখিরা দূরের উড়াল ভুলে যায়, তারা এই নতুন রাজার মাথার উপর রাজার পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণে উড়ে উড়ে ঘোরে। রাজা তাদের বলে, হত্যা করা পাখিরা ছিল নষ্ট আত্মার প্রতিরূপ; অথবা ছিল মিথ্যাবাদী, ষঢ়যন্ত্রকারী, আধোগামী, আততায়ী, অপকৃষ্ট, নিন্দুক, পরচর্চাকারী, রাষ্ট্রদোহী, স্বাধীনতাবিরোধী। রাজার পবিত্র বাণী শুনে পাখিরা হয়ত ভয় ভুলে যায়।
তখন, তবু হয়ত, কোনো কোনো পাখি উড়ে উড়ে দূরে দূরে গেলে বৃক্ষ পাখিশূন্য, তারা দূরে দূরে গেলে ফুল শুকিয়ে যায়। তখন তবে কী হয় যে, পাখিশিকারির বিদ্যালয় পড়ুয়া একমাত্র কিশোরী মেয়েটি ফুল সংগ্রহ করতে পারে না। ফুল শুকিয়ে বৃক্ষরা ফুলশূন্য হলে সে তার বাবাকে বকাবাদ্য করে, সে বলে পাখির কিচিরমিচির না থাকলে তার বইপড়া সমাপ্ত হয় কীভাবে। সে তার পাঠ্যবইয়ের ভেতর জমিয়ে রেখেছিল এইসব পাখির কিচিরমিচির, সে তার বিদ্যালয়ের নীল পোশাকের ভেতর ঢুকিয়ে রেখেছিল ডানার কিচিরমিচির; তখন তার বুকে ফুল ফুটেছিল, তখন তার হৃদয়ে পুষ্পসুধা বাগ্মী পাখিদের অবারিত উড়ালে আকাশ চিত্রিত ছিল; ফুল শুকিয়ে গেলে কিশোরী মেয়েটির মন খারাপ, শরীর খারাপ। সে খায় না, বই পড়ে না; যেন তার বই শুকিয়ে মৃত, যেন তার খাবার শুকিয়ে মৃত। তখন পাখিশিকারি লোকটির বউ কাঁদে, তার অশ্রু অস্ফুট ফুল হয়ে ভেসে যায় নদীর তরঙ্গে, অশ্রুফুল তার হৃদয়ে কান্নার গভীর গভীরতর গন্ধের ভেতর সকল বর্ণমালা স্তব্ধ, মলিন; সকল শব্দসংকলন রক্তের প্রতিধ্বনি, ধ্বনিপ্রতিধ্বনি। সে কোথায় পাবে ফুল, কোথায় পাবে পাখির কিচিরমিচির? তখন ভাষার মাসে কিশোরী মেয়েটি শহিদ মিনারে তবে কী নিয়ে যাবে ফুলশূন্য হাতে!
বৃক্ষ ফুলশূন্য হলে গ্রামের লোকেরা সকল ঋতু হারিয়ে ফেলে, এবং প্রত্যুষে তাদের মনে হয় কেবল শীত তাদের শরীরে, শীত তাদের শরীরের সকল শস্যে, শীতের অনুভূতি তাদের পেশি ও পায়ে ছড়িয়েÑতাহলে এত বিরামচিহ্নহীন শীতের বিরুদ্ধে তারা কীভাবে যুদ্ধ করবে। এই অন্তহীন শীতযুদ্ধের ভেতর তারা দেখে পাখির ছোট্ট রক্তাক্ত একটি পালক শরীরের অনুভূতির ভেতর পায়ের অনুভূতির ভেতর ঘুমের অনুভূতির ভেতর উড়ে আসছে, পালকের শরীরে লেগে আছে শুকনো ফুলের তীব্র গন্ধ। তবে কোথায় মৃত্যু হয়েছিল এই পুষ্পগন্ধশোভিত মৃদু পাখিÑএতদিন তারা পাখির মৃত্যু দেখেনি তাদের গ্রামে, এতকাল পাখির মৃত্যু দেখেনি তাদের পাখিরাষ্ট্রসংঘে। এবং এই প্রথম পাখির রক্তাক্ত পালক বিষাদজর্জরিত করলে তারা নীরব ও নির্বাক। তারা ভেবে পায় না, পাখির মৃত্যু তাহলে কোথায়? মানুষের অসুখ হয়Ñমরে যায়, বৃদ্ধ হয়Ñমরে যায়, দুর্ঘটনায় পড়েÑমরে যায়। গৃহে মরে, হাসপাতালে মরে, পথে মরে, হাটেবাজারে মরে, শীতে মরে, গ্রীষ্মে মরে, বর্ষায় মরে, শরতে মরে, বসন্তে মরে, প্রেমে মরে, অপ্রেমে মরে। মানুষের মৃত্যু দেখে তাদের শরীরের ভেতর, হাতের ভেতর। মানুষের মৃত্যু তারা শোনে হৃদয়ের ভেতর, মানুষের মৃত্যু তারা বলে গানের ভেতর। তারা কখনো খুঁজতে যায়নি মানুষের মৃত্যু নদীর স্রোতে বা অরণ্যে, মেঘের নিরুদ্দেশে বা নক্ষত্রে। তারা একদিন পাখির মৃত্যু খুঁজতে ধন্দে পড়েÑকোথায় খুঁজবে তারা পাখির মৃত্যু? তারা নিস্তব্ধ খড়ের দিগন্তে আইসক্রিমওলাকে বলে, পাখির মৃত্যু সে দেখেছে কি না; তারা আকাশের নীল নীল নীলের ভেতর দাঁতের মাজনওলাকে বলে, পাখির মৃত্যু কোথায়; তারা অরণ্যের নিঃশব্দে মনোহারিওলাকে বলে, কেমন তাহলে পাখির মৃত্যু! তারা পাখির মৃত্যু খুঁজে না পেলে দুঃখ পায়, শরীর এবং শুকনো ফুলের গন্ধের ভেতর তারা কেবল রক্তাক্ত পালক উড়তে দেখে। তখন তাদের ধারণা হয়Ñমৃত্যু নয়, তাদের গ্রামে তাদের পাখিরাষ্ট্রসংঘে হয়ত হত্যা করা হয়েছে পাখি। মৃত্যু অথবা হত্যা। হত্যা কিংবা মৃত্যুÑতাদের মনে এই শব্দবন্ধ লুকোচুরি খেলে, রহস্য করে; এবং এই শব্দবন্ধ রক্তের ভেতর গোলকধাঁধা তৈরি করলে তাদের শরীরের ভেতর আলোর মৃত্যু, ফুলের মৃত্যু; অথবা তাদের শরীরের ভাষা হত্যা, কবিতা হত্যা হলে তারা উড়ে আসা রক্তাক্ত পালক তাদের পাঠ্যবইয়ের ভেতর জমা রাখে, তাদের শরীরের ভেতর লুকিয়ে রাখে পালকের অনুভূতি, অথবা কোথায় রাখবে তারা এমন রক্তস্নাত পালক? এবং প্রত্যুষে তাদের মনে হয় তারা পাঠ্যবইয়ের সকল বাক্য ভুলে গেছে, কথা বলছে পাখির কণ্ঠে, এবং বাক্যশূন্য ভাষাশূন্য পাঠ্যবইয়ের সাদা পৃষ্ঠার ভেতর পড়ে আছে রক্তাক্ত পালক। পাঠ্যবইয়ের বাক্য ও ভাষা হারিয়ে, কথা হারিয়ে তারা বোঝে না যে এমন কী তাদের হারিয়েছে, এমন কী তাদের শরীর ও গ্রামের অন্তর ছেড়ে চলে গেছে; কেবল হয়ত কিছু একটা নেই নেই নেই শূন্যতা। গ্রামের সকল লোক পাখির কণ্ঠে বুলি আওড়ালে তখন, তারা রক্তাক্ত পালক হাতে গোধূলিদিগন্তের দিকে যায়, এবং তারা পাখিশিকারির গৃহের দিকে যায়। তারা পাখিশিকারির গৃহে খাঁচার ভেতর কিশোরী মেয়েটিকে দেখে। তারা দেখে, ফুলশূন্য হাতে কিশোরী মেয়েটির শরীরে মড়ার গন্ধÑপাখির কিচিরমিচির স্তব্ধ। তখন, তারা কিশোরী মেয়েটির সঙ্গে পাখির কণ্ঠে কথা বলে, তারা বলেÑকিশোরী মেয়েটি তার প্রতিধ্বনি করেÑ
তোর গায়ে মড়ার গন্ধ?
মড়ার গন্ধ? হতে পারে।
কুকুরশিয়াল মরেছে কোথাও।
কুকুরশিয়াল? মরতে পারে, প্রতিদিনই তো কতজন মরে।
তোর চোখ লাল কেন?
লাল! হতে পারে।
নেশা করেছিস?
নেশা! হতে পারে।
কী খাস?
কী খাই? সবই, যখন যা পাই।
গাঁয়ের সবাই নেশা করে?
গাঁয়ের সবাই? তা একটু করে।
কী খায়?
কী খায়? সবই, যখন যা পায়।
তুই কি অসুস্থ?
অসুস্থ? কী জানি, হতে পারে। কীভাবে জানেন?
তোর মুখ। আয়না আছে তোদের বাড়িতে?
আয়না? গাঁয়ের সবার বাড়িতেই আছে।
আয়নায় নিজের মুখ দেখিস?
নিজের মুখ? মার সামনে গেলেই দেখি।
তোর মা কোথায়?
মা? আয়নার ভেতর।
আয়না কোথায়?
আয়না? খাঁচার ভেতর।
খাঁচা কোথায়?
খাঁচা? চোখের ভেতর।
চোখ কোথায়?
চোখ? চাঁদের ভেতর।
চাঁদ কোথায়? (আকাশে চাঁদ নেই)
চাঁদ? ঘরের চালে।
ঘর কোথায়?
ঘর? রক্তের ভেতর।
রক্ত কোথায়?
রক্ত? অতঃপর নিস্তব্ধতা। আকাশ পানে তাকিয়ে…
নিস্তব্ধতা। মাটির পানে তাকিয়ে…
[অতঃপর নিস্তব্ধতা ভেঙে সে বলে, হত্যার রক্ত। নীল পালকের নিচে বাবার মতো এক-একজন ভাইয়ের শরীরের ক্লেদ। বাবার মতো ভাইয়েরা আমার শরীরের ভেতর গেঁথে দিয়েছে নষ্ট জন্মের ভ্রুণ, আমার হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে আমার যৌনদ্বার খুঁড়ে উপড়ে ফেলেছে তারা। চাঁদের বাইরে মায়ের শরীরের পুষ্পগন্ধ আমার নীল পালকে জড়িয়ে ছিল। ওরা, আমার বাবার মতো ভাই, আমার মাংসের ভেতর আমার নীল পালকের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে তপ্ত লোহার বিষ। আমাকে ধর্ষণ করেছে আমার পুষ্পগন্ধা মায়ের আয়নার ভেতর। আমি আমারই আত্মার রক্তের কালোনীল আগুনের ভেতর ডুবে যেতে যেতে মাকে ডাকি, তখন কান্নাই মায়ের ঈশ্বর। আমি ঈশ্বরকে ডাকি চিৎকারে। ঈশ্বর মৃত্যুগ্রস্ত, কোথায় ঈশ্বর? নেই নেই নেই নেই, নেই নেই ঈশ্বর নেই। চিৎকার করে বাবাকে ডাকি; আমার বাবার মতো ভাইয়েরা আমার কণ্ঠ ছিঁড়ে ছিঁড়ে ছড়িয়ে দেয় শুকনো রক্তধুলোর ভেতর। রক্তধুলোর গন্ধে আমার নিঃশ্বাস আটকে আসে। আমার চোখের ভেতর রক্তের ধুলো ঢুকে পড়ে, আর চারদিক প্রবল ঝড়ের অন্ধকার মাথার খুলির ভেতর লাফিয়ে পড়লে টের পাই নিভে যাচ্ছে পাঠ্যবইয়ের সকল অক্ষর, নিভে যাচ্ছে বৃক্ষ ও বসন্তের গান, নিভে যাচ্ছে গৃহ চন্দ্রালোক ও কণ্ঠ। অতঃপর মৃত্যুঅন্ধকারে কণ্ঠ ভরে ওঠে কান্নার ব্যর্থ চিৎকারে। আমি আমার মায়ের মতো কাঁদিনি, কান্নাই আমার ঈশ্বর না। শুকনো রক্তধুলোর ভেতর ছিঁড়ে ছড়িয়ে দেয়া আমার কণ্ঠে তখন মৃত্যুর স্তব্ধতা চিরে বেজে ওঠে পাখির বুলি।]
নিস্তব্ধতার ভেতর গ্রামের লোকেরা হয়ত কিশোরী মেয়েটির কথা ভুলে যায়, অথবা তারা হয়ত তাদের ব্যক্তিগত দুঃখের ভেতর মেয়েটির মুখ রাতের নক্ষত্র করে রাখে, অথবা মেয়েটিকে তারা লুকিয়ে রাখে তাদের জমানো কথার ভেতর, এবং তখন গ্রামের সকল লোক পাখির কণ্ঠে বুলি আওড়ালে তারা দেখে তাদের পাঠ্যবইয়ের সকল পৃষ্ঠা সাদাÑবর্ণ নেই, বাক্য নেই, গণিত নেই, ব্যাকরণ নেই, সারমর্ম নেই, বিজ্ঞান নেই, কবিতা নেই, ছন্দ নেই, শব্দার্থ নেই, সমাজবিজ্ঞান নেই, শিল্পকলা নেই। কবিতা হারালে, ধ্বনিবিজ্ঞান হারালে, ভাষা হারালে গ্রামের লোকেরা তবে এখন এমন যে কিশোরী মেয়েটির সাথে কীভাবে কথা বলবে নিজস্ব ভাব প্রকাশে, গণিত হারালে তারা বিভ্রান্ত কী যে কীভাবে গণনা করবে বৃক্ষভ্রমিত পাখি ও পাতা। তখন তারা দেখে তাদের পাঠ্যবইয়ের সাদা পৃষ্ঠায় উৎকীর্ণ আছে পাখির রক্তাক্ত পালক।
পাখিশিকারি লোকটি শরীরে শুকনো পাতা, সোনালি খড় এবং ছায়া সঞ্চয় করে রাখলে এসবের ছায়ায় গাথা পাখির বাসার ভেতর সে দেখেছিল পাখির গন্ধ বিভূষিত আছে। পাখিশিকারি লোকটি শরীরে শুকনো পাতা সোনালি খড় এবং ছায়া সঞ্চয় করে রাখলে, হয়ত, পাখিরা তাদের আশ্রয় ভেবে উড়ে আসে, কিচিরমিচির ডাকে; এবং পাখিরা শোনে অথবা দেখে যে, মাথায় পালকের মুকুট পরে তাদের রাজার কণ্ঠে আদিম ও পবিত্র পুস্তকের বাণী; তার কণ্ঠেই কেবল বেজে চলেছে কথা, রাজার পোশাকের অলৌকিক রহস্যের সুগন্ধী হাওয়ার ভেতর পোশাকের কথার কী যে গৌরব! পাখিরা তখন রাজার পোশাকীকথার গৌরবে বুঁদ হয়ে এলে, তখন, পাখিশিকারি বন্দুক হাতে যায় বৃক্ষের ছায়ার নিচে। সে বন্দুক হাতে যায় গোধূলিদিগন্তের দিকে। অথবা সে বন্ধুক হাতে যায় খাঁচার ভেতর। যত পাতা তত পাখি হলে তার আনন্দ। আনন্দে আত্মহারা পাখিশিকারি লোকটি পাতার ছায়ায় মুখ লুকিয়ে থাকা পাখির মৃদু হৃদয়ে গুলি ছুড়লে তার মাংসের ভেতর নীল পালকের ভেতর ঢুকে যায় তপ্ত লোহার বিষ, আর বৃক্ষের পাতায় পাতায় শাখাপ্রশাখায় রক্তের করুণ শিল্পকলা রচিত হয়। আর গুলিবিদ্ধ মৃদু পাখিটি তার হাতে ঢলে পড়লে দেখে নীল পাখির হৃদয়ে কবিতার ছন্দগন্ধ পাঠ্যবইয়ের ভেতর শিশুকণ্ঠে পাখির কিচিরমিচির চিত্রিত ছিল।
পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা সাদা হয়ে গেলে গ্রামের লোকেরা তখন ভাবে যে হয়ত কী এই কিশোরী মেয়েটির বিদ্যালয়ের নীল পোশাকে আবৃত শরীরে ফুল শুকিয়ে গেলে সে পাখি হয়ে উড়ে গেছে, ফুলশূন্যতার বিষাদ তাকে আচ্ছন্ন করলে, কিশোরী মেয়েটি, একদিন বৃক্ষপ্রান্তরের দিকে হেঁটে হেঁটে বিলীয়মান একখণ্ড বিন্দুর ভেতর মিশে যাচ্ছে, অথবা কিশোরী মেয়েটি পাখির ছিন্ন পালকের চূড়ায় ভেসে ভেসে উড়ে যাচ্ছে বৃক্ষের অজস্র পাতার ঝিলমিলের ভেতর; গ্রামের লোকেরা তাদের বৃক্ষ ফুলশূন্য হলে পাখিশিকারি লোকটির খোঁজ করে, তারা দেখে তাদের প্রভাতে পাখির কিচিরমিচির নেই ক্রমশ অনেকদিন ধরে; আর মেঘের ছায়ার ভেতর, পাতার ধ্বনিপ্রতিধ্বনির ভেতর, মাঠের শস্যের ভেতর পাখির কিচিরমিচির না পেলে পাখিশিকারি লোকটির কিশোরী মেয়ে একদিন মেঘের বিন্দু বিন্দু জলকণার ভেতর পাখি হয়ে উড়ে যাচ্ছে গোধূলিদিগন্তের দিকে। অথবা এই কী যে তার পাঠ্যবইয়ের বর্ণমালার গন্ধে পাখির কিচিরমিচির খুঁজে না পেলে সে পাখিতে রূপান্তরিত, গ্রামের লোকেরা অথবা এই কথা অবশ্যই ভাবে যে কিশোরী মেয়েটি হয়ত তার বাবার মতো ভাইয়ের শিকার করা পাখি অথবা হয়ত হত্যা হওয়া পাখিদের বিলাপ ও অশ্রুবিষাদে পাখি হয়ে দূর আকাশে যায়, অথবা যায় গোধূলিমেঘশোভিত বৃক্ষপত্রপুঞ্জের নিঃশব্দ ছায়ায় লুকিয়ে। গ্রামের লোকেরা তবে এই ভাবে যে কিশোরী মেয়েটি ফুল শুকিয়ে গেলে সে পাঠ্যবইয়ের সকল ভাষা নিয়ে গেছে তার ঠোঁটের উড়ালে, সকল বাক্য নিয়ে গেছে মেঘে, সকল অক্ষর নিয়ে গেছে জোনাকিদের আলোপুচ্ছে; তারা এরূপ বিবিধ কারণের গোলকধাঁধায় বিভ্রান্ত এবং তাদের পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা সাদা হয়ে যাওয়ার দিনে একটি পাখির রক্তাক্ত পালক তাদের গ্রামে উড়ে আসতে দেখে। গ্রামের লোকেরা তাদের শরীরের ভেতর এই রক্তাক্ত পালক পরম মমতায় আশ্রয় দিয়ে রাখে, যেন তারা গোপন রাখছে বিদ্যালয়ের নীল পোশাক, লুকিয়ে রাখছে হত্যার রক্ত; এই মাত্র যে! কেননা তখন শরীরে বিরামচিহ্নহীন শীতের ভেতর কত কত কাল তারা নির্বাক নিঃশব্দ ভেঙে কথা বলে ওঠে। তাদের গ্রামের একমাত্র বৃক্ষ, এবং তা বটবৃক্ষ বটে!Ñতারা বলেÑ
বিরিক্ষি, নাম বট।
না এটা শিরিষ গাছ
হ্যাঁ
না এটা গাব গাছ
হ্যাঁ হ্যাঁ
না এটা সুপারি গাছ
হ্যাঁ হ্যাঁ
না এটা তমাল
হ্যাঁ
কবিতা লিখিস
হ্যাঁ
লিখবি না
হ্যাঁ
স্বপ্ন দেখিস
হ্যাঁ
দেখবি না
হ্যাঁ
বই পড়িস
হ্যাঁ
পড়বি না
হ্যাঁ
গণিত জানিস
হ্যাঁ
জানবি না
হ্যাঁ
বিজ্ঞান বুঝিস
হ্যাঁ
বুঝবি না
হ্যাঁ
গাছ লাগাস
হ্যাঁ
লাগাবি না
হ্যাঁ
তোরা কি ক্ষুধার্ত
হ্যাঁ
ক্ষুধা জয় কর [ক্ষুধা জয় করা মহত্ত্বের লক্ষণ]
হ্যাঁ
তোরা কি মেরুদণ্ডহীন
হ্যাঁ
মেরুদণ্ড অত্যন্ত অপ্রয়োজনীয়
হ্যাঁ
কথা বলতে পারিস
হ্যাঁ
বলবি না
হ্যাঁ
চল বাঘ মেরে আসি
হ্যাঁ
আমরাই ইতিহাস, ইতিহাসের নতুন রচয়িতা
হ্যাঁ
ক্ষুধার ইতিহাস, রক্তের ইতিহাস, হত্যার ইতিহাস
হ্যাঁ
শিল্পকলা! শিল্পকলার ইতিহাস!
হ্যাঁ, তাও
একটা শব্দ বাড়তি… বাড়তি শব্দ উচ্চারণ শাস্তিযোগ্য
হ্যাঁ
এইসব কথোপকথন অথবা নির্দেশাবলির উৎকীর্ণ শব্দবন্ধ নতুন স্তূতিসংকলন প্রস্তুত করলে কেউ কেউ উড়ে আসা রক্তাক্ত পালক ভ্রমিত চাঁদে ডুবিয়ে গোপন শৈশবের কবিতা চর্চা করছে, তাদের কেউ কেউ নতুন শব্দবন্ধ সৃষ্টির জন্য প্রবল আত্মপীড়ন করে চলে, তাদের কেউ কেউ হয়ত এমন যে বটবৃক্ষের বিবিধ নামপরিচয় পাখিকণ্ঠে বিবৃত হলে এ এক বিস্তর নতুন কল্পনার শিল্প-আন্দোলন ভেবে রগঢ় করে, অথবা কোনো এলিগোরি রচনার কথা ভাবে। তখন এত এলিগোরি তারা কোথায় লিখবে, এমন শব্দবন্ধের স্রোত মাথার ভেতর অবিরাম ভেঙে পড়লে তারা আবিষ্কার করে সাদা হয়ে যাওয়া পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা। এবং বিস্ময় যে, তারা সাদা হয়ে যাওয়া পাঠ্যবইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা উল্টালেই খুঁজে পায় শুকিয়ে যাওয়া স্বচ্ছ ফুল। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় পাথরে খোদিত চিকিৎসাশাস্ত্রÑসেখানে লিপিবদ্ধ জটিল রোগের ওষুধ আর বিপুল দুর্ভিক্ষ থামিয়ে দেয়ার কৌশল। তৃতীয় পৃষ্ঠায় বিকেলের লুব্ধ মেঘ ঘুমিয়ে গেলে বিষণ্ন নদীর বুকে বালির রূপালি। চতুর্থ পৃষ্ঠায় শুকনো লাল ধুলোর রক্তগন্ধ। পঞ্চম পৃষ্ঠায় ডেমেক্রেসির মিনিয়েচার। ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় নুব্জ্য অধ্যাপকÑযিনি কুকুরের ভাষা বিশেষজ্ঞ, বেওয়ারিশ কুকুর নিধনের প্রতিবাদ করে আলোচিত। সপ্তম পৃষ্ঠায় একটি চৌচির আয়না। অষ্টম পৃষ্ঠায় বিবাহ এবং হত্যা বিষয়ক আইনের খসড়া। নবম পৃষ্ঠায় অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বিষের ব্যবহার প্রাণালি ও প্রতিষেধকদ্রব্যের তালিকা। দশম পৃষ্ঠায় প্রাচীন পুথি ও ব্যাকরণের ধ্বংসাবশেষ, প্রাসাদ ও দুর্গের ভেতর স্তব্ধ খুন হওয়া কবিদের অতৃপ্ত আত্মা। একাদশ পৃষ্ঠায় প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক মানচিত্র [বর্তমানের সঙ্গে যার কোনোই সাদৃশ্য নেই, এবং আশ্চর্যরকম ক্ষীয়মান]। দ্বাদশ পৃষ্ঠায় হারানো ভাষাসমূহ। ত্রয়োদশ পৃষ্ঠায় প্রতিবেশি রাষ্ট্রের কাঁটাতারে হত্যার গন্ধ। চতুর্দশ পৃষ্ঠায় গোপন প্রেমের চুক্তিপত্র ও নদীর বালিসাম্রাজ্য, এত দীর্ঘ যে পৃথিবীর ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন মানচিত্র বলে ভুল হয়। পঞ্চদশপৃষ্ঠায় কয়লার উড়ন্ত ছাইয়ে আঁধার কালো রং ফর্সাকারী ক্রিমের প্রস্তুতপ্রণালি। ষোড়শ পৃষ্ঠায় হারানো পাখিদের স্মরণে রচিত কবিতা-উৎসর্গপত্র। সপ্তদশ পৃষ্ঠার এপ্রিলে লাশের গন্তব্যে লাশ। এভাবে, এরূপ পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টে নতুন এলিগোরির মধ্যে পৌঁছায়। তারা দেখে সাতান্ন পৃষ্ঠা শূন্য; কোনো শব্দ নেই, বাক্য নেই; পৃষ্ঠা জুড়ে ছড়িয়ে আছে দীর্ঘ কালো আঁধার, শুকনো নীল রক্তের আঁধার। তারা সাতান্ন পৃষ্ঠার কালো অধ্যায়ের ভেতর তাদের সকল ভাষার সংকলন হারিয়ে ভয়; তখন তারা পাখিশিকারি লোকটির খোঁজ করে, এবং তাদের মনে হয় এই প্রথম তাদের গ্রামে পাখি হত্যা হলে পাখির রক্ত শুকিয়ে আঁধারÑশুকনো রক্তের আঁধারে শব্দ স্তব্ধ, বাক্য স্তব্ধ, ভাষা স্তব্ধ।
হয়ত পাখিশিকারিকে পাওয়া যায় না; তার গৃহের উঠোনে পড়ে আছে কিশোরী মেয়ের নীল পোশাক, পড়ে আছে পাঠ্যবইয়ের ছেঁড়া টুকরো। তারা খুঁজে পায় নীল পোশাকের ভেতর সঞ্চিত পাখির কিচিরমিচির স্তব্ধ, নীল পোশাকের ভেতর শুকনো ফুল স্তব্ধ। শুকনো স্বচ্ছ ফুলের ভেতর দিয়ে তারা আকাশ দেখে, ফুলের শুকনো ধুলোরক্ত দেখে, রক্তের ইতিহাস দেখে, কান্নার গভীরতর গন্ধের ভেতর স্তব্ধ বর্ণমালা দেখে; আর উড়ে আসা রক্তাক্ত পালক তাদের হ্যাঁ হ্যাঁ করা সংয়ের বুলি আওড়ানো ধ্বনি ভুলে বিপুল শব্দবন্ধের আকাশ চিত্রিত করলে, বৃক্ষ চিত্রিত করলে, নদী চিত্রিত করলে তারা এলিগোরি লেখেÑহয়ত কী যে হয় এইসব এলিগোরি পাখির কণ্ঠবিভূষিত, পাতা ও ফুলের দুর্বিনয় পুরস্কার ছিলÑযা গার্হস্থ্য ক্ষুধায় লিখিত, তা এই মাত্র যে পাখিশিকারি লোকটি বউ এবং কিশোরী মেয়ের অশ্রু অস্বীকার করে গিয়েছিল,Ñপাঠ্যবইয়ের পুষ্পসুধা সে দেখেনি।
উড়ে আসা রক্তাক্ত পালক ভ্রমিত চাঁদে ডুবিয়ে পাঠ্যবইয়ের সাদা হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠায় এলিগোরি লিখতে মাঠে গেলে সবুজ খড়, বাদামের চিরল চিরল পাতা। নদীতে গেলে ঝিরঝির ধুয়ে যাচ্ছে সাদা বালি, মাছের হৃদয়ে চাঁদ। তারা চাঁদের উপমা লেখে পালকে, চাঁদ পাঠ্যবইয়ের সাদা পাতায় জ্যোৎস্না ছড়ালে তাদের সকল অসুখ দূরে যায় পালকের স্পর্শে, তাদের সকল ক্ষুধা মরে যায় পালকের গন্ধে, তাদের সকল গৃহ ছায়া হয় পালকের কণ্ঠে। পালকের স্পর্শে তাদের রোগ সেরে গেলে এতদিন পর তারা গরম ভাত খেতে পায়। পালকের স্পর্শে গ্রামের বন্ধ্যা নারী গর্ভবতী হয়। তাদের জীবনের এলিগোরি রচনার নতুন শিশুবর্ণমালা গৃহে আলোছায়া ছড়িয়ে তবে কী যে তাদের আশ্রয়, গৃহে চাঁদ উঠলে তবে কী যে তাদের পাঠ্যবইয়ের বর্ণমালা ফিরে আসেÑসকল অক্ষরকে চাঁদ মনে হয়, আর পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় ফুলÑরং আর গন্ধে যার জন্ম; এখন তবে এলিগোরিতে যুক্ত হয় নতুন পুষ্পশব্দবন্ধ, নতুন চাঁদবর্ণমালা, নতুন শিশুবর্ণমালা। এখন যখন তাদের গ্রামের আয়নার ভেতর উড়ে আসে রক্তাক্ত পালকের গন্ধ, পালকের স্পর্শে তাদের গৃহের ছায়ায় ভাত রান্না হয়; তারা রক্তাক্ত পালক ভালোবেসে মেলে ধরে জ্যোৎস্নায়, তারা পালক শুকায় সূর্যেÑএভাবে তারা আকাশ আনে হৃদয়ে, হৃদয়কে নক্ষত্রের আয়না। এভাবে তারা দূরকে আনে বর্ণমালায়, নিকটকে জয় করে শিশুর আনন্দে। কিন্তু দূরেরও গণিত ছিল, আগুন ছিল। কিন্তু নিকটেরও হয়ত যে কী ধুলো ছিল, রক্ত ছিল। তারা দূরকে নিকট করতে, নিকটকে আকাশের উড়াল করতে রক্তাক্ত পালক তাদের হাতের ভেতর থেকে উড়ে যায়, পড়ে যায়, উড়ে যায়, ভেসে যায়। হয়ত পালকটি উড়ে উড়ে যায় সূর্যে। অথবা পালকটি উড়ালে গেলে নীল নীল আকাশে সূর্যের আলোর প্রতিফলন গ্রামের গৃহে গৃহে আয়নার ভেতর অথবা খাঁচার ভেতর হেসে ওঠে। তখন উড়ন্ত পালকে প্রতিফলিত সূর্যালোকের দিকে তাকিয়ে পাখিশিকারি লোকটি তার পাখি হয়ে উড়ে যাওয়া কিশোরী মেয়ের জন্য গোপনে কাঁদে, তার হাতের ছায়ায় পাতার বাঁশিতে বিষাদ বাজে। সে তার অশ্রুমতি বউকে বকাবাদ্য করে, মেয়েটি পাখি হয়ে উড়ে গেলে বউ কেন খাঁচায় ডাকেনি; সে বলে, চোখ যদি ফাঁদ না হয় অশ্রু তবে আকাশ জয় করতে পারেনি। পাখিশিকারি লোকটির বউ কিশোরী মেয়ের পাঠ্যবই খুলে দেখায় সকল অক্ষর উড়ে গেছেÑফুল শুকিয়ে ধুলো ধুলো, ধুলোর ভেতর ফুল শুকিয়ে যাচ্ছে খাঁচায়!Ñপাখিশিকারি লোকটির বউ কত কত কাল খাঁচার বাইরে তার নিষেধের শব্দবন্ধ, তাহলে সে বিয়ের পর কত কত কাল দেখেনি গ্রামের পথ, গ্রামের নদী। কীভাবে সে যাবে মেয়ের খোঁজে দিগন্তে অথবা গোধূলির ভেতর, কোন পথে সে যাবে মেয়ের খোঁজে বৃক্ষছায়ায় অথবা চরচরাচর বালির ভেতর? সে দেখেছিল গৃহের অন্ধকারে আয়নাÑতার জগৎ। সে দেখেছিল আয়না নয় এক টুকরো আকাশে তার মুখ চাঁদ হয়ে ফোটে; চাঁদের আকাশে তার মেয়ের জন্ম হলে শিশু যেন চাঁদের সন্তান। মেয়ে বড় হলে আয়নার বাইরে যায়, চাঁদের বাইরে যায়Ñতার কোনো নিষেধের খাঁচা নেই। সে নদীতে নামে, শস্যক্ষেতে যায়, গাছে চড়ে। তার জগতে সে মাকে ডাকে আয়নার বাইরে, চাঁদের বাইরে। মা হয়ত একদিন যায় আয়নার বাইরে, চাঁদের বাইরে; মা হয়ত যেতে যেতে একদিন দেখে আয়নার বাইরে প্রতিফলিত সূর্যালোকে উড়ে যাচ্ছে রক্তাক্ত পালক (আর তার পুষ্পগন্ধা আয়নার ভেতর তার শিশুচাঁদের নীল পালকের ভেতর মাংসের ভেতর বাবার মতো ভাইয়েরা ঢুকিয়ে দিয়েছে তপ্ত লোহার বিষ। অতঃপর সন্তানের মতো ভাইয়েরা তার কণ্ঠ ছিঁড়ে ছিঁড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে শুকনো রক্তের ধুলোর ভেতর, তারা তাকে ধর্ষণ করে তার নীল পালকে মোড়া শিশুচাঁদের চোখের ভেতর। তখন কান্নাই তার একমাত্র ঈশ্বর; সে কাঁদে, সে ঈশ্বরকে ডাকে চিৎকারে। ঈশ্বর মৃত্যুগ্রস্ত। মৃত্যুগ্রস্ত ঈশ্বরকে সে বলে রক্তাক্ত পালকটি বাঁচাতে। কিন্তু কোথায় ঈশ্বর? নেই নেই নেই নেই, নেই নেই ঈশ্বর নেই)।
রক্তাক্ত পালকটি বাঁচাতে গ্রামের লোকেরা ছুটে গেলে তাদের উত্তেজনা ও আতঙ্কে ছোটাছুটি, তাদের চোখের ফাঁদ অশ্রুময় আর ঝাপসা, তখন এমন যে তাদের চোখশূন্য পায়ের ধাক্কায় চুলার খড়ি তিড়িংবিড়িং উল্টালে আগুনের ফুলকি উড়ে গ্রামের দুপুর পোড়ায়, গ্রামের সকল গৃহ পোড়ায়। আগুন নেভাতে গ্রামের লোকেরা নদীর ঝিরঝির পানি আনেÑতখন নদী শুকিয়ে চর চরাচর সাদা বালি, পড়ে থাকে নদীর হাড়। যখন, এখন, আগুনে গৃহ পুড়ে চৌচিরÑমা দেখে তার খাঁচা ভেঙে খান খান, তার চাঁদ ভেঙে খান খান, তার সকল ফুল ভেঙে খান খান; তবে ভাষার মাসে কিশোরী মেয়ে কী নিয়ে যাবে ফুলশূন্য হাতে, গ্রামের লোকেরা দেখে শহিদ মিনারের বেদি ফুলশূন্য বিষাদ ছড়িয়ে এখন এমন যে কীভাবে যাবে খাঁচার বাইরেÑনদীতে, বৃক্ষে অথবা বাদাম ক্ষেতে।
তখন, দুপুরের সূর্য জুড়ে গৃহের মৃত্যু হলে গ্রামের লোকেরা গৃহের ভেতর বহিরাগত; তারা ধূসর দিগন্তের দিকে যায়, সাদা বালির প্রান্তরে যায়Ñরাতের নক্ষত্রে প্রান্তরে বালির আয়না, বালির চাঁদ। বালির আয়নার ভেতর তাদের শরীরে বালির অশ্রু টলমল, বালির চাঁদের ভেতর তাদের ক্ষুধার গন্ধ, তাদের মৃত গৃহের গন্ধ, এবং এই যে প্রথম তারা গৃহ হারালো, এই যে প্রথম হয়ত বা তারা শরীরে অশ্রুর প্লাবন নিয়ে মৃত নদীর জন্যে বিষাদ করে; শরীরে এত অশ্রু যে তাদের শরীরকে মনে হয় নদীÑশরীরে নদী নিয়ে এমন তবে এই যে তারা শরীরের জলে আগুন নেভাতে ব্যর্থ। তখন তাদের শরীর, তাদের নদী শুকনো বালির চর চরাচর, তখন শরীরে বালির চন্দ্রালোকে তারা দেখে অজস্র কাশফুল দুলছেÑতবে এখন হেমন্তকাল, শরৎকাল। এখন অথবা হয়ত বর্ষাকাল, বসন্তকাল। তখন তারা সকল কালের ভেতর দেখে কাশফুল নয় নলখাগড়ার মাথায় দুলছে পাখির পালক। তবে কী যে আগুনে গৃহের মৃত্যু হলে পাখির রক্তাক্ত পালক আশ্রয় নিয়েছে নতুন গৃহে! গ্রামের লোকেরা পালকের দেখা পেলে গৃহের মৃত্যুশোক ভুলে যায়; বৃক্ষের পরিচয় হারিয়ে আকাশ যদি পাখির গৃহের জ্ঞান, তবে তারাও যাবে নতুন গৃহে; তখন তারা নলখাগড়ার বনের ভেতর দেখে বটবৃক্ষের পাতায় পাতায় ভোরের সূচনা। তখন তারা নতুন গৃহ গড়তে চরের সাদা বালির গভীর থেকে তুলে আনে কালো মাটি, তখন ছোট-বড়ো গর্ত ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে। আর শরীরে নদীর অনুভূতি খুলে কেটে আনে খড়।
কিন্তু খড় কেটে আনলে তাহলে পালকের গৃহ কোথায়? গৃহ না থাকলে তাহলে এমন কী যে পাখিদের মৃত্যু। মৃত্যু মৃত্যু মৃত্যু, মৃত্যু মৃত্যু! তখন তাদের মনে হয় তারা পাখির মৃত্যু দেখেনিÑমানুষ যেমন লোকালয়ে ক্রমশ মৃত্যুর ধুলোর ভেতরে যায়। শরীরে অশ্রুর প্লাবন নিয়ে পাখিরা কি তবে মৃত্যুর জন্য চলে যায় লোকালয় ছেড়ে দূরে দূরে, যায় অরণ্যের গভীর নির্জনে; অথবা পাখিদের মৃত্যু কি মিশে যায় শূন্যে, চাঁদের আলোয়? উড়তে উড়তে পাখিদের মৃত্যু মিশে যায় আকাশের নীলে নীলে নীলে…! এই কথা মনে হলে নলখাগড়ার মাথায় মাথায় দেখে পালকের শরীরে অশ্রু ঝিলমিল, চাঁদের অশ্রু ঝিলমিল, বালির অশ্রু ঝিলমিল। অথবা বিন্দু বিন্দু অশ্রুর শিশিরের ভেতর তারা অসংখ্য চাঁদ দেখে, অথবা বিন্দু বিন্দু অশ্রুর শিশিরের ভেতর তারা দেখে পাঠ্যবইয়ের হারিয়ে যাওয়া অক্ষরপুঞ্জ আয়না হয়ে আছে। এত অশ্রুর চাঁদ, অশ্রুর অক্ষরমালা, অশ্রুর আয়না নিয়ে তারা সকল রাতের ভেতর গ্রামের একমাত্র বটবৃক্ষের চারপাশে পরিভ্রমণ করে। দেখে গ্রামে ছড়িয়ে পড়া ছোট-বড়ো গর্তের ভেতর বটপাতার ঝিলমিল জ্যোৎস্নায় উড়ে যাচ্ছে অজস্র পালক। জ্যোৎস্নামথিত উড়ে আসা এইসব পালকে কী যে বিস্ময়; বিস্ময়ে প্রথম পাখি হত্যার সময়ের ভেতর গ্রামের লোকদের নির্বাক কণ্ঠ ছিঁড়ে সকাল বেরিয়ে আসে, কেননা প্রভাতই তাদের কণ্ঠধ্বনি সংকলনের শব্দবন্ধ ও বর্ণনার যোগ্য দৃশ্য। তখন গ্রামের লোকেরা প্রত্যুষ সূর্যালোকে রাতের গৃহ পরিত্যাগ করে উড়ালে যায়, তাদের রূপান্তরিত পাখিজীবন নিয়ে তারা উড়ে উড়ে আসে গ্রামে ছড়িয়ে পড়া ছোট-বড়ো গর্তের খোপরায়। পালক ও পুচ্ছ নাচিয়ে নতুন পাখিরা তখন খোপরা থেকে খোপরার ভেতর ওড়ে ফুড়ুৎফুড়ুৎ।





কমেন্ট করুনঃ